📄 যাল্লাকার যুদ্ধ
যাল্লাকার যুদ্ধ BATTLE OF SAGRAJAS
তারিখ: ৪৭৯ হিজরি / ১০৮৬ খ্রি.
স্থান: যাল্লাকার প্রান্তর
ফলাফল: মুসলিম বাহিনীর বিজয়
পক্ষ-বিপক্ষ: মুরাবিতিন সাম্রাজ্য বনাম ক্যাস্টোলা রাজ্য
সেনাপ্রধান: ইউসুফ বিন তাশফিন বনাম ষষ্ঠ আলফোন্সো
সেনাসংখ্যা: ৪৮ হাজারের মতো বনাম ৬০ হাজারের মতো
ক্ষয়ক্ষতি: কয়েক হাজার শহিদ বনাম অধিকাংশ সেনা নিহত, শ পাঁচেক সৈন্যের জীবন্ত পলায়ন
৪৭৯ হিজরির ১২ই রজব মোতাবেক ২৩ অক্টোবর ১০৮৬ খ্রিস্টাব্দে মুতামিদ ইবনু আব্বাদের নেতৃত্বে মুরাবিতিনরা কাস্টলি সম্রাট ৭ম আলফোন্সোর সাথে যাল্লাকার ময়দানে আন্দালুসে ইসলামের ভবিষ্যত বিনির্মাণমূলক তাৎপর্যপূর্ণ এক যুদ্ধে মুখোমুখি হয়। যাল্লাকা শব্দের অর্থ, পিচ্ছিল জায়গা। আন্দালুসের দক্ষিণে অবস্থিত ঐতিহাসিক এ ভূমিটুকুর এমন নামকরণের কারণ হিসেবে বলা হয়, ৪৭৯ হিজরির যুদ্ধে নিহতদের রক্তে ময়দান পিচ্ছিল হয়ে যাওয়ায় যোদ্ধারা বারবার পিছলে পড়ে যাচ্ছিল। যাল্লাকার এই রক্তপিচ্ছিল যুদ্ধ আন্দালুসে ইসলামের পতন পরবর্তী আড়াই শতাব্দীর জন্য প্রলম্বিত করে দেয়।
যুদ্ধের আগে
আন্দালুসে উমাইয়া পতনের পর মুসলমানরা যখন পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে মতবৈরিতায় লিপ্ত, ঠিক তখনই খ্রিস্টানরা ঐক্যের শপথ করে। রাজা ফার্ডিনান্ড মারা গেলে ছেলে অষ্টম আলফোন্সো টলেডো দখল করে নেয়। আলফোন্সোর হাতে টলেডোর পতনের চেয়েও দুঃখের ব্যাপার ছিল আন্দালুসের কোনো শাসকই শহরটি পুনরুদ্ধারের আগ্রহ দেখায়নি; বরং তাদের কেউ কেউ আলফোন্সোর সাথে সখ্য গড়ে তোলে। সেভিলের শাসক মুতামিদ ইবনু আব্বাদ বুঝতে পারলেন যে এভাবে চললে আন্দালুসে ইসলামি অস্তিত্ব মুছে যাবে। তাই তিনি মরক্কোর মুরাবিতিন শাসক ইউসুফ বিন তাশফিনের[১] সাহায্য চান। মুতামিদের ছেলে এর বিরোধিতা করলেও মুতামিদ বলেন, 'আমি শূকরের রাখাল হওয়ার চাইতে উট চরানো উত্তম মনে করি।'
পত্র গেল উত্তর আফ্রিকায়
৪৭৮ হিজরিতে মুতামিদের প্রতিনিধিদল ইউসুফ বিন তাশফিনের সাথে সাক্ষাৎ করে। তিনি সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন এবং আলগেরিকা শহরটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন যাতে যাতায়াত নির্বিঘ্ন হয়। ইউসুফ বিন তাশফিন বিশাল বাহিনী নিয়ে জিব্রাল্টার প্রণালি পাড়ি দিয়ে আন্দালুসে পৌঁছান এবং আলফোন্সোকে ইসলাম গ্রহণ, জিযিয়া অথবা যুদ্ধের বিকল্প দেন। আলফোন্সো যুদ্ধ বেছে নেয়।
যাল্লাকার ময়দান: মহান বিজয়ের সাক্ষী
১২ই রজব ৪৭৯ হিজরি, শুক্রবার ভোরবেলা আলফোন্সো ধোঁকা দিয়ে আক্রমণ চালায়। মুসলিম বাহিনীর সম্মুখভাগে ছিলেন মুতামিদ। খ্রিস্টানদের বিশাল বাহিনীর চাপে মুসলিমরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। কিন্তু ইউসুফ বিন তাশফিন এক নিপুণ রণকৌশল অবলম্বন করেছিলেন। তিনি টিলার আড়ালে মূল বাহিনী নিয়ে লুকিয়ে ছিলেন এবং একসময় অতর্কিত আলফোন্সোর শিবিরে আক্রমণ করে আগুন ধরিয়ে দেন। এতে খ্রিস্টান বাহিনী দুই দিক থেকে আক্রান্ত হয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। আশি বছর বয়সী ইউসুফ বিন তাশফিন নিজে ময়দানে লড়াই করেন। আলফোন্সো তিরের আঘাতে গুরুতর আহত হয়ে মাত্র ১০০ সৈন্য নিয়ে পালিয়ে যায়।
ফলাফল
যাল্লাকার যুদ্ধে বিজয়ের ফলে আন্দালুসে খ্রিস্টানদের অগ্রযাত্রা থমকে যায়। ইউসুফ বিন তাশফিন গনিমতের কোনো অংশ না নিয়ে মরক্কো ফিরে যান। এই বিজয়ের ফলে আন্দালুসে মুসলিম শাসন আরও আড়াইশ বছর স্থায়ী হয়। পরবর্তীতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল দেখে তিনি ৪৮৩ হিজরিতে আন্দালুসের বিদ্রোহী শাসকদের সরিয়ে সরাসরি মুরাবিতি শাসনের অধীনে নিয়ে আসেন।
টিকাঃ
[১] ইউসুফ বিন তাশফিনের জন্ম ৪০০ হিজরিতে। ৪৫৩ হিজরিতে তিনি উত্তর সেনেগাল ও দক্ষিণ মৌরিতানিয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক ও দক্ষ সেনাপতি।
📄 আর্কের যুদ্ধ
আর্কের যুদ্ধ BATTLE OF ALARCOS
তারিখ: ৫৯১ হিজরি / ১১৯৫ খ্রি.
