📘 ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ নববী যুগ থেকে বর্তমান 📄 ওয়ালাজার যুদ্ধ

📄 ওয়ালাজার যুদ্ধ


ওয়ালাজার যুদ্ধ BATTLE OF WALAJA
তারিখ: ১২তম হিজরি / ৬৩৩ খ্রি.
স্থান: ইরাক (ফুরাত নদীর তীরে)
ফলাফল: মুসলিম বাহিনীর গৌরবান্বিত বিজয়
পক্ষ-বিপক্ষ: খিলাফতে রাশিদা (মুসলমানরা) বনাম পারস্যের সাসানি সাম্রাজ্য এবং আরব খ্রিস্টান
সেনাপ্রধান: খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ বনাম আন্দুযগার
সেনাসংখ্যা: ১৫ হাজার বনাম ২৫/৩০ হাজার
ক্ষয়ক্ষতি: প্রায় ২ হাজার শহিদ বনাম ২০ হাজারের বেশি নিহত

ঐতিহাসিক মেসোপটেমিয়ায় ১২ হিজরি (৬৩৩ খ্রি.) সনে সংঘটিত হয় ওয়ালাজার যুদ্ধ। সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বে খুলাফায়ে রাশিদিনের বাহিনীর বিপক্ষে এ যুদ্ধে মোকাবেলা করে পারস্য (ইরান) সম্রাট এবং তার আরবীয় খ্রিস্টান মিত্ররা। মুসলমানদের দ্বিগুণ সেনাসমৃদ্ধ এ জোটবাহিনীর বিরুদ্ধে চৌকস সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ মর্যাদার বিজয় তুলে আনেন। সংখ্যাধিক্যে শত্রুদল এগিয়ে থাকলেও পূর্ববর্তী যুদ্ধগুলোর মতো এ যুদ্ধেও খালিদ 'লয় ও ক্ষয়ের যুদ্ধ' বা War of Attrition-এর সাঁড়াশি নীতি অবলম্বন করেন।

পারস্য বাহিনী
উল্লাইসের যুদ্ধে (Battle of Ullais) থাকতেই পারস্যের তৎকালীন সম্রাট তৃতীয় আরদাশির (Ardashir III) আরও দুটি নতুন বাহিনী গঠনের নির্দেশ পাঠায়। তার নির্দেশ পেয়ে সম্রাটের শহরে শুরু হয় নতুন সেনাবাহিনী তৈরির কাজ। রোমান সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমাঘেঁষা পারস্য বা ইরানের পশ্চিম দিকের সীমান্ত পাহারায় থাকা সেনারা ব্যতীত সে অঞ্চলের সবগুলো শহর ও দুর্গ থেকে সেনারা দলে দলে কেন্দ্রীয় শহরের দিকে আসতে থাকে। অল্প কয়েকদিনের ব্যবধানে প্রথম বাহিনী সংগঠিত হয়ে যায়। এবার সাম্রাজ্যের দক্ষ সমরবিদেরা পরামর্শ করে স্থির করে, মুসলিম বাহিনী অচিরেই ফোরাতের পাড় ঘেঁষে ইরাকের উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়ে আসবে। কারণ, তারা জানত, নিকট ইতিহাসে আরব সেনাদেরকে মরু এলাকা থেকে দূরে সরে আসতে দেখা যায়নি; কেননা তারা যুদ্ধে পরাজয়ের শঙ্কা টের পেলে মরু অঞ্চলকে পেছনে ফিরে যাবার জন্য ব্যবহার করে থাকে। পশ্চিম দিকটাকে মুসলমানদের আগমনের সম্ভাব্য দিক নির্বাচন করে সম্রাট তৃতীয় আরদাশির 'ওয়ালাজা' নামক জায়গাটিকে ধরে নেন যে, এখানেই খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের বাহিনীর গতিরোধ করে তাদেরকে চিরতরে কবরস্থ করা সম্ভব।

পারসিকদের প্রথম বাহিনী ততক্ষণে টেসিফুন (Ctesiphon) নামক স্থানে চলে এসেছে। খোরাসানের গভর্নরের নেতৃত্বে এ বাহিনী ধীরেধীরে ওয়ালাজার দিকে এগোতে থাকে, যেখানে কিছুক্ষণের মধ্যেই দ্বিতীয় বাহিনী তাদের সাথে মিলিত হবে। সে-মতে প্রথম বাহিনী টেসিফুন থেকে বের হয়ে দজলার পূর্ব পাড় ঘেঁষে কাসকার এলাকা দিয়ে নদী পার হয়ে যায়। এরপর পশ্চিম-দক্ষিণ দিক হয়ে তারা ফোরাতের দিকে এগিয়ে যায়। ওয়ালাজার কাছাকাছি এসে গেলে তারা ফোরাত পার হয়ে ওয়ালাজায় সেনা তাঁবু স্থাপন করে যাত্রা ক্ষান্ত দেয়।

