📄 আক্কে বিজয়
সালাহুদ্দিন আইয়ুবি রহিমাহুল্লাহ ক্রুসেডারদের সবগুলো রাজ্য দখলে নিলেও অ্যাক্রে বিজয়ের পূর্বেই তার মৃত্যু এসে যায়। এরপর এই অ্যাক্রে হয়ে ওঠে এতদাঞ্চলে ক্রুসেডারদের একমাত্র ষড়যন্ত্র-ঘাঁটি। কালপরিক্রমায় এ অঞ্চলের ক্ষমতায় আসেন মামলুক সুলতান সাইফুদ্দিন কালাউন।¹ সাম্রাজ্যের মসনদে বসেই তিনি বুঝতে পারেন, অ্যাক্রে নগরী দখল না করলে তারা একসময় মামলুক সাম্রাজ্যের জন্য বিরাট হুমকি হয়ে উঠবে। কিন্তু যাত্রা শুরু করার পূর্বেই তার মৃত্যু হলে ক্ষমতায় আসেন তার ছেলে আল-আশরাফ খলিল।² তিনি মসনদে বসেই বাবার সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে অ্যাক্রে জয়ের যাত্রা অব্যাহত রাখার হুকুম দেন।
অবরোধ
সুলতান আল-আশরাফ খলিল কায়রো থেকে ১ লক্ষ ২০ হাজার সেনার এক বিশাল বাহিনী নিয়ে অ্যাক্রে অভিমুখে যাত্রা করেন। সাথে ছিল ৯২টি মিনজানিক ও বিভিন্ন পাথর নিক্ষেপের যন্ত্র। ১২৯১ সালের ৫ই এপ্রিল সুলতান অ্যাক্রের সামনে গিয়ে তাঁবু ফেলেন। পরদিন সকাল থেকে মিনজানিক দিয়ে আগুনের গোলা আর বিশালকায় পাথর নিক্ষেপ শুরু হয়। দীর্ঘ আট দিন পর মুসলিম সেনারা বিশেষ বর্ম গায়ে জড়িয়ে কেল্লার ভেতরে ঢুকতে শুরু করে। তাদের হাতে ছিল এক ধরনের বিশেষ অগ্নি-অস্ত্র, যা দিয়ে তারা বিভিন্ন জায়গায় আগুন ধরিয়ে দিচ্ছিল। ক্রুসেডাররা এই আগুনের তোপে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। ৪ঠা মে সাইপ্রাস থেকে রাজা দ্বিতীয় হেনরি ৪০টি জাহাজ নিয়ে সহায়তায় এলেও সুলতানের বাহিনীর বিশালতা দেখে সে দমে যায়।
বিজয়ের ক্ষণ
১৮ই মে, ১২৯১ খ্রিস্টাব্দ। ফজরের পরপরই মুসলমানদের রণদামামার আওয়াজে অ্যাক্রে কেঁপে ওঠে। সুলতানের নির্দেশে একযোগে তাকবির দিতে দিতে মুসলিম বাহিনী দুর্গের প্রধান ফটকের দিকে এগিয়ে যায়। উসমানীয় সেনারা প্রাণপণ লড়াই করে ক্রুসেডারদের প্রতিরক্ষা ভেঙে ফেলে। অ্যাক্রের মিনারগুলোতে উম্মাহর বিজয় পতাকা উড়তে শুরু করে। রাজা দ্বিতীয় হেনরি পরাজয় নিশ্চিত দেখে সসৈন্যে পালিয়ে যায়। একে একে শহরের সড়কগুলোতে মুসলিম সেনাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। টানা ৪৪ দিনের যুদ্ধের পর অ্যাক্রে মুসলমানদের হস্তগত হয় এবং ক্রুসেডারদের শেষ আশ্রস্থলটিও ধ্বংস হয়ে যায়।
বিজয়ানন্দ
বিজয়ের খবর ছড়িয়ে পড়তেই পুরো সাম্রাজ্যে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। সুলতান আল-আশরাফ খলিল বিজয়ীর বেশে কায়রোতে প্রবেশ করেন। তিনি বন্দিদের মুক্তি দিয়ে এবং শহরের প্রধান স্থাপত্যগুলোকে সংস্কারের নির্দেশ দিয়ে এক অনন্য নজির স্থাপন করেন। এই বিজয়ের ফলে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ক্রুসেড শক্তির অবসান ঘটে এবং মুসলিম শাসনের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
টিকাঃ
১. আল-মানসুর সাইফুদ্দিন কালাউন আল-আলফি আস-সালিহি (১২২২-১২৯০ খ্রি.)। মামলুক সাম্রাজ্যের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রসিদ্ধ সুলতান। তিনি সুলতান সালিহ আইয়ুবের বংশধর ছিলেন। ৬৭৮ হিজরিতে তিনি সালতানাতের ক্ষমতায় আসেন।
২. আল-আশরাফ সালাহুদ্দিন খলিল (১২৬৭-১২৯৩ খ্রি.)। বাবা সাইফুদ্দিন কালাউনের মৃত্যুর পর সালতানাতের মসনদে আসীন হন। তার উল্লেখযোগ্য কর্মের প্রথমেই বিবেচিত হয় অ্যাক্রে নগরীর বিজয়।