স্থান: টলেডোর দক্ষিণে আর্ক দুর্গ-সংলগ্ন প্রান্তরে
ফলাফল: মুসলিম বাহিনীর বিজয়
পক্ষ-বিপক্ষ: মুওয়াহহিদিন সাম্রাজ্য বনাম ক্যাস্টোলা রাজ্য
সেনাপ্রধান: সুলতান আবু ইউসুফ ইয়াকুব আল-মানসুর বনাম অষ্টম আলফোন্সো
সেনাসংখ্যা: ২ লাখের মতো সেনা বনাম ২ লাখ ২৫ হাজার
ক্ষয়ক্ষতি: কয়েক হাজার শহিদ বনাম ৩০ হাজার নিহত
৫৯১ হিজরিতে সংঘটিত আর্কের যুদ্ধ আন্দালুসের ইতিহাসে এক পটপরিবর্তনকারী ঘটনা। এ যুদ্ধে মুওয়াহহিদিন[২] সুলতান আবু ইউসুফ ইয়াকুব আল-মানসুর[১] ক্যাস্টোলার রাজা অষ্টম আলফোন্সোকে পরাজিত করেন। এ জয় ক্যাস্টোলা সাম্রাজ্যকে আন্দালুসে কোণঠাসা করে ফেলে।
যুদ্ধের আগে
পর্তুগালের রাজার মুসলিম রাজ্য সিলভাসে আক্রমণের প্রতিবাদে সুলতান আল-মানসুর আন্দালুসে যাত্রা করেন। ক্যাস্টোলার রাজা আলফোন্সো ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে সাহায্য নিয়ে বিশাল বাহিনী গড়ে তোলে। সুলতান সেনাপতিদের পরামর্শে বাহিনীকে পাঁচ ভাগে বিভক্ত করেন। সুলতান নিজে তাঁর রক্ষীদল নিয়ে টিলার পেছনে সতর্ক অবস্থায় থাকেন। যুদ্ধের আগে সুলতান সেনাদের উদ্দেশ্যে এক আবেগপূর্ণ চিঠি লিখেন, যাতে তিনি সবাইকে ক্ষমা চাইতে বলেন এবং নিয়ত বিশুদ্ধ করার নির্দেশ দেন।
যুদ্ধের ক্ষণ
শুরুতে খ্রিস্টান অশ্বারোহীদের তীব্র আক্রমণে মুসলিম বাহিনী কিছুটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সুলতানের উৎসাহে তারা পুনরায় সংগঠিত হয়। একপর্যায়ে মুসলিম সেনাপতি আবু আবদুল্লাহ ইবনু সানাদিদ আলফোন্সোর রক্ষীবাহিনীকে ঘিরে ফেলেন। সুলতান আল-মানসুর টিলার পেছন থেকে মূল বাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লে খ্রিস্টানদের প্রতিরক্ষা ভেঙে যায়। বিকেলের মধ্যেই ময়দান মুসলমানদের দখলে চলে আসে এবং আলফোন্সো অল্প কিছু সৈন্য নিয়ে পালিয়ে যায়।
যুদ্ধের ফলাফল
১. খ্রিস্টান জোটের শোচনীয় পরাজয়: আলফোন্সোর ২ লক্ষ ২৫ হাজার সেনার মধ্যে ১ লক্ষ ৪৬ হাজারই নিহত হয় এবং প্রায় ৩০ হাজার বন্দি হয়। সুলতান মানসুর মহানুভবতার পরিচয় দিয়ে বন্দিদের মুক্তি দেন।
২. সুদূরপ্রসারী জয়: এ যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ গনিমত অর্জিত হয়। সুলতান সেই সম্পদ দিয়ে সেভিলে এক বিরাট মসজিদ নির্মাণ করেন।
৩. রাজনৈতিক প্রভাব: এই বিজয়ের পর খ্রিস্টান রাজ্যগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিরোধ শুরু হয় এবং আলফোন্সো সুলতানের সাথে ১০ বছরের শান্তিচুক্তি করতে বাধ্য হয়।
টিকাঃ
[১] পুরো নাম: আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইবনু ইউসুফ আল-মানসুর। ১১৮৪ সালে মুওয়াহহিদিন সাম্রাজ্যের মসনদে বসেন।
[২] ১১২১ সালে মুহাম্মদ ইবনু তুমরুত-এর অনুসারীরা এ সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন।
📄 লাস নাভাস ডি টোলোসা
লাস নাভাস ডি টলোসা BATTLE OF LAS NAVAS DE TOLOSA
তারিখ: ৬০৯ হিজরি / ১২১২ খ্রি.
