📘 ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ নববী যুগ থেকে বর্তমান 📄 তালাস নদীর যুদ্ধ

📄 তালাস নদীর যুদ্ধ


তালাস নদীর যুদ্ধ BATTLE OF TALAS
তারিখ: ১৩৩ হিজরি / ৭৫১ খ্রি.
স্থান: তালাস (বর্তমান কিরগিজিস্তানের অন্তর্গত একটি শহর)
ফলাফল: চৈনিকদের পরাজয় এবং গাও শিয়ানশির পলায়ন
পক্ষ-বিপক্ষ: আব্বাসি খিলাফাহ বনাম চিনের ট্যাং রাজবংশ
সেনাপ্রধান: যিয়াদ ইবনু সালিহ, আবু মুসলিম বনাম গাও শিয়ানশি
সেনাসংখ্যা: জানা যায় নি বনাম ৩০ হাজার (মতান্তরে ১ লক্ষ)
ক্ষয়ক্ষতি: অজ্ঞাত বনাম নিহত কয়েক হাজার, বন্দি ২০ হাজারের মতো

পৃথিবীর ইতিহাসে নতুন বাঁকের সূচনা করা এই যুদ্ধ ইতিহাসে ‘ব্যাটেল অফ তালাস রিভার’ বা ‘তালাস নদীর যুদ্ধ’ হিসেবে পরিচিত। ১৩৩ হিজরি মোতাবেক ৭৫১ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান কিরগিজিস্তানের অন্তর্গত তালাস নদীর অববাহিকায় আরবদের সাথে চিনদের প্রথম এবং একইসাথে শেষ এ যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। ফলাফলে চৈনিক বাহিনীর উপর মুসলিম সেনাদের বিজয়, মধ্য এশিয়ায় আব্বাসি খিলাফাহর শেকড় আরও শক্তিশালী করে দেয়।

পূর্বকথা
অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি চিনের ট্যাং রাজবংশ তখন পূর্বদিকের একচ্ছত্র অধিপতি। একে একে মধ্য এশিয়ার তুর্কি রাজ্যগুলো চলে আসছিল তাদের করায়ত্তে। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে জেগে উঠেছে ইসলামি খেলাফত। হযরত উমার ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফতের সময় বিশাল পারস্য সাম্রাজ্য জয় করে মধ্য এশিয়ার উপকণ্ঠে পৌঁছে গিয়েছিল মুসলিম বাহিনী। ৮৫ হিজরি সালে (৭০৪ খ্রি.) কুতাইবা ইবনু মুসলিম আল-বাহিলির হাত ধরে সমরখন্দ, বুখারাসহ মধ্য এশিয়া মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। ফলে আরব ও চিন—প্রাচ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের দুই পরাশক্তির মধ্যে মোকাবেলা তখন সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

উমাইয়াদের পতন ও শিয়ানশির সফল অভিযান
৭৫১ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়াদের খিলাফতের অবসান ঘটে আব্বাসীয়দের হাতে। উমাইয়াদের পতন চিনাদের আরও উগ্র করে তোলে। ট্যাং সেনাবাহিনীর কোরীয় সেনাপতি গাও শিয়ানশি মধ্য এশিয়ার বেশ কিছু রাজ্য দখল করে মুসলিম অধিকৃত জনপদগুলোতে হুমকি দিতে শুরু করে। আব্বাসীয় খিলাফতের ক্ষমতা গ্রহণের পরই খলিফা আবুল আব্বাস সাফফাহ খোরাসানের শাসক আবু মুসলিমকে সীমান্ত রক্ষার নির্দেশ দেন। ফারগানা ও তাসখন্দের মধ্যকার দ্বন্দ্বই মূলত দুই পরাশক্তিকে যুদ্ধের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। তাসখন্দের আমিরের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুসলিম সেনাপতি যিয়াদ ইবনে সালিহ তাঁর সৈন্যদের নিয়ে অগ্রসর হন।

যুদ্ধের কথা
সংঘর্ষ শুরু হলো তালাস নদীর পাড়ে। প্রথম পাঁচদিন লড়াই চলে সমানে সমানে। কারলুক তুর্কদের এক রহস্যজনক ভূমিকায় ষষ্ঠ দিনে যুদ্ধের ফলাফল আব্বাসীয়দের পক্ষে এসে যায়। তারা চিনা সেনাদেরকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। সেনাপতি গাও শিয়ানশি পরাজয় অনুভব করতে পেরে ময়দান ছেড়ে পলায়ন করেন। মুসলিম সেনাপতি যিয়াদ ইবনু সালিহ প্রায় ২০ হাজারের মতো চৈনিক সেনা বন্দি করেন।

যেভাবে দুনিয়া জেনে গেল কাগজের অজানা রহস্য
তালাস নদীর যুদ্ধে বন্দি হওয়া চিনাদের মধ্যে অনেকে ছিলেন কাগজ তৈরির দক্ষ কারিগর। তাঁদের মাধ্যমেই কাগজ তৈরির নিগূঢ় রহস্য প্রথমবার পূর্ব এশিয়ার বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সমরকন্দে স্থাপিত হয় কাগজের কল এবং ক্রমান্বয়ে বাগদাদসহ আব্বাসীয় খিলাফতের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে এই শিল্পের অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটে।

যুদ্ধের পর
এই পরাজয়ের ফলে মধ্য এশিয়ায় ট্যাং রাজবংশের আধিপত্যের অবসান ঘটে। সিল্করুটের একটা বড় অংশ আব্বাসীয়দের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। মধ্য এশিয়ার তুর্কি গোত্রগুলো এ সময় মুসলিমদের সান্নিধ্যে আসে এবং পরবর্তী তিন শতাব্দীতে এদের অধিকাংশই ইসলাম গ্রহণ করে।

টিকাঃ
[১] বৌদ্ধ ধর্ম গৌতম বুদ্ধ কর্তৃক প্রচারিত একটি ধর্ম বিশ্বাস। ... বৌদ্ধধর্ম এখন চিনের ২য় বৃহত্তম ধর্ম (১৮-২০% লোক)। তাছাড়া দেশের ৩-৪% লোক খ্রিস্টান এবং ১-২% মুসলমান।

📘 ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ নববী যুগ থেকে বর্তমান 📄 আম্মুরিয়ার যুদ্ধ

📄 আম্মুরিয়ার যুদ্ধ


আম্মুরিয়ার যুদ্ধ SACK OF AMORIUM
তারিখ: ২২৩ হিজরি / ৮৩৮ খ্রি.
স্থান: আম্মুরিয়া শহর, তুরস্ক
ফলাফল: মুসলিম বাহিনীর বিজয়
পক্ষ-বিপক্ষ: আব্বাসি খিলাফাহ বনাম বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য
সেনাপ্রধান: খলিফা মুতাসিম বিল্লাহ বনাম সম্রাট থিওফেল
সেনাসংখ্যা: প্রচুর এবং অসংখ্য

২২৩ হিজরি মোতাবেক ৮৩৮ খ্রিস্টাব্দ সনে সংঘটিত 'আম্মুরিয়ার যুদ্ধ' ঐতিহাসিকদের মতে মধ্য এশিয়ায় আব্বাসি খেলাফতের অন্যতম প্রধান বিজয় ছিল। আম্মুরিয়া ছিল বাইজান্টাইনদের কাছে সবচেয়ে সম্মানিত ও সুরক্ষিত শহর।

যুদ্ধের কারণ
খলিফা মামুন মৃত্যুশয্যায় ভাই মুতাসিম বিল্লাহকে[১] বিদ্রোহী বাবাক খুররামির ফিতনা অবসানের ওসিয়ত করেন। বাবাক ছিল এক জঘন্য ফিতনাবাজ যে আজারবাইজানে নিজের ঘাঁটি মজবুত করে মুসলমানদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাচ্ছিল। খলিফা মুতাসিম যখন এই অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত, সেই সুযোগে বাইজান্টাইন সম্রাট থিওফেল আব্বাসি সাম্রাজ্যের জিবাত্রা ও মালিতা শহরে আক্রমণ চালায়। তারা মুসলিম জনপদ জ্বালিয়ে দেয় এবং সহস্রাধিক মুসলিম মা-বোনকে বন্দি করে নিয়ে যায়। এক হাশেমি নারী তখন চিৎকার করে উচ্চারণ করেছিলেন— 'ওয়া মুতাসিমাহ!' (হে মুতাসিম, রক্ষা করো মোদের!)

মুতাসিমের অবস্থান: যুদ্ধের প্রস্তুতি
এই নৃশংসতার খবর পেয়ে খলিফা মুতাসিম 'লাব্বাইক' বলে সিংহাসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে যান। তিনি জানতে চান রোমানদের সবচেয়ে সুরক্ষিত শহর কোনটি। সবাই আম্মুরিয়ার নাম নিলে তিনি সেখানে আক্রমণের প্রস্তুতি নেন। তিনি এমন এক বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করেন যার উদাহরণ ইতিপূর্বে আর কেউ দিতে পারেনি।

বিজয়ের রথযাত্রা
খলিফা তাঁর বাহিনীকে তিন ভাগে ভাগ করে বাইজান্টাইন ভূমিতে প্রবেশ করান। সম্রাট থিওফেল উসমানীয়দের গতিরোধ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন এবং তাঁর সেনারা পরাজয় মেনে নিয়ে মাঠ ছেড়ে পালায়। উপায় না দেখে সম্রাট সন্ধির প্রস্তাব দিলেও খলিফা তা প্রত্যাখ্যান করে সরাসরি আম্মুরিয়া অবরোধ করেন।

আম্মুরিয়া অবরোধ ও বিজয়
৬ রমাদান ২২৩ হিজরি থেকে অবরোধ শুরু হয়। শহরের এক বাসিন্দার মাধ্যমে খলিফা জানতে পারেন প্রাচীরের একটি অংশ দুর্বল। খলিফার নির্দেশে সেখানে মিনজানিকের অবিরাম পাথর নিক্ষেপ চলতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত প্রাচীর ধসে পড়ে। ১৭ রমাদান ২২৩ হিজরি মুসলিম বাহিনী শহরে প্রবেশ করে। প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ মুসলমানদের হাতে আসে। খলিফার আদেশে রোমানদের দম্ভ চূর্ণ করা হয় এবং জিবাত্রার ধ্বংসযজ্ঞের প্রতিশোধ নেওয়া হয়।

বিজয়ের তাৎপর্য
এই বিজয়ের ফলে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের দুর্বলতা বিশ্বের সামনে প্রকাশিত হয়ে যায়। এর ফলে মধ্য এশিয়ায় আব্বাসি খেলাফতের নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় হয় এবং পরবর্তীতে রোমান সম্রাট খলিফার কাছে সন্ধির আবেদন করতে বাধ্য হয়।

টিকাঃ
[১] মুতাসিম বিল্লাহ ছিলেন ৮ম আব্বাসি খলিফা। ৮৩৩ থেকে ৮৪২ সাল পর্যন্ত তিনি শাসনকার্য পরিচালনা করেন।
[১] সামাররা: বাগদাদ থেকে ১২৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত একটি শহর। ২২১ হিজরিতে খলিফা মুতাসিম বিল্লাহ এই শহর নির্মাণ করেন।

📘 ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ নববী যুগ থেকে বর্তমান 📄 সোমনাথ অভিযান

📄 সোমনাথ অভিযান


সোমনাথ অভিযান SOMNATH TEMPLE ATTACK
তারিখ: ৪১৬ হিজরি / ১০২৫ খ্রি.
স্থান: সোমনাথ মন্দির, ভারত
ফলাফল: মুসলিম বাহিনীর বিজয়
পক্ষ-বিপক্ষ: গজনভি সাম্রাজ্য বনাম হিন্দু রাজপুত জোট
সেনাপ্রধান: সুলতান মাহমুদ গজনভি

সোমনাথ মন্দির ছিল পশ্চিম হিন্দুস্তানের গুজরাট রাজ্যের এক বিশাল তীর্থস্থান। হিন্দুরা বিশ্বাস করত যে সোমনাথ দেবতা পরম শক্তিশালী। সুলতান মাহমুদের[১] কাছে খবর পৌঁছাল যে হিন্দুরা মূর্তিপূজা এবং দেবতাদের নিয়ে ভিত্তিহীন দাবি করছে, তাই তিনি তাদের ভ্রান্ত আকিদা এবং সোমনাথ মূর্তির অসহায়ত্ব প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে জিহাদের সংকল্প করেন।

বিজয়ের চিন্তা থেকে
৪১৬ হিজরির ১০ই শাবান সুলতান মাহমুদ তাঁর বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে গজনী থেকে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথে দুর্গম মরুপ্রান্তর এবং শত্রু বাহিনীর নানা বাধা উপেক্ষা করে তিনি এগিয়ে চলেন। তিনি যেখানেই পৌঁছেছেন, হিন্দুরা দাবি করেছে যে সোমনাথের শক্তি মুসলমানদের ধ্বংস করে দেবে।

ধসে গেল সোমনাথের প্রাচীর
৪১৬ হিজরির ১৫ই যিলকদ সুলতান সোমনাথে পৌঁছান। ১৬ই যিলকদ বিকেলে তুর্কি সেনারা শহরের প্রাচীর বেয়ে ভেতরে প্রবেশ শুরু করে। হিন্দুরা মূর্তির পায়ে লুটিয়ে পড়ে সাহায্যের প্রার্থনা করলেও মুসলমানদের তরবারির মুখে তারা খড়কুটোর মতো উড়ে যায়। প্রায় ৫০ হাজার হিন্দু সৈন্য নিহত হয়।

রক্তের মহড়ায় আদর্শের মেসাল
যুদ্ধ চলাকালে একদল ব্রাহ্মণ পুরোহিত সুলতানকে অঢেল সম্পদের লোভ দেখিয়ে মূর্তি না ভাঙার অনুরোধ করে। কিন্তু সুলতান মাহমুদ দৃঢ়ভাবে বললেন— 'পরকালে খোদার কাছে আমি মূর্তিবিক্রেতা হিসেবে নয়, বরং মূর্তিশিকল ভাঙার নায়ক মাহমুদ হিসেবে পরিচিত হতে চাই।' তিনি মূর্তির ভেতরে কোনো মণি-মুক্তা পাওয়ার লোভে নয়, বরং তওহিদের ঝাণ্ডা ওড়াতে সোমনাথ গুঁড়িয়ে দেন।

সোমনাথ বিজয় এবং হিন্দুদের সাম্প্রদায়িক মিথ
সুলতান মাহমুদকে আধুনিক কালের অনেক ঐতিহাসিক 'লুটেরা' হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করলেও নিরপেক্ষ বিচারে তিনি ছিলেন একজন ন্যায়নিষ্ঠ শাসক এবং বীর বিজেতা। তিনি কখনই সাধারণ হিন্দুদের ওপর নির্যাতন চালাননি। সোমনাথের মূর্তিটি ছিল কৃত্রিমভাবে চৌম্বকীয় শক্তির সাহায্যে শূন্যে ঝুলন্ত, যা সুলতান তাঁর প্রকৌশলীদের মাধ্যমে সবার সামনে প্রকাশ করে দিয়ে মূর্তিপূজার অসারতা প্রমাণ করেন। তাঁর এই অভিযান ছিল মূলত শিরকের অন্ধকার দূর করে ইসলামের সুমহান আলো ছড়িয়ে দেয়ার একটি প্রয়াস।

টিকাঃ
[১] সুলতান মাহমুদ গজনভি (৯৭১-১০৩০ খ্রি.)। গজনভি সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ শাসক। তিনি ১৭ বার ভারত আক্রমণ করেন।
[১] সোমনাথ মন্দির: ভারতের একটি প্রসিদ্ধ শিব মন্দির। গুজরাট রাজ্যের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত।
[২] ফারসাখ: প্রাচীন আরবের দূরত্ব নির্ণয়ের পরিভাষা। এক ফারসাখ সমান প্রায় তিন মাইল।
[১] ইস্তিখারা: আল্লাহর কাছে কল্যাণ কামনার একটি বিশেষ নামাজ ও দুয়া।

📘 ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ নববী যুগ থেকে বর্তমান 📄 মানজিকার্টের যুদ্ধ

📄 মানজিকার্টের যুদ্ধ


মানজিকার্টের যুদ্ধ BATTLE OF MALAZGIRT
তারিখ: ৪৬৩ হিজরি / ১০৭১ খ্রি.
স্থান: মানজিকার্ট, তুরস্ক
ফলাফল: মুসলিম বাহিনীর বিজয়
পক্ষ-বিপক্ষ: সেলজুক সাম্রাজ্য বনাম বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য
সেনাপ্রধান: আলপ আরসালান বনাম সম্রাট রোমানোস
সেনাসংখ্যা: ১৫ হাজার বনাম ২ লক্ষ

মানজিকার্টের যুদ্ধ সেলজুক সাম্রাজ্যের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান যুদ্ধ। ১০৭১ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে সুলতান আলপ আরসালানের[১] নেতৃত্বে মুসলমানরা বাইজান্টাইনদের বিরুদ্ধে গৌরবময় বিজয় লাভ করে।

পটভূমি
সেলজুক সুলতান তুগ্রিল বেগের পর তাঁর ভাতিজা আলপ আরসালান ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তাঁর বীরত্ব ও রণকৌশল রোমানদের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাইজান্টাইন সম্রাট রোমানোস ২ লক্ষ সৈন্য নিয়ে সেলজুক রাজধানী রায় দখল করার উদ্দেশ্যে রওনা হন। আলপ আরসালান তখন ফাতেমিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যস্ত থাকলেও খবর পাওয়া মাত্রই দ্রুত ফিরে আসেন।

শক্তির দম্ভ ও রণকৌশল
রোমানোসের বাহিনী বিশাল হওয়ায় সে অত্যন্ত অহংকারী ছিল। আলপ আরসালান সন্ধির প্রস্তাব দিলেও সম্রাট তা প্রত্যাখ্যান করেন। সেলজুক সুলতানের সাথে ছিল মাত্র ১৫ থেকে ২০ হাজার সৈন্য। যুদ্ধের আগে সুলতান সাদা কাপড় পরে ঘোষণা করেন— 'যদি আমি শহিদ হই, তবে এটাই আমার কাফন হবে।'

মানজিকার্টের ময়দানে
যুদ্ধ শুরু হলে সেলজুক সেনারা 'হিত এন্ড রান' (Hit and Run) কৌশল অবলম্বন করে পিছু হটতে শুরু করে। রোমানোস ভাবল মুসলমানরা পালাচ্ছে, তাই সে আরও ভেতরে ঢুকে যায়। এক পর্যায়ে সেলজুকরা চারদিক থেকে রোমান বাহিনীকে ঘিরে ফেলে। বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে বাইজান্টাইনরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় এবং সম্রাট রোমানোস সয়ং বন্দি হন।

রোমানোসের মুক্তি ও ফলাফল
সুলতান আলপ আরসালান সম্রাটকে হত্যা না করে তাঁর সাথে সন্ধি করেন এবং মুক্তিপণের বিনিময়ে তাঁকে ছেড়ে দেন। এই বিজয়ের ফলে আনাতোলিয়ার (বর্তমান তুরস্ক) দরজা তুর্কিদের জন্য চিরতরে খুলে যায়। এটিই ছিল ভবিষ্যতে উসমানীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ভিত্তি। সুলতান আরসালান মাত্র ২১ বছর বয়সে এই অবিশ্বাস্য বিজয় অর্জন করে ইতিহাসে অমর হয়ে থাকেন।

টিকাঃ
[১] আলপ আরসালান (১০২৯-১০৭২ খ্রি.)। সেলজুক সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় সুলতান। তাঁর নামের অর্থ 'সিংহযোদ্ধা'।
[১] আল-কামিল ফিত-তারিখ, ৮/৩৮৮— রোমানোসের সেনা সংখ্যা ছিল দুই লক্ষ।
[২] মানজিকার্ট: তুরস্কের অন্তর্গত একটি শহর, যা বর্তমানে 'মালাজগির্ত' নামে পরিচিত।

ফন্ট সাইজ
15px
17px