📘 ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ নববী যুগ থেকে বর্তমান 📄 কাদিসিয়ার যুদ্ধ

📄 কাদিসিয়ার যুদ্ধ


কাদিসিয়ার যুদ্ধ BATTLE OF AL-QADISIYYAH
তারিখ: ১৫তম হিজরি / ৬৩৫ খ্রি.
স্থান: কাদেসিয়া, ইরাক
ফলাফল: মুসলিম বাহিনীর বিজয়
পক্ষ-বিপক্ষ: খিলাফতে রাশিদা বনাম পারস্যের সাসানি সাম্রাজ্য
সেনাপ্রধান: সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস বনাম রুস্তম ফররুখজাদ
সেনাসংখ্যা: ৩৬ হাজার বনাম ১ লক্ষ ২০ হাজার সেনা, ৭০টি রণহস্তি
ক্ষয়ক্ষতি: ৬ হাজার শহিদ বনাম ৬০ হাজার নিহত

১৫ হিজরি মোতাবেক ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দ সনে ইরাকের কাদিসিয়াতে এ যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। সাহাবি হযরত সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাসের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীর বিজয়ের মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক এ যুদ্ধ সমাপ্ত হয়।

কেন যুদ্ধের পথে পা বাড়ানো
পারস্য সম্রাট ইয়াজদাজারদ মুসলমানদের বিরুদ্ধে এক বিশাল বাহিনী গঠন করছিলেন। খলিফা উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাসকে সেনাপতি নিযুক্ত করে ৩৬ হাজার সেনাসহ ইরাকে পাঠান। সেনাদলে বহু বিশিষ্ট সাহাবি এবং বদরি সাহাবিরা ছিলেন। ওদিকে রুস্তমের নেতৃত্বে পারস্য বাহিনী সত্তরটি হাতি নিয়ে কাদিসিয়াতে এসে পৌঁছল।

পত্র বিনিময়
যুদ্ধের পূর্বে খলিফা উমর ও সেনাপতি সাদের মাঝে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পত্র বিনিময় হয়। খলিফা তাকে সর্বদা তাকওয়া এবং নববী আদর্শ অনুসরণ করার নসিহত করেন। সেনাপতি সাদ প্রথমে পারস্য বাহিনীর প্রতি ইসলামের দাওয়াত দেন।

রুস্তমের সাথে কথোপকথন
সেনাপতি সাদ একদল সাহাবিকে রুস্তমের কাছে পাঠান। সাহাবি হযরত রিবয়ি ইবনু হিরাশ রুস্তমের জমকালো তাঁবুতে সাদাসিধে পোশাকে প্রবেশ করে ইসলামের দাওয়াত দেন। তিনি বলেন: 'আল্লাহ আমাদের পাঠিয়েছেন যেন আমরা মানুষকে মানুষের গোলামি থেকে আল্লাহর গোলামির দিকে বের করে নিয়ে আসি।' রুস্তম এই সাহাবীদের ব্যক্তিত্ব ও আত্মমর্যাদা দেখে বেশ প্রভাবিত হয়।

কিতাল
যুদ্ধ শুরু হলো। প্রথম দিনে পারস্যের হাতিগুলো মুসলমানদের বিপদে ফেলে দেয়। কিন্তু সাহাবিদের বীরত্বে সেই আক্রমণ প্রতিহত করা হয়। দ্বিতীয় দিনে (আগওয়াস) শাম থেকে আসা নতুন মুসলিম সেনারা যোগ দিলে মোড় ঘুরে যায়। তৃতীয় দিনে (আমওয়াস) মুসলমানরা কৌশল খাটিয়ে বড় হাতিগুলোকে অন্ধ এবং আহত করে দেয়, ফলে হাতিগুলো ময়দান ছেড়ে পালায়।

বিজয়
যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এক প্রচণ্ড ঝড় শুরু হয় যা পারস্য বাহিনীকে লণ্ডভণ্ড করে দেয়। হিলাল ইবনু উলফা পারস্য সেনাপতি রুস্তমকে খুঁজে বের করেন এবং তাকে হত্যা করেন। রুস্তমের মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে পারস্য সেনাদল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এই ঐতিহাসিক বিজয়ের ফলে পারস্যের দাপট চূর্ণ হয়ে যায় এবং মুসলমানদের জন্য পুরো পারস্য বিজয়ের দ্বার খুলে যায়। এ যুদ্ধে মুসলমানদের প্রায় আড়াই হাজার সেনা শহিদ হন এবং পারসিকদের বহু হাজার সেনা নিহত হয়।

টিকাঃ
[১] সুরা আম্বিয়া: আয়াত-১০৫

📘 ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ নববী যুগ থেকে বর্তমান 📄 দামেশক বিজয়

📄 দামেশক বিজয়


দামেশক বিজয় SIEGE OF DAMASCUS
১৫ হিজরির রজব মাসে ইয়ারমুকের যুদ্ধে বিজয়ের পর সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ এবং ইবরাহিম পাশার নির্দেশনায় দামেশক বিজয়ের পথ সুগম হয়।

