📄 বালক নবীর সঙ্গে পাদরি বাহিরার সাক্ষাৎ
বারো বছর বয়সে নবীজি চাচা আবু তালিবের সঙ্গে বাণিজ্যসফরে শামে গমন করেন। পথিমধ্যে বুছরায় (৯) পৌঁছলে সেখানকার বাহিরা নামক জনৈক খ্রিষ্টান পাদরি নবীজিকে চিনতে পারেন। বাহিরা নবীজিকে মক্কায় ফেরত পাঠাতে এবং ভবিষ্যতে কখনো তাকে শামে না আনতে আবু তালিবকে পরামর্শ দেন। তিনি আশঙ্কা করছিলেন, শামের ইহুদি-খ্রিষ্টানরা শেষনবীকে চিনতে পারলে তাকে হত্যা করার চেষ্টা করবে।
টিকাঃ
৯. বুছরা ও বসরা: ভিন্ন দুটি নগরীর নাম। বুছরা (بصری) বর্তমান সিরিয়ার অন্তর্গত একটি ঐতিহাসিক নগরী। সিরিয়ার রাজধানী দামেশক হতে এর দূরত্ব প্রায় ১৪০ কিলোমিটার। বুছরা তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল। অপরদিকে বসরা (البصرة) হলো বর্তমান ইরাকের অন্তর্গত ইরাকের তৃতীয় বৃহত্তম নগরী। দ্বিতীয় খলিফা উমর রাযি.-এর খিলাফত আমলে বিখ্যাত বদরি সাহাবি উতবা বিন গাযওয়ান রাযি. বসরা নগরী প্রতিষ্ঠা করেন। এর পরবর্তী ইসলামি ইতিহাসের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে বসরার নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
📄 ফিজারের যুদ্ধ
ফিজারের যুদ্ধ চলাকালে নবীজির বয়স ছিল চৌদ্দ মতান্তরে পনেরো বছর। যুদ্ধের একপক্ষে ছিল কুরাইশ, কিনানা ও তাদের মিত্র অন্যান্য গোত্র, অপরপক্ষে ছিল হাওয়াযিন গোত্র। নবীজি এ যুদ্ধে তার চাচাদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। তিনি যুদ্ধ চলাকালে চাচাদেরকে তির সংগ্রহ করে দিতেন। পবিত্র নগরী মক্কার পবিত্রতা বিনষ্ট হওয়ায় এবং পবিত্র মাস মুহাররমের মর্যাদাহানি ঘটায় এ যুদ্ধের নামকরণ করা হয় 'হারবুল ফিজার' বা অন্যায়যুদ্ধ।
📄 হিলফুল ফুজুল
ফিজারের যুদ্ধ হতে কুরাইশ গোত্রের প্রত্যাবর্তনের পর হিলফুল ফুজুল নামক সেবাসংঘ গঠিত হয়। বনু হাশিম, বনু যুহরা ও বনু তাইম বিন মুৱা প্রভৃতি শাখা-গোত্র আবদুল্লাহ বিন জুদআনের গৃহে সমবেত হয় এবং সকলে এ বিষয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় যে, ভবিষ্যতে তারা জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের সহায়তায় এবং মজলুমের অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ থাকবে। কুরাইশরা এই অঙ্গীকার-চুক্তিকে 'হিলফুল ফুজুল'(১০) নামকরণ করে মন্তব্য করে, 'এই অঙ্গীকার-চুক্তির মাধ্যমে সকলে একটি কল্যাণকর কর্ম সম্পাদন করেছে।' হিলফুল ফুজুল গঠনকে ইসলামপূর্ব আরবজাতির অন্যতম গৌরবময় কীর্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ উদ্যোগে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি পরবর্তী সময়ে বলেন-
«لَقَدْ شَهِدْتُ فِي دَارِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ جُدْعَانَ حِلْفًا مَا أُحِبُّ أَنَّ لِي بِهِ حُمْرَ النَّعَمِ ، وَلَوْ دُعِيْتُ بِهِ فِي الْإِسْلَامِ لَأَجَبْتُ».
