📄 আইন জালুতের যুদ্ধ
৬৫৮ হিজরির রমাদান মাসে সংঘটিত আইন জালুত যুদ্ধকে ইসলামি ইতিহাসে অন্যতম নজিরবিহীন ঘটনা বলে উল্লেখ করা হয়। এ যুদ্ধে মুসলমানদের পায়ের কাছে আনত হয়ে এসেছিল পৃথিবীর ইতিহাসে ভয়ংকর হিংস্র জাতি হিসেবে পরিচিত মোঙ্গলরা। সে-সময় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্যের মালিক ছিল এরা। চেঙ্গিসখানের সময় থেকে শুরু হওয়া মোঙ্গলদের জয়যাত্রা অব্যাহত ছিল পরবর্তী গ্রেট খানদের সময়ও। বাগদাদ, সমরখন্দ, বেইজিং, বুখারা, আলেপ্পোর মত বড় বড় শহর তাতারিদের হামলায় মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল। কি পূর্ব কি পশ্চিম, এমন একটিও রাজ্য ছিল না, যারা মোঙ্গলদের গতিপথে বিন্দুমাত্র বাধা সৃষ্টি করতে পেরেছিল। বিশ্বজয়ের যে আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ রেখে মারা গিয়েছিলেন চেঙ্গিস খান, তার পুত্র ও পৌত্ররা সেটাকেই যেন সত্যে পরিণত করতে যাচ্ছিল। তাদের বর্বরতায় ইউরোপ ও এশিয়ার কোটি কোটি নিরীহ মানুষ প্রাণ দিয়েছে অনেকটা বিনা-প্রতিরোধে। তাই সারা দুনিয়ার মানুষ ভেবেই নিয়েছিল, মোঙ্গলদের থামানো বোধ হয় পৃথিবীবাসীর জন্য অসম্ভব। কিন্তু ১২৬০ সালে হঠাৎই থেমে যায় অপ্রতিরোধ্য মোঙ্গলদের জয়রথ। এক অসাধ্য সাধন হয়ে যায় ফিলিস্তিনের গাজার অদূরে, নাবলুস শহরের পাশে আইন জালুত প্রান্তরে। রক্তক্ষয়ী এক শক্ত মোকাবেলায় মুসলিম বাহিনীর সামনে মুখ থুবড়ে পড়ে বিশ্ব-পরাশক্তি হালাকু খানের বাহিনী। এ পরাজয় শামে তাদের ধ্বংসাত্মক অনুপ্রবেশ বাধাগ্রস্ত করে এবং ৬৫৬ হিজরিতে (১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে) খেলাফতের রাজধানী বাগদাদকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়া তাতারদের অগ্রযাত্রা একেবারে রুদ্ধ করে দেয়। পাশাপাশি এই হিংস্র জাতি দমনের মধ্য দিয়ে উসমানি খেলাফত প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত প্রায় দুইশো বছরের জন্য, তৎসময়ের প্রধান মুসলিম শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে মামলুক সাম্রাজ্য।
চেঙ্গিস খান এবং মোঙ্গল জাতির উত্থান
মঙ্গোলিয়ার স্তেপ বা তৃণ-চারণভূমিতে জন্ম হয়েছিল ইতিহাস সৃষ্টিকারী দাপুটে এই বিজেতার। তেমুজিন যখন সমগ্র মঙ্গোলিয়ান স্তেপের একক অধিপতি হিসাবে আবির্ভূত হন, তখন তাকে 'চেঙ্গিস খান' উপাধি দেওয়া হয়। চেঙ্গিসের জন্মের সময় স্তেপ ভূমিতে ছিল তাতারদের আধিপত্য। তার পিতা ছিলেন তাতারদের ঘোর শত্রু। মোঙ্গল জনশ্রুতি অনুসারে, তাতারদের দেওয়া বিষমিশ্রিত ঘোড়ার দুধ পানেই মৃত্যু হয়েছিল চেঙ্গিসের পিতার।¹ পিতার মৃত্যুর পর অপ্রাপ্ত বয়স্ক তেমুজিনের নেতৃত্ব মেনে নিতে চাইল না তার গোত্রের লোকজন। ১৭ বছর বয়সে তেমুজিন ঘরে তুলে আনে তার বাল্যবধূ বোর্তেকে। চেঙ্গিস খান হওয়ার পর তেমুজিন জয় করেছিলেন চিন, ইউরোপ এবং এশিয়ার প্রায় ১ কোটি বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত অঞ্চল।
