📄 মোহাচের যুদ্ধ
৯৩২ হিজরিতে (১৫২৬ খ্রি.) উসমানি সম্রাট সুলতান সুলাইমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট এবং হাঙ্গেরির রাজা দ্বিতীয় লুইয়ের (ভ্লাদিস্লাস) মধ্যে মোহাক্স নামক স্থানে এ যুদ্ধটি সংঘটিত হয়।
পটভূমি
হাঙ্গেরির রাজা উসমানি সাম্রাজ্যের সাথে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করে সুলতানের দূতকে হত্যা করলে সুলতান সুলাইমান ক্ষিপ্ত হন। তিনি বিশাল এক বাহিনী নিয়ে বেলগ্রেড হয়ে হাঙ্গেরির দিকে অগ্রসর হন। সুলতানের বাহিনীতে প্রায় ১ লক্ষ সেনা ও ৩০০ কামান ছিল।
যুদ্ধ ও বিজয়
১৫২৬ সালের ২৯ আগস্ট মোহাক্স উপত্যকায় দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়। হাঙ্গেরীয়রা উসমানীয়দের মধ্যভাগে আক্রমণ করে। সুলতান সুলাইমান এক বিশেষ যুদ্ধকৌশল অবলম্বন করেন; তিনি তার বাহিনীকে সরিয়ে দিয়ে হাঙ্গেরীয়দের ভেতরে আসার সুযোগ দেন এবং পরে তাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেন। উসমানীয় কামানের গোলার আঘাতে হাঙ্গেরীয় বাহিনী লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। মাত্র দেড় ঘণ্টার যুদ্ধে হাঙ্গেরির ২ লক্ষ সৈন্যের পরাজয় ঘটে এবং রাজা লুই পলায়নের সময় পানিতে ডুবে মারা যান।
ফলাফল
এ বিজয়ের মাধ্যমে হাঙ্গেরি উসমানীয়দের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এবং আগামী ১৪০ বছরের জন্য সেখানে উসমানি শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ইউরোপের ইতিহাসে এই যুদ্ধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এর ফলে উসমানীয়দের অগ্রযাত্রা ভিয়েনা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
টিকাঃ
১. সুলতান সুলাইমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট। অটোমান স্বর্ণযুগের অন্যতম মহান শাসক। তার আমলে উসমানি সাম্রাজ্য সামরিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছায়।
২. ফারসাখ: প্রাচীন আরবের দূরত্ব-নির্ণয়ের একটি পরিভাষা। ১ ফারসাখ সমান প্রায় তিন মাইল।
📄 লেপান্টের যুদ্ধ
১৫৭১ সালে ইউরোপীয় মিত্রশক্তিগুলোর সম্মিলিত নৌবাহিনীর সাথে উসমানীয়দের ঐতিহাসিক লেপান্টের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে উসমানীয় বাহিনী পরাজিত হয়।
পূর্বকথা
সুলতান দ্বিতীয় সালিমের সময় উসমানীয়রা সাইপ্রাস দখল করতে চাইলে ইউরোপের খ্রিস্টান রাজ্যগুলো পোপের আহ্বানে একতাবদ্ধ হয়। স্পেন, ভেনিস ও পোপের সম্মিলিত নৌবাহিনী উসমানীয়দের বিরুদ্ধে এক বিশাল জোট গঠন করে। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন ডন জন।
যুদ্ধ ও ক্ষয়ক্ষতি
১৫৭১ সালের ৭ অক্টোবর গ্রিসের লেপান্ট সাগরে ভয়াবহ নৌযুদ্ধ শুরু হয়। উসমানীয় সেনাপতিদের কিছু কৌশলগত ভুলের কারণে তারা প্রতিকূল অবস্থায় পড়ে যায়। তুর্কি নৌবাহিনী প্রচণ্ড সাহসের সাথে লড়লেও শেষ পর্যন্ত তারা পরাজিত হয়। উসমানীয়দের প্রায় ১৪২টি জাহাজ ডুবে যায় এবং ২০,০০০-এর বেশি সেনা নিহত হয়।
ফলাফল
