📘 ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ নববী যুগ থেকে বর্তমান 📄 ভিয়েনার যুদ্ধ

📄 ভিয়েনার যুদ্ধ


১০৯৪ হিজরি মোতাবেক ১৬৮৩ সালে উসমানীয় সেনারা দুই মাস ভিয়েনা অবরোধ করে রাখে। এরপর ২০ শে রমাদান (১২ই সেপ্টেম্বর) পোল্যান্ড, আলমেনিয়া এবং অস্ট্রিয়ার জোটসেনারা পোল্যান্ডের রাজা তৃতীয় জন সোবিয়েস্কির নেতৃত্বে উসমানীয়দের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। শেষপর্যন্ত উসমানীয় সেনাপতি কারা মুস্তাফা পাশার নেতৃত্বাধীন বাহিনী খ্রিস্টানদের কাছে পরাজিত হয়ে ফেরে এবং এ পরাজয় ইউরোপে উসমানীয়দের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয়।

উসমানি সাম্রাজ্য এবং ভিয়েনা
ইউরোপের অভ্যন্তরে বাণিজ্য সুবিধার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে ভিয়েনা বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছিল। উসমানীয়দের ব্যবসায়িক স্বার্থে ভিয়েনা অধিকারের চিন্তা করছিলেন ধারাবাহিকভাবে বেশ কয়েকজন সুলতান। সে লক্ষ্যে অভিযানও পরিচালিত হয়েছে বেশ কয়েকবার। কিন্তু প্রতিবারই ভিয়েনার প্রাচীর থেকে কিছু গনিমতের সম্পদ হাতে পেয়েই সেনারা ফিরে এসেছে অথবা অস্ট্রিয়ার সম্রাটের সাথে চুক্তি করে ইউরোপের অন্য কোনো রাজ্য অর্জনকেই যথেষ্ট মনে করে চলে এসেছে। উসমানীয়রা প্রথমবার ভিয়েনা অবরোধ করে প্রায় দেড় শতাব্দী আগে সুলতান সুলাইমান আল-কানুনির আমলে। এরপর ১৬৮৩ সালে তুর্কিরা দ্বিতীয় বার ভিয়েনা অবরোধ করে। কিন্তু কালিনবার্গ পাহাড়ের কাছে এক শক্তিশালী যুদ্ধে গ্রাফ স্টারহামবার্গ তুর্কিদের প্রতিহত করতে সক্ষম হন।

যুদ্ধপূর্ব অবস্থা
১৬৬০ সালের দিকে হাঙ্গেরি এবং স্লোভাকিয়াতে উসমানি সাম্রাজ্যের কাজে-কর্মে দখলদারিত্ব দেখানোর পাঁয়তারা করছিল আলমেনিয়া। কারা মুস্তাফা পাশা মনে করেন, এদেরকে এখনই প্রতিহত না করলে এরা বড়ধরনের ঝামেলা পাকাবে। তিনি আলমেনিয়াতে আক্রমণের পক্ষে সুলতান চতুর্থ মুহাম্মদ এবং দিওয়ানে হুমায়ুনির (মন্ত্রিপরিষদ) সম্মতি আদায় করে নেন। এরপর ১৬৬৩ সালের ১৭ই আগস্ট উসমানীয়রা নুহযেল দুর্গ অবরোধ শুরু করেন এবং দীর্ঘ ৩৭ দিন পর তা দখল করে নেন।

যুদ্ধ পরিষদের বৈঠক
কারা মুস্তাফা পাশা জরুরি ভিত্তিতে যুদ্ধ পরিষদের সভা আহ্বান করেন। সেখানে তিনি এ বছরই ভিয়েনা আক্রমণের প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, ভিয়েনা অধিকারের পর আমরা বেশকিছু শর্তসম্বলিত পত্র পাঠাব আলমেনিয়া বরাবর, যাতে তারা হাঙ্গেরিতে আমাদের কোনো কাজে বাধা না হয়। উজির ইবরাহিম পাশা দ্বিমত পোষণ করলেও মুস্তাফা পাশা তার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।

ইউরোপের হালচল
উসমানীয়দের তৎপরতার কথা জানতে পেরেই ইউরোপীয়ান রাজ্যগুলো ভিয়েনাকে বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। পোল্যান্ডের রাজা সোবিয়েস্কি উসমানি সাম্রাজ্যের সাথে চুক্তি ভঙ্গ করে আলমেনিয়া ও অস্ট্রিয়ার সাথে জোট গঠন করেন। ১১ই সেপ্টেম্বর নাগাদ সবরকম প্রস্তুতি শেষ করে তারা ভিয়েনার দিকে যাত্রা করে।