আবদুল্লাহ বিন জুদআনের গৃহে উপস্থিত থেকে আমি যে অঙ্গীকার-চুক্তিতে অংশগ্রহণ করেছি, তার বিনিময়ে আমার কাছে রক্তবর্ণ উটও অধিক পছন্দ নয়। ইসলামি যুগেও যদি আমাকে এরূপ কোনো প্রচেষ্টায় আহ্বান জানানো হতো, আমি অবশ্যই সাড়া দিতাম।(১১)
টিকাঃ
১০. হিলফ শব্দের অর্থ অঙ্গীকার আর ফুজুল অর্থ মজলুমের প্রাপ্য অধিকার। সুতরাং হিলফুল ফুজুল অর্থ মজলুম ও অত্যাচারিতের প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার।
১১. বায়হাকি, আস-সুনানুল কুবরা, হাদিস নং- ১৩০৮০।
📄 খাদিজার বাণিজ্য-ভার গ্রহণ এবং পাণিগ্রহণ
তরুণ বয়সের প্রারম্ভেই নবীজি ব্যবসাবাণিজ্য শুরু করেন। এক বর্ণনায় আছে, নবীজি সায়িব বিন আবু সায়িব মাখযুমির সঙ্গে মিলে বাণিজ্য করতেন। (১২) পঁচিশ বছর বয়সে নবীজি কুরাইশ গোত্রের বিদুষী, সম্ভ্রান্ত ও ধনবতী নারী খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদের সম্পদ নিয়ে শামে বাণিজ্যে গমন করেন। এ সফরে খাদিজার ক্রীতদাস মায়সারা-ও নবীজির সঙ্গে ছিল।
বাণিজ্য শেষে নবীজি মক্কায় ফিরে আসেন এবং প্রচুর মুনাফাসহ বাণিজ্যের মূলধন খাদিজাকে বুঝিয়ে দেন। একদিকে নবীজির অপূর্ব সততা ও বিশ্বস্ততা, অপরদিকে মুনাফায় বিস্ময়কর বরকত প্রত্যক্ষ করে খাদিজা মুগ্ধ হন। তিনি নবীজির সহধর্মিণী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করেন এবং বান্ধবী নাফিসা বিনতে মুনাব্বিহের কাছে নিজের আগ্রহ প্রকাশ করেন। নাফিসা নবীজিকে প্রস্তাব দিলে নবীজি সম্মতি প্রকাশ করেন।
বিয়ের সময় নবীজির বয়স ছিল পঁচিশ বছর আর খাদিজার বয়স ছিল চল্লিশ বছর। (১৩) খাদিজার ইতিপূর্বে আরও দু-বার বিয়ে হয়েছিল এবং দু-বারই তার স্বামী মৃত্যুবরণ করেছিলেন। আম্মাজান খাদিজা রাযি. নবীজির সঙ্গে পঁচিশ বছর সংসার করেন। তিনি ছিলেন স্বামীর জন্য শ্রেষ্ঠতম সহধর্মিণী, নবী-সন্তানদের শ্রেষ্ঠতম জননী। তার ইন্তেকালের পূর্বে নবীজি দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। ইবরাহিম ব্যতীত নবীজির সকল সন্তান হজরত খাদিজা রাযি.-এর গর্ভেই জন্মগ্রহণ করেন।
টিকাঃ
১২. দেখুন- সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং- ৪৮৩৬।
১৩. নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে বিয়ের সময় আম্মাজান খাদিজা রাযি.-এর বয়স কত ছিল, তা নিয়ে বর্ণনাসমূহের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। পঁচিশ বছর, আটাশ বছর, পঁয়ত্রিশ বছর ও চল্লিশ বছর ইত্যাদি বিভিন্ন মত সীরাত ও ইতিহাসগ্রন্থগুলোতে পাওয়া যায়। বিস্তারিত জানতে দেখুন-মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ উশান, মা শাআ' ওয়া লাম ইয়াছবুত ফিস সীরাতিন নাবabiyya, পৃষ্ঠা: ১৮-১৯।