বর্বরতার বর্বর চিত্র
চেঙ্গিস খানের রাজ্য জয় করার পদ্ধতি ছিল ভয়াবহ রকমের বীভৎস। কোনো শহর জয়ের আগে সে শহরের মানুষদের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আদেশ করা হতো। সেটা না মেনে নিলে শুরু হত অবরোধ, তারপর একসময় অনাহারক্লিষ্ট নগরবাসীর উপর চালানো হত অতর্কিত হামলা। নারী, পুরুষ, শিশু কেউই মোঙ্গল বাহিনীর বর্বরতা থেকে বাঁচতে পারেনি। ধারণা করা হয়, চেঙ্গিস খানের বিভিন্ন অভিযানে মারা পড়েছিল প্রায় ৪ কোটির মতো সাধারণ মানুষ।²
মুসলিম শহরগুলোতে মোঙ্গলদের ধ্বংসতাণ্ডব
মোঙ্গলদের উপদ্রবের যুগে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো বেশ কয়েকটি ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন রাজ্যে বিভক্ত ছিল। মোঙ্গলদের গ্রেট খান হিসেবে তখন আসনে ছিল মঙ্গে খান। তারই ভাই হালাকু তখন মধ্যপ্রাচ্যে মোঙ্গল বাহিনীর দায়িত্বে নিয়োজিত। মুসলিম শহরগুলোর সঞ্চিত রাশি রাশি ধনভাণ্ডার হালাকু খানকে ভেতর থেকে প্ররোচিত করেছিল মুসলমানদের আবাসভূমিগুলো বিরান করে দিতে। মুসলিম রাজ্য হিসেবে মোঙ্গলদের প্রথম ভয়াবহতার শিকার হয় পারস্য ও মা-ওয়ারাউন-নাহারের³ খাওয়ারিজম সাম্রাজ্যের শহরগুলো।
বাগদাদ ধ্বংসের পটভূমি
হালাকু খানের পরবর্তী টার্গেট ছিল আব্বাসীয় খিলাফতের রাজধানী বাগদাদ। খলিফা মুস্তাসিম বিল্লাহর দুর্বলতা এবং উজির ইবনুল আলকেমির বিশ্বাসঘাতকতায় বাগদাদ আক্রান্ত হয়। ১২৫৮ সালের দিকে বাগদাদকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে হালাকুর সৈন্যরা। শুরু হয় নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ। ধ্বংস করে ফেলা হয় বাগদাদের বিখ্যাত লাইলব্রেরি দারুল হিকমাহ। ধারণা করা হয়, সেখানে প্রায় ১০ লক্ষ বই সংগৃহীত ছিল, যেগুলো দজলা নদীতে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল জালিম হালাকু বাহিনী।
মিশর আক্রমণ এবং ইতিহাসের সূচনা
মোঙ্গলদের ভয়ে সিরিয়া থেকে পালিয়ে মানুষ তখন মিশরে আশ্রয় নিচ্ছিল। হালাকু খানের পরবর্তী পরিকল্পনা ছিল মিশর দখল করা। মিশরে তখন শাসন চলছে মামলুক সাম্রাজ্যের। সাইফুদ্দিন কুতুয আমির-অমাত্যদের পরামর্শে মিশরের ক্ষমতা হাতে নিয়ে মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডাক দেন। তিনি হালাকুর পাঠানো আত্মসমর্পণের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন এবং রণপ্রস্তুতি শুরু করেন। তিনি জানতেন, ইতিপূর্বে যারা বিনা যুদ্ধে মোঙ্গলদের ভয়ে আত্মসমর্পণ করেছিল, তাদের কী করুণ পরিণতি হয়েছিল।