গাদ্দারি
পশ্চিম দিক থেকে ভিয়েনা পৌঁছার একমাত্র পথ ছিল দাওনা সেতু। কারা মুস্তাফা পাশা সেতুটি পাহারা দেওয়ার জন্য মুরাদ গিরেইকে নির্দেশ দেন। কিন্তু মুরাদ ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে উসমানি সাম্রাজ্যের সাথে গাদ্দারি করে ইউরোপিয়ানদেরকে সেতু পার হয়ে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিয়ে দেয়। সে ভেবেছিল মুস্তাফা পাশা পরাজিত হলে তার ক্ষমতা ও সম্মান বাড়বে, কিন্তু সে বুঝতে পারেনি এই ভুলের মাশুল কতটা ভয়াবহ হবে।

অবশেষে যুদ্ধ
১৬৮৩ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর ভিয়েনার প্রান্তরে চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হয়। উসমানীয় বাহিনী ৫৯ দিন ধরে ভিয়েনা অবরোধ করে রেখেছিল। গোলন্দাজ বাহিনী দুর্গের দেয়ালে প্রচণ্ড আঘাত হানছিল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে ইউরোপীয় জোটবাহিনী হাজির হয়। উসমানীয় বাহিনীতে আরও এক বিপর্যয় ঘটে যখন ওঘলু ইবরাহিম তার বাহিনী নিয়ে ময়দান থেকে পালিয়ে যান। দুই পক্ষের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর উসমানীয়রা পরাজিত হয়।

লজ্জাজনক পরাজয়
ভিয়েনার প্রান্তরে উসমানীয়দের এই পরাজয় পুরো তিনশো বছরের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ইউরোপে শাসকের চেয়ার থেকে উসমানীয়রা নেমে আসে শোষিতের আসনে। অনির্দিষ্টকালের জন্য ইউরোপে উসমানি সাম্রাজ্যের প্রভাব ও প্রসার ব্যাহত হয়। এই পরাজয়টি ছিল উসমানি সাম্রাজ্যের জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতি।

📘 ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ নববী যুগ থেকে বর্তমান 📄 ফ্রেজারের আক্রমণ এবং রশিদের যুদ্ধ

📄 ফ্রেজারের আক্রমণ এবং রশিদের যুদ্ধ


মুহাম্মদ আলি পাশা মিশরের মসনদে বসেছেন দুই বছরও হয়নি। চারপাশে শত্রুরা জোঁকের মতো লেগে আছে তার পেছনে। এই সুযোগে ইংরেজরা ছলে বলে কৌশলে মামলুক সুলতান মুহাম্মদ বেক আল-আলফিকে পাশার বিরুদ্ধে উস্কে দেওয়ার অপচেষ্টা করে। পরিকল্পনা ছিল মামলুকরা কায়রোতে আক্রমণ করবে এবং ইংরেজরা নৌ শক্তি ব্যবহার করে মিশরের বন্দর এলাকাগুলো নিয়ন্ত্রণে নেবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী জেনারেল ফ্রেজার ২৫টি রণতরি এবং ৭ হাজার প্রশিক্ষিত যোদ্ধা নিয়ে আলেকজান্দ্রিয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়ে যান। ১৮০৭ সালের ১৭ই মার্চ ফ্রেজার আলেকজান্দ্রিয়ায় প্রবেশ করেন। সেখানকার শাসক আমিন আগা বিশ্বাসঘাতকতা করে শহর ফ্রেজারের হাতে তুলে দেয়। এরপর ফ্রেজার রশিদ¹ শহর দখলের জন্য একদল সৈন্য প্রেরণ করেন।

রশিদের পথে
২৯শে মার্চ, ১৮০৭ সাল। ইংরেজ সেনারা আলেকজান্দ্রিয়া থেকে বের হয়ে রশিদ শহরের দিকে যাত্রা শুরু করল। ওদিকে শহরপতি আলি বে আলেকজান্দ্রিয়ার ঘটনার কথা জেনে আগেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। রশিদের প্রখ্যাত আলিম শাইখ হাসান ক্রেত আল-আহালি জনগণকে জিহাদের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেন। মুসলমানরা কৌশলে নীল নদের তীরে জাহাজগুলোকে সরিয়ে নেয় এবং ইংরেজদের জন্য একটি ফাঁদ তৈরি করে।

