📄 অর্থনৈতিক পরিস্থিতি
আরব উপদ্বীপের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে যেহেতু কোথাও ছিল মরুভূমি, আবার কোথাও মরূদ্যান, তাই আরবদেশের বাসিন্দারাও দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। অধিকাংশ জনসাধারণ ছিল মরুচারী বেদুইন, অন্যরা ছিল মরুদ্যানকেন্দ্রিক বিভিন্ন নগর-জনপদের স্থায়ী বাসিন্দা। বেদুইনরা যাযাবর জীবন যাপন করত এবং পশুপালন করে জীবিকা নির্বাহ করত।
অপরদিকে বিভিন্ন জনপদের স্থায়ী বাসিন্দারা কৃষিকর্ম ও ব্যবসাবাণিজ্যের মাধ্যমে জীবন ধারণ করত। পশুপালনের ক্ষেত্রে উট, ছাগল ও ভেড়াই ছিল প্রধান, তবে কোনো কোনো এলাকায় ঘোড়াপালনও জনপ্রিয় ছিল। কৃষিকর্মের ক্ষেত্রে প্রধান ফসল ছিল খেজুর। এর পাশাপাশি সীমিত পরিসরে গম, ধান ও ভুট্টার চাষ হতো।
বেদুইন-জীবনের অন্যতম অবলম্বন ছিল উট। দীর্ঘদিন পানি পান না করে, লতাপাতা বা কাঁটাগাছ খেয়ে এবং কিছু না পেলে খেজুর-বিচি চিবিয়ে জীবনধারণের সক্ষমতাই উটকে মরুজীবনের অপরিহার্য বাহনরূপে উপযুক্ত করে তুলেছিল। অপরদিকে উষ্ণ মরুতে সহজে বর্ধিত হয় বলে মরূদ্যানবাসীর প্রধান সম্পদ ছিল খেজুর। খেজুর আরবদের কেবল খাদ্যপ্রয়োজনই পূরণ করত না; ঘর, বিছানা ও বিভিন্ন আসবাবপত্র তৈরিতে খেজুর গাছের কাণ্ড, ডাল-পাতা ইত্যাদি ব্যবহৃত হতো। যাযাবর জীবনে যেমন সম্পদের পরিমাণ পোষ্য পশুর সংখ্যা দ্বারা নির্ণীত হতো, স্থায়ী বাসিন্দাদের সম্পদ-পরিমাণ তেমনই নির্ণয় করা হতো খেজুর গাছের সংখ্যা অনুপাতে।
পানির স্বল্পতার কারণে আরব উপদ্বীপে কৃষিকর্মের সুযোগ যেহেতু নগণ্য, তাই আরববাসীর জীবিকা উপার্জনের অন্যতম প্রধান অবলম্বন ছিল ব্যবসাবাণিজ্য। যেহেতু আরব উপদ্বীপের অবস্থান ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়া মহাদেশের মিলনস্থলে, তাই পূর্ব-পশ্চিমের বাণিজ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে আরব অন্যতম প্রধান সংযোগ সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আরবের এসব পথের নানা বিন্দুতে গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন নগর-জনপদ।
ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরব উপদ্বীপের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ছিল মিশ্র। কিছু এলাকা সমৃদ্ধিশালী ছিল, আবার কিছু এলাকা দরিদ্র ছিল।
আরব উপদ্বীপের প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য, পশুপালন ও কৃষিকাজ। মক্কা ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র। এখানে বিভিন্ন দেশ থেকে বণিকরা আসত এবং পণ্য আদান-প্রদান করত।
আরব উপদ্বীপের প্রধান কৃষিপণ্য ছিল খেজুর, গম ও যব। পশুপালনের মধ্যে উট, ভেড়া ও ছাগল ছিল প্রধান।
আরব উপদ্বীপে স্বর্ণ, রৌপ্য ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর খনিও ছিল।
📄 সামাজিক পরিস্থিতি
