📄 মুক্ত চিন্তা, স্বাধীন চেতনা
সৃষ্টির আদি যুগ থেকে কখনোই আরবজাতি কোনো বিদেশি শক্তির সামনে মাথা অবনত করেনি, পরাধীনতা স্বীকার করেনি। বিশেষ করে ইসমাইলি আরবগণের আবাসভূমি উত্তর আরব চিরদিনই স্বাধীন থেকেছে।
নিয়মতান্ত্রিক কোনো রাজা বা রাজ্য মক্কায় ছিল না। দীর্ঘকাল ধরে সেখানে বহাল ছিল আন্তঃগোত্রীয় ব্যবস্থা। একজন সকলের ওপর প্রভুত্বের ছড়ি ঘোরাবে এবং সবার সঙ্গে প্রভুসুলভ আচরণ করবে, এমন সংস্কৃতির সঙ্গে আরবরা মোটেও পরিচিত ছিল না। বিপরীতে আরবভূখণ্ডের নিকট প্রতিবেশী পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। সেখানে কিসরা ও কায়সারকে অতিমানব বরং উপাস্য মনে করা হতো। সম্রাটের সামনে এমনকি মঙ্গলবাক্য উচ্চারণ করার সাহসও কারও হতো না। মুক্ত চিন্তা ও মতামত প্রকাশের কথা এসব সাম্রাজ্যে কল্পনাও করা যেত না।
ইসলামপূর্ব যুগে জনৈক আরব একবার কিসরার দরবারে উপস্থিত হয়েছিল। তখন দরবারে উপস্থিত জনৈক পারসিক রাজপ্রতিনিধি তাকে কটূক্তি করে বলল, 'তোমরা আরবরা হিংস্র ও যাযাবর জাতি। অতি তুচ্ছ ও সামান্য বিষয়েও তোমরা মারামারি ও রক্তারক্তি কাণ্ড শুরু করে দাও।'
তখন সেই আরব দীপ্তকণ্ঠে উত্তর দিলো, 'জনাব, সুবিশাল পারস্য সাম্রাজ্যে কোটি কোটি মানুষের মধ্য হতে মাত্র একজন মানুষ রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার যোগ্য। ঠিক একই পরিস্থিতি বিশাল রোমান সাম্রাজ্যেও। তারপরও দেখুন, মাত্র দুজন যোগ্য মানুষকে কেন্দ্র করে উভয় সাম্রাজ্যের মধ্যে কত হানাহানি, লড়াই-বিগ্রহ! এ কারণে তাদেরকে নিশ্চয়ই আপনি হিংস্র ও যাযাবর বলবেন না। বিপরীতে আরবের লক্ষ লক্ষ অধিবাসীর প্রত্যেকেই বীরত্ব ও সাহসিকতায়, শক্তি ও রণকুশলতায় এবং পরিচিতি ও বংশমর্যাদায় একেকটি বিস্তৃত সাম্রাজ্যের সম্রাট হওয়ার যোগ্য। অথচ রাজমুকুট, সিংহাসন, রাজ্য কিছুই তাদের নেই। তাহলে তাদের মধ্যে যদি যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগে থাকে, তাতে বিচিত্র কী? এজন্য কি তাদের হিংস্র ও যাযাবর আখ্যায়িত করা যায়?'
আরবদের এই স্বাধীনচেতা মনোভাবের কারণেই বাবেলের অত্যাচারী শাসক বুখতে নাসার বনি ইসরাইলকে ধ্বংস করলেও আরবের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস করেননি। প্রথমে গ্রিক ও পরবর্তীকালে রোমানগণ শতাব্দীর পর শতাব্দী মিশর হতে ইরাকের সীমান্ত পর্যন্ত সুবিশাল অঞ্চল শাসন করলেও পার্শ্ববর্তী আরব ভূখণ্ডে ভুলেও পা রাখেনি। সাসানি ও রোমান সাম্রাজ্যের অধিপতিগণ একে অপরের ভূখণ্ড জয় করার জন্য উন্মত্ত লড়াইয়ে পয়ে পড়লেও অরক্ষিত ও উন্মুক্ত আরবভূখণ্ড জয় করার চিন্তা করেনি।
📄 অত্যুচ্চ বংশমর্যাদা, চারিত্রিক উদারতা
আরবজাতির বংশকৌলীন্য ছিল সর্বজনস্বীকৃত। প্রখর মেধার অধিকারী আরবরা বংশানুক্রমে নিজেদের বংশধারা, গোত্রমূল, শাখাপ্রশাখা ইত্যাদির পরিচয় প্রামাণিকভাবে সংরক্ষণ করত। আর তাই আরবজাতির বংশপরিচয় ছিল স্বচ্ছ ও সুবিদিত। আরবদের মধ্যে কুরাইশরা ছিল সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত বংশপরিচয়ের অধিকারী। আল্লাহর নবী ইবরাহিম আ. ও ইসমাইল আ.-এর সরাসরি বংশধর হওয়ায় আরবজুড়ে তাদের ছিল স্বীকৃত গ্রহণযোগ্যতা। পাশাপাশি অতিথিসেবা, প্রতিবেশীর প্রয়োজনে ত্যাগ ও কোরবানির মানসিকতা ছিল আরবদের স্বভাব-বৈশিষ্ট্য। এককথায়, সারা বিশ্বকে সত্য ও ন্যায়ের পথে নেতৃত্ব প্রদানের মতো পরিচিতি ও উদারতা মারবজাতির মধ্যে ছিল।
