📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 সাসানি সাম্রাজ্য

📄 সাসানি সাম্রাজ্য


তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতাপশালী দুই সাম্রাজ্যের একটি ছিল পারস্যকেন্দ্রিক সাসানি সাম্রাজ্য। পারস্য এককালে যদিও সভ্যতার অত্যুচ্চ শিখরে উন্নীত হয়েছিল; কিন্তু নবীজির আবির্ভাবের দেড়শ বছর পূর্ব থেকেই সাসানি সাম্রাজ্যে শুরু হয় অবনতির উল্টো স্রোত। অনেক আগেই পারসিকরা গ্রহ-নক্ষত্রের পূজা পরিত্যাগ করে ধর্ম হিসেবে জরথুস্ত্রবাদ (অগ্নিপূজা) গ্রহণ করেছিল। ইসলামের আবির্ভাবের কয়েক শতাব্দী পূর্বে পারস্যে ‘মানি’ নামক জনৈক ধর্মপ্রচারক জরথুস্ত্রবাদ ও খ্রিষ্টধর্মের মিশ্রণে এক অভিনব ধর্মের প্রচার শুরু করে।
পারসিক সমাজে নীতি-নৈতিকতা এতটা নিম্নগামী অবস্থানে উপনীত হয়েছিল যে, পিতা নিজ কন্যাকে এবং ভাই আপন বোনকে নির্দ্বিধায় বিয়ে করত। সাধারণ প্রজারা সম্রাট (কিসরা) ও রাজপ্রতিনিধিদের প্রণাম করত। রাজদরবারে কোনো প্রজা বসতে বা কথা বলতে পারত না।
সাসানি-রোমান ঐতিহ্যবাহী সংঘাত ও যুদ্ধের কারণে রাজ্যজুড়ে সব সময় অশান্তি বিরাজ করত। কোনো এলাকা রোমানদের দখলে চলে গেলে রাতারাতি অগ্নিপূজার মন্দির গির্জায় পরিণত হতো, বিপরীতে রোমানদের কোনো অঞ্চল সাসানিদের দখলে এলে গির্জা পরিণত হতো মন্দিরে।
ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে পারস্যে এক নতুন ধর্মীয় দর্শন জনপ্রিয়তা লাভ করে—‘নারী ও ধনসম্পদ কারও ব্যক্তিগত অধিকার নয়; বরং প্রতিটি নারী ও সকল সম্পদে সকলের সমভাবে ভোগের অধিকার রয়েছে।’ ইতর শ্রেণির লোকেরা সোৎসাহে এই নীতি গ্রহণ করে নেয়। পরবর্তীকালে রাজদরবার কর্তৃক স্বীকৃত হয়ে এই বিকৃত দর্শন পরিণত হয় সাসানি সাম্রাজ্যের রাজকীয় নীতিতে। সাম্রাজ্যজুড়ে ভোগবিলাস ও কামপ্রবৃত্তি চরিতার্থের এক উন্মত্ত ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়। ৫৩১ খ্রিষ্টাব্দে নওশেরওয়া সম্রাট হওয়ার পর এই কুপ্রথা রহিত করেন এবং জরথুস্ত্রবাদকে (Zoroastrianism) রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন।

সাসানি সাম্রাজ্য (Sasanian Empire) ছিল প্রাচীন পারস্যের সর্বশেষ সাম্রাজ্য। ২২৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৬৫১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এই সাম্রাজ্য টিকে ছিল। সাসানি সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল তিসফুন (Ctesiphon) নগরী। সাসানি সাম্রাজ্য ছিল তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শক্তি। রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের শত্রুতা ছিল। সাসানি সাম্রাজ্যের জনগণ ছিল অগ্নিপূজারি। তারা যরথুস্ত্র (Zoroaster) নামক জনৈক ব্যক্তির প্রবর্তিত ধর্ম অনুসরণ করত। যরথুস্ত্রের অনুসারীগণ অগ্নিকে পবিত্র মনে করত এবং অগ্নিকে উপাসনা করত। সাসানি সাম্রাজ্যের সমাজব্যবস্থা ছিল শ্রেণি-বিভক্ত। সমাজের উচ্চশ্রেণির লোকেরা ছিল অভিজাত ও ধনী। তারা রাষ্ট্রের সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত। নিম্নশ্রেণির লোকেরা ছিল দরিদ্র ও শোষিত। তারা রাষ্ট্রের সকল বোঝা বহন করত। সাসানি সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট ছিলেন ৩য় ইয়াযদগার্দ (Yazdgerd III)। তিনি ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৬৫১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত শাসন করেন। তার শাসনামলেই মুসলিম বাহিনী সাসানি সাম্রাজ্য জয় করে এবং ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসে।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 ইসলামপূর্ব অবশিষ্ট বিশ্ব