মুসলিম বাহিনী
উল্লাইসের যুদ্ধে বিজয় মুসলমানদের জন্য ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য ক্ষয়ক্ষতি সয়ে সে-যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী পারস্যের বিশাল সেনাদলকে পরাজিত করে। সাথে হাসিল করে নেয় বিপুল পরিমাণ গনিমতের সম্পদ। এতে সেদিন থেকে পারসিকদের বহু সম্পদের উৎস মুসলমানদের হস্তগত হয়ে যায়। অথচ ততদিনে তারা কেবল ভিন্ন দুটি যুদ্ধে দুটি আলাদা বাহিনীর মোকাবেলা করেছে। এমনকি সে যুদ্ধগুলোর ভূমিও নির্ধারণ করেছে মুসলমানরা। তবে পারস্যের ছোট ছোট সহায়ক বাহিনী (Backup Force) তাদের সে ধারা নষ্ট করেছে। আমরা পূর্বেও বলেছি, পারসিকরা একই সময়ে একাধিক সেনাবাহিনী প্রস্তুত করতে পারত।

খালিদ তাঁর তদন্ত টিমকে নির্দিষ্ট কাজে নিয়োজিত রেখেছিলেন, যারা তাকে ক্ষণে ক্ষণে পারস্য বাহিনীর অবস্থান ও গতি-প্রকৃতি তাকে জানিয়ে দিচ্ছিল। খালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর এ বিশেষ টিম ছিল আরবের এমন সব অঞ্চলের লোকজন, যা ছিল পারসিকদের আঁতুড়ঘর। তাই এরা পারস্যের নতুন বাহিনী গঠন, ওয়ালাজায় তাদের অবস্থান গ্রহণ এবং তাদের বিপুল যুদ্ধপ্রস্তুতির কথা সহজেই খালিদের কাছে পৌঁছে দেয়। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু 'আল-হিরা' (Al-Hirah) অঞ্চল অধিকার করতে পূর্ব থেকেই ছিলেন বদ্ধপরিকর। ওয়ালাজা এলাকাটি 'আল-হিরা'র পথেই ছিল; তাই সাথে থাকা পনেরো হাজার সেনার বাহিনী নিয়ে খালিদ মূলত রওনা করেন আল-হিরা শহরকে টার্গেট করে। জলাভূমি পার হয়ে তিনি দ্রুত তাঁর বাহিনী এগিয়ে নিচ্ছিলেন। বাহামানের কল্পনার কয়েক দিন আগেই পূর্ব দিকে মুসলিম বাহিনীর উদয় ঘটল; ওয়ালাজার সামান্য দূরত্বে এসে তারা সেনাদের জন্য তাঁবু খাটাল।

খালিদের সুদক্ষ রণকৌশল
ওয়ালাজায় পারস্য বাহিনীর কিরাাট সংখ্যক সাসানি সেনা ছিল পূর্বের যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা। এরা এখানে এসে পুনরায় অস্ত্র হাতে তুলেছে। যাতুস সালাসিল যুদ্ধ থেকে বেঁচে আসা সেনারা যুক্ত হয়েছিল কারিনের সাথে, এরপর তারা উল্লাইসের যুদ্ধে মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়েছে। আবার সেখানে যারা পরাজিত হয়ে পলায়ন করেছিল, তাদেরকে এখন দেখা যাচ্ছে খোরাসানের শাসকের সাথে একজোট হয়ে ওয়ালাজায় এসে জড়ো হয়েছে।

অবস্থাদৃষ্টে মুসলমানরা দুটি কৌশলগত পরিকল্পনা করে। একটি সামগ্রিক, আরেকটি তুলনামূলক আংশিক এবং আনুষঙ্গিক।
এক: সামগ্রিক পরিকল্পনা
পারস্যের দুই বাহিনী অচিরেই একত্র হয়ে মুসলমানদের প্রতিরোধ করার সম্ভাবনা ছিল। এ আশংকার সমাধানে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ চিন্তা করেন, উপস্থিত প্রতিপক্ষের উপর দ্রুত হামলে পড়বেন এবং বাহামানের নেতৃত্বে দ্বিতীয় বাহিনী ময়দানে এসে পৌঁছার আগেই খোরাসানের শাসকের অধীনে ময়দানে হাজির প্রথম এ বাহিনীর ফায়সালা চূড়ান্ত করবেন। এরপর দ্বিতীয় বাহিনী এলে আলাদা করে তাদের মোকাবেলা করা যাবে।
দুই: আনুষঙ্গিক পরিকল্পনা
যুদ্ধের ময়দান থেকে শত্রুপক্ষের একজন সেনাকেও পালাতে দেয়া হবে না, যাতে তারা নতুন করে কাতারবদ্ধ হয়ে পুনরায় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে না পারে, যেমনটা এ-যাবৎ তারা করে এসেছে। এ-জন্য সেনাপতি খালিদ ভাবলেন, পারস্য সেনাদের সবদিক থেকে ঘিরে ফেলবেন, পেছন দিক থেকে আক্রমণ করবেন এবং সেখানে তাদেরকে নিঃশেষ করে ফেলবেন। বস্তুত খালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর এবারের পরিকল্পনাও ছিল অনেকটা সাঁড়াশি চিন্তা-উদ্ভূত।

এদিকে তিনি সুওয়াইদ ইবনু মুকরিনকে আদেশ করলেন, কিছু দায়িত্বশীল লোক নিয়ে বিজিত অঞ্চলগুলোর প্রশাসনের দিকে নজর রাখতে। আরেকদল সাহসী জানবাজদের ছড়িয়ে দিলেন দজলা নদীর আশপাশে, যাতে তারা শত্রুপক্ষের দ্বিতীয় প্লাটুনকে নদী পার হয়ে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে মুসলিম বাহিনীর উপর হামলে পড়া থেকে বাধা দেয়। পাশাপাশি সেদিক থেকে শত্রুসেনাদের ব্যাপারে যে-কোনো ধরনের সতর্ক বার্তা যেন সরাসরি মূল বাহিনীতে পৌঁছে দেয়।

যুদ্ধের ভূমি
পারস্য বাহিনীর সাথে মুসলমানদের এবারের যুদ্ধের ভূমি ছিল প্রায় দুই মাইল দীর্ঘ দিগন্তবিস্তৃত সমতল জমিন। যার দুপাশ স্বাভাবিক ভূমি থেকে প্রায় তিরিশ কদম উঁচু। এ সমতল ভূমির উত্তর-পূর্ব পাশ ঢুকে গেছে উত্তপ্ত মরু অঞ্চলে; এই উত্তর-পূর্ব দিকের অনতিদূরেই বয়ে গেছে 'খাসেফ' নামে ফোরাতের একটি উপনদী।

যুদ্ধের ক্ষণ
প্রথম বাহিনীর সেনাপতি খোরাসানের শাসক সাহায্যের ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত ছিল। তাই সে তার বাহিনীকে নদীর পাড় থেকে মাইল খানেক ভেতরে নিয়ে যাওয়ায় কোনো অসুবিধা বোধ করেনি। তখন হিজরি ১২তম বর্ষ (মে, ৬৩৩ খ্রি.)। চূড়ান্ত যুদ্ধের জন্য উভয় বাহিনী তাদের বিন্যাস সেরে নিয়েছে। প্রত্যেক বাহিনীর রয়েছে একটি কেন্দ্রীয় ভাগ ও কিছু শাখা অংশ। মুসলমানদের শাখা অংশগুলোর নেতৃত্বে ছিলেন আসেম ইবনু আমর আর আসি ইবনু হাতিম। ওদিকে পারস্যের বাহিনী সমতল ভূমির মাঝামাঝি এসে গেছে। তারা ছিল পূর্ব এবং পূর্ব-দক্ষিণমুখী। খালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু উনার বাহিনীকে দাঁড় করিয়েছেন পারস্য সেনাদের মুখোমুখি করে পূর্ব-উত্তরের টিলাগুলোর সামনে এবং অনেকটা ময়দানের ঠিক মাঝামাঝি অংশে। এ-যুদ্ধে মুসলিম সেনাদের অধিকাংশই ছিলেন মেষপালক, অশ্বারোহণে অভিজ্ঞ ছিলেন হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন।

পারস্যের অপেক্ষারত বাহিনী ভেবেছিল, খালিদের বাহিনী না-জানি কত বড় ও বিশাল হবে। ওয়ালাজার যুদ্ধের আগের রাতে সেনাপতি খালিদ বিশর ইবনু আবি রাহাম এবং সাঈদ ইবনু মারাকে দুই হাজার সেনার দুটি ছোট বাহিনীর নেতা বানিয়ে প্রেরণ করেন। তাদেরকে তিনি নিম্নোক্ত নির্দেশনা দেন:
১. প্রত্যেকে মধ্যরাতের দিকে সকলে ঘুমিয়ে গেলে তার অশ্বারোহী সেনাদের নিয়ে পারস্যের অশ্বারোহী শিবিরের দক্ষিণ দিকে দ্রুত বের হয়ে যাবে।
২. শত্রুদের অশ্বারোহী শিবিরের পেছনের সারিবদ্ধ টিলাগুলোর অপরপাশে পৌঁছে গেলে তোমরা তোমাদের সেনাদের লুকিয়ে ফেলবে।
৩. ভোরবেলা যখন যুদ্ধ শুরু হবে, তোমাদের এ দুটি দলের সেনারা তখন টিলার পেছনে লুকিয়ে থাকবে।
৪. আমি ইশারা দিতেই পেছন থেকে পারস্যের বাহিনীর উপর তোমরা হামলে পড়বে।

সেনাপতি খালিদ এ-নির্দেশনা ও দায়িত্ব তাদেরই দিয়েছিলেন, যারা তাঁর পরিকল্পনা সুষ্ঠুরূপে বুঝতে ও আঞ্জাম দিতে পারবে। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ তাঁর অবশিষ্ট ১৪ হাজার সেনাকে পারসিক সাসানি বাহিনীর সামনে দাঁড়াকালেন। ওদিকে প্রতিপক্ষ সেনাদের নিয়ে তাদের সেনাপতির পরিকল্পনা ছিল প্রতিরোধমূলক। তারা মুসলমানদেরকে প্রথমে আক্রমণ করার সুযোগ দিচ্ছিল এবং নিজেরা পণ করেছিল তাদেরকে ঠেকিয়ে দেয়ার।

ময়দানে যুদ্ধের প্রথম সূচনাটা প্রতিপক্ষের সেনাপতির পরিকল্পনা মতোই হলো। খালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু তার বাহিনীকে ব্যাপকভাবে শত্রুদের উপর হামলা করার নির্দেশ দিলেন। পারস্য সেনাদের কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ছিল, সেনাদলের সাহসী পুরুষেরা সেগুলো পরিকল্পনামতো বাস্তবায়নের চেষ্টা করল। এরই মধ্যে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ পারস্যের প্রসিদ্ধ বীর যোদ্ধার সাথে—যাকে হাজারমর্দ নামে ডাকা হতো—মুখোমুখি যুদ্ধ করলেন এবং তাকে মেরে ফেললেন। এতে মুসলমানদের ভেতর প্রাথমিক মনস্তাত্ত্বিক বিজয় খেলে গেল।

প্রথম ভাগের যুদ্ধ ততক্ষণে শেষ। দ্বিতীয় ভাগের যুদ্ধ শুরু হলো পারস্য বাহিনীর পাল্টা আক্রমণ দিয়ে। প্রতিপক্ষের সেনাপতি এ-সময় মুসলিম বাহিনীতে কিছুটা ক্লান্তির ছাপ দেখতে পেল। তাই সে ভাবল, এটাই মুসলিম বাহিনীকে সমূলে উৎখাতের জন্য পারসিক সেনাদের চূড়ান্ত আক্রমণের উপযুক্ত সময়। এই ভেবে সে ভারী অস্ত্রধারী মূল অশ্বারোহীদের বাহিনীর সামনের দিকে নিয়ে আসল মুসলমানদের মেরে ফেলার জন্য। মুসলমানরা কিছু সময় তাদের মোকাবেলা করল, কিন্তু প্রতিপক্ষের অশ্বারোহীরা যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করছিল, তাই মুসলমানরা অস্পষ্টভাবে খানিকটা পিছু হটতে লাগল।

পরিশেষে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর মূল পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে টিলার পেছনে লুকিয়ে থাকা সেনাদের বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত দিলেন। পারস্য বাহিনীর তাঁবুদের পেছন থেকে তারা বের হয়ে এলে তাদের যোদ্ধারা দুভাগ হয়ে গেল। একদল পেছনের ডান দিক সামাল দিতে চলে গেল, আরেকদল বাম দিক মোকাবেলা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু এরপরও পারস্য অশ্বারোহীদের ভারী অস্ত্রগুলো মুসলমান অশ্বারোহীদের হালকা ও সামান্য অস্ত্রের মোকাবেলায় পেরে উঠছিল না। এভাবে পারসিক অশ্বারোহীরা হেরে গেলে ছোট ছোট দলবদ্ধ হামলা করে তাদেরকে সংকুচিত করে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরা হলো। এরপর খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বে থাকা মুসলিম বাহিনীর মূল অংশ পারসিক বাহিনীর সম্মুখভাগে আক্রমণ করল। এরই মধ্যে পরিকল্পনামতো অশ্বারোহীদের দুই টিম তাদেরকে পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে ফেলেছে। ফলে পারস্য বাহিনী এমন জালে আটকে গেল, যা থেকে পালাবার আর কোনো উপায় রইল না। চারদিক থেকে ধারাবাহিক আক্রমণ হওয়ায় পারস্যের সেনারা এমন এক বৃত্তে আটকে গেল, যেখান থেকে তারা স্বাধীনভাবে না হাতিয়ার উঠাতে পারছিল— না পারছিল আক্রমণকারীদের প্রতিরোধ করতে।

যুদ্ধ তখন শেষ। পারস্যের বাহিনীর লজ্জাজনক পরাজয় হয়েছে। সাকুল্যে মাত্র কয়েক হাজার সেনা পালাতে পেরেছে, তাদের মধ্যে আছে খোদ সেনাপতিও। কিন্তু ফোরাতের দিকে কোনো পথ না পেয়ে তারা দৌড়ে গেছে মরুভূমির উত্তপ্ত বালুর দিকে। পরে সেখানে বাহিনীর সেনাপতিসহ অনেকে পিপাসায় কাতর হয়ে ক্লান্তি ও কষ্টে মৃত্যুর কোলে ঢলে গেছে।

wars-এর পরকথা
যুদ্ধ থেমে গেলে মুসলিম সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর সেনাদের একত্র করলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, আজকের যুদ্ধ পারস্য শক্তির জন্য প্রচণ্ড ভীতি ও চাপ সৃষ্টি করবে। যদিও মুসলমানরা পারসিক বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করতে পেরেছে, কিন্তু তারপরও—ওয়ালাজার এ-যুদ্ধ ইরাকের মাটিতে মুসলমানদের জন্য সবচে দীর্ঘ এবং ঘোরতর যুদ্ধ ছিল; আর এ-জন্য যুদ্ধকালের পুরোটা সময়জুড়ে সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ যে-কোনো মূল্যে মুসলমানদের মনস্তত্ত্ব উঁচু রাখতে নানাভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন।

📘 ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ নববী যুগ থেকে বর্তমান 📄 আইন আত-তামর যুদ্ধ

📄 আইন আত-তামর যুদ্ধ


আইন আত-তামর যুদ্ধ BATTLE OF AYN AL-TAMR
তারিখ: ১২তম হিজরি / ৬৩৩ খ্রি.
স্থান: আইন আত-তামর, ইরাক
ফলাফল: মুসলিম বাহিনীর বিজয়
পক্ষ-বিপক্ষ: খিলাফতে রাশিদা (মুসলিম) বনাম ইরাকের সাসানি গোষ্ঠী এবং তাদের আরব সহযোগীরা
সেনাপ্রধান: খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ বনাম আক্কা ইবনু আবি আক্কা
সেনাসংখ্যা: ৫/৬ শত বনাম ১০ হাজার
ক্ষয়ক্ষতি: সামান্য, যা উল্লেখযোগ্য নয় বনাম প্রচুর

আইন আত-তামর নামে প্রসিদ্ধ এ-যুদ্ধটি সংঘটিত হয় সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী এবং সাসানীয় জোট শক্তিগুলোর মাঝে। এ-যুদ্ধে আরবের বেশকিছু খ্রিস্টান গোত্র সাসানীয়দের সঙ্গে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অংশ নেয়। 'আনবার' অঞ্চলের পশ্চিমে অবস্থিত আইন আল-তামর এলাকাটি পারসিকরা তাদের সীমান্ত রক্ষার জন্য স্থাপন করেছিল। মুসলিম সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের হাতে দ্বাদশ হিজরিতে (৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে) 'আল-হিরা' শহর পতনের পর মুসলমান সেনাবাহিনী এই আইন আল-তামরে অবস্থিত পারস্যের সবচেয়ে বড় দুর্গের দিকে যাত্রা করে। দুর্গটি তখন মোটাদাগে দুই ভাগে বিভক্ত ছিল: প্রথমাংশ ছিল পারসিকদের, যার নেতৃত্বে ছিল পারস্য সেনাপতি মেহরান ইবনু বাহরাম। দ্বিতীয়াংশ ছিল আরবীয়দের, যেখানে আক্কা ইবনু আবি আক্কার নেতৃত্বে বসবাস করত তাগলিব, নামর এবং ইয়াদ গোত্রের লোকেরা।

এ যুদ্ধটি ইতিহাসে অন্যতম 'দ্রুতসমাপ্ত' যুদ্ধ হিশেবে পরিচিত; যেখানে আরবের খ্রিস্টানরা ময়দানে কার্যত কোনো যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার আগেই তল্পিতল্পা তুলে পালিয়ে গিয়েছিল।

যুদ্ধের আগে
আইন আত-তামর দুর্গে আরবদের নেতৃত্বে থাকা আক্কা ইবনু আবি আক্কা হঠাৎই অহংকারী এবং উদ্ধত হয়ে ওঠে। সে পারস্য নেতা মেহরানকে বলে, ময়দান খালি করে দিতে, যাতে সে পারসিকদের কোনো সহায়তা ছাড়া একাই মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে। মেহরান আক্কার এমন বাসনা দেখে তার প্রস্তাবে সম্মত হয়ে গেল। মেহরান মূলত মুসলমানদের সাথে সম্মুখযুদ্ধ এড়াতে চাচ্ছিল; কারণ সে জানত, ইরাকে লাগাতার বিজয়ের কেতন উড়িয়ে আসা অদম্য এ বাহিনী পরাভূত হবার নয়। মেহরানের যুক্তি ছিল, এই আরবরা খালিদকে পরাজিত করলে সেটা পারসিকদের জন্য কল্যাণ; আর তারা হেরে গেলে পারসিকরা তখন মাঠে নামবে।

যুদ্ধ
আক্কা তার খ্রিস্টান আরব সেনাদের নিয়ে মুসলিম বাহিনীর মোকাবেলার উদ্দেশ্যে সদম্ভে 'আইন আল-তামর' দুর্গ থেকে বের হলো। চলতে চলতে 'কারখ' নামক স্থানে পৌঁছে সে যাত্রাবিরতি করল এবং সেনাদের প্রস্তুত করে নিল। ওদিকে মুসলমানরাও যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত। সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ দ্রুত তাঁর সেনাদের গুছিয়ে নিলেন। মুসলিম সেনাপতি খালিদ শত্রুপক্ষের সেনাপতি আক্কাকে দেখে বুঝতে পারলেন লোকটা খুব অহংকারী। তাই তিনি দুঃসাহসিক এক অভিনব কৌশল করার চিন্তা করলেন। ভাবলেন, প্রতিপক্ষের সেনাপতি আক্কার উপর বজ্রাঘাতের মতো এক প্রাণোৎসর্গকারী হামলা চালাবেন এবং তাকে অপহরণ করে নিয়ে আসবেন। সে-মতে তিনি একদল বীর বাহাদুর সেনা নির্বাচন করলেন।

যুদ্ধ-পরিকল্পনার দাবি ছিল, মুসলমানরা আগে ছোট ছোট দলবদ্ধ আক্রমণ শুরু করবে। মুসলিম বাহিনীর দুই পাশকে হালকা আক্রমণে লাগিয়ে প্রতিপক্ষের মনোযোগ সেদিকে নিবদ্ধ রাখলেন; মাঝের মূল অংশকে নীরব রেখে সেনাপতি খালিদ চূড়ান্ত হামলার জন্য তাঁর ইঙ্গিতের অপেক্ষা করতে বললেন। এর অল্প কিছুক্ষণ পরে যা ঘটল, তাতে খ্রিস্টানদের দশ হাজার সেনা হতবুদ্ধি হয়ে গেল। তখনও আঘাতের ঘোর কাটেনি, আক্কা নিজেকে আবিষ্কার করল খালিদের দু হাতের মধ্যে—বন্দি অবস্থায়। সেনাপতি খালিদ তাকে বাচ্চাদের মতো দুই হাতে তুলে নিয়ে মুসলমানদের সারিতে এনে ফেললেন। এ দৃশ্য দেখে আরবীয় খ্রিস্ট সেনাদের শিরাগুলোয় রক্ত জমে গেল। তারা ময়দান ছেড়ে পালাতে শুরু করল।