লেপান্টের যুদ্ধ ছিল উসমানীয়দের জন্য একটি বড় ধাক্কা। যদিও তারা এক বছরের মধ্যে পুনরায় তাদের নৌবাহিনী গড়ে তুলেছিল, কিন্তু মানসিকভাবে ইউরোপীয়রা বুঝতে পেরেছিল যে উসমানীয়দের পরাজিত করা সম্ভব। এই যুদ্ধ ভূমধ্যসাগরে উসমানীয়দের একচ্ছত্র আধিপত্য কিছুটা কমিয়ে দেয়।
📄 ওয়াদি-আল-মাখাযিন যুদ্ধ
১৫৭৮ সালের ৪ আগস্ট মরক্কোর ওয়াদি আল-মাখাযিন নামক স্থানে উসমানি খিলাফত সমর্থিত মরক্কোর বাহিনী এবং পর্তুগিজ বাহিনীর মধ্যে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এটি 'তিন রাজার যুদ্ধ' নামেও পরিচিত।
পটভূমি
মরক্কোর সিংহাসন নিয়ে বিরোধের জেরে ক্ষমতাচ্যুত সুলতান আল-মুতাওয়াক্কিল পর্তুগালের রাজা সেবাস্তিয়ানের সাহায্য চান। সেবাস্তিয়ান বিশাল এক ক্রুসেড বাহিনী নিয়ে মরক্কো আক্রমণ করেন। বিপরীতে উসমানি সাম্রাজ্যের সমর্থনে সুলতান আবদুল মালিক মরক্কো রক্ষার প্রস্তুতি নেন।
যুদ্ধ ও বিজয়
মরক্কোর মুসলিম বাহিনী পর্তুগিজদের কৌশলে একটি নদীর তীরে নিয়ে আসে। যুদ্ধের সময় সুলতান আবদুল মালিক অসুস্থ অবস্থায় মারা গেলেও তার সেনারা তা জানতে পারেনি এবং যুদ্ধ চালিয়ে যায়। পর্তুগিজ বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। রাজা সেবাস্তিয়ান এবং ক্ষমতাচ্যুত মুতাওয়াক্কিল উভয়েই যুদ্ধে নিহত হন। একই যুদ্ধে তিন রাজার মৃত্যুর কারণে একে 'তিন রাজার যুদ্ধ' বলা হয়।
ফলাফল
এ বিজয়ের ফলে মরক্কো পর্তুগিজদের দখলদারিত্ব থেকে রক্ষা পায় এবং উসমানি সাম্রাজ্যের সাথে উত্তর আফ্রিকার মুসলিমদের সম্পর্ক আরও মজবুত হয়। পর্তুগাল তাদের সামরিক শক্তি হারিয়ে ফেলে এবং পরবর্তীতে স্পেনের অধীনে চলে যায়।
টিকাঃ
১. সাদিয়া সাম্রাজ্য: মরক্কো ও তার আশপাশের এলাকায় ১৬৫৯ সাল পর্যন্ত এই সাম্রাজ্যের শাসন বজায় ছিল। তারা নিজেদের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশধর হিসেবে পরিচয় দিত।
📄 ভিয়েনার যুদ্ধ
১০৯৪ হিজরি মোতাবেক ১৬৮৩ সালে উসমানীয় সেনারা দুই মাস ভিয়েনা অবরোধ করে রাখে। এরপর ২০ শে রমাদান (১২ই সেপ্টেম্বর) পোল্যান্ড, আলমেনিয়া এবং অস্ট্রিয়ার জোটসেনারা পোল্যান্ডের রাজা তৃতীয় জন সোবিয়েস্কির নেতৃত্বে উসমানীয়দের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। শেষপর্যন্ত উসমানীয় সেনাপতি কারা মুস্তাফা পাশার নেতৃত্বাধীন বাহিনী খ্রিস্টানদের কাছে পরাজিত হয়ে ফেরে এবং এ পরাজয় ইউরোপে উসমানীয়দের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয়।
উসমানি সাম্রাজ্য এবং ভিয়েনা
ইউরোপের অভ্যন্তরে বাণিজ্য সুবিধার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে ভিয়েনা বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছিল। উসমানীয়দের ব্যবসায়িক স্বার্থে ভিয়েনা অধিকারের চিন্তা করছিলেন ধারাবাহিকভাবে বেশ কয়েকজন সুলতান। সে লক্ষ্যে অভিযানও পরিচালিত হয়েছে বেশ কয়েকবার। কিন্তু প্রতিবারই ভিয়েনার প্রাচীর থেকে কিছু গনিমতের সম্পদ হাতে পেয়েই সেনারা ফিরে এসেছে অথবা অস্ট্রিয়ার সম্রাটের সাথে চুক্তি করে ইউরোপের অন্য কোনো রাজ্য অর্জনকেই যথেষ্ট মনে করে চলে এসেছে। উসমানীয়রা প্রথমবার ভিয়েনা অবরোধ করে প্রায় দেড় শতাব্দী আগে সুলতান সুলাইমান আল-কানুনির আমলে। এরপর ১৬৮৩ সালে তুর্কিরা দ্বিতীয় বার ভিয়েনা অবরোধ করে। কিন্তু কালিনবার্গ পাহাড়ের কাছে এক শক্তিশালী যুদ্ধে গ্রাফ স্টারহামবার্গ তুর্কিদের প্রতিহত করতে সক্ষম হন।
