📄 ওয়াদি বারবাতের যুদ্ধ
শাজুনা বা ওয়াদি লাক্কার যুদ্ধ হিসেবে ইতিহাসে পরিচিত এ যুদ্ধটি সংঘটিত হয় মুসলমান এবং পশ্চিমা গোথ (Goths) সম্প্রদায়ের মধ্যে। এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন হযরত তারিক ইবনু যিয়াদ[১] এবং শত্রুপক্ষের সেনাপতি ছিল গোথ সাম্রাজ্যের বাদশা রডারিক (Roderic)। যুদ্ধে মুসলমানদের নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ হয়, যা পশ্চিমাদের এ গোথ সাম্রাজ্যকে পতনের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়।
যুদ্ধের আগের কথা
৯২ হিজরির শাবান মাস। মাত্র সাত হাজার মুসলিম সেনা নিয়ে তারিক ইবনু যিয়াদ 'জাবাল আত-তারিক' বা জিব্রাল্টারের সংকীর্ণ গিরিপথ পাড়ি দিলেন। সেখান থেকে তিনি 'সবুজ উপদ্বীপ' বা 'জাযিরাতুল খাদ্বরা' অভিমুখে যাত্রা করেন। সেখানে খ্রিস্টান বাহিনীর রক্ষক গোষ্ঠীর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। তারিক তাদের ইসলাম গ্রহণ অথবা জিযিয়া কর প্রদানের প্রস্তাব দিলে তারা তা প্রত্যাখ্যান করে যুদ্ধের পথ বেছে নেয়। যুদ্ধে তারা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলে রাজা রডারিকের কাছে সাহায্য চেয়ে পত্র পাঠায়। রডারিক এক লক্ষ অশ্বারোহী নিয়ে মুসলমানদের মোকাবেলায় এগিয়ে আসে। বিপরীতে তারিক ইবনু যিয়াদের সেনা ছিল মাত্র বারো হাজার।
বারবাতের উপত্যকায় উভয় বাহিনীর মোকাবেলা হলো। যুদ্ধ ছিল চূড়ান্ত রকমের অসম। একদিকে রডারিকের বিশাল বাহিনী, অন্যদিকে তারিক ইবনু যিয়াদের ঈমানি শক্তিতে বলীয়ান ক্ষুদ্র সেনাদল। ৯২ হিজরি সনের ২৮শে রমাদান (১৮ই জুলাই, ৭১১ খ্রিস্টাব্দ) যুদ্ধ শুরু হয়। টানা আট দিন রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর মুসলমানদের গৌরবময় বিজয় অর্জিত হয় এবং রডারিক এ যুদ্ধে নিহত হয় (মতান্তরে পালিয়ে যায়)।
বিজয়ের ফলাফল
এ বিজয়ের মধ্য দিয়ে আন্দালুসের মাটি থেকে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে এবং ইসলামি সভ্যতা ও উন্নতির দুয়ার খুলে যায়। মুসলমানদের হাতে বিপুল পরিমাণ গনিমত আসে। ১২ হাজার সেনার মধ্যে ৩ হাজার মুজাহিদ শাহাদাত বরণ করেন। পরবর্তী এক বছরের মধ্যেই পুরো আইবেরিয়া উপদ্বীপ মুসলমানদের দখলে চলে আসে।
দশম শতাব্দীর মধ্যেই আল-আন্দালুস পরিণত হলো ইউরোপ, আফ্রিকা আর মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে সফল রাষ্ট্র হিসেবে। জ্ঞান-বিজ্ঞানে তারা সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। জিম্মা ব্যবস্থার কারণে অমুসলিমরাও সেখানে পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করত। তবে পরবর্তীতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর খ্রিস্টানদের ক্রমাগত আক্রমণের মুখে ১৪৯২ সালে গ্রানাডার পতনের মাধ্যমে আন্দালুসে মুসলিম শাসনের সমাপ্তি ঘটে।
টিকাঃ
[১] তারিক বিন জিয়াদ (৬৭০-৭২০ খ্রি.)। স্পেনে মুসলিম বিজয়ের মহানায়ক। জিব্রাল্টার (জাবাল আত-তারিক) পাহাড়টি তাঁর নামেই পরিচিত।
📄 ট্রিলসের যুদ্ধ
বালাত আশ-শুহাদা যুদ্ধ বা বাওয়াতিহ যুদ্ধ নামে পরিচিত এ যুদ্ধটি সংঘটিত হয় মুসলমান এবং ইউরোপিয়ানদের মধ্যে। ১১৪ হিজরি (৭৩২ খ্রি.) সনে সংঘটিত এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর সেনাপ্রধান ছিলেন হযরত আবদুর রহমান আল-গাফেকি এবং ইউরোপীয় বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল চার্লস মার্টেল (Charles Martel)। এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর পরাজয় ঘটে এবং সেনাপতি গাফেকি শহিদ হন।
৭৩০ খ্রিস্টাব্দে আবদুর রহমান আল-গাফেকি আন্দালুসের শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। তিনি ফরাসিদের অপতৎপরতা রুখতে এবং পূর্বের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে প্রায় ৫০ হাজার সৈন্য নিয়ে ফ্রান্সে প্রবেশ করেন। একের পর এক শহর জয় করে তিনি টুর শহরের কাছাকাছি পৌঁছান। পলায়নরত ডিউক ওদোর আহ্বানে সাড়া দিয়ে চার্লস মার্টেল এক বিশাল ইউরোপীয় বাহিনী নিয়ে মুসলমানদের গতিরোধ করতে এগিয়ে আসে।
১১৪ হিজরির শাবান মাসে বাওয়াতিহ ও টুর নগরীর মাঝামাঝি এক সমতল ভূমিতে (যা আরবিতে বিলাত নামে পরিচিত) যুদ্ধ শুরু হয়। টানা দশ দিন লড়াই চলে। যুদ্ধের দশম দিনে যখন মুসলমানরা বিজয়ের সন্নিকটে, তখন খ্রিস্টানরা কৌশলে মুসলমানদের গনিমতের মাল রাখা শিবিরের ওপর আক্রমণ করে। গনিমত রক্ষার তাড়নায় মুসলিম বাহিনীর একাংশ ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। সেনাপতি আবদুর রহমান আল-গাফেকি সেনাদের শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করার সময় তিরের আঘাতে শহিদ হন। সেনাপতির মৃত্যুতে মুসলমানরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং রাতের আঁধারে ময়দান ত্যাগ করে পিছু হটে।
পরাজয়ের কারণ ও ফলাফল
১. ইস্তাম্বুল বা দামেশক থেকে বিশাল ভৌগোলিক দূরত্ব।
২. গনিমতের সম্পদের প্রতি অতি মোহ, যা মুসলিম বাহিনীর শৃঙ্খলায় ফাটল ধরায়। কুরআনের আয়াত ও হাদিসে এ ধরনের পার্থিব প্রবঞ্চনার ব্যাপারে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল।
টুরসের যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে ইউরোপের অভ্যন্তরে মুসলমানদের সামরিক অগ্রযাত্রা থমকে যায়। ইউরোপীয় ঐতিহাসিকরা একে খ্রিস্টধর্মের রক্ষা হিসেবে দেখলেও অনেক নিরপেক্ষ গবেষক মনে করেন, এ পরাজয় ইউরোপকে ইসলামি সভ্যতা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকবর্তিকা থেকে বঞ্চিত করেছে।
টিকাঃ
[১] সুরা ফাতির: আয়াত-০৫
[১] বুখারি: হাদিস নং-৬০৬১, মুসলিম: হাদিস নং-২৯৬১— রাসূল (সা.) বলেছেন: 'আমি তোমাদের জন্য দারিদ্র্য নয়, বরং দুনিয়ার প্রাচুর্য ও তা নিয়ে প্রতিযোগিতার আশঙ্কা করি।'
[২] সুরা ফাতির: আয়াত-৪৩