📘 ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ নববী যুগ থেকে বর্তমান 📄 নিকোপলিসের যুদ্ধ

📄 নিকোপলিসের যুদ্ধ


৮০০ হিজরি মোতাবেক ১৩৯৬ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত উসমানি সম্রাট প্রথম বায়েজিদ এবং হাঙ্গেরির রাজা সিগিসমুন্ডের মধ্যে বলকানের উত্তরে অবস্থিত নিকোপলিসের ঐতিহাসিক যুদ্ধ। এ যুদ্ধে উভয়পক্ষের বহু ক্ষয়ক্ষতির পর সর্বশেষ বিজয়ের গৌরব মুসলিম বাহিনীর পদ চুম্বন করে।

পূর্বকথন
কসোভোর যুদ্ধে জয়ের ফলে বলকান অঞ্চলের অধিকাংশ উসমানিদের অধীনে চলে আসে। এতে আতঙ্কিত হয়ে হাঙ্গেরির রাজা সিগিসমুন্ড পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে সাহায্য চান। পোপ নবম বোনাফিস উসমানীয়দের বিরুদ্ধে নতুন এক ক্রুসেডের ডাক দেন। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে হাজার হাজার নাইট ও যোদ্ধা এই ক্রুসেডে যোগ দেয়। তাদের লক্ষ্য ছিল বলকান অঞ্চল থেকে তুর্কিদের বিতাড়িত করে ফিলিস্তিন ও জেরুজালেম পর্যন্ত এগিয়ে যাওয়া।

অবরোধ ও যুদ্ধ
১৩৯৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর নাগাদ ক্রুসেড বাহিনী নিকোপলিস দুর্গ চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। তারা ভেবেছিল সুলতান বায়েজিদ তাদের ভয়ে পালিয়েছে। কিন্তু সুলতান বায়েজিদ দ্রুতবেগে সৈন্য নিয়ে নিকোপলিসের উদ্ধারার্থে হাজির হন। ১৫ সেপ্টেম্বর উভয় বাহিনী মুখোমুখি হয়। উসমানীয় বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন সুলতান বায়েজিদ নিজে এবং তার সাথে ছিলেন সার্বিয়ান নাইটরা। যুদ্ধের শুরুতে ফরাসি নাইটরা উসমানীয়দের অগ্রবর্তী বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা পাহাড়ের ওপর উঠে উসমানীয়দের মূল ক্যাম্প ধ্বংস করতে চেয়েছিল। কিন্তু পাহাড়ের ওপর সুলতান বায়েজিদের সংরক্ষিত শক্তিশালী সিপাহীদের রিজার্ভ ফোর্সের সামনে পড়ে তারা কচুকাটা হয়।

ফলাফল
ফরাসি নাইটদের পরাজয়ের পর হাঙ্গেরীয় ও অন্যান্য মিত্র বাহিনীও ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। রাজা সিগিসমুন্ড কোনোমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যান। উসমানীয় বাহিনী এই যুদ্ধে বিশাল বিজয় লাভ করে। এ জয়ের ফলে বলকান অঞ্চলে উসমানীয়দের নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত হয় এবং পরবর্তী কয়েক দশক ইউরোপীয়রা উসমানীয়দের বিরুদ্ধে বড় কোনো আক্রমণ করার সাহস পায়নি।

টিকাঃ
১. জেনিসারি (উসমানীয় তুর্কি: يگیچری) অটোমান সাম্রাজ্যের অভিজাত পদাতিক সেনাবাহিনী। এই বাহিনী অটোমান সম্রাটের দেহরক্ষী এবং ইউরোপের প্রথম আধুনিক সেনাবাহিনী হিসেবে পরিচিত।

📘 ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ নববী যুগ থেকে বর্তমান 📄 আঙ্কারার যুদ্ধ ও তৈমুর লং

📄 আঙ্কারার যুদ্ধ ও তৈমুর লং


১৪০২ সালের ২০ জুলাই আঙ্কারার নিকটে চুবুকের যুদ্ধক্ষেত্রে উসমানীয় সাম্রাজ্য ও তৈমুরি সাম্রাজ্যের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। তিমুরীয়দের কাছে এ যুদ্ধে উসমানি সুলতান প্রথম বায়েজিদ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন।

তৈমুর লঙের উত্থান
তৈমুর লং ছিলেন তিমুরীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি মধ্য এশিয়া থেকে শুরু করে পারস্য, রাশিয়া, ইরাক এবং ভারতবর্ষ পর্যন্ত তার শাসন বিস্তার করেছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দুর্ধর্ষ ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির বিজেতা। চেঙ্গিস খানের মতো বিশ্বজয়ের আকাঙ্ক্ষা থেকে তিনি তার অভিযান পরিচালনা করতেন।

যুদ্ধের কারণ
আনাতোলিয়া অঞ্চলে সুলতান প্রথম বায়েজিদের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছু স্থানীয় আমির তৈমুর লঙের কাছে আশ্রয় নেয়। অন্যদিকে তৈমুরের শত্রুদের আশ্রয় দেন সুলতান বায়েজিদ। এ নিয়ে দুই পরাক্রমশালী শাসকের মধ্যে তিক্ত চিঠি বিনিময় হয়। সুলতান বায়েজিদের উদ্ধত আচরণে ক্ষিপ্ত হয়ে তৈমুর লং আনাতোলিয়া আক্রমণ করেন।

আঙ্কারার ময়দান ও পরাজয়
তৈমুর লং তার বিশাল বাহিনী ও ভারতীয় যুদ্ধ-হাতি নিয়ে আঙ্কারার সমতল ভূমিতে অবস্থান নেন। সুলতান বায়েজিদের বাহিনী দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় ময়দানে পৌঁছায়। তৈমুর কৌশলে যুদ্ধের ময়দানের পানির উৎসগুলো নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। যুদ্ধের একপর্যায়ে বায়েজিদের বাহিনীর কিছু তুর্কি আমির ও তাতার সৈন্যরা বিশ্বাসঘাতকতা করে তৈমুরের পক্ষে যোগ দেয়। ফলে উসমানীয় বাহিনী বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। সুলতান বায়েজিদ তার অনুগত জেনিসারিদের নিয়ে প্রাণপণে লড়লেও শেষ পর্যন্ত পরাজয় বরণ করেন এবং তৈমুরের হাতে বন্দি হন।

ফলাফল
এ যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে উসমানীয় সাম্রাজ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এবং সাম্রাজ্য প্রায় পতনের মুখে পড়ে। সুলতান বায়েজিদ বন্দি অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তবে তৈমুর লঙের মৃত্যুর পর উসমানীয়রা পুনরায় সংগঠিত হতে শুরু করে এবং তাদের হারানো গৌরব ফিরে পায়।

টিকাঃ
১. প্রথম বায়েজিদ (১৩৬০-১৪০৩ খ্রি.)। উসমানীয় সুলতান। তার দ্রুতগতির সামরিক অভিযানের কারণে তাকে 'ইলদিরিম' বা 'বজ্রপাত' উপাধি দেওয়া হয়েছিল।

📘 ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ নববী যুগ থেকে বর্তমান 📄 ভার্নার যুদ্ধ

📄 ভার্নার যুদ্ধ


৮৪৮ হিজরি মোতাবেক ১৪৪৪ খ্রিস্টাব্দে বুলগেরিয়ার ভার্না শহরের কাছাকাছি উসমানি সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ এবং ক্রুসেড জোটশক্তির মধ্যে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

পটভূমি
সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ তার শাসনামলে বলকান অঞ্চলে উসমানিদের আধিপত্য বজায় রাখতে নিরন্তর সংগ্রাম করেন। একপর্যায়ে তিনি হাঙ্গেরির সাথে ১০ বছরের শান্তিচুক্তি করে তার পুত্র মুহাম্মদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে অবসরে যান। কিন্তু সুলতান মুরাদের অবসরের খবর শুনে ইউরোপীয়রা ভাবল উসমানি সাম্রাজ্য এখন দুর্বল। পোপের প্ররোচনায় হাঙ্গেরির রাজা এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলো শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করে উসমানি সাম্রাজ্য আক্রমণের জন্য বিশাল বাহিনী গড়ে তোলে।

সুলতানের প্রত্যাবর্তন ও যুদ্ধ
পরিস্থিতি ভয়াবহ দেখে কিশোর সুলতান মুহাম্মদ তার পিতাকে পুনরায় নেতৃত্বের দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করেন। সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ ম্যাগনেসিয়া থেকে ফিরে এসে সেনাবাহিনীর দায়িত্ব নেন। তিনি দ্রুতবেগে ভার্নার দিকে অগ্রসর হন। ১৪৪৪ সালের ১০ নভেম্বর উভয় বাহিনী যুদ্ধে লিপ্ত হয়। হাঙ্গেরির রাজা তৃতীয় ল্যাডিস্লাস সরাসরি সুলতানের বাহিনীর ওপর আক্রমণ করেন। কিন্তু উসমানীয়দের সুসংহত আক্রমণের সামনে তিনি পরাজিত ও নিহত হন। রাজার মৃত্যুতে ক্রুসেড বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়।

