📄 আঙ্কারার যুদ্ধ ও তৈমুর লং
১৪০২ সালের ২০ জুলাই আঙ্কারার নিকটে চুবুকের যুদ্ধক্ষেত্রে উসমানীয় সাম্রাজ্য ও তৈমুরি সাম্রাজ্যের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। তিমুরীয়দের কাছে এ যুদ্ধে উসমানি সুলতান প্রথম বায়েজিদ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন।
তৈমুর লঙের উত্থান
তৈমুর লং ছিলেন তিমুরীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি মধ্য এশিয়া থেকে শুরু করে পারস্য, রাশিয়া, ইরাক এবং ভারতবর্ষ পর্যন্ত তার শাসন বিস্তার করেছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দুর্ধর্ষ ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির বিজেতা। চেঙ্গিস খানের মতো বিশ্বজয়ের আকাঙ্ক্ষা থেকে তিনি তার অভিযান পরিচালনা করতেন।
যুদ্ধের কারণ
আনাতোলিয়া অঞ্চলে সুলতান প্রথম বায়েজিদের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছু স্থানীয় আমির তৈমুর লঙের কাছে আশ্রয় নেয়। অন্যদিকে তৈমুরের শত্রুদের আশ্রয় দেন সুলতান বায়েজিদ। এ নিয়ে দুই পরাক্রমশালী শাসকের মধ্যে তিক্ত চিঠি বিনিময় হয়। সুলতান বায়েজিদের উদ্ধত আচরণে ক্ষিপ্ত হয়ে তৈমুর লং আনাতোলিয়া আক্রমণ করেন।
আঙ্কারার ময়দান ও পরাজয়
তৈমুর লং তার বিশাল বাহিনী ও ভারতীয় যুদ্ধ-হাতি নিয়ে আঙ্কারার সমতল ভূমিতে অবস্থান নেন। সুলতান বায়েজিদের বাহিনী দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় ময়দানে পৌঁছায়। তৈমুর কৌশলে যুদ্ধের ময়দানের পানির উৎসগুলো নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। যুদ্ধের একপর্যায়ে বায়েজিদের বাহিনীর কিছু তুর্কি আমির ও তাতার সৈন্যরা বিশ্বাসঘাতকতা করে তৈমুরের পক্ষে যোগ দেয়। ফলে উসমানীয় বাহিনী বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। সুলতান বায়েজিদ তার অনুগত জেনিসারিদের নিয়ে প্রাণপণে লড়লেও শেষ পর্যন্ত পরাজয় বরণ করেন এবং তৈমুরের হাতে বন্দি হন।
ফলাফল
এ যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে উসমানীয় সাম্রাজ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এবং সাম্রাজ্য প্রায় পতনের মুখে পড়ে। সুলতান বায়েজিদ বন্দি অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তবে তৈমুর লঙের মৃত্যুর পর উসমানীয়রা পুনরায় সংগঠিত হতে শুরু করে এবং তাদের হারানো গৌরব ফিরে পায়।
টিকাঃ
১. প্রথম বায়েজিদ (১৩৬০-১৪০৩ খ্রি.)। উসমানীয় সুলতান। তার দ্রুতগতির সামরিক অভিযানের কারণে তাকে 'ইলদিরিম' বা 'বজ্রপাত' উপাধি দেওয়া হয়েছিল।
📄 ভার্নার যুদ্ধ
৮৪৮ হিজরি মোতাবেক ১৪৪৪ খ্রিস্টাব্দে বুলগেরিয়ার ভার্না শহরের কাছাকাছি উসমানি সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ এবং ক্রুসেড জোটশক্তির মধ্যে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
পটভূমি
সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ তার শাসনামলে বলকান অঞ্চলে উসমানিদের আধিপত্য বজায় রাখতে নিরন্তর সংগ্রাম করেন। একপর্যায়ে তিনি হাঙ্গেরির সাথে ১০ বছরের শান্তিচুক্তি করে তার পুত্র মুহাম্মদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে অবসরে যান। কিন্তু সুলতান মুরাদের অবসরের খবর শুনে ইউরোপীয়রা ভাবল উসমানি সাম্রাজ্য এখন দুর্বল। পোপের প্ররোচনায় হাঙ্গেরির রাজা এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলো শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করে উসমানি সাম্রাজ্য আক্রমণের জন্য বিশাল বাহিনী গড়ে তোলে।
সুলতানের প্রত্যাবর্তন ও যুদ্ধ
পরিস্থিতি ভয়াবহ দেখে কিশোর সুলতান মুহাম্মদ তার পিতাকে পুনরায় নেতৃত্বের দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করেন। সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ ম্যাগনেসিয়া থেকে ফিরে এসে সেনাবাহিনীর দায়িত্ব নেন। তিনি দ্রুতবেগে ভার্নার দিকে অগ্রসর হন। ১৪৪৪ সালের ১০ নভেম্বর উভয় বাহিনী যুদ্ধে লিপ্ত হয়। হাঙ্গেরির রাজা তৃতীয় ল্যাডিস্লাস সরাসরি সুলতানের বাহিনীর ওপর আক্রমণ করেন। কিন্তু উসমানীয়দের সুসংহত আক্রমণের সামনে তিনি পরাজিত ও নিহত হন। রাজার মৃত্যুতে ক্রুসেড বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়।
ফলাফল
ভার্নার এই বিজয় উসমানি সাম্রাজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর ফলে বলকান অঞ্চলে উসমানীয়দের আধিপত্য পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তী কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত এই অঞ্চলে ইসলামি শাসন টিকে থাকে। এই বিজয়ই মূলত কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিল।
টিকাঃ
১. দ্বিতীয় মুরাদ (১৩২৬-১৩৮৯ খ্রি.)। উসমানীয় সুলতান। তিনি বলকান অঞ্চলে উসমানীয় সীমানা বৃদ্ধি করেন এবং ভার্নার যুদ্ধে ক্রুসেডারদের পরাজিত করে উসমানি সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করেন।
📄 কনস্টান্টিনোপল বিজয়
প্রায় আটশত বছর মুসলমানরা তাদের বুকের ভেতর যে স্বপ্ন পুষে রেখেছিল, ১৪৫৩ সালে সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ (মুহাম্মদ আল-ফাতিহ) সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দান করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী কন্সটান্টিনোপল বিজিত হয়।¹
বিজয়ী সুলতান ও প্রস্তুতি
১৪৫১ সালে সিংহাসনে আরোহণ করেই সুলতান মুহাম্মদ কন্সটান্টিনোপল বিজয়ের পরিকল্পনা শুরু করেন। তিনি বসফরাস প্রণালির তীরে রুহেলি হিসারি নামক এক শক্তিশালী দুর্গ নির্মাণ করেন। তিনি প্রকৌশলী উরবানকে দিয়ে এক প্রকাণ্ড কামান তৈরি করান, যা দুর্গের দেয়াল গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম ছিল। এছাড়াও তিনি বিশাল এক নৌবাহিনী প্রস্তুত করেন।
অবরোধ ও অভিনব কৌশল
১৪৫৩ সালের ৬ এপ্রিল অবরোধ শুরু হয়। কন্সটান্টিনোপল শহরটি ছিল তিন দিক থেকে সমুদ্রবেষ্টিত এবং এর প্রতিরক্ষা দেয়াল ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। সমুদ্রপথে গোল্ডেন হর্ন নামক স্থানে প্রবেশের পথটি চেইন দিয়ে আটকে রেখেছিল বাইজান্টাইনরা। সুলতান মুহাম্মদ এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি রাতের অন্ধকারে কাঠের পাটাতনে চর্বি মাখিয়ে পাহাড়ের ওপর দিয়ে প্রায় ৭০-৮০টি জাহাজ চালিয়ে গোল্ডেন হর্নের ভেতরে নিয়ে যান। এই দৃশ্য দেখে বাইজান্টাইনরা বিস্মিত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