📄 ইসলামপূর্ব অবশিষ্ট বিশ্ব


ইসলামপূর্ব যুগে আরবের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো ছিল সাসানি সাম্রাজ্য (পারস্য), রোমান সাম্রাজ্য (বাইজান্টাইন) ও ভারতবর্ষ। এই তিনটি সাম্রাজ্যই ছিল তৎকালীন বিশ্বের বৃহৎ শক্তি। এ ছাড়াও ছিল ইহুদি ও খ্রিষ্টান অধ্যুষিত বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চল। সাসানি ও রোমান সাম্রাজ্যের আলোচনা সামনে বিস্তারিত আসবে। এখানে সংক্ষেপে ভারতবর্ষ ও ইহুদি সমাজের অবস্থা তুলে ধরা হলো।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 রোমান সাম্রাজ্য

📄 রোমান সাম্রাজ্য


গ্রিকদের পতনের পর দীর্ঘদিন রোমান সাম্রাজ্যই ছিল পৃথিবীর সর্ববৃহৎ শক্তি। আল্লাহর নবী হজরত ঈসা আ. রোমান সাম্রাজ্যেই প্রেরিত হয়েছিলেন। কিন্তু ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে রোমান সাম্রাজ্যের পরিস্থিতিও সাসানি সাম্রাজ্যের চেয়ে কোনো দিক থেকে উন্নত ছিল না।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন হজরত ঈসা আ.-কে উঠিয়ে নেওয়ার পর তার শিষ্যদের মধ্যে আত্মকলহ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে সেন্ট পল নামক জনৈক ইহুদি খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে সমকালীন খ্রিষ্টানসমাজের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে এবং বিভিন্ন মনগড়া মতাদর্শ খ্রিষ্টধর্মে যুক্ত করে। চিরতরে এই পবিত্র ধর্মের বিনাশ সাধন করে। তার কূট চক্রান্তে একত্ববাদ প্রতিষ্ঠাকারী খ্রিষ্টধর্ম পরিণত হয় ত্রিত্ববাদ প্রচারকারী অসার ধর্মে। আল্লাহর রাসুল হজরত ঈসা আ. পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন মূর্তিপূজা ও পৌত্তলিকতার মূলোৎপাটন করতে; কিন্তু এবার তার অনুসারীরাই শুরু করে মূর্তিপূজা। ঈসা আ. ও তার জননীর মূর্তি তৈরি করে গির্জার অভ্যন্তরে শুরু হয় প্রতিমার আরাধনা।
চতুর্থ শতাব্দীতে রোমান সাম্রাজ্য পূর্ব-পশ্চিম দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের অধিপতি সম্রাট কনস্টান্টাইন (Constantine the Great) রাজনৈতিক স্বার্থে সাম্রাজ্যের সাধারণ মানুষের গণধর্ম খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় এবার ত্রিত্ববাদ ও পৌত্তলিকতাপূর্ণ খ্রিষ্টধর্ম রোমান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় ধর্মে পরিণত হয়।
অপরদিকে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যে 'হলি রোমান অ্যাম্পায়ার' নামে স্বতন্ত্র খ্রিষ্টজগৎ অস্তিত্ব লাভ করে। রোমের পোপ লাভ করেন ধর্মসংক্রান্ত যাবতীয় অপরাধের বিচারিক ক্ষমতা। ফলে লোভনীয় পোপ পদ নিয়ে শুরু হয় হানাহানি-সংঘাত। পোপ ও পাদরিরা নিজ নিজ অঞ্চলে সাধারণ খ্রিষ্টান জনগণের উপাস্যে পরিণত হয়। ধর্মযাজকরা ঘোষণা করে, 'স্বর্গের চাবি আমাদের হাতে। যথেচ্ছা পাপ করো; এরপর আমাদের কাছ থেকে ক্ষমা ও স্বর্গপ্রাপ্তির স্বীকৃতি নিয়ে যাও।' তাদের এই ঘোষণার ফলে খ্রিষ্টজগতে অন্যায়-অপরাধ এবং পাপ ও দুর্নীতির যে অবাধ স্রোত প্রবাহিত হয়, ইতিহাসে তার তুলনা নেই। পবিত্র কুরআনের ভাষায়—
اِتَّخَذُوْا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ )
তারা আল্লাহর পরিবর্তে নিজেদের ধর্মগুরু ও সন্ন্যাসীদের প্রতিপালক বানিয়ে নিয়েছে এবং মাসিহ বিন মরিয়মকেও। [সুরা তাওবা: ৩১]
নিঃসন্দেহে আল্লাহর নবী ঈসা আ.-ও যদি তখন পুনরাগমন করতেন, এই খ্রিষ্টধর্মকে চিনতে পারতেন না এবং কিছুতেই এর সঙ্গে নিজের সম্পৃক্তি স্বীকার করতেন না।

