📄 অবরোধ ও বয়কট
নবীজির পক্ষাবলম্বন করায় এবং নবীজিকে নিরাপত্তা দেওয়ায় কুরাইশরা বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবের মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকল সদস্যের ওপর অবরোধ ও বয়কট আরোপ করে এবং নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তসমূহ গ্রহণ করে।
• এই দুই গোত্রের লোকদের সঙ্গে তারা ক্রয়-বিক্রয় বা কোনো ধরনের লেনদেন করবে না।
• এই দুই গোত্রের কারও সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন করবে না।
• তাদের সঙ্গে যোগাযোগ, সাক্ষাৎ, ওঠা-বসা, কথাবার্তা, মেলামেশা কিছুই করবে না।
• তাদের সঙ্গে কুরাইশরা কোনো সন্ধি করবে না, তাদের প্রতি কোনোপ্রকার দয়া ও করুণা প্রকাশ করবে না।
সকলে যেন এসব শর্ত মেনে চলে, এ উদ্দেশ্যে কুরাইশরা শর্তগুলো একটি কাগজে প্রতিজ্ঞাপত্র হিসেবে লিখে তা কাবা-প্রাচীরে টাঙিয়ে দেয়।
কুরাইশদের আরোপিত এই অবরোধ নবুওয়তের সপ্তম বছরের মুহাররম মাস হতে দশম বছরের মুহাররম মাস পর্যন্ত পূর্ণ তিন বছর স্থায়ী ছিল।
লাগাতার তিন বছরের অবরোধে বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব সীমাহীন দুর্যোগ-দুর্দশার শিকার হয়। একপর্যায়ে যুহায়র বিন আবু উমাইয়া, মুতইম বিন আদি, আবুল বুখতারি বিন হিশাম, যামআ' বিন আসওয়াদ প্রমুখ কুরাইশ ব্যক্তিদের অন্তরে আত্মমর্যাদা ও মহত্ত্ববোধ জেগে ওঠে। তারা সকলে এই অমানবিক অবরোধ প্রত্যাহার ও বাতিল করার চেষ্টা চালায়। তাদের চেষ্টা সফল হলে নবীজি ও তার সঙ্গীগণ সেই গিরিপথ থেকে বের হয়ে আসেন, যেখানে তারা দীর্ঘ তিন বছর অবরুদ্ধ ছিলেন। নতুন করে আবারও শুরু হয় আল্লাহর হুকুমে দ্বীনের পথে অব্যাহত সংগ্রাম এবং ঈমান ও ইসলামের পথে মানুষকে আহ্বানের নিরবচ্ছিন্ন সাধনা।
📄 শোকের বছর: আবু তালিব ও খাদিজা রাযি.-এর পরলোকগমন
অবরোধ ও বয়কটের দুঃসহ তিন বছর শেষ হওয়ার স্বস্তির রেশ কাটতে না কাটতেই একই বছরে ঘটে দু-দুটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা। অবরোধ শেষ হওয়ার ছয় মাস পর নবুওয়তের দশম বছর রজব মাসে মৃত্যুবরণ করেন নবীজির চাচা আবু তালিব। আবু তালিব ছিলেন নবীজির সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধায়ক ও নিরবচ্ছিন্ন সহায়তাকারী। এর পঞ্চাশ দিন পর রমজান মাসে ইন্তেকাল করেন নবীজির সহধর্মিণী আম্মাজান খাদিজা রাযি.। ঘরের-বাইরের দুই পরম নির্ভরতাকে হারিয়ে নবীজি অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে পড়েন। এ কারণেই নবীজি এ বছরকে 'আমুল হুযন' বা শোকের বছর নামকরণ করেন। অবশ্য একের পর এক দুর্যোগময় পরিস্থিতিতেও নবীজি হতোদ্যম হননি; বরং আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা রেখে নিরবচ্ছিন্নভাবে ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
📄 সাওদা বিনতে যামআ রাযি. ও আয়েশা রাযি.-কে বিবাহ