যুদ্ধপূর্ব অবস্থা
১৬৬০ সালের দিকে হাঙ্গেরি এবং স্লোভাকিয়াতে উসমানি সাম্রাজ্যের কাজে-কর্মে দখলদারিত্ব দেখানোর পাঁয়তারা করছিল আলমেনিয়া। কারা মুস্তাফা পাশা মনে করেন, এদেরকে এখনই প্রতিহত না করলে এরা বড়ধরনের ঝামেলা পাকাবে। তিনি আলমেনিয়াতে আক্রমণের পক্ষে সুলতান চতুর্থ মুহাম্মদ এবং দিওয়ানে হুমায়ুনির (মন্ত্রিপরিষদ) সম্মতি আদায় করে নেন। এরপর ১৬৬৩ সালের ১৭ই আগস্ট উসমানীয়রা নুহযেল দুর্গ অবরোধ শুরু করেন এবং দীর্ঘ ৩৭ দিন পর তা দখল করে নেন।
যুদ্ধ পরিষদের বৈঠক
কারা মুস্তাফা পাশা জরুরি ভিত্তিতে যুদ্ধ পরিষদের সভা আহ্বান করেন। সেখানে তিনি এ বছরই ভিয়েনা আক্রমণের প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, ভিয়েনা অধিকারের পর আমরা বেশকিছু শর্তসম্বলিত পত্র পাঠাব আলমেনিয়া বরাবর, যাতে তারা হাঙ্গেরিতে আমাদের কোনো কাজে বাধা না হয়। উজির ইবরাহিম পাশা দ্বিমত পোষণ করলেও মুস্তাফা পাশা তার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।
ইউরোপের হালচল
উসমানীয়দের তৎপরতার কথা জানতে পেরেই ইউরোপীয়ান রাজ্যগুলো ভিয়েনাকে বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। পোল্যান্ডের রাজা সোবিয়েস্কি উসমানি সাম্রাজ্যের সাথে চুক্তি ভঙ্গ করে আলমেনিয়া ও অস্ট্রিয়ার সাথে জোট গঠন করেন। ১১ই সেপ্টেম্বর নাগাদ সবরকম প্রস্তুতি শেষ করে তারা ভিয়েনার দিকে যাত্রা করে।
গাদ্দারি
পশ্চিম দিক থেকে ভিয়েনা পৌঁছার একমাত্র পথ ছিল দাওনা সেতু। কারা মুস্তাফা পাশা সেতুটি পাহারা দেওয়ার জন্য মুরাদ গিরেইকে নির্দেশ দেন। কিন্তু মুরাদ ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে উসমানি সাম্রাজ্যের সাথে গাদ্দারি করে ইউরোপিয়ানদেরকে সেতু পার হয়ে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিয়ে দেয়। সে ভেবেছিল মুস্তাফা পাশা পরাজিত হলে তার ক্ষমতা ও সম্মান বাড়বে, কিন্তু সে বুঝতে পারেনি এই ভুলের মাশুল কতটা ভয়াবহ হবে।
অবশেষে যুদ্ধ
১৬৮৩ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর ভিয়েনার প্রান্তরে চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হয়। উসমানীয় বাহিনী ৫৯ দিন ধরে ভিয়েনা অবরোধ করে রেখেছিল। গোলন্দাজ বাহিনী দুর্গের দেয়ালে প্রচণ্ড আঘাত হানছিল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে ইউরোপীয় জোটবাহিনী হাজির হয়। উসমানীয় বাহিনীতে আরও এক বিপর্যয় ঘটে যখন ওঘলু ইবরাহিম তার বাহিনী নিয়ে ময়দান থেকে পালিয়ে যান। দুই পক্ষের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর উসমানীয়রা পরাজিত হয়।
লজ্জাজনক পরাজয়
ভিয়েনার প্রান্তরে উসমানীয়দের এই পরাজয় পুরো তিনশো বছরের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ইউরোপে শাসকের চেয়ার থেকে উসমানীয়রা নেমে আসে শোষিতের আসনে। অনির্দিষ্টকালের জন্য ইউরোপে উসমানি সাম্রাজ্যের প্রভাব ও প্রসার ব্যাহত হয়। এই পরাজয়টি ছিল উসমানি সাম্রাজ্যের জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতি।