📄 আকাবার প্রথম বায়আত
খাযরাজ গোত্রের ছয় যুবকের ইসলামগ্রহণের এক বছর পর নবুওয়তের দ্বাদশ বছর হজের মৌসুমে ইয়াসরিব হতে বারোজনের একটি প্রতিনিধিদল আকাবায় (১৭) উপস্থিত হয়। তাদের মধ্যে দশজন খাযরাজ গোত্রীয় এবং দুজন আওস গোত্রীয়। তারা নবীজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নবীজির হাতে বায়আত গ্রহণ করে। এই বায়আত ইতিহাসে 'প্রথম বায়আতে আকাবা' নামে খ্যাত।
বিশিষ্ট সাহাবি উবাদা বিন সামিত রাযি. বলেন, যেহেতু এ বায়আত সম্পন্ন হয়েছিল জিহাদ-বিধান ফরজ হওয়ার পূর্বে, তাই আমরা নবীজির হাতে নারীদের বায়আতের ন্যায় বায়আত গ্রহণ করলাম। অর্থাৎ আমরা প্রতিজ্ঞা করলাম—আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করব না, চুরি-ছিনতাই, ব্যভিচার করব না, নিজ সন্তানকে হত্যা করব না, স্বেচ্ছায়-স্বজ্ঞানে কারও প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করব না এবং কোনো কল্যাণ-কর্মে নবীজির অবাধ্যতা করব না। আমরা বায়আত গ্রহণ করার পর নবীজি বললেন, যদি তোমরা আপন প্রতিজ্ঞায় অটল থাক, তাহলে তোমাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। আর যদি কোনো অংশ লঙ্ঘন কর, তাহলে তোমাদের পরিণতি আল্লাহর হাতে। আল্লাহ চাইলে তোমাদের শাস্তি দেবেন, চাইলে তোমাদের ক্ষমা করে দেবেন।
এরপর নবীজি দ্বীন ও কুরআন পাঠ শিক্ষা দিতে এবং নামাজে ইমামতি করতে হজরত মুসআব বিন উমায়র রাযি.-কে তাদের সঙ্গে ইয়াসরিবে প্রেরণ করেন। মুসআব রাযি. অতি অল্প সময়ের মধ্যে ইয়াসরিবের প্রতিটি ঘরে ইসলামের মর্মবাণী পৌঁছিয়ে দিতে সক্ষম হন। তার দাওয়াতে সাদ বিন মুআয, উসায়দ বিন হুযায়রসহ ইয়াসরিবের নেতৃস্থানীয় অনেকেই ইসলামের পতাকাতলে শামিল হয়ে দ্বীনের আনসার ও সাহায্যকারীতে পরিণত হয়।
পরবর্তী বছরের (নবুওয়তের ত্রয়োদশ বছরের) হজের মৌসুম আগমনের পূর্বেই মুসআব বিন উমায়র রাযি. কল্যাণ ও সৌভাগ্যের বার্তা নিয়ে নবীজির দরবারে প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি নবীজিকে ইয়াসরিবের বিভিন্ন গোত্রের ইসলামগ্রহণ এবং তাদের সামরিক ও প্রতিরক্ষা শক্তি সম্পর্কে অবগত করেন।
টিকাঃ
১৭. আরবিতে সংকীর্ণ গিরিপথকে 'আকাবা' বলা হয়। মক্কা থেকে মিনায় গমনের পথে মিনার ময়দানের পশ্চিমে অবস্থিত একটি সংকীর্ণ পাহাড়ি পথ 'আকাবা' নামে খ্যাত ছিল। উল্লেখ্য, হজের সময় মিনায় যে তিনটি গুঞ্জকে লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করা হয়, তার প্রথমটি অর্থাৎ জামারায়ে আকাবা এই গিরিপথটির প্রান্তেই অবস্থিত।
📄 আকাবার দ্বিতীয় বায়আত
