📄 মিরাজের সফর
একদিকে ঘরের-বাইরের দুই অকৃত্রিম সহযোগী খাদিজা রাযি. ও আবু তালিবের মৃত্যু, অপরদিকে তায়েফের সফরে প্রচণ্ড শারীরিক-মানসিক নিপীড়ন—এই চরম দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আপন নিদর্শনাবলি প্রত্যক্ষ করিয়ে প্রিয় বন্ধুকে সান্ত্বনা দিতে এবং আপন রবের প্রতি প্রিয়নবীর আস্থা ও নির্ভরতা আরও বৃদ্ধি করার মনস্থ করেন। সাইয়েদ আবুল হাসান আলি মিয়া নদবি রহ. লিখেছেন,
ইসরার (ও মিরাজের) ঘটনা এমন কোনো বিচ্ছিন্ন ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক ঘটনা ছিল না, যার উদ্দেশ্য নবীজিকে শুধুই আল্লাহ তাআলার বড় বড় নিদর্শন প্রত্যক্ষ করানো এবং আসমান জমিন ও ঊর্ধ্বলোকের যাবতীয় সৃষ্টিরহস্য নবীজির দৃষ্টিপথে উদ্ভাসিত করা। বরং এই কুদরতি সফরে প্রচ্ছন্ন ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম আরও অনেক রহস্য ও মর্মবাণী এবং সুদূরপ্রসারী ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বহু ইঙ্গিত ও সংকেত নিহিত রয়েছে। ইসরার (ও মিরাজের) ঘটনা এই বাস্তবতাকেই সুদৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করে যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদুল হারাম ও মসজিদুল আকসা উভয় কেবলার নবী, পূর্ব ও পশ্চিম, প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের ইমাম, পূর্ববর্তী নবীগণের উত্তরাধিকারী এবং আগামী মানবপ্রজন্মের পথপ্রদর্শক।
মিরাজের প্রেক্ষাপটে অবতীর্ণ সুরা ইসরা ও সুরা নাজমেও এ ঘোষণা করা হয়েছে। নবীজির মিরাজ সফরে মক্কা আল-কুদসের সঙ্গে এবং মসজিদুল হারাম মসজিদুল আকসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। তার ইমামতিতে সমস্ত আম্বিয়ায়ে কেরাম সালাত আদায় করেছেন। এটি ছিল তার দাওয়াত ও পয়গামের সর্বজনীনতা, ইমামত ও নেতৃত্বের চিরন্তনতা-সর্বোপরি তার শিক্ষা ও সংস্কারের মানবিকতা এবং স্থান-কালের ভিন্নতাভেদে সামগ্রিকতা ও উপযুক্ততার সুস্পষ্ট প্রমাণ। উক্ত সুরায় নবীজির ব্যক্তিত্বের সঠিক ও সুনির্ধারিত রূপ, নেতৃত্বের সুস্পষ্ট বিবরণ, এই উম্মাহর (যাদের উদ্দেশে তিনি প্রেরিত হয়েছেন এবং যারা তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে) প্রকৃত মর্যাদা ও অবস্থান নির্ণয় এবং নববি পয়গাম ও দাওয়াতের বিবরণ ও ভূমিকার কথা উল্লেখ আছে, যা বিশ্বসমাজের প্রতিটি মানবশ্রেণির জন্য প্রযোজ্য ও পরিব্যাপ্ত। (১৬)
এই অলৌকিক ঘটনার মক্কা থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত সফরকে ইসরা এবং মসজিদুল আকসা থেকে ঊর্ধ্বাকাশে গমনকে মিরাজ বলা হয়। মিরাজে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপন প্রভুর সান্নিধ্যলাভে ধন্য হন। মিরাজের সফরেই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়। নবীজি জান্নাত-জাহান্নাম ও জান্নাতি-জাহান্নামিদের পরিস্থিতি স্বচক্ষে দর্শন করেন। এই সুমহান তাৎপর্যমণ্ডিত সফরের পর রিসালাত ও দাওয়াতের কর্মধারা অব্যাহত রাখতে সে রাতেই নবীজি মক্কায় ফিরে আসেন।
