📄 নির্যাতন-নিপীড়নের অধ্যায়
নবুওয়তের চতুর্থ বছর যখন প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াতি কার্যক্রম শুরু হয়, তখন থেকেই ব্যাপকভাবে সকল মুসলমান এবং বিশেষভাবে দুর্বল মুসলমানগণ কুরাইশদের ক্রোধ ও ক্ষোভের শিকার হতে থাকে। প্রত্যেক শাখা-গোত্রের গোত্রপতিগণ নিজ নিজ গোত্রের মুসলিম সদস্যদের ওপর নির্যাতন শুরু করে। প্রত্যেক মনিব তার মুসলিম ক্রীতদাসদের ওপর হিংস্র উন্মত্ততায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। সীমিত সংখ্যক মুসলমানের ছোট্ট কাফেলার ওপর নেমে আসে নির্যাতনের এমন এক কঠিন ও বিভীষিকাময় অধ্যায়, যা পাঠ করলেও দেহ-মন প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। নমুনাস্বরূপ কিছু দৃষ্টান্ত পেশ করা হলো-
• স্বয়ং নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু লাহাব, আবু জাহল, উকবা বিন আবু মুইত, উমাইয়া বিন খালফ প্রমুখ শীর্ষস্থানীয় মুশরিক সর্দারদের পক্ষ হতে ক্রমাগত নির্যাতন ও বিদ্রূপ-আচরণের সম্মুখীন হন।
• আবু বকর সিদ্দিক রাযি.-কে মুখমণ্ডলজুড়ে প্রচণ্ড প্রহার করা হয়। মুশরিকদের প্রহারে তিনি যখন অচেতন হয়ে পড়েন, তখন তারা তাকে মৃত মনে করে প্রহার বন্ধ করে।
• উসমান বিন আফফান রাযি.-কে তার চাচা খেজুরপত্রের চাটাইয়ের ভেতর আটকে প্রহার করে এবং চাটাইয়ের অভ্যন্তরে ধোঁয়া প্রবেশ করিয়ে তাকে শ্বাসরুদ্ধ করার চেষ্টা করে।
• মুসআব বিন উমায়র রাযি.-এর মা পুত্রের ইসলামগ্রহণের কথা জানতে পেরে তার পানাহার বন্ধ করে দেন এবং তাকে বন্দি করে রাখেন। অবশেষে তিনি হাবশায় হিজরত করেন।
• সাদ বিন আবু ওয়াককাস রাযি. তার মুশরিক মায়ের পক্ষ হতে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন। তাকে ইসলামত্যাগে বাধ্য করতে মা তার পানাহার বন্ধ করে দেন।
এগুলো কুরাইশ গোত্রের সম্ভ্রান্ত ও নেতৃস্থানীয় মুসলমানদের দুর্যোগের কিছু খণ্ডচিত্র। তাহলে যেসব মুসলমান ছিলেন ক্রীতদাস বা মুক্ত দাস, অথবা যাদের ছিল না কোনো প্রতিপত্তি বা নিরাপত্তা-প্রতিশ্রুতি, তাদের জীবনে কী নিদারুণ দুর্যোগ নেমে এসেছিল, তা সহজেই অনুমেয়। উদাহরণস্বরূপ—
• বিলাল বিন রবাহ রাযি. নির্যাতিত হন তার মালিক উমাইয়া বিন খালফের হাতে।
• আম্মার বিন ইয়াসির রাযি. ও তার মাতা-পিতা সীমাহীন নিপীড়নের শিকার হন। পিতা ইয়াসির রাযি. কাফিরদের নির্যাতনে মৃত্যুবরণ করেন এবং মাতা সুমাইয়া পাপিষ্ঠ আবু জাহলের হাতে শহিদ হন। মাতা-পিতার মৃত্যুর পরও কাফিররা আম্মারকে নির্যাতন করা বন্ধ করেনি।
• সুহায়ব বিন সিনান রুমি রাযি. প্রচণ্ড নিপীড়নের কারণে চেতনা ও বোধশক্তি হারিয়ে ফেলতেন।
• খাব্বাব বিন আরাত রাযি. ছিলেন উম্মে আনমারের ক্রীতদাস। পেশায় কামার উম্মে আনমার উত্তপ্ত লোহা এনে হজরত খাব্বাব রাযি.-এর মাথায় ও পিঠে চেপে ধরত।
• এ ছাড়াও আমির বিন ফুহাইরা রাযি., আবু ফুকায়হা রাযি., যিন্নিরা রুমিয়া রাযি., নাহদিয়া রাযি. ও তার কন্যা প্রমুখ ক্রীতদাস সাহাবি-সাহাবিয়াগণও অবর্ণনীয় নির্যাতনের সম্মুখীন হন।
কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এমন একটি বর্ণনাও খুঁজে পাওয়া যাবে না যে, তাদের কেউ এ ধরনের কঠিন নির্যাতন ও নিষ্পেষণের শিকার হওয়ার পর ইসলাম ত্যাগ করেছেন। বরং ইতিহাস এই গৌরবোজ্জ্বল তথ্যই সংরক্ষণ করেছে যে, কঠিন থেকে কঠিনতর নির্যাতন ইসলাম নামক সুমহান ধর্মের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ও বন্ধন আরও সুদৃঢ় করেছে। কারণ, তারা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন— ইসলাম পৃথিবীতে আগমন করেছে তাদেরকে পার্থিব জীবনের দুর্ভাগ্য ও পরকালের মহা যন্ত্রণা হতে নিষ্কৃতি দিতে।
📄 হাবশায় প্রথম হিজরত
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, নবুওয়তের চতুর্থ বছর হতেই নির্যাতন-নিপীড়নের ধারা শুরু হয়েছিল। নবুওয়তের পঞ্চম বছরের মধ্যভাগে এসে নির্যাতনের মাত্রা চরম অসহনীয় পর্যায়ে উপনীত হয়। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপন সাহাবিদের এই অবর্ণনীয় কষ্ট দেখে তাদেরকে বলেন, 'তোমরা যদি হাবশা-ভূমিতে(১৪) চলে যাও, তাহলে কল্যাণকর হবে। কেননা, সেখানে এমন এক শাসক আছেন, যার রাজত্বে কেউ জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয় না। হাবশা হলো সত্যের ভূমি। আল্লাহ তাআলা যতদিন না তোমাদেরকে চলমান দুর্যোগ থেকে মুক্তি দান করেন, ততদিন তোমরা সেখানেই থাকবে।'
নবীজির নির্দেশে বারোজন পুরুষ ও চারজন নারীর একটি সাহাবা-কাফেলা নবুওয়তের পঞ্চম বছর রজব মাসে হাবশায় হিজরত করে। কাফেলার নেতৃত্বে ছিলেন উসমান বিন আফফান রাযি। তার সঙ্গে তার সহধর্মিণী নবীকন্যা রুকাইয়া রাযি.-ও ছিলেন।
টিকাঃ
১৪. হাবশা : আরব উপদ্বীপ হতে সরাসরি দক্ষিণে অবস্থিত একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী সাম্রাজ্য ছিল হাবশা বা আবিসিনিয়া। বর্তমান ইরিত্রিয়া, উত্তর ইথিওপিয়া, সোমালিয়ার উত্তর-পূর্ব অংশ, জিবুতি, মিশরের দক্ষিণাঞ্চল, সুদানের পূর্বাঞ্চল ও ইয়ামেনজুড়ে এর বিস্তৃতি ছিল।
📄 মুহাজিরদের মক্কায় প্রত্যাবর্তন
মাসতিনেক পরই হাবশায় হিজরতকারী মুহাজির-কাফেলার কাছে এই ভুল সংবাদ পৌঁছায় যে, মক্কার কুরাইশরা সকলে ইসলামগ্রহণ করেছে। এ সংবাদ পেয়ে একই বছরের শাওয়াল মাসে মুহাজির-কাফেলা মক্কায় ফিরে আসে। মক্কায় প্রবেশ করার পূর্বেই প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অবগতি লাভ করায় অনেকেই পুনরায় হাবশায় ফিরে যায় আর কয়েকজন সাহাবি অতি সঙ্গোপনে বা নেতৃস্থানীয় কোনো কুরাইশ ব্যক্তির নিরাপত্তা-আশ্রয় গ্রহণ করে মক্কায় প্রবেশ করে।
📄 হাবশায় দ্বিতীয় হিজরত
প্রথমবারের হিজরতের পর যারা মক্কায় ফিরে এসেছিল, তাদের প্রতি কুরাইশদের নির্যাতন ও নিপীড়ন আরও বৃদ্ধি পায়। গোত্রের লোকেরা তীব্র ক্রোধ নিয়ে নব উদ্যমে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে অমানুষিক নির্যাতন চালাতে থাকে। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদেরকে দ্বিতীয়বার হাবশায় হিজরতের অনুমতি প্রদান করেন। দ্বিতীয়বারের এই হিজরত ছিল প্রথমবারের চেয়েও কষ্টসাধ্য। এবার হিজরত করে তিরাশিজন পুরুষ ও আঠারোজন নারী সাহাবি।