📄 সমঝোতা ও দরকষাকষির পথে
হামজা ও উমরের ইসলামগ্রহণের পর কুরাইশরা সিদ্ধান্ত নেয়— এবার তারা নির্যাতন-নিপীড়নের পথ ছেড়ে ভিন্ন পথে নবীজিকে নিবৃত্ত করার প্রচেষ্টা চালাবে। নবীজিকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান হতে বিরত রাখতে প্রথমে তারা দরকষাকষির পথ অবলম্বন করে এবং নবীজিকে নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও শাসনক্ষমতা প্রদানের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু এ পদ্ধতিও ব্যর্থ হলে তারা নবীজির চাচা আবু তালিবের কাছে উপস্থিত হয়ে তাকে অনুরোধ জানায় যে, তিনি যেন ভ্রাতুষ্পুত্রের প্রতি সমর্থন ও সহায়তা প্রত্যাহার করে নেন। কিন্তু আবু তালিব সুস্পষ্ট ভাষায় তাদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। এবারও ব্যর্থ হওয়ার পর মক্কার কুরাইশরা সম্পূর্ণ নতুন ও অভিনব এক পদ্ধতি অবলম্বন করে। আরবজাতি ও মানবজাতির ইতিহাসে এর অতীত কোনো দৃষ্টান্ত নেই। অবশ্য পরবর্তীকালে অনেক জাতি-গোষ্ঠীই এ পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। আর তা হলো অবরোধ ও বয়কটের পথ।
📄 অবরোধ ও বয়কট
নবীজির পক্ষাবলম্বন করায় এবং নবীজিকে নিরাপত্তা দেওয়ায় কুরাইশরা বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবের মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকল সদস্যের ওপর অবরোধ ও বয়কট আরোপ করে এবং নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তসমূহ গ্রহণ করে।
• এই দুই গোত্রের লোকদের সঙ্গে তারা ক্রয়-বিক্রয় বা কোনো ধরনের লেনদেন করবে না।
• এই দুই গোত্রের কারও সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন করবে না।
• তাদের সঙ্গে যোগাযোগ, সাক্ষাৎ, ওঠা-বসা, কথাবার্তা, মেলামেশা কিছুই করবে না।
• তাদের সঙ্গে কুরাইশরা কোনো সন্ধি করবে না, তাদের প্রতি কোনোপ্রকার দয়া ও করুণা প্রকাশ করবে না।
সকলে যেন এসব শর্ত মেনে চলে, এ উদ্দেশ্যে কুরাইশরা শর্তগুলো একটি কাগজে প্রতিজ্ঞাপত্র হিসেবে লিখে তা কাবা-প্রাচীরে টাঙিয়ে দেয়।
কুরাইশদের আরোপিত এই অবরোধ নবুওয়তের সপ্তম বছরের মুহাররম মাস হতে দশম বছরের মুহাররম মাস পর্যন্ত পূর্ণ তিন বছর স্থায়ী ছিল।
লাগাতার তিন বছরের অবরোধে বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব সীমাহীন দুর্যোগ-দুর্দশার শিকার হয়। একপর্যায়ে যুহায়র বিন আবু উমাইয়া, মুতইম বিন আদি, আবুল বুখতারি বিন হিশাম, যামআ' বিন আসওয়াদ প্রমুখ কুরাইশ ব্যক্তিদের অন্তরে আত্মমর্যাদা ও মহত্ত্ববোধ জেগে ওঠে। তারা সকলে এই অমানবিক অবরোধ প্রত্যাহার ও বাতিল করার চেষ্টা চালায়। তাদের চেষ্টা সফল হলে নবীজি ও তার সঙ্গীগণ সেই গিরিপথ থেকে বের হয়ে আসেন, যেখানে তারা দীর্ঘ তিন বছর অবরুদ্ধ ছিলেন। নতুন করে আবারও শুরু হয় আল্লাহর হুকুমে দ্বীনের পথে অব্যাহত সংগ্রাম এবং ঈমান ও ইসলামের পথে মানুষকে আহ্বানের নিরবচ্ছিন্ন সাধনা।
📄 শোকের বছর: আবু তালিব ও খাদিজা রাযি.-এর পরলোকগমন
অবরোধ ও বয়কটের দুঃসহ তিন বছর শেষ হওয়ার স্বস্তির রেশ কাটতে না কাটতেই একই বছরে ঘটে দু-দুটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা। অবরোধ শেষ হওয়ার ছয় মাস পর নবুওয়তের দশম বছর রজব মাসে মৃত্যুবরণ করেন নবীজির চাচা আবু তালিব। আবু তালিব ছিলেন নবীজির সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধায়ক ও নিরবচ্ছিন্ন সহায়তাকারী। এর পঞ্চাশ দিন পর রমজান মাসে ইন্তেকাল করেন নবীজির সহধর্মিণী আম্মাজান খাদিজা রাযি.। ঘরের-বাইরের দুই পরম নির্ভরতাকে হারিয়ে নবীজি অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে পড়েন। এ কারণেই নবীজি এ বছরকে 'আমুল হুযন' বা শোকের বছর নামকরণ করেন। অবশ্য একের পর এক দুর্যোগময় পরিস্থিতিতেও নবীজি হতোদ্যম হননি; বরং আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা রেখে নিরবচ্ছিন্নভাবে ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
📄 সাওদা বিনতে যামআ রাযি. ও আয়েশা রাযি.-কে বিবাহ
আম্মাজান খাদিজা রাযি.-এর ইন্তেকালের এক মাস পর আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাওদা বিনতে যামআ রাযি.-কে বিয়ে করেন। সাওদা রাযি. ইতিপূর্বে সাকরান বিন আমর রাযি.-এর স্ত্রী ছিলেন। হজরত সাকরান রাযি. ইসলামগ্রহণ করার পর হাবশায় হিজরত করেন এবং সেখানেই মতান্তরে মক্কায় ফেরার পর ইন্তেকাল করেন। হজরত সাওদা রাযি.-এর ইদ্দত ও নির্জনবাস শেষ হলে নবীজি তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন এবং নবুওয়তের দশম বছর শাওয়াল মাসে তাকে বিয়ে করেন। একই মাসে নবীজি আবুবকর সিদ্দিক রাযি.-এর কন্যা আয়েশা রাযি.-কেও বিয়ে করেন। অবশ্য আম্মাজান আয়েশা রাযি.-এর সঙ্গে নবীজির বাসর মদিনায় হিজরতের পরে হয়েছিল।