জয়ের প্রাপ্তি ও পরাজয়ের পূর্ণতা
যুদ্ধের পরিস্থিতি জানতে মেহরান ময়দানে লোক পাঠিয়ে রেখেছিল। সে যখন জানতে পারল, আক্কা ও তার বাহিনী পরাজিত হয়েছে, কেল্লা থেকে নেমে দ্রুত সে তার দুর্গবাসীদের নিয়ে টেসিফুন বা মাদায়েনের দিকে পালিয়ে গেল। দুর্গ পড়ে রইল ন্যূনতম প্রহরাহীন অবস্থায়। ময়দান ছেড়ে পালিয়ে আসা আরব সেনারা দুর্গে প্রবেশ করে নিজেদের নিরাপদ জ্ঞান করে। কিন্তু খালিদ তাদের পশ্চাদ্ধাবনে দুর্গের বাইরে চলে আসেন এবং শক্ত অবরোধ করেন। তারা নেমে এলে শেকলে জড়ানো হয় সকলের পা, দুর্গ হস্তান্তর হয় মুসলিম সেনাপতির হাতে। এরপর আক্কা ও ময়দানে যুদ্ধ অবস্থায় বন্দি হওয়া অন্যদের শিরশ্ছেদ করা হয়।

খালিদের যে বন্দিরা মহৎ বড়
দুর্গ জয়ের পর সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ সেটার ভেতরে প্রবেশ করলেন। সেখানে গির্জার ভেতর এক কারাপ্রকোষ্ঠে দেখতে পেলেন চল্লিশটি স্বল্পবয়সী বালক, যারা ইনজিলের জ্ঞান আহরণে মত্ত ছিল। সেনাপতি তালা ভেঙে তাদের জীবন বাঁচালেন; এরপর মুসলিম ভূমি, রাজ্য ও দেশ-বিদেশে তাদেরকে ছড়িয়ে দিলেন। আইন আল-তামর দুর্গে সেনাপতি খালিদের হাতে আসা সে-সব বালকদের একজন ছিলেন সিরিন, যিনি প্রসিদ্ধ ফকিহ ইমাম মুহাম্মদ ইবনু সিরিনের পিতা। তেমনি এই বন্দিদলের আরেকজন ছিলেন নুসাইর, যার ঔরসে পরবর্তীতে জন্ম গ্রহণ করেন দিগ্বিজয়ী মুসলিম সেনাপতি মুসা বিন নুসাইর।

📘 ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ নববী যুগ থেকে বর্তমান 📄 দাওমাতুল জানদাল যুদ্ধ

📄 দাওমাতুল জানদাল যুদ্ধ


দাওমাতুল জান্দাল যুদ্ধ BATTLE OF DAWMAT AL-JANDAL
তারিখ: ১২তম হিজরি / ৬৩৩ খ্রি.
স্থান: দাওমাতুল জান্দাল
ফলাফল: মুসলিম বাহিনীর বিজয়
পক্ষ-বিপক্ষ: খিলাফতে রাশিদা (মুসলিম) বনাম কালব নামক আরবের খ্রিস্টান গোত্র
সেনাপ্রধান: খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ বনাম জুদি ইবনু রাবিআ
সেনাসংখ্যা: ১০ হাজার বনাম ১২/১৫ হাজার
ক্ষয়ক্ষতি: জানা যায় নি বনাম অধিকাংশ সেনা নিহত, মহিলা শিশুসহ বহু যুবক আটক

দাওমাতুল জান্দাল। দ্বাদশ হিজরি সময়ের আরব উপদ্বীপ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র। জায়গাটি প্রসিদ্ধ হয় এখানে অবস্থিত জনপ্রিয় বাজারটির কারণে। দাওমাতুল জান্দালের মানুষেরা বিভিন্ন মূর্তির পূজা করত। তাবুক যুদ্ধের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এ অঞ্চলে আসেন এবং 'ওয়াদ' মূর্তিটি গুঁড়িয়ে দেন।

দাওমাতুল জান্দালে মুসলমানদের বারংবার অভিযান
দাওমাতুল জান্দালে মুসলমানদের মোট চারটি অভিযান পরিচালিত হয়। প্রথমবার ৫ম হিজরিতে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) সেখানে হাজির হন। এরপর ৬ষ্ঠ হিজরিতে আবদুর রহমান ইবনু আওফ এবং নবম হিজরিতে হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ সেখানে অভিযান পরিচালনা করেন।

