📄 জিহাদের অনুমতিদান
ঐতিহাসিক ইবনে কাছির রহ. বলেন,
নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা যথার্থ ও উপযুক্ত সময়েই জিহাদের বিধান অবতীর্ণ করেছেন। কেননা, মুসলমানগণ যখন মক্কায় ছিলেন, তখন মুশরিকরা ছিল সংখ্যায় অধিক আর মুসলমানগণ ছিলেন অতি অল্প। তখন যদি মুসলমানদের ওপর জিহাদ-বিধান অবতীর্ণ হতো, তাহলে তা তাদের জন্য কঠিন বিবেচিত হতো। এ কারণেই আমরা দেখতে পাই যে, আকাবার রজনীতে যখন মদিনা হতে আগত প্রায় আশিজন নওমুসলিম সাহাবি নবীজির হাতে বায়আত গ্রহণ করেন এবং নবীজিকে বলেন, আল্লাহর রাসুল, আমরা এই উপত্যকাবাসীর (মিনাবাসীর) ওপর আক্রমণ করে এই রাতেই তাদের ধরাশায়ী করে ফেলব, তখন নবীজি উত্তর দেন, আমি এখনো এর জন্য আদিষ্ট হইনি। এরপর মুশরিকরা যখন অত্যধিক অত্যাচার শুরু করে, নবীজিকে দেশান্তরে বাধ্য করে, তার প্রাণনাশের চেষ্টা চালায় এবং নানারকম নির্যাতন-উৎপীড়ন করে তার সঙ্গীদেরকে দেশত্যাগে বাধ্য করে, তখন তাদের একদল হাবশায় গমন করে, অপরদল মদিনায় হিজরত করে। অবশেষে সাহাবায়ে কেরাম যখন মদিনায় স্থির হন এবং মদিনায় নবীজির শুভাগমন হয়, তখন সকলে নবীজির নেতৃত্বে একত্র হন এবং সকলেই নবীজির সাহায্যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন। এভাবে মদিনা যখন মুসলমানদের জন্য একটি ইসলামি রাষ্ট্র ও আশ্রয় গ্রহণের দুর্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন আল্লাহ তাআলা শত্রুর বিরুদ্ধে জিহাদ করার অনুমতি দান করেন এবং এ সম্পর্কিত প্রথম আয়াত নাজিল হয়-
۞ أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا ۚ وَإِنَّ اللَّهَ عَلَىٰ نَصْرِهِمْ لَقَدِيرُ ﴿٣٩﴾ الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِن دِيَارِهِم بِغَيْرِ حَقٍّ إِلَّا أَن يَقُولُوا رَبُّنَا اللَّهُ ۗ
যাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা হচ্ছে, যেহেতু তাদের প্রতি জুলুম করা হয়েছে, তাই তাদেরকে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে (তারা নিজেদের প্রতিরক্ষার্থে যুদ্ধ করতে পারে)। নিশ্চিত জেনে রেখো, আল্লাহ তাদেরকে জয়যুক্ত করতে পরিপূর্ণ সক্ষম। যাদেরকে তাদের ঘরবাড়ি হতে অন্যায়ভাবে কেবল এ কারণে বিতাড়িত করা হয়েছে যে, তারা বলেছিল, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। [সুরা হাজ: ৩৯-৪০ (২২)]
📄 বদর যুদ্ধের পূর্বের অভিযানসমূহ
১. সারিয়্যায়ে সিফুল বাহর। ১ম হিজরি সনের রমজান মাসে সংঘটিত হয়। হামজা বিন আবদুল মুত্তালিব রাযি.-এর নেতৃত্বে ত্রিশজন মুহাজির এতে অংশগ্রহণ করেন। (২১)
২. সারিয়্যায়ে রাবিগ। ১ম হিজরি সনের শাওয়াল মাসে সংঘটিত হয়। উবায়দা ইবনুল হারিস রাযি.-এর নেতৃত্বে ষাটজন মুহাজির সাহাবি এতে অংশগ্রহণ করেন। (২২)
৩. সারিয়্যাতুল খাররার। ১ম হিজরি সনের জিলকদ মাসে সংঘটিত হয়। সাদ বিন আবু ওয়াককাস রাযি.-এর নেতৃত্বে বিশজন সাহাবি এতে অংশগ্রহণ করেন। (২৩)
৪. গাযওয়ায়ে আবওয়া বা গাযওয়ায়ে ওয়াদ্দান। ২য় হিজরি সনের সফর মাসে সংঘটিত হয়। স্বয়ং নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্তরজন মুহাজির সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে এতে অংশগ্রহণ করেন। (২৪)
