📄 মুহাজিরদের ফিরিয়ে আনতে মক্কার মুশরিকদের ষড়যন্ত্র
সাহাবায়ে কেরামের দ্বিতীয়বার হাবশায় হিজরতের পর মক্কার কুরাইশরা মুহাজির-কাফেলাকে মক্কায় ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা চালায়। এ উদ্দেশ্যে তারা আমর ইবনুল আস ও আবদুল্লাহ বিন আবু রাবিয়াকে হাবশায় প্রেরণ করে। পূর্বপুরুষদের ধর্ম ত্যাগ করে নতুন ধর্ম গ্রহণকারী মুহাজিরদের ফিরিয়ে দিতে হাবশা-অধিপতি নাজাশিকে(১৫) রাজি করানোর জন্য তারা দুজন মিথ্যা ও প্রতারণার আশ্রয় নেয়। রাজদরবারে নাজাশি ও হাবশায় আশ্রয়গ্রহণকারী মুহাজির-কাফেলার প্রতিনিধি জাফর বিন আবু তালিব রাযি.-এর মধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। জাফর রাযি. কুরাইশ প্রতিনিধিদলের সমস্ত মিথ্যা অভিযোগ খণ্ডন করে নাজাশির সামনে নিজেদের নিষ্ঠা ও সততা প্রমাণ করতে সক্ষম হন। হাবশা-রাজ নাজাশি মুহাজির কাফেলাকে মক্কায় ফেরত পাঠানোর পরিবর্তে নিজেই গোপনে ইসলামগ্রহণ করেন এবং সপ্তম হিজরিতে (৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে) খায়বার যুদ্ধ চলাকালে মুহাজির-কাফেলার মদিনায় গমনের পূর্ব পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে তাদের নিরাপত্তা ও সহযোগিতা প্রদান করেন।
টিকাঃ
১৫. নাজাশি কোনো বিশেষ ব্যক্তির নাম নয়; বরং তৎকালীন আবিসিনিনিয়া সাম্রাজ্যের প্রত্যেক অধিপতিকেই সম্মানসূচক সম্বোধন হিসেবে নাজাশি বলা হতো। তদ্রূপ রোমান সাম্রাজ্যের অধিপতিকে কায়সার, পারস্য সাম্রাজ্যের অধিপতিকে কিসরা, মিশর ও আলেকজান্দ্রিয়ার শাসককে মুকাওকিস এবং তুর্কি সাম্রাজ্যের অধিপতিকে খাকান বলা হতো। আলোচ্য নাজাশি বা হাবশা-রাজের নাম ছিল আসহামা বিন আবজার। তিনি সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি, যার জন্য নবীজি গায়েবি জানাযা আদায় করেছিলেন। তিনি মক্কা বিজয়ের পূর্বেই ইন্তেকাল করেন।
📄 প্রথমে হামজা ও তারপর উমর ইবনুল খাত্তাবের ইসলামগ্রহণ
নবুওয়তের ষষ্ঠ বছরের শেষদিকে মহান আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের প্রভাব মজবুত ও সুদৃঢ় করার এবং কাফির ও মুশরিকদের লাঞ্ছিত ও হীনবল করার ইচ্ছা করেন। এ সময় প্রথমে ইসলামগ্রহণ করেন নবীজির পিতৃব্য ও কুরাইশ গোত্রের সম্ভ্রান্ত ও শক্তিশালী যুবক হামজা রাযি.। এর তিনদিন পরই ইসলামগ্রহণ করেন আরেক তেজস্বী যুবক উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি.। উমরের ইসলামগ্রহণ মক্কার মুশরিকসমাজে বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং মুশরিকরা নিজেদেরকে লাঞ্ছিত-অপমানিত ভাবতে শুরু করে। বিপরীতে মুসলমানরা লাভ করে গৌরব ও আনন্দ-অনুভূতি।
বিশিষ্ট সাহাবি আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রাযি. বলতেন, 'উমর ইসলামগ্রহণ করার পূর্বে আমরা কাবার কাছে নামাজ আদায় করতে পারিনি।'