রোমান সাম্রাজ্য (Roman Empire) ছিল ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ সাম্রাজ্য। ২৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১৪৫৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এই সাম্রাজ্য টিকে ছিল। রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল কনস্টান্টিনোপল (Constantinople)। রোমান সাম্রাজ্যের জনগণ ছিল খ্রিষ্টান। তারা যিশুকে আল্লাহর পুত্র মনে করত এবং ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস করত। রোমান সাম্রাজ্যের সমাজব্যবস্থা ছিল সাসানি সাম্রাজ্যের ন্যায় শ্রেণি-বিভক্ত। সমাজের উচ্চশ্রেণির লোকেরা ছিল অভিজাত ও ধনী। তারা রাষ্ট্রের সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত। নিম্নশ্রেণির লোকেরা ছিল দরিদ্র ও শোষিত। তারা রাষ্ট্রের সকল বোঝা বহন করত। রোমান সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট ছিলেন ১১শ কনস্টান্টাইন (Constantine XI Palaiologos)। তার শাসনামলেই উসমানি সুলতান মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ কনস্টান্টিনোপল জয় করেন এবং ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসেন।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 ভারতবর্ষ

📄 ভারতবর্ষ


সুপ্রাচীন সভ্যতার গৌরবময় ঐতিহ্যের অধিকারী ভারতবর্ষের অবস্থাও তখন অত্যন্ত শোচনীয় ছিল। ভারতবর্ষে ছিল বহু দেবদেবীর উপাসনা ও পূজা-অর্চনা। বরং এ ক্ষেত্রে ভারতবাসী ছিল অন্য দেশের চেয়ে এককাঠি সরেস! কালের পরিক্রমায় ভারতবর্ষে উপাস্য ও দেবতার সংখ্যা পৌঁছেছিল তেত্রিশ কোটিতে! ঝড়বৃষ্টি, বজ্র-বিদ্যুৎ, ঊষা-রজনী, নদী-পর্বত, গাছ-পালা, পশুপাখি, অগ্নি-পাথর কোনো বস্তুই উপাস্যের তালিকার বাইরে ছিল না।
ভারতবর্ষের সামাজিক অবক্ষয়ের আরেকটি নিদর্শন হলো জাতিপ্রথা ও শ্রেণিবিভাগ। একই ভূখণ্ডে বসবাসকারী মানবসমাজকে বিভক্ত করা হয়েছিল উচ্চ শ্রেণি ও নিম্ন শ্রেণিতে। সামাজিক এই বিভাজনের প্রভাব ছিল জীবনের সকল ক্ষেত্রে। উচ্চ শ্রেণির কেউ যত বড় অপরাধই করুক, তার কোনো শাস্তি হতো না। অপরদিকে নিম্ন শ্রেণির মানুষকে লঘু অপরাধে প্রদান করা হতো গুরুদণ্ড। নিম্ন শ্রেণিকে অস্পৃশ্য গণ্য করা হতো এবং তাদের ছোঁয়া লাগলে বস্তুকে অপবিত্র মনে করা হতো। নারীদেরকে দাসী গণ্য করা হতো। কোনো পুরুষ মারা গেলে তার স্ত্রীকে বরণ করতে হতো স্বেচ্ছামৃত্যু।
চীন, তুর্কিস্তান, আবিসিনিয়া ও অন্যান্য সাম্রাজ্যের পরিস্থিতিতে সাসানি সাম্রাজ্য, রোমান সাম্রাজ্য বা ভারতবর্ষের চেয়ে ভিন্নতর কিছু ছিল না।

ভারতবর্ষ ছিল তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও সমৃদ্ধ অঞ্চল। এখানে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ বসবাস করত। হিন্দুধর্ম ছিল এখানকার প্রধান ধর্ম। এ ছাড়াও বৌদ্ধধর্ম, জৈনধর্ম ও অন্যান্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধর্ম প্রচলিত ছিল। ভারতবর্ষের সমাজব্যবস্থা ছিল বর্ণপ্রথা-ভিত্তিক। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র—এই চারটি বর্ণে সমাজ বিভক্ত ছিল। ব্রাহ্মণরা ছিল সমাজের উচ্চশ্রেণির লোক, যারা ধর্মীয় ও শিক্ষাগত দিক থেকে শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হতো। ক্ষত্রিয়রা ছিল শাসক ও যোদ্ধা। বৈশ্যরা ছিল ব্যবসায়ী ও কৃষক। শূদ্ররা ছিল সমাজের নিম্নশ্রেণির লোক, যারা সমাজের সকল বোঝা বহন করত এবং দাসত্বের জীবনযাপন করত। ইসলামপূর্ব যুগে ভারতবর্ষে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য ও সাম্রাজ্য বিদ্যমান ছিল। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল গুপ্ত সাম্রাজ্য, মৌর্য সাম্রাজ্য ও পাল সাম্রাজ্য। ইসলামপূর্ব যুগে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অস্থিতিশীল। বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে প্রায়শই যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগে থাকত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00