যুদ্ধের জন্য যাত্রা
১৫ই শাবান ৬৫৮ হিজরি। মিশরের সুলতান সাইফুদ্দিন কুতুয কায়রোর আল-জাবাল দুর্গ থেকে বের হয়ে ফিলিস্তিনের গাজা অভিমুখে চলেন। তার সামনে ছিলেন কিংবদন্তি সেনাপতি রুকনুদ্দিন বাইবার্স। কুতুয তার সেনাপতিদের একত্র করে মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মনোবল ধরে রাখার উপদেশ দিলেন। তিনি চওড়া প্রান্তরে মোঙ্গলদের মুখোমুখি না হয়ে বরং তাদেরকে টাইবেরিয়ার ঐতিহাসিক আইন জালুত প্রান্তরে নিয়ে আসার কৌশল নিলেন।
আক্রমণ
২৫শে রমাদান, ৬৫৮ হিজরি সন। সুলতান কুতুয শুরুতে ছোট একটি দল পাঠিয়ে মোঙ্গল বাহিনীকে প্ররোচিত করেন এবং তাদেরকে পূর্বপরিকল্পিত ফাঁদে আটকে ফেলেন। টিলার দুই পাশ থেকে মোঙ্গলদের উপর নেমে আসল তিরবৃষ্টি। একপর্যায়ে সুলতান কুতুয নিজের শিরস্ত্রাণ খুলে উচ্চস্বরে চিৎকার করে 'ওয়া ইসলামাহ!' বলে সৈন্যদের সাহস জোগালেন এবং নিজেও ঝাঁপিয়ে পড়লেন। মুসলমানদের সম্মিলিত আক্রমণে মোঙ্গল সেনারা বিক্ষিপ্ত হয়ে পালাতে শুরু করল। কুতুযের সৈন্যরা প্রায় ৬০০ কিলোমিটার তাড়িয়ে শেষ মোঙ্গল সৈন্যটিকেও হত্যা করে আসে। এভাবেই মামলুক সৈন্যদের কাছে পরাজয় ঘটে অহংকারী, বর্বর ও জালিম হালাকু বাহিনীর। নিমিষেই চূর্ণ হয়ে যায় তাঁদের আকাশছোঁয়া দন্ত এবং ইতিহাসে মুসলমানদের নামে অঙ্কিত হয় এক যুগান্তকারী বিজয়।
টিকাঃ
১. তাতারদের দেওয়া বিষমিশ্রিত ঘোড়ার দুধ পানেই মৃত্যু হয়েছিল চেঙ্গিসের পিতার। তুঘরুল খান ছিলেন এক শক্তিশালী গোত্রপ্রধান এবং চেঙ্গিসের পিতার রক্তের ভাই। সেকালে মোঙ্গলরা ছোটবেলায় ব্লাড ব্রাদার বা রক্তের ভাই সম্পর্কে আবদ্ধ হতেন হাত কেটে রক্ত বিনিময় করে।
২. এতগুলো মানুষের নির্মম মৃত্যুর দায় নিয়ে অবশেষে ১২২৭ সালে মৃত্যু হয় পৃথিবীর বুকে মানবতার সবচে বড় শত্রুদের কাতারে জায়গা করে নেয়া এই দুর্ধর্ষ সাম্রাজ্য বিজেতার। তবে চেঙ্গিসের সমাধি কোথায় সেটা কেউই জানে না।
৩. দরিয়ায়ে সাইহুন (সাইর নদী) ও দরিয়ায়ে যাইহুন (আমু দরিয়া)-এর মধ্যবর্তী অঞ্চলকে বলা হয় মা-ওয়ারাউন নাহার। এর শাব্দিক অর্থ নদীর ওপার। এই অঞ্চলের আধুনিক নাম ট্রান্স অক্সিয়ানা।
📄 আক্কে বিজয়
সালাহুদ্দিন আইয়ুবি রহিমাহুল্লাহ ক্রুসেডারদের সবগুলো রাজ্য দখলে নিলেও অ্যাক্রে বিজয়ের পূর্বেই তার মৃত্যু এসে যায়। এরপর এই অ্যাক্রে হয়ে ওঠে এতদাঞ্চলে ক্রুসেডারদের একমাত্র ষড়যন্ত্র-ঘাঁটি। কালপরিক্রমায় এ অঞ্চলের ক্ষমতায় আসেন মামলুক সুলতান সাইফুদ্দিন কালাউন।¹ সাম্রাজ্যের মসনদে বসেই তিনি বুঝতে পারেন, অ্যাক্রে নগরী দখল না করলে তারা একসময় মামলুক সাম্রাজ্যের জন্য বিরাট হুমকি হয়ে উঠবে। কিন্তু যাত্রা শুরু করার পূর্বেই তার মৃত্যু হলে ক্ষমতায় আসেন তার ছেলে আল-আশরাফ খলিল।² তিনি মসনদে বসেই বাবার সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে অ্যাক্রে জয়ের যাত্রা অব্যাহত রাখার হুকুম দেন।