📄 ভৌগোলিক অবস্থান, বাইতুল্লাহর উপস্থিতি
আরব উপদ্বীপ এশিয়া মহাদেশের অংশ হলেও এর অবস্থান আফ্রিকা ও ইউরোপ মহাদেশের সন্নিকটে। আরবভূখণ্ড ছিল তিনটি মহাদেশের মিলনকেন্দ্র। আরব থেকে স্থলপথে ইরাক, পারস্য, তুর্কিস্তান, খোরাসান ও কাবুল হয়ে সুদূর ভারতবর্ষে পৌঁছা যেত। অপরদিকে শাম হয়ে যাওয়া যেত মিশর, মাগরিব ও আন্দালুসের সীমানায়। জলপথেও আরব থেকে আফ্রিকা ও ইউরোপ মহাদেশের বিভিন্ন জনপদে যাতায়াত করা যেত। আন্তর্জাতিক রেখায় অবস্থানের এই স্বাতন্ত্র্যের কারণেই আরব বিনা প্রশ্নে এমন এক বিশ্বজনীন দাওয়াত ও আন্দোলনের কেন্দ্র হওয়ার উপযুক্ত ছিল, যেখান থেকে সারা পৃথিবীতে ন্যায় ও কল্যাণের বার্তা প্রচার করা যাবে।
আরব উপদ্বীপে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণের আরেকটি রহস্য হলো এই ভূখণ্ডে পবিত্র কাবাঘরের অস্তিত্ব। আল্লাহর নবী হজরত ইবরাহিম আ. ও হজরত ইসমাইল আ. এ উদ্দেশ্যেই বাইতুল্লাহ নির্মাণ করেছিলেন, যেন তাতে এক আল্লাহর ইবাদত করা হয় এবং তা চিরদিনের জন্য তাওহিদ ও একত্ববাদ এবং হিদায়াত ও পথপ্রদর্শনের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। মক্কায় প্রিয় নবীজির আবির্ভাব ছিল ইবরাহিম আ. ও ইসমাইল আ.-এর সেই দোয়ার বাস্তবায়ন, যা তারা কাবাঘরের ভিত্তিস্থাপনের সময় করেছিলেন।
তারা আল্লাহর দরবারে নিবেদন করেছিলেন-
رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ أَيْتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتٰبَ وَ الْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
হে আমাদের প্রতিপালক, তাদের মধ্যে এমন একজন রাসুল প্রেরণ করুন, যে তাদেরই মধ্য হতে হবে; যে তাদের সামনে আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবে, তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবে এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবে। নিশ্চয়ই আপনি পরিপূর্ণ ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার অধিকারী। [সুরা বাকারা: ১২৯]
এভাবে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের মহাপ্রজ্ঞা ও সর্বজ্ঞানের ফয়সালা এটাই ছিল যে, হিদায়াত ও মুক্তির যে মহান সূর্য বিশ্ব মানবতাকে আলোকিত করবে, তা উদিত হবে সেই ভূখণ্ডে, যেখানকার মানুষ নিজেদের স্বভাব স্বচ্ছতা ও হৃদয় নির্মলতার গুণে অতি সহজে প্রিয় নবীজির আনীত দ্বীনের সত্যতা উপলব্ধি করতে পারবে, তার সাহাবি ও সহচর হয়ে সুদৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ও প্রবাদতুল্য বীরত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে আল্লাহর শত্রুদের পরাভূত করতে পারবে, মুক্ত চিন্তা ও স্বাধীন চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে বাতিলের সকল প্রলোভন ও আক্রমণ প্রতিহত করতে পারবে, অত্যুচ্চ বংশমর্যাদা ও চারিত্রিক উদারতার গুণে দূরের-কাছের সকলকে আপন করে নিয়ে ভ্রাতৃত্বের এক উপমাহীন নমুনা স্থাপন করতে সক্ষম হবে এবং উপযোগী ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে একত্ববাদের নিদর্শন বাইতুল্লাহকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলতে পারবে কিয়ামত পর্যন্ত বিদ্যমান এক মৃত্যুঞ্জয়ী কাফেলা।
۞ ﴿ٱللَّهُ أَعْلَمُ حَيْثُ يَجْعَلُ رِسَالَتَهُۥٓ ﴾
আল্লাহই ভালো জানেন যে, তিনি আপন পয়গাম কোথায় ন্যস্ত করবেন। [সুরা আনআম : ১২৪]