📄 স্বভাব স্বচ্ছতা, হৃদয় নির্মলতা
যদিও আক্ষরিক জ্ঞানের বিচারে আরবরা ছিল তদানীন্তন পৃথিবীর অন্যতম পশ্চাৎপদ জাতি; কিন্তু আল্লাহ তাআলা আরবদের দান করেছিলেন স্বচ্ছ ও নির্মল হৃদয়জগৎ। আগে থেকে তাদের হৃদয়পটে এমন কোনো চিত্র অঙ্কিত ছিল না, যা মুছে ফেলে নতুন কোনো চিত্র অঙ্কন করা কঠিন হতো। বিপরীতে রোমান, পারসিক বা ভারতীয়দের ছিল জ্ঞানবিজ্ঞান ও শিল্পকলার সুদীর্ঘ ঐতিহ্য এবং সমৃদ্ধ সভ্যতা-সংস্কৃতির গৌরব। তাদের হৃদয়জগৎ আচ্ছন্ন ছিল এমন সুকঠিন মানসিক ও চিন্তাগত নানা জটিলতায়, আপাতদৃষ্টিতে যা দূর করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। এভাবেও বলা যায় যে, আরবরা ছিল 'নির্ভেজাল মূর্খতা'র শিকার, যার প্রতিকারবিধান সহজ ছিল; অপরদিকে অন্যান্য সুসভ্য জাতিগোষ্ঠী ছিল 'মিশ্রিত ও ভেজাল মূর্খতা'র শিকার, যার চিকিৎসা ছিল অত্যন্ত কঠিন ও কষ্টসাধ্য।
ইতিহাস সাক্ষী, স্বচ্ছ-নির্মল হৃদয়ের অধিকারী আরবদের সামনে যখন ইসলাম নামক অমিয় সুধার পেয়ালাটি তুলে ধরা হয়েছিল, তারা তখন তা নিঃসংকোচে আকণ্ঠ পান করে ধন্য হয়েছিল আর সুসভ্য পারসিক ও রোমানরা জটিল মানসিক টানাপোড়েনের শিকার হয়ে সে পানপাত্র হেলায় ছুঁড়ে ফেলেছিল।
📄 সুদৃঢ় ইচ্ছাশক্তি, প্রবাদতুল্য বীরত্ব
আরবরা ছিল আপন প্রকৃতিতে সমুজ্জ্বল, ইস্পাতকঠিন সুদৃঢ় ইচ্ছাশক্তি এবং সহজাত বীরত্ব ও রণকুশলতার অধিকারী। কোনো হক কথা যদি তাদের উপলব্ধিতে ধরা দিত, তাহলে তারা তা বাস্তবায়নে ব্রতী হতো এবং বিরুদ্ধবাদীদের মোকাবিলায় তরবারি তুলে নিতে সামান্য দ্বিধা করত না। সত্য ও সুন্দর যখন তাদের হৃদয়জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করত, তখন তারা তা মনে-প্রাণে গ্রহণ করে নিত এবং প্রয়োজনে তার জন্য জীবন বিলিয়ে দিতেও এতটুকু ইতস্তত করত না। আরবজাতির বীরত্ব ছিল সর্বজনস্বীকৃত। জীবনবাজি রেখে লড়াই করা ছিল তাদের সহজাত বৈশিষ্ট্য। আরবরা ছিল বাস্তবতাপ্রিয়, মননশীল, স্পষ্টভাষী ও কষ্টসহিষ্ণু। পাশাপাশি তাদের অন্তরে ছিল কর্ম সম্পাদনের অদম্য প্রেরণা।
বিপরীতে রোম, পারস্য ও ভারতবর্ষের জনগণ ছিল যুগ-স্রোতে ভেসে যাওয়ায় এবং হাওয়ার অনুকূলে পাল তোলায় অভ্যস্ত। সমাজে চলমান জুলুম ও বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে আন্দোলন সৃষ্টির স্পৃহা ও সক্ষমতা তাদের মাঝে ছিল না। তাদের জীবন ছিল আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসনির্ভর, কষ্ট সহ্য করা তাদের ধাতে ছিল না।
এটি একটি অনস্বীকার্য বাস্তবতা যে, কোনো জাতি যদি পৃথিবীতে কৃতিত্বপূর্ণ কোনো অবদান রচনা করতে চায় এবং জগৎজুড়ে সংস্কার ও পরিবর্তন সাধন করতে চায়, তাহলে সহজ-সরল জীবনধারা, কঠোর সহ্য ও প্রতিরোধ ক্ষমতা, দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি এবং রণাঙ্গনে জীবনবাজি রেখে লড়াই করার যোগ্যতা তাদের জন্য অপরিহার্য শর্ত। এজন্যই ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করার অব্যবহিত পরেই আরবরা স্রোতের প্রতিকূলে কেবল রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্য নয়, পুরো অবিশ্বাসী পৃথিবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পেরেছিল এবং স্বল্পতম সময়ের মধ্যে জগৎজুড়ে ইসলামের ঝান্ডা সমুন্নত করেছিল।
📄 মুক্ত চিন্তা, স্বাধীন চেতনা