সমকালীন আরবের সামাজিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। বাধাহীন অনাচার, অত্যাচার, আত্মকলহ, ব্যভিচার, চুরি-ডাকাতি এবং হানাহানি-রক্তপাত ছিল তৎকালীন আরবসমাজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। গোত্রে গোত্রে শত্রুতা, ক্ষতিসাধনের চেষ্টা এবং মারামারি-কাটাকাটি ছিল নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়।
তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে গোত্রে গোত্রে লড়াই শুরু হতো এবং বছরের পর বছর বরং কয়েক দশক ধরে তা অব্যাহত থাকত। মৃত্যুশয্যায় শায়িত ব্যক্তি তার আত্মীয়স্বজনকে একটা অসিয়তই করে যেত— প্রতিশোধ। প্রতিটি শিশু বাল্যকাল থেকেই প্রতিশোধ গ্রহণের জিঘাংসা লালন করে বেড়ে উঠত।
চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই-রাহাজানিও ছিল প্রতিদিনের ঘটনা। এক গোত্র অপর গোত্রের ধনসম্পদ, গৃহপালিত পশু এমনকি স্ত্রী-কন্যা পর্যন্ত লুট করত এবং নারী ও শিশুদেরকে পণ্যরূপে বিক্রি করে দিত।
সমসাময়িক আরবসমাজে নারী অধিকার বলে কিছু ছিল না। নারীদেরকে পণ্য ও সম্ভোগের বস্তুর চেয়ে অধিক কিছু মনে করা হতো না। মৃত ব্যক্তির ত্যাজ্য সম্পত্তি থেকে নারীরা কিছু লাভ করত না। যুদ্ধ শেষে বিজয়ী পক্ষ বিজিত পক্ষের নারীদের ওপর পাশবিক অত্যাচার চালাত। বিয়ের কোনো নিয়ন্ত্রিত সংখ্যা ছিল না। যার যত ইচ্ছা বিয়ে করতে পারত। পিতার মৃত্যুর পর বিমাতাগণ পুত্রের পত্নীতে পরিণত হতো! ঋতুকালে নারীরা অস্পৃশ্য হয়ে যেত। বিধবা হলে মলিন জীর্ণ বসনে একটি সংকীর্ণ অন্ধকার কক্ষে পুরো এক বছর আবদ্ধ থাকতে হতো।
নারীদের প্রতি এই লাঞ্ছনাকর আচরণের কারণে আরবসমাজে কন্যাসন্তানকে ঘৃণার চোখে দেখা হতো। কারও কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করলে তাকে পুরো বংশের কলঙ্ক মনে করা হতো। কন্যাসন্তানের পিতার মস্তক লজ্জায় অবনত হয়ে যেত। পবিত্র কুরআনে সেই বর্বর যুগের চরম নিকৃষ্ট মানসিকতাকে এভাবে চিত্রিত করা হয়েছে—
﴿وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُمْ بِالْأُنْثَى ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًّا وَهُوَ كَظِيمٌ يَتَوَارَى مِنَ الْقَوْمِ مِنْ سُوءِ مَا بُشِّرَ بِهِ أَيُمْسِكُهُ عَلَى هُوَنٍ أَمْ يَدُسُّهُ فِي التُّرَابِ أَلَا سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ﴾
যখন তাদের কাউকে কন্যাসন্তান (জন্মগ্রহণ)-এর সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার চেহারা মলিন হয়ে যায় এবং সে দুঃখ-ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে। সে একে মন্দ ভেবে মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে বেড়ায়, (এবং ভাবতে থাকে) অপমান সয়ে তাকে নিজের কাছেই রেখে দেবে, নাকি মাটিতে পুঁতে ফেলবে? [সুরা নাহল : ৫৮-৫৯]