টিকাঃ
১৬. আবুল হাসান আলি মিয়া নদবি, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১৪৯।
📄 ইয়াসরিববাসীর ইসলামগ্রহণের সূচনা
নবুওয়তের একাদশ বছর হজের মৌসুমে নবীজি নিজেই ইয়াসরিব (মদিনা)-এর অধিবাসী ছয়জন খাযরাজ বংশীয় যুবককে ইসলামের দাওয়াত দেন। তারা নবীজির দাওয়াত কবুল করে ইসলামগ্রহণ করে। এরপর তারা নবীজিকে নিজেদের কওমের অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করে বলে, আমরা আমাদের কওমকে এমন অবস্থায় রেখে এসেছি যে, তাদের মধ্যে যেরূপ শত্রুতা ও বিভেদ রয়েছে, তা অন্য কারও মধ্যে নেই। আমরা আশাবাদী, আল্লাহ তাআলা আপনার মাধ্যমে তাদেরকে মিলিত ও ঐক্যবদ্ধ করবেন। আমরা তাদের কাছে যাব এবং তাদেরকে আপনার দ্বীনের প্রতি আহ্বান জানাব। আপনার ডাকে সাড়া দিয়ে আমরা যে দ্বীন কবুল করেছি, তাদের সামনেও সে দ্বীন পেশ করব। যদি আল্লাহ তাআলা তাদেরকে আপনার পাশে সমবেত করেন, তাহলে আপনার চেয়ে সম্মানিত অন্য কেউ হবে না।
নওমুসলিম ছয় খাযরাজি সাহাবি ইসলামের সুমহান দাওয়াত নিয়ে ইয়াসরিবে ফিরে যান। তাদের প্রচেষ্টায় ইয়াসরিবের ঘরে-ঘরে আলোচিত হতে থাকে মক্কায় আবির্ভূত শেষ নবীর প্রসঙ্গ।
📄 আকাবার প্রথম বায়আত
খাযরাজ গোত্রের ছয় যুবকের ইসলামগ্রহণের এক বছর পর নবুওয়তের দ্বাদশ বছর হজের মৌসুমে ইয়াসরিব হতে বারোজনের একটি প্রতিনিধিদল আকাবায় (১৭) উপস্থিত হয়। তাদের মধ্যে দশজন খাযরাজ গোত্রীয় এবং দুজন আওস গোত্রীয়। তারা নবীজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নবীজির হাতে বায়আত গ্রহণ করে। এই বায়আত ইতিহাসে 'প্রথম বায়আতে আকাবা' নামে খ্যাত।
বিশিষ্ট সাহাবি উবাদা বিন সামিত রাযি. বলেন, যেহেতু এ বায়আত সম্পন্ন হয়েছিল জিহাদ-বিধান ফরজ হওয়ার পূর্বে, তাই আমরা নবীজির হাতে নারীদের বায়আতের ন্যায় বায়আত গ্রহণ করলাম। অর্থাৎ আমরা প্রতিজ্ঞা করলাম—আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করব না, চুরি-ছিনতাই, ব্যভিচার করব না, নিজ সন্তানকে হত্যা করব না, স্বেচ্ছায়-স্বজ্ঞানে কারও প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করব না এবং কোনো কল্যাণ-কর্মে নবীজির অবাধ্যতা করব না। আমরা বায়আত গ্রহণ করার পর নবীজি বললেন, যদি তোমরা আপন প্রতিজ্ঞায় অটল থাক, তাহলে তোমাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। আর যদি কোনো অংশ লঙ্ঘন কর, তাহলে তোমাদের পরিণতি আল্লাহর হাতে। আল্লাহ চাইলে তোমাদের শাস্তি দেবেন, চাইলে তোমাদের ক্ষমা করে দেবেন।
এরপর নবীজি দ্বীন ও কুরআন পাঠ শিক্ষা দিতে এবং নামাজে ইমামতি করতে হজরত মুসআব বিন উমায়র রাযি.-কে তাদের সঙ্গে ইয়াসরিবে প্রেরণ করেন। মুসআব রাযি. অতি অল্প সময়ের মধ্যে ইয়াসরিবের প্রতিটি ঘরে ইসলামের মর্মবাণী পৌঁছিয়ে দিতে সক্ষম হন। তার দাওয়াতে সাদ বিন মুআয, উসায়দ বিন হুযায়রসহ ইয়াসরিবের নেতৃস্থানীয় অনেকেই ইসলামের পতাকাতলে শামিল হয়ে দ্বীনের আনসার ও সাহায্যকারীতে পরিণত হয়।
পরবর্তী বছরের (নবুওয়তের ত্রয়োদশ বছরের) হজের মৌসুম আগমনের পূর্বেই মুসআব বিন উমায়র রাযি. কল্যাণ ও সৌভাগ্যের বার্তা নিয়ে নবীজির দরবারে প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি নবীজিকে ইয়াসরিবের বিভিন্ন গোত্রের ইসলামগ্রহণ এবং তাদের সামরিক ও প্রতিরক্ষা শক্তি সম্পর্কে অবগত করেন।
টিকাঃ
১৭. আরবিতে সংকীর্ণ গিরিপথকে 'আকাবা' বলা হয়। মক্কা থেকে মিনায় গমনের পথে মিনার ময়দানের পশ্চিমে অবস্থিত একটি সংকীর্ণ পাহাড়ি পথ 'আকাবা' নামে খ্যাত ছিল। উল্লেখ্য, হজের সময় মিনায় যে তিনটি গুঞ্জকে লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করা হয়, তার প্রথমটি অর্থাৎ জামারায়ে আকাবা এই গিরিপথটির প্রান্তেই অবস্থিত।
📄 আকাবার দ্বিতীয় বায়আত
নবুওয়তের ত্রয়োদশ বছর হজের মৌসুমে হজকর্ম সম্পাদনের উদ্দেশ্যে ইয়াসরিব থেকে তিয়াত্তরজন পুরুষ ও দুজন নারীর একটি মুসলিম জামাত আপন কওমের মুশরিক তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে মক্কায় উপস্থিত হয়। আইয়ামে তাশরিকের মাঝের দিন ১২ জিলহজ তারা আকাবায় নবীজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। মিনার নিকটবর্তী গিরিপথে রাতের অন্ধকারে পূর্ণ গোপনীয়তায় অনুষ্ঠিত এ সাক্ষাতে নবীজির সঙ্গে তার চাচা আব্বাসও ছিলেন। তিনি তখনও মুসলমান হননি। উপস্থিত আনসারি সাহাবিরা নবীজির হাতে বায়আত গ্রহণ করে। বায়আতে উল্লেখ ছিল—নবীজি যখন ইয়াসরিবে হিজরত করবেন, তখন তারা আপন পরিবার-পরিজনের নিরাপত্তায় যেরূপ সচেষ্ট থাকে, নবীজির সার্বক্ষণিক প্রতিরক্ষায়ও সেরূপ সচেষ্ট থাকবে।
বায়আত সম্পন্ন হওয়ার পর নবীজি তাদেরকে জানান যে, মক্কার মুসলমানগণ শীঘ্রই ইয়াসরিবে হিজরত করবেন। তিনি তাদেরকে তাদের মুহাজির ভাইদের সাদর সংবর্ধনা জানাতে এবং তাদের জন্য আবাস ও জীবিকার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব নিতে বলেন। তারা নবীজির নির্দেশ সাদরে গ্রহণ করে নেয়। ইতিহাস সাক্ষী—আনসারি সাহাবিগণ পূর্ণ বিশ্বস্ততার সঙ্গে বায়আতের দাবি রক্ষা করেছিল এবং দ্বীন ও নবীর প্রতি আনুগত্যের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছিল। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তাদেরকে সন্তুষ্ট করেছেন।