৫. গাযওয়ায়ে বুওয়াত। ২য় হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসে সংঘটিত হয়। নবীজি দুইশ সাহাবিকে নিয়ে এ অভিযান পরিচালনা করেন। (২৫)
৬. গাযওয়ায়ে সাফওয়ান। ২য় হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসেই সংঘটিত হয়। নবীজি সত্তরজন সাহাবিকে নিয়ে এই অভিযান পরিচালনা করেন। মদিনার চারণভূমিতে কুরয বিন জাবির আল-ফিহরি আক্রমণ করার প্রতিক্রিয়ায় এ গাযওয়া সংঘটিত হয়। (২৬)
৭. গাযওয়ায়ে যুলউশায়রা। ২য় হিজরি সনের জুমাদাল উলা ও জুমাদাল উখরা মাসে সংঘটিত হয়। নবীজি দেড়শ মতান্তরে দুইশ সাহাবিকে নিয়ে এতে অংশগ্রহণ করেন। (২৭)
৮. সারিয়্যায়ে নাখলা। ২য় হিজরি সনের রজব মাসে সংঘটিত হয়। আবদুল্লাহ বিন জাহ্শ আসাদির নেতৃত্বে বারোজন মুহাজির সাহাবি এতে অংশগ্রহণ করেন। (২৮)
বদর যুদ্ধের পূর্বে সংঘটিত এই সকল গাযওয়া ও সারিয়্যার একটিতেও প্রত্যক্ষ লড়াই বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি; মুসলমানরা কোনো মুশরিককে হত্যাও করেনি। কেবল সারিয়্যায়ে নাখলায় আমর ইবনুল হাযরামিকে হত্যা করা হয়েছিল। পবিত্র মাসচতুষ্টয়ের অন্তর্ভুক্ত রজব মাসে এ ঘটনা ঘটায় নবীজি সাহাবিদেরকে ভর্ৎসনা করেন এবং বলেন, 'আমি তোমাদেরকে পবিত্র মাসে লড়াইয়ের নির্দেশ দিইনি।' এরপর নবীজি নিহতের পরিবারকে রক্তপণ প্রদান করেন।
টিকাঃ
২০. গাযওয়া ও সারিয়্যা : নবীযুগে সংঘটিত সামরিক অভিযানসমূহকে হাদিসবিশারদ, সিরাতরচয়িতা ও ঐতিহাসিকগণ দু-ভাগে বিভক্ত করেছেন। এক. গাযওয়া : যেসব অভিযানে নবীজি নিজে অংশগ্রহণ করেছেন এবং নেতৃত্বদান ও পরিচালনা করেছেন। দুই. সারিয়্যা : যেসব অভিযানে নবীজি প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেননি; বরং কোনো সাহাবিকে বাহিনী-প্রধান নির্ধারণ করে অভিযানে প্রেরণ করেছেন। কখনো কখনো অভিযানের সফলতার লক্ষ্যে মূল অভিযানের পূর্বে এক বা একাধিক ক্ষুদ্র বাহিনী প্রেরণ করা হতো। তদ্রূপ শত্রুপক্ষের গতিবিধির তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যেও প্রেরণ করা হতো ক্ষুদ্র কাফেলাকে। শাস্ত্রবিদগণ সেগুলোকেও সারিয়্যারূপে গণ্য করেছেন। উল্লেখ্য, কোনো অভিযানে সরাসরি সংঘর্ষের ঘটনা না ঘটলেও পরিভাষায় তাকে গাযওয়া বা সারিয়্যা বিবেচনা করা হয়।
প্রসিদ্ধ ও অগ্রগণ্য মতানুসারে গাযওয়ার সংখ্যা সাতাশটি, যার মধ্যে আটটি মতান্তরে নয়টিতে প্রত্যক্ষ লড়াই সংঘটিত হয়। গাযওয়াসমূহের মধ্যে প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ গাযওয়া হচ্ছে সাতটি-১. বদর (রমজান, ২য় হিজরি) ২. উহুদ (শাওয়াল, ৩য় হিজরি) ৩. খন্দক (শাওয়াল, ৫ম হিজরি) ৪. খায়বার (মুহাররম, ৭ম হিজরি) ৫. মক্কাবিজয় (রমজান, ৮ম হিজরি) ৬. হুনায়ন (শাওয়াল, ৮ম হিজরি) ও ৭. তাবুক (রজব, ৯ম হিজরি)। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, সীরাত বিশ্বকোষ, ৬/১৪০-১৭৭।