অবরোধ
সুলতান আল-আশরাফ খলিল কায়রো থেকে ১ লক্ষ ২০ হাজার সেনার এক বিশাল বাহিনী নিয়ে অ্যাক্রে অভিমুখে যাত্রা করেন। সাথে ছিল ৯২টি মিনজানিক ও বিভিন্ন পাথর নিক্ষেপের যন্ত্র। ১২৯১ সালের ৫ই এপ্রিল সুলতান অ্যাক্রের সামনে গিয়ে তাঁবু ফেলেন। পরদিন সকাল থেকে মিনজানিক দিয়ে আগুনের গোলা আর বিশালকায় পাথর নিক্ষেপ শুরু হয়। দীর্ঘ আট দিন পর মুসলিম সেনারা বিশেষ বর্ম গায়ে জড়িয়ে কেল্লার ভেতরে ঢুকতে শুরু করে। তাদের হাতে ছিল এক ধরনের বিশেষ অগ্নি-অস্ত্র, যা দিয়ে তারা বিভিন্ন জায়গায় আগুন ধরিয়ে দিচ্ছিল। ক্রুসেডাররা এই আগুনের তোপে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। ৪ঠা মে সাইপ্রাস থেকে রাজা দ্বিতীয় হেনরি ৪০টি জাহাজ নিয়ে সহায়তায় এলেও সুলতানের বাহিনীর বিশালতা দেখে সে দমে যায়।
বিজয়ের ক্ষণ
১৮ই মে, ১২৯১ খ্রিস্টাব্দ। ফজরের পরপরই মুসলমানদের রণদামামার আওয়াজে অ্যাক্রে কেঁপে ওঠে। সুলতানের নির্দেশে একযোগে তাকবির দিতে দিতে মুসলিম বাহিনী দুর্গের প্রধান ফটকের দিকে এগিয়ে যায়। উসমানীয় সেনারা প্রাণপণ লড়াই করে ক্রুসেডারদের প্রতিরক্ষা ভেঙে ফেলে। অ্যাক্রের মিনারগুলোতে উম্মাহর বিজয় পতাকা উড়তে শুরু করে। রাজা দ্বিতীয় হেনরি পরাজয় নিশ্চিত দেখে সসৈন্যে পালিয়ে যায়। একে একে শহরের সড়কগুলোতে মুসলিম সেনাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। টানা ৪৪ দিনের যুদ্ধের পর অ্যাক্রে মুসলমানদের হস্তগত হয় এবং ক্রুসেডারদের শেষ আশ্রস্থলটিও ধ্বংস হয়ে যায়।
বিজয়ানন্দ
বিজয়ের খবর ছড়িয়ে পড়তেই পুরো সাম্রাজ্যে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। সুলতান আল-আশরাফ খলিল বিজয়ীর বেশে কায়রোতে প্রবেশ করেন। তিনি বন্দিদের মুক্তি দিয়ে এবং শহরের প্রধান স্থাপত্যগুলোকে সংস্কারের নির্দেশ দিয়ে এক অনন্য নজির স্থাপন করেন। এই বিজয়ের ফলে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ক্রুসেড শক্তির অবসান ঘটে এবং মুসলিম শাসনের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
টিকাঃ
১. আল-মানসুর সাইফুদ্দিন কালাউন আল-আলফি আস-সালিহি (১২২২-১২৯০ খ্রি.)। মামলুক সাম্রাজ্যের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রসিদ্ধ সুলতান। তিনি সুলতান সালিহ আইয়ুবের বংশধর ছিলেন। ৬৭৮ হিজরিতে তিনি সালতানাতের ক্ষমতায় আসেন।
২. আল-আশরাফ সালাহুদ্দিন খলিল (১২৬৭-১২৯৩ খ্রি.)। বাবা সাইফুদ্দিন কালাউনের মৃত্যুর পর সালতানাতের মসনদে আসীন হন। তার উল্লেখযোগ্য কর্মের প্রথমেই বিবেচিত হয় অ্যাক্রে নগরীর বিজয়।