আম্মাজান খাদিজা রাযি.-এর ইন্তেকালের এক মাস পর আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাওদা বিনতে যামআ রাযি.-কে বিয়ে করেন। সাওদা রাযি. ইতিপূর্বে সাকরান বিন আমর রাযি.-এর স্ত্রী ছিলেন। হজরত সাকরান রাযি. ইসলামগ্রহণ করার পর হাবশায় হিজরত করেন এবং সেখানেই মতান্তরে মক্কায় ফেরার পর ইন্তেকাল করেন। হজরত সাওদা রাযি.-এর ইদ্দত ও নির্জনবাস শেষ হলে নবীজি তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন এবং নবুওয়তের দশম বছর শাওয়াল মাসে তাকে বিয়ে করেন। একই মাসে নবীজি আবুবকর সিদ্দিক রাযি.-এর কন্যা আয়েশা রাযি.-কেও বিয়ে করেন। অবশ্য আম্মাজান আয়েশা রাযি.-এর সঙ্গে নবীজির বাসর মদিনায় হিজরতের পরে হয়েছিল।
📄 নবীজির তায়েফ গমন
নবুওয়তের দশম বছরের শাওয়াল মাসে নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলাম প্রচারের জন্য সহায়ক ও উপযুক্ত কোনো ভূমির সন্ধানে বের হন। এ উদ্দেশ্যে নবীজি তার মুক্ত ক্রীতদাস যায়দ বিন হারিসাকে সঙ্গে নিয়ে তায়েফে গমন করেন। তায়েফ মক্কা হতে প্রায় ষাট মাইল দূরে অবস্থিত। নবীজি পায়ে হেঁটেই তায়েফে গমন করেন, পায়ে হেঁটেই সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করেন। পথ অতিক্রমকালে নবীজি আশেপাশে বসবাসকারী প্রতিটি গোত্রকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করেন। কিন্তু কোনো গোত্রই নবীজির দাওয়াতে সাড়া দেয়নি।
নবীজি তায়েফে দশদিন অবস্থান করেন এবং তায়েফবাসীকে এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার দাওয়াত দেন। কিন্তু একজন ব্যক্তিও তার আহ্বানে সাড়া দেয়নি। উল্টো তারা নবীজিকে তায়েফ থেকে বেরিয়ে যেতে বলে। নবীজি যখন তায়েফ থেকে প্রত্যাবর্তনের মনস্থ করেন, তখন তায়েফবাসীর প্ররোচনায় নির্বোধ-দুষ্ট, শিশু-কিশোর ও ক্রীতদাসরা নবীজির পিছু নেয় এবং তাকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও গালাগালি করতে থাকে। তারা নবীজির মোবারক শরীরে পাথর নিক্ষেপ করে নবীজিকে রক্তাক্ত করে। প্রবাহিত রক্তে নবীজির পদযুগল সিক্ত হয়ে ওঠে, পাদুকাদুটি রক্তে পূর্ণ হয়ে যায়।
ন নবীজি তায়েফ থেকে তিন মাইল দূরে অবস্থিত উতবা ও শায়বার একটি আঙুর-বাগানে আশ্রয় গ্রহণ করলে পিছু নেওয়া দুষ্ট লোকেরা ফিরে চলে যায়। এরপর নবীজি ও যায়দ বিন হারিসা একটি আঙুর-গাছের নিচে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করেন।
প্রিয় নবীজি তখন ব্যথা ও কষ্ট, দুঃখ ও মনঃপীড়া এবং মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণায় ভারাক্রান্ত। এই চরম সঙ্গিন মুহূর্তে তিনি আপন রবের প্রতি নিবেদিত ও সমর্পিত হন এবং অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ভাষায় আল্লাহর কাছে নিম্নোক্ত দোয়া করেন-
«اللَّهُمَّ إِلَيْكَ أَشْكُوْ ضُعْفَ قُوَّتِي وَقِلَّةَ حِيْلَتِي وَهَوَانِي عَلَى النَّاسِ، يَا أَرْحَمَ الرَّاحِمِينَ أَنْتَ رَبُّ الْمُسْتَضْعَفِيْنَ ، وَأَنْتَ رَبِّي ، إِلَى مَنْ تَكِلُنِي؟ إلى بَعِيدٍ يَتَجَهَّمُنِي أَمْ إِلى عَدُوٌّ مَلَكْتَه أَمْرِي ؟ إِنْ لَمْ يَكُنْ بِكَ عَلَيَّ غَضَبٌ فَلَا أُبَالِي، وَلَكِنَّ عَافِيَتَكَ هِيَ أَوْسَعُ لِيْ. أَعُوْذُ بِنُوْرِ وَجْهِكَ الَّذِي أَشْرَقَتْ لَهُ الظُّلُمَاتُ، وَصَلُحَ عَلَيْهِ أَمْرُ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ مِنْ أَنْ تُنْزِلَ بِي غَضَبَكَ، أَوْ يَحِلَّ عَلَيَّ سُخْطُكَ، لَكَ الْعُتْبَي حَتَّى تَرْضَى، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِكَ».
