📄 কসোভো যুদ্ধ
৭৯১ হিজরি মোতাবেক ১৩৮৯ খ্রিস্টাব্দে সুলতান প্রথম মুরাদের আমলে সংঘটিত উসমানি সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত কসোভো যুদ্ধ। সার্বিয়ান শাসক লাজারের নেতৃত্বে আসা বসনিয়া, সার্বিয়া এবং বুলগেরিয়ার ক্রুসেড জোট শক্তির বিরুদ্ধে উসমানীয়দের গুরুত্বপূর্ণ এ যুদ্ধে উভয়পক্ষের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়।
পটভূমি
উসমানি সাম্রাজ্যের তৃতীয় সম্রাট সুলতান প্রথম মুরাদ তখন বলকান অঞ্চলে উসমানিদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট ছিলেন। বুলগেরিয়ার অধিকাংশ শহর তখন উসমানিদের পদানত। ফলে সার্বিয়া ও বসনিয়ার ক্রুসেডাররা উসমানি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে জোট গঠন করে। সম্মিলিত জোটবাহিনী সার্বিয়ান শাসক লাজার রেবেলয়ানোভিচের নেতৃত্বে উসমানীয় সেনাদলকে কয়েকবার পরাজিত করে। পরিস্থিতি প্রতিকূল দেখে সুলতান মুরাদ চূড়ান্ত যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। যুদ্ধের জন্য বেরোবার আগে সুলতান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন এবং নিজের জীবনের বিনিময়ে মুজাহিদদের বিজয় ও শাহাদাতের মর্যাদা কামনা করেন।
সৈন্য সমাবেশ
কসোভোর যুদ্ধে সুলতান মুরাদের বাহিনীতে ছিল প্রায় ৪০,০০০-এর মতো সেনা। এদের মাঝে ছিল ২,০০০ জেনিসারি, ২,৫০০ অশ্বারোহী, ৬,০০০ সিপাহী এবং প্রায় ২০,০০০ আজাপ ও আকিঞ্জি। তিন ভাগে বিভক্ত এ বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন সুলতান মুরাদ এবং তার দুই ছেলে বায়েজিদ ও ইয়াকুব সেলেবি। প্রতিপক্ষের জোট বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল সার্বিয়ান শাসক লাজার রেবেলয়ানোভিচ। তাদের বাহিনীতে ছিল প্রায় ২৬,০০০-এর মতো সেনা।
যুদ্ধ ও সুলতান মুরাদের শাহাদাতবরণ
যুদ্ধ শুরু হয় সার্বিয়ানদের প্রচণ্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে। উসমানীয় তিরন্দাজরা বৃষ্টির মতো তির বর্ষণ করে তাদের গতিরোধ করার চেষ্টা করে। যুদ্ধের একপর্যায়ে উসমানীয় অশ্বারোহী বাহিনী ও জেনিসারিরা বীরত্বের সাথে পাল্টা আক্রমণ চালায়। এতে সার্বিয়ানদের শৃঙ্খলা ভেঙে যায় এবং শাসক লাজার বন্দি হন। যুদ্ধ শেষে সুলতানের সামনে দিয়ে যখন যুদ্ধবন্দিদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন মিলোস ওবিলিচ নামক এক সার্বিয়ান অভিজাত হঠাৎ সুলতানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে ছুরিকাঘাত করে। এতে সুলতান মুরাদ শাহাদাত বরণ করেন। সুলতানের শাহাদাতের পর তার ছেলে বায়েজিদ বাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন এবং বিজয় নিশ্চিত করেন।
যুদ্ধের ফলাফল
যুদ্ধে উভয় পক্ষই মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। সার্বিয়ানদের প্রধান নেতারা নিহত বা বন্দি হন এবং তাদের অধিকাংশ সেনা মারা যায়। এ যুদ্ধের ফলে সার্বিয়ার বিভিন্ন ক্ষুদ্র রাজ্য উসমানীয়দের সামন্ত রাজ্যে পরিণত হয়। কসোভোর জয় উসমানিদের দাপট ইউরোপের আরও গভীরে পৌঁছে দেয়।
টিকাঃ
১. প্রথম মুরাদ (১৩২৬-১৩৮৯ খ্রি.)। উসমানীয় সুলতান। ১৩৬২ থেকে ১৩৮৯ সাল পর্যন্ত উসমানি সাম্রাজ্য শাসন করেছেন। তিনি এদিন নগরীতে উসমানীয় সালতানাতের নতুন রাজধানী স্থাপন করেন এবং বলকান অঞ্চলের অধিকাংশ জয় করেন। প্রশাসনিক কারণে তিনি সালতানাতকে আনাতোলিয়া ও রুমেলিয়া এই দুই প্রদেশে ভাগ করেছিলেন।
📄 নিকোপলিসের যুদ্ধ
৮০০ হিজরি মোতাবেক ১৩৯৬ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত উসমানি সম্রাট প্রথম বায়েজিদ এবং হাঙ্গেরির রাজা সিগিসমুন্ডের মধ্যে বলকানের উত্তরে অবস্থিত নিকোপলিসের ঐতিহাসিক যুদ্ধ। এ যুদ্ধে উভয়পক্ষের বহু ক্ষয়ক্ষতির পর সর্বশেষ বিজয়ের গৌরব মুসলিম বাহিনীর পদ চুম্বন করে।
পূর্বকথন
কসোভোর যুদ্ধে জয়ের ফলে বলকান অঞ্চলের অধিকাংশ উসমানিদের অধীনে চলে আসে। এতে আতঙ্কিত হয়ে হাঙ্গেরির রাজা সিগিসমুন্ড পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে সাহায্য চান। পোপ নবম বোনাফিস উসমানীয়দের বিরুদ্ধে নতুন এক ক্রুসেডের ডাক দেন। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে হাজার হাজার নাইট ও যোদ্ধা এই ক্রুসেডে যোগ দেয়। তাদের লক্ষ্য ছিল বলকান অঞ্চল থেকে তুর্কিদের বিতাড়িত করে ফিলিস্তিন ও জেরুজালেম পর্যন্ত এগিয়ে যাওয়া।
অবরোধ ও যুদ্ধ
১৩৯৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর নাগাদ ক্রুসেড বাহিনী নিকোপলিস দুর্গ চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। তারা ভেবেছিল সুলতান বায়েজিদ তাদের ভয়ে পালিয়েছে। কিন্তু সুলতান বায়েজিদ দ্রুতবেগে সৈন্য নিয়ে নিকোপলিসের উদ্ধারার্থে হাজির হন। ১৫ সেপ্টেম্বর উভয় বাহিনী মুখোমুখি হয়। উসমানীয় বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন সুলতান বায়েজিদ নিজে এবং তার সাথে ছিলেন সার্বিয়ান নাইটরা। যুদ্ধের শুরুতে ফরাসি নাইটরা উসমানীয়দের অগ্রবর্তী বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা পাহাড়ের ওপর উঠে উসমানীয়দের মূল ক্যাম্প ধ্বংস করতে চেয়েছিল। কিন্তু পাহাড়ের ওপর সুলতান বায়েজিদের সংরক্ষিত শক্তিশালী সিপাহীদের রিজার্ভ ফোর্সের সামনে পড়ে তারা কচুকাটা হয়।
ফলাফল
ফরাসি নাইটদের পরাজয়ের পর হাঙ্গেরীয় ও অন্যান্য মিত্র বাহিনীও ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। রাজা সিগিসমুন্ড কোনোমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যান। উসমানীয় বাহিনী এই যুদ্ধে বিশাল বিজয় লাভ করে। এ জয়ের ফলে বলকান অঞ্চলে উসমানীয়দের নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত হয় এবং পরবর্তী কয়েক দশক ইউরোপীয়রা উসমানীয়দের বিরুদ্ধে বড় কোনো আক্রমণ করার সাহস পায়নি।
টিকাঃ
১. জেনিসারি (উসমানীয় তুর্কি: يگیچری) অটোমান সাম্রাজ্যের অভিজাত পদাতিক সেনাবাহিনী। এই বাহিনী অটোমান সম্রাটের দেহরক্ষী এবং ইউরোপের প্রথম আধুনিক সেনাবাহিনী হিসেবে পরিচিত।
📄 আঙ্কারার যুদ্ধ ও তৈমুর লং
১৪০২ সালের ২০ জুলাই আঙ্কারার নিকটে চুবুকের যুদ্ধক্ষেত্রে উসমানীয় সাম্রাজ্য ও তৈমুরি সাম্রাজ্যের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। তিমুরীয়দের কাছে এ যুদ্ধে উসমানি সুলতান প্রথম বায়েজিদ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন।
তৈমুর লঙের উত্থান
তৈমুর লং ছিলেন তিমুরীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি মধ্য এশিয়া থেকে শুরু করে পারস্য, রাশিয়া, ইরাক এবং ভারতবর্ষ পর্যন্ত তার শাসন বিস্তার করেছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দুর্ধর্ষ ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির বিজেতা। চেঙ্গিস খানের মতো বিশ্বজয়ের আকাঙ্ক্ষা থেকে তিনি তার অভিযান পরিচালনা করতেন।
যুদ্ধের কারণ
আনাতোলিয়া অঞ্চলে সুলতান প্রথম বায়েজিদের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছু স্থানীয় আমির তৈমুর লঙের কাছে আশ্রয় নেয়। অন্যদিকে তৈমুরের শত্রুদের আশ্রয় দেন সুলতান বায়েজিদ। এ নিয়ে দুই পরাক্রমশালী শাসকের মধ্যে তিক্ত চিঠি বিনিময় হয়। সুলতান বায়েজিদের উদ্ধত আচরণে ক্ষিপ্ত হয়ে তৈমুর লং আনাতোলিয়া আক্রমণ করেন।
আঙ্কারার ময়দান ও পরাজয়
তৈমুর লং তার বিশাল বাহিনী ও ভারতীয় যুদ্ধ-হাতি নিয়ে আঙ্কারার সমতল ভূমিতে অবস্থান নেন। সুলতান বায়েজিদের বাহিনী দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় ময়দানে পৌঁছায়। তৈমুর কৌশলে যুদ্ধের ময়দানের পানির উৎসগুলো নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। যুদ্ধের একপর্যায়ে বায়েজিদের বাহিনীর কিছু তুর্কি আমির ও তাতার সৈন্যরা বিশ্বাসঘাতকতা করে তৈমুরের পক্ষে যোগ দেয়। ফলে উসমানীয় বাহিনী বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। সুলতান বায়েজিদ তার অনুগত জেনিসারিদের নিয়ে প্রাণপণে লড়লেও শেষ পর্যন্ত পরাজয় বরণ করেন এবং তৈমুরের হাতে বন্দি হন।
ফলাফল
এ যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে উসমানীয় সাম্রাজ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এবং সাম্রাজ্য প্রায় পতনের মুখে পড়ে। সুলতান বায়েজিদ বন্দি অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তবে তৈমুর লঙের মৃত্যুর পর উসমানীয়রা পুনরায় সংগঠিত হতে শুরু করে এবং তাদের হারানো গৌরব ফিরে পায়।
টিকাঃ
১. প্রথম বায়েজিদ (১৩৬০-১৪০৩ খ্রি.)। উসমানীয় সুলতান। তার দ্রুতগতির সামরিক অভিযানের কারণে তাকে 'ইলদিরিম' বা 'বজ্রপাত' উপাধি দেওয়া হয়েছিল।
📄 ভার্নার যুদ্ধ
৮৪৮ হিজরি মোতাবেক ১৪৪৪ খ্রিস্টাব্দে বুলগেরিয়ার ভার্না শহরের কাছাকাছি উসমানি সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ এবং ক্রুসেড জোটশক্তির মধ্যে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
পটভূমি
সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ তার শাসনামলে বলকান অঞ্চলে উসমানিদের আধিপত্য বজায় রাখতে নিরন্তর সংগ্রাম করেন। একপর্যায়ে তিনি হাঙ্গেরির সাথে ১০ বছরের শান্তিচুক্তি করে তার পুত্র মুহাম্মদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে অবসরে যান। কিন্তু সুলতান মুরাদের অবসরের খবর শুনে ইউরোপীয়রা ভাবল উসমানি সাম্রাজ্য এখন দুর্বল। পোপের প্ররোচনায় হাঙ্গেরির রাজা এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলো শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করে উসমানি সাম্রাজ্য আক্রমণের জন্য বিশাল বাহিনী গড়ে তোলে।
সুলতানের প্রত্যাবর্তন ও যুদ্ধ
পরিস্থিতি ভয়াবহ দেখে কিশোর সুলতান মুহাম্মদ তার পিতাকে পুনরায় নেতৃত্বের দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করেন। সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ ম্যাগনেসিয়া থেকে ফিরে এসে সেনাবাহিনীর দায়িত্ব নেন। তিনি দ্রুতবেগে ভার্নার দিকে অগ্রসর হন। ১৪৪৪ সালের ১০ নভেম্বর উভয় বাহিনী যুদ্ধে লিপ্ত হয়। হাঙ্গেরির রাজা তৃতীয় ল্যাডিস্লাস সরাসরি সুলতানের বাহিনীর ওপর আক্রমণ করেন। কিন্তু উসমানীয়দের সুসংহত আক্রমণের সামনে তিনি পরাজিত ও নিহত হন। রাজার মৃত্যুতে ক্রুসেড বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়।
ফলাফল
ভার্নার এই বিজয় উসমানি সাম্রাজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর ফলে বলকান অঞ্চলে উসমানীয়দের আধিপত্য পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তী কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত এই অঞ্চলে ইসলামি শাসন টিকে থাকে। এই বিজয়ই মূলত কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিল।
টিকাঃ
১. দ্বিতীয় মুরাদ (১৩২৬-১৩৮৯ খ্রি.)। উসমানীয় সুলতান। তিনি বলকান অঞ্চলে উসমানীয় সীমানা বৃদ্ধি করেন এবং ভার্নার যুদ্ধে ক্রুসেডারদের পরাজিত করে উসমানি সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করেন।