এই কলঙ্কজনক অনুভূতি থেকে নিষ্কৃতি লাভের জন্য একসময় শুরু হয় কন্যাসন্তানকে জীবিত প্রোথিত করার চরম গর্হিত প্রথা। কায়স বিন আসিম নামক জনৈক ব্যক্তি ইসলামগ্রহণ করার পর নবীজির খেদমতে হাজির হয়ে বলেছিল, 'আমি নিজ হাতে আমার আটটি মেয়েকে জীবন্ত মাটিচাপা দিয়েছি।' (৬)
নির্লজ্জতা আরবসমাজে সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। ব্যভিচার ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। নারী-পুরুষ কেউই জনসম্মুখে বিবস্ত্র হতে সামান্য দ্বিধা করত না। এমনকি কুরাইশ বংশ ব্যতীত অন্যরা সম্পূর্ণ দিগম্বর হয়ে কাবাঘর তাওয়াফ করত।
বাছবিচার না করে খাদ্য-অখাদ্য-কুখাদ্য সবই ভক্ষণ করা হতো। কীট-পতঙ্গ, হিংস্র ও সরীসৃপ প্রাণী, শূকর, মৃত জন্তু ইত্যাদিও আরবদের সাধারণ খাদ্যতালিকায় স্থান পেত। এমনকি জীবিত প্রাণীর দেহের বিভিন্ন অংশও কেটে আহার্য হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
মদ হলো সকল প্রকার পাপ ও অন্যায়ের চাবিকাঠি। অথচ আরবে মদ ছিল আভিজাত্য ও কৌলীন্যের প্রতীক! ঘরে ঘরে আড্ডা জমিয়ে মদপান করা হতো। মাতালদের উন্মাদনায় সংঘটিত হতো নির্লজ্জতা ও পাশবিকতার হাজারো দুর্ঘটনা। প্রসিদ্ধ প্রবাদ ছিল—আরবরা মদ পান করে না; মদে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়! মদ ও মদের আসর নিয়ে কবিরা কবিতা রচনা করত এবং সগৌরবে আবৃত্তি করে সকলের প্রশংসা কুড়াত।
মদের ন্যায় আরবের ঘরে ঘরে জুয়ার প্রচলন ছিল। ব্যাপক প্রচলন ছিল সুদেরও। সম্পদশালী লোকেরা সুদের কারবার করত আর তাদের চক্রবৃদ্ধির ফাঁদে পড়ে দরিদ্ররা সর্বশান্ত হতো। আরবসমাজে আরও ছিল গণক-জ্যোতিষী ও ভবিষ্যদ্বক্তাদের জমজমাট ব্যবসা। জ্যোতিষীরা ভাগ্যগণনা করত, আগামীর বিভিন্ন বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করত এবং ভবিষ্যৎ বিপদ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য দেবতার উপাসনা বা ভোগ প্রদানের পরামর্শ দিত।
টিকাঃ
৬. ইবনে কাছির দিমাশকি, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, সুরা তাকভির।
ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরব উপদ্বীপের সামাজিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। সমাজে শ্রেণি-বিভেদ ছিল প্রকট। ধনী-গরিবের মধ্যে পার্থক্য ছিল অনেক। নারীদের কোনো অধিকার ছিল না। কন্যাশিশুদের জীবন্ত কবর দেওয়া হতো। দাসপ্রথা প্রচলিত ছিল।
আরব সমাজে গোত্রপ্রথা ছিল শক্তিশালী। প্রতিটি গোত্রের নিজস্ব সম্মান ও মর্যাদা ছিল। গোত্রগুলোর মধ্যে প্রায়ই যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগে থাকত।
আরব সমাজে কিছু ভালো দিকও ছিল। যেমন: আতিথেয়তা, বীরত্ব ও উদারতা। আরবরা কবিতা ও সাহিত্যচর্চায়ও পারদর্শী ছিল।
📄 ধর্মীয় পরিস্থিতি