যুদ্ধকালীন মুসলমানদের খলিফা
দ্বাদশ হিজরি চলছে। মুসলিম জাহানের খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু ইয়াজ ইবনু গানামকে পাঠালেন দাওমাতুল জান্দাল অধিকার করার ফরমান দিয়ে। ইয়াজ যখন দাওমাতুল জান্দালে পৌঁছলেন, শহরটি তখন খ্রিস্টানঅধ্যুষিত 'কালব' গোত্রের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ইয়াজ দুর্গের দক্ষিণ দিকে তাঁর বাহিনীর শিবির স্থাপন করলেন। কয়েক সপ্তাহ এভাবে কেটে গেল। দুর্গের ভেতর থেকে কিছু তির-বর্শা উড়ে আসা ছাড়া কার্যকর কোনো যুদ্ধই হলো না। অগত্যা সেনাপতি ইয়াজ ইরাকে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের কাছে সাহায্য চেয়ে একটি পত্র পাঠালেন। মহান সেনাপতি খালিদ তখন আইন আল-তামরের কাজ শেষ করেছেন। ইয়াজের পত্র পেয়ে পরদিন তিনি ছয় হাজার সৈন্য নিয়ে দাওমাতুল জান্দাল অভিমুখে যাত্রা করলেন।

পরিস্থিতির নতুন মোড়
দুর্গের ইটে ইটে খবর রটে গেল, খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ এসেছেন দাওমাতুল জান্দাল অবরোধে। দুর্গরুদ্ধ সেনাদের মূল নেতৃত্বে ছিল দুইজন, আকিদর ইবনে আবদুল মালিক আল-কিন্দি এবং জুদি ইবনে রাবিআ। হঠাৎ এ দুই আরবনেতার মধ্যে বিরোধ দেখা দিল এবং আকিদর নেতৃত্ব থেকে সরে পড়ল। আকিদর বলেছিল: 'খালিদের ব্যাপারে আমার চেয়ে ভালো কেউ জানে না, যুদ্ধের ময়দানে তার চেয়ে ভাগ্যবান এবং সাহসী নেতা হতে পারে না।' আকিদর দুর্গ থেকে বেরিয়ে গেল। কিন্তু তার দুর্গ ছাড়ার কথা পৌঁছে গেল খালিদের কাছে। তিনি আসিম ইবনু আমরকে পাঠালেন তাকে ধরে আনতে এবং পরবর্তীতে তার শিরশ্ছেদ করা হয়।

খ্রিস্টানরা সাহায্যের আবেদন সমেত পার্শ্ববর্তী আরব গোত্রগুলোতে দূত পাঠাল। কালব এবং গাসসান গোত্রের সেনারা দুর্গ বাঁচাতে তাদের সাথে অংশ নিল। ফলে সেনাসংখ্যা এত বেড়ে গেল যে, দুর্গে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় অনেকে দুর্গের দেয়ালের নিচে অবস্থান গ্রহণ করল।

যুদ্ধের গতি
সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ এসে ইয়াজ ইবনু গানামকে তাঁর নেতৃত্বে নিয়ে নিলেন। এখন দুই বাহিনী মিলে মুসলমানদের সেনাসংখ্যা দাঁড়াল প্রায় ১০ হাজারে। খালিদ ইয়াজের বাহিনীকে দায়িত্ব দিলেন দুর্গের দক্ষিণ দিকের গমনপথ আটকে দিতে এবং নিজের বাহিনী নিয়ে তিনি উত্তরের দিকগুলো অবরোধ করলেন।

আরব খ্রিস্টান বাহিনীর নেতা জুদি ইবন রাবিআ ভাবল সে নিজেই মুসলিম বাহিনীর প্রধান সেনাদলের ওপর হামলা করবে। জুদি যখন বাহিনী নিয়ে মুসলিমদের সামনে এগিয়ে এল, তখন সে দেখল মুসলমানরা যুদ্ধের জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছে। যখন উভয় বাহিনীর সামনে খুব বেশি আর দূরত্ব নেই, খালিদ তখন তাঁর বাহিনীকে অতর্কিত হামলে পড়ার নির্দেশ দিলেন। অল্প সময়ের ভেতর জুদির বাহিনীকে দমন করা হলো। বন্দি হলো গোত্রপতি জুদি, বাকিরা দুর্গের দিকে পালিয়ে গেল। মুসলিম সেনারা তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে দুর্গের ফটক আটকে দিল। ফটকের সামনেই অনেক খ্রিস্টান সেনার প্রাণ গেল। সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ জুদি ও তার সাথে বন্দি হওয়া অন্যদের ধরে দুর্গের সামনে নিয়ে এলেন এবং তাদের শিরশ্ছেদ করলেন। এরপর চূড়ান্ত হামলা চালিয়ে দুর্গটি দখল করে নেয়া হয়।

যুদ্ধ যখন শেষ
যুদ্ধের পরও বেশ কিছুদিন সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ দাওমাতুল জান্দালে অবস্থান করলেন। এরপর ইয়াজ ইবনু গানামকে সাথে নিয়ে তিনি 'আল-হিরা' নগরীর পথ ধরলেন। এ ঘটনাটি দ্বাদশ হিজরির (৬৩৩ খ্রিস্টাব্দ) আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহের।

📘 ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ নববী যুগ থেকে বর্তমান 📄 আজনাদাইন যুদ্ধ