ইংরেজ সেনারা রশিদে প্রবেশ করে কোনো প্রতিরোধ না দেখে মনে করল শহরটি অনায়াসে বিজিত হয়েছে। তারা যখন বাজারের দোকানে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল এবং খাবারে মত্ত ছিল, ঠিক তখনই মসজিদের মিনার থেকে 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি ভেসে আসে। মুহূর্তের মধ্যে শহরবাসী ইংরেজদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ১৭০ জন ব্রিটিশ সেনার লাশ রশিদের মাটিতে পড়ে যায় এবং বাকিরা বন্দি হয় অথবা পালিয়ে যায়।

ফিরতি পথে ফ্রেজার
সবকটি ফ্রন্টে শোচনীয় পরাজয়ের পর জেনারেল ফ্রেজার দিশেহারা হয়ে পড়েন। তিনি বুঝতে পারেন মিশরের এই ভূমিতে টিকে থাকা সম্ভব নয়। শেষে তিনি বাধ্য হয়ে মুহাম্মদ আলি পাশার কাছে সন্ধির প্রস্তাব পাঠান। ১৮০৭ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর উভয়পক্ষের মধ্যে সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং ইংরেজরা মিশর ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। মুহাম্মদ আলি পাশা আলেকজান্দ্রিয়া পুনরায় উসমানি সাম্রাজ্যের অধীনে নিয়ে আসেন।

টিকাঃ
১. মিশরের আলেক্সান্দ্রিয়া থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ঐতিহাসিক একটি বন্দর এলাকা। নয়ের দশকে গড়ে ওঠা এই বন্দর বর্তমানে রোসেটা নামেও পরিচিত। ১৫১৭ সালে উসমানীয়দের অন্যতম নৌ বন্দর হিসেবে স্বীকৃত এ-এলাকাটি বর্তমানে নেইল ডেল্টা শহরের অন্তর্গত।

📘 ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ নববী যুগ থেকে বর্তমান 📄 নাভারিনোর যুদ্ধ

📄 নাভারিনোর যুদ্ধ


২৯শে রবিউল আউয়াল, ১২৪৩ হিজরি মোতাবেক ২০শে অক্টোবর ১৮২৭ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত নাভারিনোর যুদ্ধটি নিকট ইতিহাসের অন্যতম বৈপ্লবিক নৌ যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত। এ যুদ্ধে একপাশে ছিল উসমানি সাম্রাজ্য, মিশর, তিউনিসিয়া এবং আলজেরিয়া; অপরপাশে ছিল ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং রাশিয়া।

গ্রিসের বিদ্রোহ
সুদীর্ঘকাল ধরে গ্রিস ছিল উসমানি সাম্রাজ্যের একটি অনুগত অঙ্গরাজ্য। ১৮১৪ সালের দিকে গ্রিসের জনগণের মধ্যে উসমানীয়দের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী চেতনা জেগে ওঠে। গির্জাকেন্দ্রিক ধর্মীয় সংগঠনগুলো তাদেরকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখাতে থাকে। রাশিয়া এই সুযোগে গ্রিকদের উস্কানি দিতে শুরু করে এবং উসমানি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাদের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেয়।

মিশরের নৌবহর ও যুদ্ধ
সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ গ্রিসের বিদ্রোহ দমনের জন্য মিশরের সুলতান মুহাম্মদ আলি পাশার সাহায্য চান। মুহাম্মদ আলি পাশা তার ছেলে ইবরাহিম পাশাকে এক বিশাল নৌবহর দিয়ে গ্রিসের উদ্দেশ্যে পাঠান। ইবরাহিম পাশা নাভারিনো জয় করে এথেন্সের দিকে অগ্রসর হন। এই সময় ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলো গ্রিসের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয় এবং উসমানীয়দের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

১৮২৭ সালের ২০শে অক্টোবর কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং রাশিয়ার নৌবাহিনী নাভারিনো বন্দরে প্রবেশ করে। তারা বিশ্বাসঘাতকতা করে উসমানীয় জাহাজে আগুন ধরিয়ে দেয়। চোখের সামনে উসমানীয়দের শক্তিশালী নৌবহর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এটি ছিল মুসলিম বাহিনীর জন্য এক অভাবনীয় এবং আকস্মিক বিপর্যয়।

ফলাফল
নাভারিনোর যুদ্ধের এই পরাজয় উসমানি সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা করে। গ্রিস স্বাধীন হয়ে যায় এবং উসমানীয় নৌ শক্তি প্রচণ্ডভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সুযোগে ১৮৩০ সালে ফ্রান্স আলজেরিয়া দখল করে নেয়। উসমানি সাম্রাজ্য তার পূর্বের গৌরব হারিয়ে ক্রমেই পতনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px