২১. সিফুল বাহর অর্থ সমুদ্রতীর। লোহিত সাগরের উপকূলে মুসলিম বাহিনী শত্রুবাহিনীর মুখোমুখি হওয়ায় এই নামকরণ করা হয়।
২২. মুসলিম বাহিনী বতনে রাবিগ এলাকায় প্রেরিত হওয়ায় এ অভিযানকে সারিয়্যারে রাবিগ নামকরণ করা হয়।
২৩. খাররার অভিমুখে প্রেরিত হওয়ায় অভিযানের নাম সারিয়্যায়ে খাররার।
২৪. আবওয়া: মদিনা হতে প্রায় আশি মাইল দূরে অবস্থিত একটি এলাকার নাম। কুরাইশদের একটি বাণিজ্যকাফেলার গতিরোধের উদ্দেশ্যে এ অভিযান পরিচালিত হলেও কোনো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি।
২৫. বুওয়াত: মদিনা হতে শাম যাওয়ার পথে জুহায়না অঞ্চলের একটি পাহাড়ের নাম। আরেকটি কুরাইশ বাণিজ্যকাফেলার গতিরোধের উদ্দেশ্যে এ অভিযান পরিচালিত হয়েছিল।
২৬. মুসলিম বাহিনী বদরের নিকটবর্তী সাফওয়ান নামক এলাকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল বলে একে গাযওয়ায়ে সাফওয়ান বলা হয়। এই গাযওয়ার আরেক নাম বদরের প্রথম অভিযান। উল্লেখ্য, কুরয বিন জাবির আল-ফিহরি পরবর্তী সময়ে ইসলামগ্রহণ করেন এবং বিভিন্ন অভিযানে মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব দেন।
২৭. মক্কা হতে শামে গমনরত একটি কুরাইশ বাণিজ্যকাফেলাকে বাধাদানের উদ্দেশ্যে এ অভিযান পরিচালিত হয়। মুসলিম বাহিনী ফুলউশায়রা নামক স্থানে পৌঁছার পর জানতে পারে যে, বাণিজ্যকাফেলা কয়েকদিন পূর্বেই এ স্থান অতিক্রম করে চলে গেছে। উক্ত কুরাইশকাফেলা শাম থেকে প্রত্যাবর্তনের সময়ই ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
২৮. নাখলা: মক্কা ও তায়েফের মধ্যে অবস্থিত একটি স্থানের নাম নাখলা। এই অভিযানে যৎসামান্য সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
📄 কিবলা পরিবর্তন এবং এর সূক্ষ্ম তাৎপর্য
শায়খ মুবারকপুরি রহ. বলেন,
সেই সময় অর্থাৎ দ্বিতীয় হিজরির শাবান মোতাবেক ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে আল্লাহ তাআলা বায়তুল মুকাদ্দাসের পরিবর্তে কাবাঘরকে কিবলা হিসেবে গ্রহণ করার নির্দেশ দেন। এই পরিবর্তনের ফলে যেসব দুর্বল ঈমানদার বা কপট ইহুদি মুসলমানদের মাঝে অস্থিরতা ও জটিলতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে মুসলিমবেশে মুসলমানদের কাতারে ঢুকে পড়েছিল, তারা চিহ্নিত হয়ে যায় এবং মুসলমানদের থেকে পৃথক হয়ে পড়ে। ফলে মুসলিম জামাত প্রচুর সংখ্যক প্রতারক ও বিশ্বাসঘাতক হতে মুক্ত ও পবিত্র হয়।
কিবলা পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্ভবত মুসলমানদের এই সূক্ষ্ম বিষয়েও অবগত করা হয়েছে যে, এখন থেকে এক নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে, যার পরিসমাপ্তি ঘটবে উক্ত কিবলা মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে আসার মাধ্যমে। কারণ, কোনো জাতির কিবলা থাকবে শত্রুদের দখলে, এর চেয়ে বিস্ময়ের বিষয় আর কী হতে পারে?! যদি কোনো জাতি হক ও সত্যের পথে থাকে আর তাদের কিবলা অন্যের দখলদারিতেও থাকে, তাহলে অবশ্যই তারা তা একদিন না একদিন মুক্ত করবেই। (২৯)
টিকাঃ
২৯. সফিউর রহমান মুবারকপুরি, আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃষ্ঠা: ১৮২।