হে আল্লাহ, আমি আপন দুর্বলতা ও উপায়হীনতা, অসহায়ত্ব ও কৌশলস্বল্পতা এবং মানুষের কাছে আমার অকিঞ্চিৎকরতা সম্পর্কে আপনার দরবারেই ফরিয়াদ করছি। হে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়াময়, আপনিই অক্ষম ও দুর্বলের প্রতিপালক, আপনিই আমার মালিক। আপনি আমাকে কার হাতে সমর্পণ করছেন?! যারা আমাকে রুক্ষ ব্যবহারে জর্জরিত করবে, এমন অচেনা কারও হাতে? নাকি যারা আমাকে বিপর্যস্ত করার ক্ষমতা রাখে, এমন শত্রুর হাতে? আপনি যদি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট না হন, তাহলে আমি কোনো কিছুর পরোয়া করি না। আপনার ক্ষমা ও নিরাপত্তার শামিয়ানাই আমার জন্য সুপ্রশস্ত সম্বল। আমি আপনার সেই পুণ্য জ্যোতির আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যার প্রভাবে যাবতীয় অন্ধকার বিদূরিত হয়ে চারদিক আলোয় উদ্ভাসিত হয় এবং দ্বীন-দুনিয়ার সবকিছু সুবিন্যস্ত হয়। আমি আমার প্রতি আপনার ক্রোধ ও অসন্তুষ্টি পতিত না হওয়ার প্রার্থনা করছি। আমি আমার ত্রুটি স্বীকার করছি, যতক্ষণ না আপনি সন্তুষ্ট হন। আপনি শক্তি দান না করলে সৎ কাজ করার ও অন্যায় কাজ হতে বিরত থাকার কোনো ক্ষমতা আমার নেই।
দোয়ার প্রতিটি বাক্যে আল্লাহর প্রতি নবীজির অগাধ আস্থা ও নির্ভরতা, দ্বীনের পথে নিষ্ঠাপূর্ণ পদচারণা ও অবিচলতা এবং শত দুঃখ-কষ্টেও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি ও আত্মনিবেদন ফুটে উঠেছে।
নবীজির দোয়া শেষ হতেই ঊর্ধ্বাকাশ হতে নবীজির কাছে আল্লাহ-প্রদত্ত সাহায্য উপস্থিত হয়। আল্লাহ তাআলা পাহাড়-পর্বতের দায়িত্বশীল ফিরেশতাসহ হজরত জিবরাইল আ.-কে নবীজির কাছে প্রেরণ করেন। ফিরেশতাদ্বয় নবীজির কাছে নিবেদন করেন, 'আল্লাহর রাসুল, আপনি অনুমতি দিলে আমরা এখনই দু-পাশের পাহাড় মিলিয়ে দিয়ে তায়েফবাসীকে ধ্বংস করে দিই।'
নবীজি উত্তরে বলেন, 'না, আমি বরং আশা করি, পরবর্তীকালে আল্লাহ তাআলা তাদের মাঝে এমন এক প্রজন্ম সৃষ্টি করবেন, যারা (ইসলামকে বরণ করে নিয়ে) এক আল্লাহর ইবাদত করবে, তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না।'
রহমতের নবীর এই উত্তরে তাঁর অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব, দয়া ও মহত্ত্ব এবং সুমহান চারিত্রিক আদর্শই প্রস্ফুটিত হয়েছে। পাশাপাশি ফুটে উঠেছে নিকট বা দূর-ভবিষ্যতে তায়েফবাসীর ইসলামগ্রহণের প্রত্যাশা।
আল্লাহর দ্বীনকে আল্লাহর জমিনে প্রতিষ্ঠিত করার এই সংগ্রামী সফরে শত বাধার মুখেও নবীজি তখন দৃঢ় প্রত্যয়ী ও অবিচল। অব্যাহত দ্বীন প্রচারের লক্ষ্যে তিনি এবার মুতইম বিন আদি-এর নিরাপত্তা-আশ্রয় গ্রহণ করে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন।