📄 ভারতবর্ষ
সুপ্রাচীন সভ্যতার গৌরবময় ঐতিহ্যের অধিকারী ভারতবর্ষের অবস্থাও তখন অত্যন্ত শোচনীয় ছিল। ভারতবর্ষে ছিল বহু দেবদেবীর উপাসনা ও পূজা-অর্চনা। বরং এ ক্ষেত্রে ভারতবাসী ছিল অন্য দেশের চেয়ে এককাঠি সরেস! কালের পরিক্রমায় ভারতবর্ষে উপাস্য ও দেবতার সংখ্যা পৌঁছেছিল তেত্রিশ কোটিতে! ঝড়বৃষ্টি, বজ্র-বিদ্যুৎ, ঊষা-রজনী, নদী-পর্বত, গাছ-পালা, পশুপাখি, অগ্নি-পাথর কোনো বস্তুই উপাস্যের তালিকার বাইরে ছিল না।
ভারতবর্ষের সামাজিক অবক্ষয়ের আরেকটি নিদর্শন হলো জাতিপ্রথা ও শ্রেণিবিভাগ। একই ভূখণ্ডে বসবাসকারী মানবসমাজকে বিভক্ত করা হয়েছিল উচ্চ শ্রেণি ও নিম্ন শ্রেণিতে। সামাজিক এই বিভাজনের প্রভাব ছিল জীবনের সকল ক্ষেত্রে। উচ্চ শ্রেণির কেউ যত বড় অপরাধই করুক, তার কোনো শাস্তি হতো না। অপরদিকে নিম্ন শ্রেণির মানুষকে লঘু অপরাধে প্রদান করা হতো গুরুদণ্ড। নিম্ন শ্রেণিকে অস্পৃশ্য গণ্য করা হতো এবং তাদের ছোঁয়া লাগলে বস্তুকে অপবিত্র মনে করা হতো। নারীদেরকে দাসী গণ্য করা হতো। কোনো পুরুষ মারা গেলে তার স্ত্রীকে বরণ করতে হতো স্বেচ্ছামৃত্যু।
চীন, তুর্কিস্তান, আবিসিনিয়া ও অন্যান্য সাম্রাজ্যের পরিস্থিতিতে সাসানি সাম্রাজ্য, রোমান সাম্রাজ্য বা ভারতবর্ষের চেয়ে ভিন্নতর কিছু ছিল না।
ভারতবর্ষ ছিল তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও সমৃদ্ধ অঞ্চল। এখানে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ বসবাস করত। হিন্দুধর্ম ছিল এখানকার প্রধান ধর্ম। এ ছাড়াও বৌদ্ধধর্ম, জৈনধর্ম ও অন্যান্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধর্ম প্রচলিত ছিল। ভারতবর্ষের সমাজব্যবস্থা ছিল বর্ণপ্রথা-ভিত্তিক। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র—এই চারটি বর্ণে সমাজ বিভক্ত ছিল। ব্রাহ্মণরা ছিল সমাজের উচ্চশ্রেণির লোক, যারা ধর্মীয় ও শিক্ষাগত দিক থেকে শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হতো। ক্ষত্রিয়রা ছিল শাসক ও যোদ্ধা। বৈশ্যরা ছিল ব্যবসায়ী ও কৃষক। শূদ্ররা ছিল সমাজের নিম্নশ্রেণির লোক, যারা সমাজের সকল বোঝা বহন করত এবং দাসত্বের জীবনযাপন করত। ইসলামপূর্ব যুগে ভারতবর্ষে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য ও সাম্রাজ্য বিদ্যমান ছিল। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল গুপ্ত সাম্রাজ্য, মৌর্য সাম্রাজ্য ও পাল সাম্রাজ্য। ইসলামপূর্ব যুগে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অস্থিতিশীল। বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে প্রায়শই যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগে থাকত।
📄 ইহুদিসমাজ
তৎকালে পুরো পৃথিবীতে ইহুদিদের স্বতন্ত্র কোনো রাষ্ট্র ছিল না। আরব উপদ্বীপের মদিনা ও খায়বার অঞ্চলে কিছু ইহুদি বসবাস করত। এর বাইরে রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু ইহুদির অস্তিত্ব ছিল।
নিষ্ঠুরতা ও বিশ্বাসঘাতকতা ছিল ইহুদিদের প্রধান চরিত্র-বৈশিষ্ট্য। পাশাপাশি তারা ছিল চরম পর্যায়ের হিংস্র। ইহুদিরাই নাজরানের খ্রিস্টানদেরকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করে হত্যা করেছিল।
ধর্মজ্ঞানে পারদর্শী ইহুদি বুদ্ধিজীবীরা ধনবান ব্যক্তিদের মনস্তুষ্টির জন্য ধর্মীয় বিধানে যথেচ্ছ সংযোজন-বিয়োজন করত। তাদের স্বেচ্ছাচারিতায় ইহুদিধর্ম তখন ধর্মগুরুদের স্বার্থসিদ্ধির মাধ্যমে পরিণত হয়েছিল। আচরণগত অবক্ষয়ের কারণে পৃথিবীবাসীর কাছে ইহুদিরা পরিণত হয়েছিল নিকৃষ্ট ও ঘৃণিত এক জাতিতে।
(ضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذِّلَّةُ وَالْمَسْكَنَةُ وَبَاءُوْ بِغَضَبٍ مِنَ اللَّهِ )
আর তাদের (ইহুদিদের) ওপর লাঞ্ছনা ও অসহায়ত্বের ছাপ মেরে দেওয়া হলো এবং তারা আল্লাহর গজব নিয়ে ফিরল। [সুরা বাকারা: ৬১]
সমকালীন বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী ও প্রতাপশালী সাম্রাজ্যগুলোর অবস্থা যখন এই, তখন ছোট ছোট রাজ্য ও জনপদগুলোর পরিস্থিতি যে কতটা নিম্নগামী ছিল, তা সহজেই অনুমেয়। ধরণিজুড়ে কোথাও ছিল না সত্য ও বিশ্বাসের আলো, পৃথিবী নিমজ্জিত ছিল অন্যায় ও অবিশ্বাসের অন্ধকারে। অবক্ষয়ের চরম প্রান্তে উপনীত সেই কালের নামই হয়ে গিয়েছিল 'আল-আইয়ামুল জাহিলিয়া' বা মূর্খতা ও অন্ধকারের যুগ।
মানবতা যেন সহ্যের শেষ সীমায় উপনীত হয়ে দয়াময় আল্লাহর কুদরতি করুণার প্রত্যাশায় প্রহর গুনছিল। সকলের প্রত্যাশা ছিল নিকষ কালো আঁধার চিরে নতুন সূর্যোদয়ের, মানবতার ভাগ্যাকাশে নতুন এক ভাগ্যতারা উদয়ের।
পৃথিবীতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের প্রতিষ্ঠিত সুন্নাত ও শাশ্বত রীতি হলো—প্রতিটি আঁধার রাতের শেষেই আসে সুহাসিনী ভোর। রাত যত গভীর হয়, ভোরের আগমনধ্বনি তত নিকটবর্তী হয়। আর তাই মূর্খতার তমশাচ্ছন্ন ধরণিতেই নিকষ আঁধার ভেদ করে সত্যের আলো ছড়াতে উদয় হয়েছিল ন্যায় ও কল্যাণের মহাসূর্যের; পুণ্যের পথ দেখাতে আগমন ঘটেছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানবের।
তার পরিচয়?! তিনি ইমামুল মুরসালিন, নবী-রাসুলগণের ইমাম; রহমাতুল্লিল আলামিন, বিশ্ববাসীর জন্য আল্লাহর রহমত; সাইয়িদুল কাওনাইন, উভয় জাহানের নেতা; শাফিউল মুযনিবিন, কিয়ামত-দিবসে পাপী-তাপীদের জন্য সুপারিশকারী; বাদরুদ-দুজা, আঁধার রাতের শশী; শামসুদ-দুহা, পূর্বাহ্নের দিবাকর। তিনি...!
ইসলামপূর্ব যুগে ইহুদিরা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করত। তাদের কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্য ছিল না। ইহুদিরা নিজেদেরকে আল্লাহর নির্বাচিত জাতি মনে করত এবং তাওরাতকে তাদের ধর্মগ্রন্থ হিসেবে অনুসরণ করত। ইহুদি সমাজে ধর্মীয় নেতারা ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী। তারা সমাজের সকল বিষয়ে হস্তক্ষেপ করত এবং সাধারণ মানুষকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখত। ইসলামপূর্ব যুগে ইহুদিরা আরবেও বসবাস করত। মদিনায় তাদের বেশ কয়েকটি গোত্র ছিল, যেমন: বনূ কায়নুকা, বনূ নাযির ও বনূ কুরায়যা। তারা আরবের অন্যান্য গোত্রের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করত এবং তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখত। তবে তারা নিজেদেরকে আরবের অন্যান্য গোত্রের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করত এবং তাদের সঙ্গে বিবাহ-সম্পর্ক স্থাপন করত না। ইসলামপূর্ব যুগে ইহুদিরা মদিনার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।