📄 আজনাদাইন যুদ্ধ


আজনাদাইন যুদ্ধ BATTLE OF AJNADAYN
তারিখ: ১৩তম হিজরি / ৬৩৪ খ্রি.
স্থান: আজনাদাইন, রামাল্লা, ফিলিস্তিন
ফলাফল: মুসলিম বাহিনীর বিজয়
পক্ষ-বিপক্ষ: খিলাফতে রাশিদা বনাম বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য
সেনাপ্রধান: খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ বনাম কুবুকলার
সেনাসংখ্যা: ৪০ হাজার বনাম ৯০ হাজার
ক্ষয়ক্ষতি: ৪৫০ জন শহিদ বনাম কয়েক হাজার নিহত

ফিলিস্তিনের রামাল্লার অদূরে ১৩ হিজরি (৬৩৪ খ্রিস্টাব্দ) সালে বাইজান্টাইন বাহিনীর সাথে মুসলমানদের সংঘটিত আরেকটি ঐতিহাসিক যুদ্ধের নাম 'আজনাদাইন'। রোমান বাইজেন্টাইনের সাথে খেলাফতে রাশেদার সেনাদের ইয়ারমুকের যুদ্ধের দুই বছর আগে এ যুদ্ধটি সংঘটিত হয়।

মরুভূমির তপ্ত বালু মাড়িয়ে গেলেন যিনি
সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ তখন ইরাকে। খলিফা আবু বকর সিদ্দিকের নির্দেশ পেয়ে তিনি অর্ধেক বাহিনী নিয়ে শামে যাত্রা করেন। সেখানে আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ-এর বাহিনীর সাথে মিলিত হওয়ার নির্দেশনা ছিল। ১৩ হিজরির সফর মাসে নয় হাজার সেনা নিয়ে খালিদ যাত্রা শুরু করেন এবং মাত্র আঠারো দিনে 'সামাওয়া মরুভূমি' পাড়ি দিয়ে দামেশকের ফটকের সামনে হাজির হন। এরপর সম্মিলিত বাহিনী বসরা নগরীর দিকে রওনা হয় এবং ১৩ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসে বসরা নগরী মুসলমানদের করতলগত হয়।

আজনাদাইনের প্রস্তুতি
বসরা নগরীর পতনের পর বাইজান্টাইন সম্রাট হেরাক্লিয়াস ভীত হয়ে পড়েন এবং বিশাল সেনা সমাগমের চিন্তা করেন। সম্মিলিত খ্রিস্টান বাহিনী আজনাদাইন এলাকায় সমবেত হয়। মুসলমানদের সুসংহত সেনাদল প্রায় ৪০ হাজার যোদ্ধাদের নিয়ে আজনাদাইনের নিকটবর্তী স্থানে সংগঠিত হয়। শামের ভূমিতে রোমানদের সাথে এটাই ছিল মুসলমানদের প্রথম কোনো বৃহৎ যুদ্ধ মোকাবেলা।

সেনাপতি খালিদ তাঁর বাহিনীকে বিন্যস্ত করলেন। ডান অংশের নেতৃত্বে রাখলেন সাহাবি মুয়ায ইবনু জাবালকে, বামপাশের দায়িত্ব দিলেন সাঈদ ইবনু আমেককে। কেন্দ্রীয় পদাতিক সেনাদের সেনানায়ক করলেন আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহকে। অশ্বারোহীদের সেনাপতি করলেন সাঈদ ইবনু যাইদকে। অন্যদিকে রোমান সেনারাও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল।

যুদ্ধের বারুদ
১৩ হিজরির ২৭শে জুমাদাল উলা মোতাবেক ৩০শে জুলাই ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দ। ফজরের সালাতের পর খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ তাঁর বাহিনীকে সামনে অগ্রসর হবার নির্দেশ দিলেন। তিনি সেনাদেরকে যুদ্ধের জন্য উৎসাহ দিলেন। রোমানরা তাদের সেনাসংখ্যা নিয়ে অহংকারে মত্ত ছিল। তারা প্রথমে মুসলমানদের ডান এবং বাম অংশে আক্রমণ করে বসল। কিন্তু মুসলিম সেনারা অনড় দাঁড়িয়ে থেকে তাদের প্রতিহত করলেন।

খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ অশ্বারোহীদের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন: 'আল্লাহর নামে অস্ত্র হাতে তুলে নাও, তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করুন!' সেনাপতির নির্দেশে তারা অস্ত্র তুলে নিতেই শত্রুদের পায়ের তলার মাটি কেঁপে উঠল। মুসলমানদের আক্রমণে শত্রুদের শক্তিবৃহ্য ভেঙে খানখান হয়ে গেল। রোমান সেনাপতি কুবুকলার পরাজয় দেখে ভয়ে নিজের মাথা কাপড়ে ঢেকে নিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই রোমানরা পরাজয় বরণ করল।

বীরত্ব ও আত্মত্যাগ
এ যুদ্ধে মুসলিম সেনারা ঘোরতর বিপদের মোকাবেলা করেছে এবং বীরত্বের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এ যুদ্ধে মুসলমানদের মধ্য হতে প্রায় ৪৫০ যোদ্ধা শাহাদাত বরণ করেন। অন্যদিকে রোমানদের নিহতের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে যায়। যুদ্ধের পর খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে বিজয়ের সুসংবাদ পাঠিয়ে চিঠি লেখেন। আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এই চিঠি পড়ে অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px