সুহায়ব বিন সিনান রাযি. বলেন, 'উমরের ইসলামগ্রহণের পরই ইসলাম পূর্ণরূপে আত্মপ্রকাশ করে এবং প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত প্রদানের পথ সুগম হয়। আমরা কাবাগৃহের পাশে উপবেশন ও তাওয়াফ করার সুযোগ পাই। এতদিন যারা আমাদের সঙ্গে নির্দয় আচরণ করত, এবার আমরা তাদের প্রতিবাদ করার এবং মন্দ আচরণের কিছু অংশ তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ পাই।'
আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রাযি. আরও বলেন, 'উমরের ইসলামগ্রহণের পর থেকে আমরা সর্বদা মর্যাদাসম্পন্ন ছিলাম।'
📄 দ্রষ্টব্য: হজরত উমর রাযি.-কে 'আল-ফারুক' নামকরণের কারণ
বিশিষ্ট তাবেয়ি মুজাহিদ রহ. হতে বর্ণিত, হজরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রাযি. বলেন, আমি একবার উমর ইবনুল খাত্তাবকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাকে 'আল-ফারুক' নামকরণ করা হয়েছে কেন? তিনি উত্তর দিলেন, হামজা আমার তিনদিন পূর্বে ইসলামগ্রহণ করেন। এ কথা বলার পর উমর তার ইসলামগ্রহণের ইতিবৃত্ত বর্ণনা করেন। শেষে তিনি বলেন, ইসলামগ্রহণ করার পর আমি নবীজিকে বললাম, আল্লাহর রাসুল! মারা যাই বা বেঁচে থাকি, আমরা কি হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত নই? নবীজি উত্তর দিলেন, অবশ্যই! ওই মহান সত্তার শপথ, যার কুদরতি হাতে আমার জীবন! মারা যাও বা বেঁচে থাকো, সর্বাবস্থায় তোমরা ন্যায় ও সত্যের পথে আছ। তখন আমি নবীজিকে প্রশ্ন করলাম, তাহলে কেন এই সঙ্গোপন?! ওই মহান সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন! অবশ্যই আমরা বাইরে বের হব। এরপর আমরা দুটি কাতার করে নবীজিকে নিয়ে বের হয়ে এলাম। এক কাতারের অগ্রভাগে ছিলেন হামজা, অপর কাতারের অগ্রভাগে আমি। আমরা যখন পথ চলছিলাম, রাস্তাজুড়ে জাঁতা-পেষা আটার মতো ধুলা উড়ছিল। আমরা মসজিদে প্রবেশ করলাম। সারিদুটির সম্মুখে আমাকে ও হামজাকে দেখে কুরাইশরা এমন হতভম্ব ও বিষণ্ণ হয়ে পড়ল, যা তারা ইতিপূর্বে কখনো হয়নি। সেদিনই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে 'আল-ফারুক' উপাধি দান করেন।
📄 সমঝোতা ও দরকষাকষির পথে
হামজা ও উমরের ইসলামগ্রহণের পর কুরাইশরা সিদ্ধান্ত নেয়— এবার তারা নির্যাতন-নিপীড়নের পথ ছেড়ে ভিন্ন পথে নবীজিকে নিবৃত্ত করার প্রচেষ্টা চালাবে। নবীজিকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান হতে বিরত রাখতে প্রথমে তারা দরকষাকষির পথ অবলম্বন করে এবং নবীজিকে নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও শাসনক্ষমতা প্রদানের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু এ পদ্ধতিও ব্যর্থ হলে তারা নবীজির চাচা আবু তালিবের কাছে উপস্থিত হয়ে তাকে অনুরোধ জানায় যে, তিনি যেন ভ্রাতুষ্পুত্রের প্রতি সমর্থন ও সহায়তা প্রত্যাহার করে নেন। কিন্তু আবু তালিব সুস্পষ্ট ভাষায় তাদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। এবারও ব্যর্থ হওয়ার পর মক্কার কুরাইশরা সম্পূর্ণ নতুন ও অভিনব এক পদ্ধতি অবলম্বন করে। আরবজাতি ও মানবজাতির ইতিহাসে এর অতীত কোনো দৃষ্টান্ত নেই। অবশ্য পরবর্তীকালে অনেক জাতি-গোষ্ঠীই এ পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। আর তা হলো অবরোধ ও বয়কটের পথ।