স্থান: নাভাস উপত্যকা, টলোসা, আন্দালুস
ফলাফল: খ্রিস্টানদের বিজয়
পক্ষ-বিপক্ষ: মুওয়াহহিদিন সাম্রাজ্য বনাম ক্যাস্টোলা, আরাগন, পর্তুগাল এবং নাভাররের সম্মিলিত বাহিনী
সেনাপ্রধান: সুলতান আন-নাসির মুহাম্মদ ইবনু ইয়াকুব বনাম অষ্টম আলফোন্সো ও অন্যান্য খ্রিস্টান রাজা
সেনাসংখ্যা: ২ লাখ (মতান্তরে ৫ লাখ) বনাম ২ লাখ (মতান্তরে ৬০ হাজার)
ক্ষয়ক্ষতি: ৭০ হাজার শহিদ বনাম মুসলমানদের তুলনায় অনেক কম
১২১২ খ্রিস্টাব্দের এ যুদ্ধটি স্পেনের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ যুদ্ধে মুওয়াহহিদিন সুলতান আন-নাসির মুহাম্মদের পরাজয়ের ফলে স্পেনে মুসলমানদের পতন ত্বরান্বিত হয়। আরবিতে একে 'ইকাবের যুদ্ধ' বলা হয়।
পটভূমি
আর্কের যুদ্ধে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে আলফোন্সো পোপের সাহায্য চায়। পোপের ডাকে সাড়া দিয়ে ইউরোপের খ্রিস্টানরা জোটবদ্ধ হয়। সুলতান আন-নাসির মুহাম্মদ প্রায় পাঁচ লক্ষ সেনা নিয়ে এগিয়ে যান। কিন্তু সুলতান অভিজ্ঞ আন্দালুসি উজিরদের কথা না শুনে তাঁর আফ্রিকান উজিরের পরামর্শে সালবাতরা কেল্লা অবরোধ করে দীর্ঘ আট মাস সময় নষ্ট করেন। এর ফলে শীতকালে অনেক মুসলিম সৈন্য ঠান্ডায় মারা যায় এবং খ্রিস্টানরা প্রস্তুতির পর্যাপ্ত সময় পায়।
পরাজয়ের পূর্বাভাস ও সুলতানের ভুল
সুলতান রাবাহ দুর্গের রক্ষী আবুল হাজ্জাজকে মিথ্যা অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেন, যা মুসলিম বাহিনীর মনোবল কমিয়ে দেয়। যুদ্ধের ময়দানে সুলতান অনভিজ্ঞ স্বেচ্ছাসেবীদের সামনে রাখেন এবং দক্ষ সেনাদের পেছনে রাখেন। তাঁর এই ভুল বিন্যাস পরাজয় নিশ্চিত করে।
যুদ্ধ বা তিক্ত ইতিহাস
১৬ই জুলাই যুদ্ধ শুরু হলে অনভিজ্ঞ স্বেচ্ছাসেবীরা ক্রুসেডারদের প্রথম আঘাতেই ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। আন্দালুসি সৈন্যরা সুলতানের ওপর ক্ষুব্ধ থাকায় এবং রণক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা দেখে ময়দান ত্যাগ করে। এর ফলে খ্রিস্টানরা মুসলিম বাহিনীকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে ব্যাপক গণহত্যা চালায়। সুলতান আন-নাসির মুষ্টিমেয় সৈন্য নিয়ে পালিয়ে যান।
পরাজয়ের কারণ ও ফলাফল
১. দীর্ঘ অবরোধে সময়ক্ষেপণ।
২. অযোগ্য উজিরের পরামর্শ গ্রহণ।
৩. সেনাপতি আবুল হাজ্জাজকে অন্যায়ভাবে হত্যা।
৪. যুদ্ধের ময়দানে ভুল সেনাবিন্যাস।
এই পরাজয়ের পর খ্রিস্টানরা উব্বাজা শহরে প্রায় ৬০ হাজার মুসলমানকে হত্যা করে। এই যুদ্ধের ফলে স্পেনে মুসলমানদের শাসনের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায় এবং একের পর এক মুসলিম শহর খ্রিস্টানদের দখলে চলে যায়।
টিকাঃ
টিকা পাওয়া যায়নি।