📄 হাবশায় প্রথম হিজরত
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, নবুওয়তের চতুর্থ বছর হতেই নির্যাতন-নিপীড়নের ধারা শুরু হয়েছিল। নবুওয়তের পঞ্চম বছরের মধ্যভাগে এসে নির্যাতনের মাত্রা চরম অসহনীয় পর্যায়ে উপনীত হয়। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপন সাহাবিদের এই অবর্ণনীয় কষ্ট দেখে তাদেরকে বলেন, 'তোমরা যদি হাবশা-ভূমিতে(১৪) চলে যাও, তাহলে কল্যাণকর হবে। কেননা, সেখানে এমন এক শাসক আছেন, যার রাজত্বে কেউ জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয় না। হাবশা হলো সত্যের ভূমি। আল্লাহ তাআলা যতদিন না তোমাদেরকে চলমান দুর্যোগ থেকে মুক্তি দান করেন, ততদিন তোমরা সেখানেই থাকবে।'
নবীজির নির্দেশে বারোজন পুরুষ ও চারজন নারীর একটি সাহাবা-কাফেলা নবুওয়তের পঞ্চম বছর রজব মাসে হাবশায় হিজরত করে। কাফেলার নেতৃত্বে ছিলেন উসমান বিন আফফান রাযি। তার সঙ্গে তার সহধর্মিণী নবীকন্যা রুকাইয়া রাযি.-ও ছিলেন।
টিকাঃ
১৪. হাবশা : আরব উপদ্বীপ হতে সরাসরি দক্ষিণে অবস্থিত একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী সাম্রাজ্য ছিল হাবশা বা আবিসিনিয়া। বর্তমান ইরিত্রিয়া, উত্তর ইথিওপিয়া, সোমালিয়ার উত্তর-পূর্ব অংশ, জিবুতি, মিশরের দক্ষিণাঞ্চল, সুদানের পূর্বাঞ্চল ও ইয়ামেনজুড়ে এর বিস্তৃতি ছিল।
📄 মুহাজিরদের মক্কায় প্রত্যাবর্তন
মাসতিনেক পরই হাবশায় হিজরতকারী মুহাজির-কাফেলার কাছে এই ভুল সংবাদ পৌঁছায় যে, মক্কার কুরাইশরা সকলে ইসলামগ্রহণ করেছে। এ সংবাদ পেয়ে একই বছরের শাওয়াল মাসে মুহাজির-কাফেলা মক্কায় ফিরে আসে। মক্কায় প্রবেশ করার পূর্বেই প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অবগতি লাভ করায় অনেকেই পুনরায় হাবশায় ফিরে যায় আর কয়েকজন সাহাবি অতি সঙ্গোপনে বা নেতৃস্থানীয় কোনো কুরাইশ ব্যক্তির নিরাপত্তা-আশ্রয় গ্রহণ করে মক্কায় প্রবেশ করে।
📄 হাবশায় দ্বিতীয় হিজরত
প্রথমবারের হিজরতের পর যারা মক্কায় ফিরে এসেছিল, তাদের প্রতি কুরাইশদের নির্যাতন ও নিপীড়ন আরও বৃদ্ধি পায়। গোত্রের লোকেরা তীব্র ক্রোধ নিয়ে নব উদ্যমে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে অমানুষিক নির্যাতন চালাতে থাকে। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদেরকে দ্বিতীয়বার হাবশায় হিজরতের অনুমতি প্রদান করেন। দ্বিতীয়বারের এই হিজরত ছিল প্রথমবারের চেয়েও কষ্টসাধ্য। এবার হিজরত করে তিরাশিজন পুরুষ ও আঠারোজন নারী সাহাবি।
📄 মুহাজিরদের ফিরিয়ে আনতে মক্কার মুশরিকদের ষড়যন্ত্র
সাহাবায়ে কেরামের দ্বিতীয়বার হাবশায় হিজরতের পর মক্কার কুরাইশরা মুহাজির-কাফেলাকে মক্কায় ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা চালায়। এ উদ্দেশ্যে তারা আমর ইবনুল আস ও আবদুল্লাহ বিন আবু রাবিয়াকে হাবশায় প্রেরণ করে। পূর্বপুরুষদের ধর্ম ত্যাগ করে নতুন ধর্ম গ্রহণকারী মুহাজিরদের ফিরিয়ে দিতে হাবশা-অধিপতি নাজাশিকে(১৫) রাজি করানোর জন্য তারা দুজন মিথ্যা ও প্রতারণার আশ্রয় নেয়। রাজদরবারে নাজাশি ও হাবশায় আশ্রয়গ্রহণকারী মুহাজির-কাফেলার প্রতিনিধি জাফর বিন আবু তালিব রাযি.-এর মধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। জাফর রাযি. কুরাইশ প্রতিনিধিদলের সমস্ত মিথ্যা অভিযোগ খণ্ডন করে নাজাশির সামনে নিজেদের নিষ্ঠা ও সততা প্রমাণ করতে সক্ষম হন। হাবশা-রাজ নাজাশি মুহাজির কাফেলাকে মক্কায় ফেরত পাঠানোর পরিবর্তে নিজেই গোপনে ইসলামগ্রহণ করেন এবং সপ্তম হিজরিতে (৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে) খায়বার যুদ্ধ চলাকালে মুহাজির-কাফেলার মদিনায় গমনের পূর্ব পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে তাদের নিরাপত্তা ও সহযোগিতা প্রদান করেন।
টিকাঃ
১৫. নাজাশি কোনো বিশেষ ব্যক্তির নাম নয়; বরং তৎকালীন আবিসিনিনিয়া সাম্রাজ্যের প্রত্যেক অধিপতিকেই সম্মানসূচক সম্বোধন হিসেবে নাজাশি বলা হতো। তদ্রূপ রোমান সাম্রাজ্যের অধিপতিকে কায়সার, পারস্য সাম্রাজ্যের অধিপতিকে কিসরা, মিশর ও আলেকজান্দ্রিয়ার শাসককে মুকাওকিস এবং তুর্কি সাম্রাজ্যের অধিপতিকে খাকান বলা হতো। আলোচ্য নাজাশি বা হাবশা-রাজের নাম ছিল আসহামা বিন আবজার। তিনি সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি, যার জন্য নবীজি গায়েবি জানাযা আদায় করেছিলেন। তিনি মক্কা বিজয়ের পূর্বেই ইন্তেকাল করেন।