বিজয়ের ক্ষণ
২৯ মে ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে সুলতান মুহাম্মদ চূড়ান্ত আক্রমণের নির্দেশ দেন। স্থল ও জল উভয় দিক থেকে প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে বাইজান্টাইনদের প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ে। উসমানীয় সেনারা বীরদর্পে শহরে প্রবেশ করে। সম্রাট একাদশ কন্সটান্টিন যুদ্ধরত অবস্থায় নিহত হন। জোহরের সময় সুলতান মুহাম্মদ বিজয়ী বেশে শহরে প্রবেশ করেন। তিনি আয়া সুফিয়া গির্জাটিকে মসজিদে রূপান্তর করেন এবং শহরের নাম দেন 'ইসলামবুল' বা ইস্তাম্বুল। এই বিজয়ের ফলে মধ্যযুগের অবসান ঘটে এবং উসমানীয় সাম্রাজ্য বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়।
টিকাঃ
১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে গেছেন: 'তোমরা অবশ্যই কন্সটান্টিনোপল বিজয় করবে। কতই না অপূর্ব হবে সেই বিজয়ী সেনাপতি, কতই না অপূর্ব হবে তার সেনাবাহিনী।'
📄 মোহাচের যুদ্ধ
৯৩২ হিজরিতে (১৫২৬ খ্রি.) উসমানি সম্রাট সুলতান সুলাইমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট এবং হাঙ্গেরির রাজা দ্বিতীয় লুইয়ের (ভ্লাদিস্লাস) মধ্যে মোহাক্স নামক স্থানে এ যুদ্ধটি সংঘটিত হয়।
পটভূমি
হাঙ্গেরির রাজা উসমানি সাম্রাজ্যের সাথে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করে সুলতানের দূতকে হত্যা করলে সুলতান সুলাইমান ক্ষিপ্ত হন। তিনি বিশাল এক বাহিনী নিয়ে বেলগ্রেড হয়ে হাঙ্গেরির দিকে অগ্রসর হন। সুলতানের বাহিনীতে প্রায় ১ লক্ষ সেনা ও ৩০০ কামান ছিল।
যুদ্ধ ও বিজয়
১৫২৬ সালের ২৯ আগস্ট মোহাক্স উপত্যকায় দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়। হাঙ্গেরীয়রা উসমানীয়দের মধ্যভাগে আক্রমণ করে। সুলতান সুলাইমান এক বিশেষ যুদ্ধকৌশল অবলম্বন করেন; তিনি তার বাহিনীকে সরিয়ে দিয়ে হাঙ্গেরীয়দের ভেতরে আসার সুযোগ দেন এবং পরে তাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেন। উসমানীয় কামানের গোলার আঘাতে হাঙ্গেরীয় বাহিনী লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। মাত্র দেড় ঘণ্টার যুদ্ধে হাঙ্গেরির ২ লক্ষ সৈন্যের পরাজয় ঘটে এবং রাজা লুই পলায়নের সময় পানিতে ডুবে মারা যান।
ফলাফল
এ বিজয়ের মাধ্যমে হাঙ্গেরি উসমানীয়দের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এবং আগামী ১৪০ বছরের জন্য সেখানে উসমানি শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ইউরোপের ইতিহাসে এই যুদ্ধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এর ফলে উসমানীয়দের অগ্রযাত্রা ভিয়েনা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
টিকাঃ
১. সুলতান সুলাইমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট। অটোমান স্বর্ণযুগের অন্যতম মহান শাসক। তার আমলে উসমানি সাম্রাজ্য সামরিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছায়।
২. ফারসাখ: প্রাচীন আরবের দূরত্ব-নির্ণয়ের একটি পরিভাষা। ১ ফারসাখ সমান প্রায় তিন মাইল।