📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 রোমান সাম্রাজ্য

📄 রোমান সাম্রাজ্য


গ্রিকদের পতনের পর দীর্ঘদিন রোমান সাম্রাজ্যই ছিল পৃথিবীর সর্ববৃহৎ শক্তি। আল্লাহর নবী হজরত ঈসা আ. রোমান সাম্রাজ্যেই প্রেরিত হয়েছিলেন। কিন্তু ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে রোমান সাম্রাজ্যের পরিস্থিতিও সাসানি সাম্রাজ্যের চেয়ে কোনো দিক থেকে উন্নত ছিল না।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন হজরত ঈসা আ.-কে উঠিয়ে নেওয়ার পর তার শিষ্যদের মধ্যে আত্মকলহ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে সেন্ট পল নামক জনৈক ইহুদি খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে সমকালীন খ্রিষ্টানসমাজের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে এবং বিভিন্ন মনগড়া মতাদর্শ খ্রিষ্টধর্মে যুক্ত করে। চিরতরে এই পবিত্র ধর্মের বিনাশ সাধন করে। তার কূট চক্রান্তে একত্ববাদ প্রতিষ্ঠাকারী খ্রিষ্টধর্ম পরিণত হয় ত্রিত্ববাদ প্রচারকারী অসার ধর্মে। আল্লাহর রাসুল হজরত ঈসা আ. পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন মূর্তিপূজা ও পৌত্তলিকতার মূলোৎপাটন করতে; কিন্তু এবার তার অনুসারীরাই শুরু করে মূর্তিপূজা। ঈসা আ. ও তার জননীর মূর্তি তৈরি করে গির্জার অভ্যন্তরে শুরু হয় প্রতিমার আরাধনা।
চতুর্থ শতাব্দীতে রোমান সাম্রাজ্য পূর্ব-পশ্চিম দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের অধিপতি সম্রাট কনস্টান্টাইন (Constantine the Great) রাজনৈতিক স্বার্থে সাম্রাজ্যের সাধারণ মানুষের গণধর্ম খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় এবার ত্রিত্ববাদ ও পৌত্তলিকতাপূর্ণ খ্রিষ্টধর্ম রোমান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় ধর্মে পরিণত হয়।
অপরদিকে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যে 'হলি রোমান অ্যাম্পায়ার' নামে স্বতন্ত্র খ্রিষ্টজগৎ অস্তিত্ব লাভ করে। রোমের পোপ লাভ করেন ধর্মসংক্রান্ত যাবতীয় অপরাধের বিচারিক ক্ষমতা। ফলে লোভনীয় পোপ পদ নিয়ে শুরু হয় হানাহানি-সংঘাত। পোপ ও পাদরিরা নিজ নিজ অঞ্চলে সাধারণ খ্রিষ্টান জনগণের উপাস্যে পরিণত হয়। ধর্মযাজকরা ঘোষণা করে, 'স্বর্গের চাবি আমাদের হাতে। যথেচ্ছা পাপ করো; এরপর আমাদের কাছ থেকে ক্ষমা ও স্বর্গপ্রাপ্তির স্বীকৃতি নিয়ে যাও।' তাদের এই ঘোষণার ফলে খ্রিষ্টজগতে অন্যায়-অপরাধ এবং পাপ ও দুর্নীতির যে অবাধ স্রোত প্রবাহিত হয়, ইতিহাসে তার তুলনা নেই। পবিত্র কুরআনের ভাষায়—
اِتَّخَذُوْا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ )
তারা আল্লাহর পরিবর্তে নিজেদের ধর্মগুরু ও সন্ন্যাসীদের প্রতিপালক বানিয়ে নিয়েছে এবং মাসিহ বিন মরিয়মকেও। [সুরা তাওবা: ৩১]
নিঃসন্দেহে আল্লাহর নবী ঈসা আ.-ও যদি তখন পুনরাগমন করতেন, এই খ্রিষ্টধর্মকে চিনতে পারতেন না এবং কিছুতেই এর সঙ্গে নিজের সম্পৃক্তি স্বীকার করতেন না।

রোমান সাম্রাজ্য (Roman Empire) ছিল ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ সাম্রাজ্য। ২৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১৪৫৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এই সাম্রাজ্য টিকে ছিল। রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল কনস্টান্টিনোপল (Constantinople)। রোমান সাম্রাজ্যের জনগণ ছিল খ্রিষ্টান। তারা যিশুকে আল্লাহর পুত্র মনে করত এবং ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস করত। রোমান সাম্রাজ্যের সমাজব্যবস্থা ছিল সাসানি সাম্রাজ্যের ন্যায় শ্রেণি-বিভক্ত। সমাজের উচ্চশ্রেণির লোকেরা ছিল অভিজাত ও ধনী। তারা রাষ্ট্রের সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত। নিম্নশ্রেণির লোকেরা ছিল দরিদ্র ও শোষিত। তারা রাষ্ট্রের সকল বোঝা বহন করত। রোমান সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট ছিলেন ১১শ কনস্টান্টাইন (Constantine XI Palaiologos)। তার শাসনামলেই উসমানি সুলতান মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ কনস্টান্টিনোপল জয় করেন এবং ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসেন।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 ভারতবর্ষ

📄 ভারতবর্ষ


সুপ্রাচীন সভ্যতার গৌরবময় ঐতিহ্যের অধিকারী ভারতবর্ষের অবস্থাও তখন অত্যন্ত শোচনীয় ছিল। ভারতবর্ষে ছিল বহু দেবদেবীর উপাসনা ও পূজা-অর্চনা। বরং এ ক্ষেত্রে ভারতবাসী ছিল অন্য দেশের চেয়ে এককাঠি সরেস! কালের পরিক্রমায় ভারতবর্ষে উপাস্য ও দেবতার সংখ্যা পৌঁছেছিল তেত্রিশ কোটিতে! ঝড়বৃষ্টি, বজ্র-বিদ্যুৎ, ঊষা-রজনী, নদী-পর্বত, গাছ-পালা, পশুপাখি, অগ্নি-পাথর কোনো বস্তুই উপাস্যের তালিকার বাইরে ছিল না।
ভারতবর্ষের সামাজিক অবক্ষয়ের আরেকটি নিদর্শন হলো জাতিপ্রথা ও শ্রেণিবিভাগ। একই ভূখণ্ডে বসবাসকারী মানবসমাজকে বিভক্ত করা হয়েছিল উচ্চ শ্রেণি ও নিম্ন শ্রেণিতে। সামাজিক এই বিভাজনের প্রভাব ছিল জীবনের সকল ক্ষেত্রে। উচ্চ শ্রেণির কেউ যত বড় অপরাধই করুক, তার কোনো শাস্তি হতো না। অপরদিকে নিম্ন শ্রেণির মানুষকে লঘু অপরাধে প্রদান করা হতো গুরুদণ্ড। নিম্ন শ্রেণিকে অস্পৃশ্য গণ্য করা হতো এবং তাদের ছোঁয়া লাগলে বস্তুকে অপবিত্র মনে করা হতো। নারীদেরকে দাসী গণ্য করা হতো। কোনো পুরুষ মারা গেলে তার স্ত্রীকে বরণ করতে হতো স্বেচ্ছামৃত্যু।
চীন, তুর্কিস্তান, আবিসিনিয়া ও অন্যান্য সাম্রাজ্যের পরিস্থিতিতে সাসানি সাম্রাজ্য, রোমান সাম্রাজ্য বা ভারতবর্ষের চেয়ে ভিন্নতর কিছু ছিল না।

ভারতবর্ষ ছিল তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও সমৃদ্ধ অঞ্চল। এখানে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ বসবাস করত। হিন্দুধর্ম ছিল এখানকার প্রধান ধর্ম। এ ছাড়াও বৌদ্ধধর্ম, জৈনধর্ম ও অন্যান্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধর্ম প্রচলিত ছিল। ভারতবর্ষের সমাজব্যবস্থা ছিল বর্ণপ্রথা-ভিত্তিক। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র—এই চারটি বর্ণে সমাজ বিভক্ত ছিল। ব্রাহ্মণরা ছিল সমাজের উচ্চশ্রেণির লোক, যারা ধর্মীয় ও শিক্ষাগত দিক থেকে শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হতো। ক্ষত্রিয়রা ছিল শাসক ও যোদ্ধা। বৈশ্যরা ছিল ব্যবসায়ী ও কৃষক। শূদ্ররা ছিল সমাজের নিম্নশ্রেণির লোক, যারা সমাজের সকল বোঝা বহন করত এবং দাসত্বের জীবনযাপন করত। ইসলামপূর্ব যুগে ভারতবর্ষে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য ও সাম্রাজ্য বিদ্যমান ছিল। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল গুপ্ত সাম্রাজ্য, মৌর্য সাম্রাজ্য ও পাল সাম্রাজ্য। ইসলামপূর্ব যুগে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অস্থিতিশীল। বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে প্রায়শই যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগে থাকত।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 ইহুদিসমাজ

📄 ইহুদিসমাজ


তৎকালে পুরো পৃথিবীতে ইহুদিদের স্বতন্ত্র কোনো রাষ্ট্র ছিল না। আরব উপদ্বীপের মদিনা ও খায়বার অঞ্চলে কিছু ইহুদি বসবাস করত। এর বাইরে রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু ইহুদির অস্তিত্ব ছিল।
নিষ্ঠুরতা ও বিশ্বাসঘাতকতা ছিল ইহুদিদের প্রধান চরিত্র-বৈশিষ্ট্য। পাশাপাশি তারা ছিল চরম পর্যায়ের হিংস্র। ইহুদিরাই নাজরানের খ্রিস্টানদেরকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করে হত্যা করেছিল।
ধর্মজ্ঞানে পারদর্শী ইহুদি বুদ্ধিজীবীরা ধনবান ব্যক্তিদের মনস্তুষ্টির জন্য ধর্মীয় বিধানে যথেচ্ছ সংযোজন-বিয়োজন করত। তাদের স্বেচ্ছাচারিতায় ইহুদিধর্ম তখন ধর্মগুরুদের স্বার্থসিদ্ধির মাধ্যমে পরিণত হয়েছিল। আচরণগত অবক্ষয়ের কারণে পৃথিবীবাসীর কাছে ইহুদিরা পরিণত হয়েছিল নিকৃষ্ট ও ঘৃণিত এক জাতিতে।
(ضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذِّلَّةُ وَالْمَسْكَنَةُ وَبَاءُوْ بِغَضَبٍ مِنَ اللَّهِ )
আর তাদের (ইহুদিদের) ওপর লাঞ্ছনা ও অসহায়ত্বের ছাপ মেরে দেওয়া হলো এবং তারা আল্লাহর গজব নিয়ে ফিরল। [সুরা বাকারা: ৬১]
সমকালীন বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী ও প্রতাপশালী সাম্রাজ্যগুলোর অবস্থা যখন এই, তখন ছোট ছোট রাজ্য ও জনপদগুলোর পরিস্থিতি যে কতটা নিম্নগামী ছিল, তা সহজেই অনুমেয়। ধরণিজুড়ে কোথাও ছিল না সত্য ও বিশ্বাসের আলো, পৃথিবী নিমজ্জিত ছিল অন্যায় ও অবিশ্বাসের অন্ধকারে। অবক্ষয়ের চরম প্রান্তে উপনীত সেই কালের নামই হয়ে গিয়েছিল 'আল-আইয়ামুল জাহিলিয়া' বা মূর্খতা ও অন্ধকারের যুগ।
মানবতা যেন সহ্যের শেষ সীমায় উপনীত হয়ে দয়াময় আল্লাহর কুদরতি করুণার প্রত্যাশায় প্রহর গুনছিল। সকলের প্রত্যাশা ছিল নিকষ কালো আঁধার চিরে নতুন সূর্যোদয়ের, মানবতার ভাগ্যাকাশে নতুন এক ভাগ্যতারা উদয়ের।
পৃথিবীতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের প্রতিষ্ঠিত সুন্নাত ও শাশ্বত রীতি হলো—প্রতিটি আঁধার রাতের শেষেই আসে সুহাসিনী ভোর। রাত যত গভীর হয়, ভোরের আগমনধ্বনি তত নিকটবর্তী হয়। আর তাই মূর্খতার তমশাচ্ছন্ন ধরণিতেই নিকষ আঁধার ভেদ করে সত্যের আলো ছড়াতে উদয় হয়েছিল ন্যায় ও কল্যাণের মহাসূর্যের; পুণ্যের পথ দেখাতে আগমন ঘটেছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানবের।
তার পরিচয়?! তিনি ইমামুল মুরসালিন, নবী-রাসুলগণের ইমাম; রহমাতুল্লিল আলামিন, বিশ্ববাসীর জন্য আল্লাহর রহমত; সাইয়িদুল কাওনাইন, উভয় জাহানের নেতা; শাফিউল মুযনিবিন, কিয়ামত-দিবসে পাপী-তাপীদের জন্য সুপারিশকারী; বাদরুদ-দুজা, আঁধার রাতের শশী; শামসুদ-দুহা, পূর্বাহ্নের দিবাকর। তিনি...!

ইসলামপূর্ব যুগে ইহুদিরা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করত। তাদের কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্য ছিল না। ইহুদিরা নিজেদেরকে আল্লাহর নির্বাচিত জাতি মনে করত এবং তাওরাতকে তাদের ধর্মগ্রন্থ হিসেবে অনুসরণ করত। ইহুদি সমাজে ধর্মীয় নেতারা ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী। তারা সমাজের সকল বিষয়ে হস্তক্ষেপ করত এবং সাধারণ মানুষকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখত। ইসলামপূর্ব যুগে ইহুদিরা আরবেও বসবাস করত। মদিনায় তাদের বেশ কয়েকটি গোত্র ছিল, যেমন: বনূ কায়নুকা, বনূ নাযির ও বনূ কুরায়যা। তারা আরবের অন্যান্য গোত্রের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করত এবং তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখত। তবে তারা নিজেদেরকে আরবের অন্যান্য গোত্রের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করত এবং তাদের সঙ্গে বিবাহ-সম্পর্ক স্থাপন করত না। ইসলামপূর্ব যুগে ইহুদিরা মদিনার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00