সৃষ্টির আদি যুগ থেকে কখনোই আরবজাতি কোনো বিদেশি শক্তির সামনে মাথা অবনত করেনি, পরাধীনতা স্বীকার করেনি। বিশেষ করে ইসমাইলি আরবগণের আবাসভূমি উত্তর আরব চিরদিনই স্বাধীন থেকেছে।
নিয়মতান্ত্রিক কোনো রাজা বা রাজ্য মক্কায় ছিল না। দীর্ঘকাল ধরে সেখানে বহাল ছিল আন্তঃগোত্রীয় ব্যবস্থা। একজন সকলের ওপর প্রভুত্বের ছড়ি ঘোরাবে এবং সবার সঙ্গে প্রভুসুলভ আচরণ করবে, এমন সংস্কৃতির সঙ্গে আরবরা মোটেও পরিচিত ছিল না। বিপরীতে আরবভূখণ্ডের নিকট প্রতিবেশী পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। সেখানে কিসরা ও কায়সারকে অতিমানব বরং উপাস্য মনে করা হতো। সম্রাটের সামনে এমনকি মঙ্গলবাক্য উচ্চারণ করার সাহসও কারও হতো না। মুক্ত চিন্তা ও মতামত প্রকাশের কথা এসব সাম্রাজ্যে কল্পনাও করা যেত না।
ইসলামপূর্ব যুগে জনৈক আরব একবার কিসরার দরবারে উপস্থিত হয়েছিল। তখন দরবারে উপস্থিত জনৈক পারসিক রাজপ্রতিনিধি তাকে কটূক্তি করে বলল, 'তোমরা আরবরা হিংস্র ও যাযাবর জাতি। অতি তুচ্ছ ও সামান্য বিষয়েও তোমরা মারামারি ও রক্তারক্তি কাণ্ড শুরু করে দাও।'
তখন সেই আরব দীপ্তকণ্ঠে উত্তর দিলো, 'জনাব, সুবিশাল পারস্য সাম্রাজ্যে কোটি কোটি মানুষের মধ্য হতে মাত্র একজন মানুষ রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার যোগ্য। ঠিক একই পরিস্থিতি বিশাল রোমান সাম্রাজ্যেও। তারপরও দেখুন, মাত্র দুজন যোগ্য মানুষকে কেন্দ্র করে উভয় সাম্রাজ্যের মধ্যে কত হানাহানি, লড়াই-বিগ্রহ! এ কারণে তাদেরকে নিশ্চয়ই আপনি হিংস্র ও যাযাবর বলবেন না। বিপরীতে আরবের লক্ষ লক্ষ অধিবাসীর প্রত্যেকেই বীরত্ব ও সাহসিকতায়, শক্তি ও রণকুশলতায় এবং পরিচিতি ও বংশমর্যাদায় একেকটি বিস্তৃত সাম্রাজ্যের সম্রাট হওয়ার যোগ্য। অথচ রাজমুকুট, সিংহাসন, রাজ্য কিছুই তাদের নেই। তাহলে তাদের মধ্যে যদি যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগে থাকে, তাতে বিচিত্র কী? এজন্য কি তাদের হিংস্র ও যাযাবর আখ্যায়িত করা যায়?'
আরবদের এই স্বাধীনচেতা মনোভাবের কারণেই বাবেলের অত্যাচারী শাসক বুখতে নাসার বনি ইসরাইলকে ধ্বংস করলেও আরবের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস করেননি। প্রথমে গ্রিক ও পরবর্তীকালে রোমানগণ শতাব্দীর পর শতাব্দী মিশর হতে ইরাকের সীমান্ত পর্যন্ত সুবিশাল অঞ্চল শাসন করলেও পার্শ্ববর্তী আরব ভূখণ্ডে ভুলেও পা রাখেনি। সাসানি ও রোমান সাম্রাজ্যের অধিপতিগণ একে অপরের ভূখণ্ড জয় করার জন্য উন্মত্ত লড়াইয়ে পয়ে পড়লেও অরক্ষিত ও উন্মুক্ত আরবভূখণ্ড জয় করার চিন্তা করেনি।
📄 অত্যুচ্চ বংশমর্যাদা, চারিত্রিক উদারতা
আরবজাতির বংশকৌলীন্য ছিল সর্বজনস্বীকৃত। প্রখর মেধার অধিকারী আরবরা বংশানুক্রমে নিজেদের বংশধারা, গোত্রমূল, শাখাপ্রশাখা ইত্যাদির পরিচয় প্রামাণিকভাবে সংরক্ষণ করত। আর তাই আরবজাতির বংশপরিচয় ছিল স্বচ্ছ ও সুবিদিত। আরবদের মধ্যে কুরাইশরা ছিল সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত বংশপরিচয়ের অধিকারী। আল্লাহর নবী ইবরাহিম আ. ও ইসমাইল আ.-এর সরাসরি বংশধর হওয়ায় আরবজুড়ে তাদের ছিল স্বীকৃত গ্রহণযোগ্যতা। পাশাপাশি অতিথিসেবা, প্রতিবেশীর প্রয়োজনে ত্যাগ ও কোরবানির মানসিকতা ছিল আরবদের স্বভাব-বৈশিষ্ট্য। এককথায়, সারা বিশ্বকে সত্য ও ন্যায়ের পথে নেতৃত্ব প্রদানের মতো পরিচিতি ও উদারতা মারবজাতির মধ্যে ছিল।