নবুওয়তের ত্রয়োদশ বছর হজের মৌসুমে হজকর্ম সম্পাদনের উদ্দেশ্যে ইয়াসরিব থেকে তিয়াত্তরজন পুরুষ ও দুজন নারীর একটি মুসলিম জামাত আপন কওমের মুশরিক তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে মক্কায় উপস্থিত হয়। আইয়ামে তাশরিকের মাঝের দিন ১২ জিলহজ তারা আকাবায় নবীজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। মিনার নিকটবর্তী গিরিপথে রাতের অন্ধকারে পূর্ণ গোপনীয়তায় অনুষ্ঠিত এ সাক্ষাতে নবীজির সঙ্গে তার চাচা আব্বাসও ছিলেন। তিনি তখনও মুসলমান হননি। উপস্থিত আনসারি সাহাবিরা নবীজির হাতে বায়আত গ্রহণ করে। বায়আতে উল্লেখ ছিল—নবীজি যখন ইয়াসরিবে হিজরত করবেন, তখন তারা আপন পরিবার-পরিজনের নিরাপত্তায় যেরূপ সচেষ্ট থাকে, নবীজির সার্বক্ষণিক প্রতিরক্ষায়ও সেরূপ সচেষ্ট থাকবে।
বায়আত সম্পন্ন হওয়ার পর নবীজি তাদেরকে জানান যে, মক্কার মুসলমানগণ শীঘ্রই ইয়াসরিবে হিজরত করবেন। তিনি তাদেরকে তাদের মুহাজির ভাইদের সাদর সংবর্ধনা জানাতে এবং তাদের জন্য আবাস ও জীবিকার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব নিতে বলেন। তারা নবীজির নির্দেশ সাদরে গ্রহণ করে নেয়। ইতিহাস সাক্ষী—আনসারি সাহাবিগণ পূর্ণ বিশ্বস্ততার সঙ্গে বায়আতের দাবি রক্ষা করেছিল এবং দ্বীন ও নবীর প্রতি আনুগত্যের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছিল। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তাদেরকে সন্তুষ্ট করেছেন।
📄 দ্রষ্টব্য: দ্বীনের পথে আনসারি সাহাবিগণের ত্যাগ ও নিষ্ঠা
জীবনীশাস্ত্রের গ্রন্থসমূহ হতে আকাবার দ্বিতীয় বায়আতে অংশগ্রহণকারী আনসারি সাহাবিগণের জীবনেতিহাস অধ্যয়ন করলে দেখা যায়—তাদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সাহাবি নবীযুগে বা পরবর্তীকালে বিভিন্ন যুদ্ধে শহিদ হয়েছেন। তেত্রিশজন অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক সাহাবি নবীজির সঙ্গে সকল গাযওয়ায় অংশগ্রহণ করেছেন। তাদের মধ্য হতে বদরের যুদ্ধে শরিক ছিলেন প্রায় সত্তরজন।
এই সব আনসারি সাহাবি আল্লাহ ও রাসুলের সঙ্গে কৃত প্রতিজ্ঞা ও প্রতিশ্রুতি নিষ্ঠার সঙ্গে রক্ষা করেছেন। তাদের অনেকে শাহাদাতের গৌরব লাভ করেছেন, আপন জান আল্লাহর পথে কুরবানি করেছেন এবং শহিদ অবস্থায় আপন রবের সাক্ষাৎ লাভ করেছেন। আবার অনেকে গাজির মর্যাদা লাভ করেছেন, জিহাদে শরিক হয়েও জীবিত থেকেছেন এবং পরবর্তী সময়ে মুসলিম রাষ্ট্রের বিনির্মাণে নেতৃত্ব দিয়েছেন। নবীজির ইন্তেকালের পর তারা ইসলামি রাষ্ট্রের সুমহান ও গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহে শরিক ছিলেন। এ ধরনের মহান ও আদর্শ কাফেলার কর্মপ্রচেষ্টায়ই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইসলামি রাষ্ট্র। কোনো পার্থিব প্রাপ্তির মোহ নয়; বরং একমাত্র জান্নাতই ছিল তাদের কাম্য। আর তাই তারা স্থাপন করতে পেরেছিলেন ত্যাগ ও কুরবানির অনুপম সব দাস্তান। ইতিহাস যদিও পৃথিবীর সকল যুগের সকল শ্রেণির মানুষের কর্ম ও কীর্তির তথ্য সংরক্ষণ করেছে; কিন্তু এই মহান কাফেলার সঙ্গে তুল্য কোনো ব্যক্তি বা দলের নমুনা তুলে ধরতে ইতিহাস সব সময়ই ব্যর্থ হয়েছে।