অবরোধের সূচনা
খলিফা উমরের নির্দেশে সেনাপতি আবু উবাইদা দামেশকে পৌঁছে শহরটি অবরোধ করেন। তিনি বাহিনীকে শহরের বিভিন্ন ফটকে বণ্টন করে দেন। উসমানীয় সেনারা দীর্ঘ সত্তর দিন দামেশক অবরোধ করে রাখে। বাইরের সব রকম সাহায্য আসার পথ মুসলমানরা বন্ধ করে দিলেন।

হেরাক্লিয়াসের সেনা সাহায্য এবং মুসলমানদের জয়
বাইজান্টাইন সম্রাট হেরাক্লিয়াস দামেশকবাসীকে বাঁচাতে বিশাল বাহিনী পাঠালেও পথে মুসলিম সেনারা তাদের পরাজিত করে। এই বিজয় অবরোধে থাকা মুসলমানদের মনোবল বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। হেরাক্লিয়াস পরে আরও কোনো কার্যকর সাহায্য পাঠাতে পারেননি।

মুসলমানদের উপর থমাসের আক্রমণ
দামেশকের প্রধান সেনাপতি থমাস অবরোধ ভাঙ্গার জন্য মুসলমানদের ওপর অতর্কিত হামলা চালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু মুসলিম সেনাদের সতর্কতায় সে আক্রমণ ব্যর্থ হয় এবং থমাস নিজে আহত হয়ে দুর্গে ফিরে যায়।

খালিদ: না ঘুমায়, না ঘুমোতে দেয়
সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ পূর্ব ফটকে অতন্দ্র প্রহরীর মতো ছিলেন। তিনি সংবাদ পেলেন যে শহরের ভেতরে বিশপরা এক উৎসবে মত্ত এবং প্রহরীরা উদাসীন। খালিদ দড়ির সিঁড়ি বানিয়ে প্রাচীর বেয়ে উপরে উঠলেন এবং ফটকের দরোজা খুলে দিলেন। তাঁর 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনিতে পুরো শহর কেঁপে উঠল। বাইজান্টাইন সেনারা দিশেহারা হয়ে পড়ল এবং দ্রুত আত্মসমর্পণ করল।

১৫ হিজরির ১৬ই রজব দামেশক মুসলমানদের অধিকারে আসে। আবু উবাইদা শহরবাসীকে নিরাপত্তা প্রদানের ঘোষণা দেন এবং দামেশক ইসলামি খিলাফতের একটি সমৃদ্ধ নগরে পরিণত হয়।

📘 ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ নববী যুগ থেকে বর্তমান 📄 ইয়ারমুকের যুদ্ধ

📄 ইয়ারমুকের যুদ্ধ


ইয়ারমুকের যুদ্ধ BATTLE OF YARMOUK
তারিখ: ১৫ হিজরি / ৬৩৬ খ্রি.
স্থান: জর্ডানের উত্তরে, ইয়ারমুক নদীর অববাহিকায়
ফলাফল: মুসলিম বাহিনীর বিজয়
পক্ষ-বিপক্ষ: খিলাফতে রাশিদা বনাম বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য
সেনাপ্রধান: খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ, আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ বনাম মাহান
সেনাসংখ্যা: ৩৬ হাজার বনাম ২ লক্ষ ৫০ হাজার
ক্ষয়ক্ষতি: ৪ হাজার শহিদ বনাম ৭০ হাজার থেকে ১ লক্ষ নিহত

এটি বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ যা জাযিরাতুল আরবের বাইরে ইসলামের অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করে।

পূর্বকথা
খলিফা উমর সেনাপ্রধান হিসেবে আবু উবাইদাকে নিযুক্ত করলেও যুদ্ধের ময়দানে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্ব বজায় থাকে। বাইজান্টাইন সম্রাট হেরাক্লিয়াস উসমানীয়দের থামাতে দুই লক্ষ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী গঠন করেন। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ তাঁর রণকৌশলে সকল মুসলিম বাহিনীকে ইয়ারমুকে একত্র করেন।

যুদ্ধের ময়দান ও মুসলিম বাহিনী
খালিদ তাঁর বাহিনীকে ৩৬টি ব্যাটেলিয়নে বিভক্ত করেন। অশ্বারোহী এবং পদাতিকদের সমন্বয়ে এক সুসংহত প্রতিরক্ষা গড়ে তোলেন। অন্যদিকে বাইজান্টাইন বাহিনী তাদের বিশাল সংখ্যা নিয়ে দাম্ভিক ছিল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে মাহান খালিদকে ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব দিলে খালিদ তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন।

যুদ্ধের ঘটনাবলি
ছয় দিন ধরে অবিরাম যুদ্ধ চলে। প্রথম চারদিন উভয় পক্ষই তীব্র লড়াই করে। বাইজান্টাইনদের তিরন্দাজ বাহিনী মুসলমানদের অনেক ক্ষয়ক্ষতি করে। এ সময় ইকরামা ইবনু আবি জাহল তাঁর সাথীদের নিয়ে মরণপণ লড়াই করে শাহাদাত বরণ করেন।

ষষ্ঠ দিনে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ আক্রমণাত্মক রণকৌশল গ্রহণ করেন। তিনি তাঁর বিশেষ অশ্বারোহী বাহিনী দিয়ে বাইজান্টাইন অশ্বারোহীদের মূল পদাতিক বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। এরপর তিন দিক থেকে আক্রমণ চালিয়ে বাইজান্টাইনদের প্রতিরক্ষা ভেঙে ফেলেন।

বিজয়
পরাজিত বাইজান্টাইন বাহিনী পালাতে গিয়ে নদীর গভীর খালে পড়ে প্রাণ হারায়। মাহানসহ বাইজান্টাইনদের অধিকাংশ সৈন্য নিহত হয়। এ যুদ্ধের ফলে সিরিয়া ও শামের ওপর বাইজান্টাইন আধিপত্য চিরতরে শেষ হয়ে যায়। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের বিচক্ষণ নেতৃত্বে ৩৬ হাজার মুসলিম সেনা ২ লক্ষাধিক শত্রুবাহিনীকে পরাজিত করে এক অভাবনীয় বিজয় ছিনিয়ে আনে।

টিকাঃ
[১] কভ্যুলরি বা অশ্বারোহী বাহিনী।
[১] যুদ্ধক্ষেত্রটি বর্তমানে গোলান মালভূমির দক্ষিণপূর্বে সিরিয়ার হাওরান অঞ্চলে অবস্থিত।
[১] ক্যভুলরি রিজার্ভ বা তুলাইয়া মুতাহারিক্কাহ।

📘 ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ নববী যুগ থেকে বর্তমান 📄 নাহাওয়াмদ যুদ্ধ

📄 নাহাওয়াмদ যুদ্ধ


নাহাওয়ান্দ যুদ্ধ BATTLE OF NAHAVAND
তারিখ: ২০ হিজরি / ৬৪১ খ্রি.
স্থান: ইরানের নাহাওয়ান্দ শহর
ফলাফল: মুসলিম বাহিনীর বিজয়
পক্ষ-বিপক্ষ: খিলাফতে রাশিদা বনাম পারস্যের সাসানি সাম্রাজ্য
সেনাপ্রধান: নুমান ইবনুল মুকরিন বনাম ফিরজান
সেনাসংখ্যা: ৩০ হাজার বনাম ১ লক্ষ ৫০ হাজার
ক্ষয়ক্ষতি: সেনাপতি নুমানসহ বহু শহিদ বনাম ১ লক্ষ নিহত

পারস্যের সাথে চূড়ান্ত ফায়সালাকারী এ যুদ্ধটি ২০ হিজরিতে সংঘটিত হয়। এ জয়ের মাধ্যমেই ইরানে ৪১৬ বছরের সাসানি সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে।

যুদ্ধের প্রাককথা
কাদিসিয়ার পরাজয়ের পর পারস্য সম্রাট ইয়াজদাজারদ পুনরায় দেড় লক্ষ সৈন্য সংগ্রহ করে নাহাওয়ান্দে জমায়েত করে। খলিফা উমর (রা.) সাহাবীদের পরামর্শে নুমান ইবনুল মুকরিনকে সেনাপতি নিযুক্ত করে পাঠান। পারস্য বাহিনী মুসলমানদের জন্য পথে লোহার পেরেক ছিটিয়ে রেখেছিল, কিন্তু মুসলিম গোয়েন্দারা তা ধরে ফেলেন।

হযরত মুগিরা: মুসলিম বাহিনীর দূত
যুদ্ধের আগে হযরত মুগিরা ইবনু শুবা পারস্য শিবিরে দূত হিসেবে যান। পারস্য সেনাপতি পিন্দার দাম্ভিকতা দেখালে মুগিরা বীরত্বের সাথে তার জবাব দেন এবং ইসলাম ও কুফরের পার্থক্য বুঝিয়ে দেন।

যুদ্ধের ময়দানে
যুদ্ধ শুরু হলে পারস্য বাহিনী কেল্লার ভেতর থেকে বের হতে চাচ্ছিল না। তখন এক কৌশলে মুসলমানদের পলায়নের ভান করে তাদের সমতলে টেনে আনা হয়। সুলতান নুমান সূর্য হেলে যাওয়ার পর আল্লাহর নামে চূড়ান্ত আক্রমণের নির্দেশ দেন। যুদ্ধে সেনাপতি নুমান ইবনু মুকরিন মারাত্মক আহত হন এবং পরবর্তীতে শাহাদাত বরণ করেন।

বিজয়
পরাজিত পারস্য বাহিনী রাতের অন্ধকারে সরু উপত্যকায় পালাতে গিয়ে গণহারে প্রাণ হারায়। এ যুদ্ধে প্রায় এক লক্ষ পারসিক সেনা নিহত হয়। সেনাপতি নুমানের শাহাদাতের পর হযরত হুযাইফা দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং নাহাওয়ান্দ শহর বিজয় করেন। বিজয়ের সুসংবাদ শুনে খলিফা উমর আনন্দিত হন।

টিকাঃ
[১] সুরা আম্বিয়া: আয়াত-১০৫

ফন্ট সাইজ
15px
17px