হজরত ইবরাহিম আ.-এর মাধ্যমে আরব ভূখণ্ডে একত্ববাদের বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা লাভ করার পর থেকে আরবরা একত্ববাদ ও এক আল্লাহয় বিশ্বাসী ছিল। তবে কালের পরিক্রমায় একসময় তাদের মাঝে বহুত্ববাদের উৎপত্তি ঘটে। তাদের মাঝে এই ভ্রান্ত বিশ্বাস আসন গেড়ে বসে যে, আল্লাহ তাআলা আসমান জমিন সৃষ্টি করে অবসর গ্রহণ করেছেন এবং পার্থিব সকল বিষয়ের দায়িত্বভার ছোট ছোট উপাস্যদের হাতে ন্যস্ত করেছেন। মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন এসব উপাস্যই পূর্ণ করে। সুতরাং নিজেদের প্রয়োজন পূরণে সর্বশ্রেষ্ঠ উপাস্য আল্লাহ তাআলার পরিবর্তে তাদের উপাসনাই বেশি করে করা প্রয়োজন। এজন্য আরবরা কাল্পনিক বিভিন্ন উপাস্যের উপাসনা করত, তাদের নামে নজরানা পেশ করত এবং নিজেদের অভাব-অভিযোগ তাদের কাছেই নিবেদন করত। তারা বলত—
﴿مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى আমরা তাদের উপাসনা কেবল এজন্য করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে। [সুরা যুমার: ০৩]
কালক্রমে তারা কাল্পনিক উপাস্যদের মূর্তি বানিয়ে পূজা করা শুরু করে। ক্রমান্বয়ে অলীক দেবতার পূজা এত ব্যাপক হয়ে পড়ে যে, কোথাও একটি সুন্দর পাথর পাওয়া গেলে তা উঠিয়ে নিয়ে পূজা করা শুরু হতো। কিছুদিন পর আরও সুন্দর কোনো পাথর পাওয়া গেলে আগেরটি ফেলে শুরু হতো 'নতুন উপাস্যে'র বন্দনা।
আমর খুযাই নামক জনৈক ব্যক্তি বনু জুরহামকে পরাস্ত করে কাবার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর পবিত্র কাবাঘরের অভ্যন্তরেই মূর্তি স্থাপন করে। এরপর একত্ববাদের প্রতীক কাবাঘরেই শুরু হয় মূর্তিপূজার অনাচার।
মূর্তিপূজার পাশাপাশি আরবসমাজে ছিল নানা ধরনের অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের ছড়াছড়ি। বিভিন্ন দিনকে শুভ-অশুভ গণ্য করা, বিশেষ ধরনের পশুকে সম্মানিত ও হারাম মনে করা, গণক ও জ্যোতিষীদের ভবিষ্যদ্বাণীকে বিশ্বাস করে তাদের নির্দেশে দেবতার সামনে ভোগ পেশ করা ইত্যাদি কুসংস্কার আরবসমাজে ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করেছিল।
সারকথা, নৈতিক-সামাজিক ও ধর্মীয় বিচারে আরব উপদ্বীপ তখন অবক্ষয়ের সর্বনিম্ন স্তরে উপনীত হয়েছিল এবং চূড়ান্ত পতনের প্রহর গুনছিল।
ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরব উপদ্বীপের ধর্মীয় পরিস্থিতি ছিল মিশ্র। অধিকাংশ আরব পৌত্তলিক ছিল। তারা বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করত। তাদের প্রধান দেব-দেবী ছিল লাত, মানাত ও উযযা। কাবা শরিফে ৩৬০টি মূর্তি ছিল।
আরব উপদ্বীপে কিছু ইহুদি ও খ্রিস্টানও বসবাস করত। ইহুদিরা মদিনা ও ইয়ামেনের কিছু এলাকায় বসবাস করত। খ্রিস্টানরা নাজরান ও শামের কিছু এলাকায় বসবাস করত।
আরব উপদ্বীপে কিছু হানিফও ছিল। তারা এক আল্লাহর উপাসনা করত এবং পৌত্তলিকতার বিরোধিতা করত। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিতামহ আবদুল মুত্তালিব ও তার চাচা আবু তালিব হানিফ ছিলেন।