ফলাফল
ভার্নার এই বিজয় উসমানি সাম্রাজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর ফলে বলকান অঞ্চলে উসমানীয়দের আধিপত্য পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তী কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত এই অঞ্চলে ইসলামি শাসন টিকে থাকে। এই বিজয়ই মূলত কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিল।

টিকাঃ
১. দ্বিতীয় মুরাদ (১৩২৬-১৩৮৯ খ্রি.)। উসমানীয় সুলতান। তিনি বলকান অঞ্চলে উসমানীয় সীমানা বৃদ্ধি করেন এবং ভার্নার যুদ্ধে ক্রুসেডারদের পরাজিত করে উসমানি সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করেন।

📘 ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ নববী যুগ থেকে বর্তমান 📄 কনস্টান্টিনোপল বিজয়

📄 কনস্টান্টিনোপল বিজয়


প্রায় আটশত বছর মুসলমানরা তাদের বুকের ভেতর যে স্বপ্ন পুষে রেখেছিল, ১৪৫৩ সালে সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ (মুহাম্মদ আল-ফাতিহ) সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দান করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী কন্সটান্টিনোপল বিজিত হয়।¹

বিজয়ী সুলতান ও প্রস্তুতি
১৪৫১ সালে সিংহাসনে আরোহণ করেই সুলতান মুহাম্মদ কন্সটান্টিনোপল বিজয়ের পরিকল্পনা শুরু করেন। তিনি বসফরাস প্রণালির তীরে রুহেলি হিসারি নামক এক শক্তিশালী দুর্গ নির্মাণ করেন। তিনি প্রকৌশলী উরবানকে দিয়ে এক প্রকাণ্ড কামান তৈরি করান, যা দুর্গের দেয়াল গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম ছিল। এছাড়াও তিনি বিশাল এক নৌবাহিনী প্রস্তুত করেন।

অবরোধ ও অভিনব কৌশল
১৪৫৩ সালের ৬ এপ্রিল অবরোধ শুরু হয়। কন্সটান্টিনোপল শহরটি ছিল তিন দিক থেকে সমুদ্রবেষ্টিত এবং এর প্রতিরক্ষা দেয়াল ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। সমুদ্রপথে গোল্ডেন হর্ন নামক স্থানে প্রবেশের পথটি চেইন দিয়ে আটকে রেখেছিল বাইজান্টাইনরা। সুলতান মুহাম্মদ এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি রাতের অন্ধকারে কাঠের পাটাতনে চর্বি মাখিয়ে পাহাড়ের ওপর দিয়ে প্রায় ৭০-৮০টি জাহাজ চালিয়ে গোল্ডেন হর্নের ভেতরে নিয়ে যান। এই দৃশ্য দেখে বাইজান্টাইনরা বিস্মিত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।

বিজয়ের ক্ষণ
২৯ মে ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে সুলতান মুহাম্মদ চূড়ান্ত আক্রমণের নির্দেশ দেন। স্থল ও জল উভয় দিক থেকে প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে বাইজান্টাইনদের প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ে। উসমানীয় সেনারা বীরদর্পে শহরে প্রবেশ করে। সম্রাট একাদশ কন্সটান্টিন যুদ্ধরত অবস্থায় নিহত হন। জোহরের সময় সুলতান মুহাম্মদ বিজয়ী বেশে শহরে প্রবেশ করেন। তিনি আয়া সুফিয়া গির্জাটিকে মসজিদে রূপান্তর করেন এবং শহরের নাম দেন 'ইসলামবুল' বা ইস্তাম্বুল। এই বিজয়ের ফলে মধ্যযুগের অবসান ঘটে এবং উসমানীয় সাম্রাজ্য বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়।

টিকাঃ
১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে গেছেন: 'তোমরা অবশ্যই কন্সটান্টিনোপল বিজয় করবে। কতই না অপূর্ব হবে সেই বিজয়ী সেনাপতি, কতই না অপূর্ব হবে তার সেনাবাহিনী।'

ফন্ট সাইজ
15px
17px