📘 ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ নববী যুগ থেকে বর্তমান 📄 যাতুস সালাসিল

📄 যাতুস সালাসিল


যাতুস সালাসিল BATTLE OF CHAINS
তারিখ: ১২তম হিজরি / ৬৩৩ খ্রি.
স্থান: কুয়েত
ফলাফল: মুসলিম বাহিনীর বিজয়
পক্ষ-বিপক্ষ: খিলাফতে রাশিদা বনাম পারস্যের সাসানি সাম্রাজ্য
সেনাপ্রধান: খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ বনাম হরমুজ
সেনাসংখ্যা: ১৮ হাজার বনাম ৮০ হাজার
ক্ষয়ক্ষতি: ১ হাজার শহিদ বনাম ৩০ হাজার নিহত

ইতিহাসের অপরাজেয় সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বে ১২তম হিজরি মোতাবেক ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের বাহিনী ও মুসলিম সেনাদের মধ্যকার সংঘটিত যুদ্ধকেই 'যাতুস সালাসিল' বা Battle of Chains বলা হয়। এ যুদ্ধে পারস্যবাহিনীর সঞ্চালনায় ছিল হিংস্র সেনাপতি হরমুজ। মুসলমানদের অবিস্মরণীয় বিজয়ের মধ্য দিয়ে যুদ্ধটি সমাপ্ত হয়।

যুদ্ধের প্রাকালাপ
ইরাক বিজয়ের সূচনা হিসেবে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর দৃষ্টি ছিল 'আল-আবেলাহ' (Al Abelah) শহরটি দখল করার প্রতি। সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে এ শহরের ভৌগলিক এবং সামরিক গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। কেননা, এ-শহরটিই ছিল আরবের সাথে পারস্যের নৌ যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। শহরটির সাগর উপকূল ব্যবহার করেই ইরাকে ছড়িয়ে থাকা পারস্যের ঘাঁটিগুলোতে সবধরনের সাহায্য পৌঁছানো হতো। সে-সময় এ শহরের দায়িত্বভার ছিল উচ্চপদস্থ পারসিক আমির, প্রসিদ্ধ সেনাপতি হরমুজের হাতে। বর্তমানেও আরব উপদ্বীপের উপকূলীয় একটি শহরের নাম রয়েছে এই হরমুজের নামে। হরমুজ ছিল প্রচণ্ড অহংকারী এবং হিংস্র প্রকৃতির লোক। ইসলাম এবং মুসলমানদের প্রতি—এমনকি পুরো আরব জাতীয়তার প্রতি—তার ছিল সীমাহীন ক্ষোভ। তেমনি আরবরাও সে-সময় ইরাকবাসীদের প্রতি নানা কারণে হয়ে উঠেছিল বীতশ্রদ্ধ; তারা সমাজে এদের উপমা দিয়ে বলতো: 'এরা তো দেখি হরমুজের চেয়েও বড় কাফের, হরমুজের চেয়েও নিকৃষ্ট।'

খলিফার কাছে সেনা সাহায্য তলবের পর সর্বমোট ১৮ হাজার সদস্যের মুসলিম বাহিনী নিয়ে সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ সেখানে পৌঁছে প্রতিপক্ষ দলের নেতা হরমুজের বরাবর একটি চিঠি লিখলেন। যেখানে তিনি ইসলামে জিহাদের বাস্তবতা কী, তার স্পষ্ট বিবরণ দিলেন। উত্তম ভাষা ও উপস্থাপনায় বর্ণনা করলেন মুসলিম সেনাবাহিনীর বিশেষ গুণাগুণ। তিনি বললেন:
'ইসলাম গ্রহণ করে নিন, নিরাপদ হয়ে যাবেন; অথবা নিজের ও স্বজাতির জন্য জিম্মি চুক্তি মেনে নিন এবং মুসলমানদেরকে জিযিয়া কর প্রদানে সম্মত হয়ে যান— নতুবা সবকিছুর জন্য নিজেকেই তিরস্কার করতে হবে আপনার। কারণ, আমি এমন এক জাতি নিয়ে এসেছি, যারা মৃত্যুতে ততটা ভালোবাসে, যতটা আপনারা জীবনকে ভালোবাসেন।'

মুসলিম বাহিনীর চরিত্র-স্বভাবের এরচেয়ে সত্য চিত্রায়ন আর কী হতে পারে? এই স্বভাব ও মানসিকতার কারণেই তো ইসলামের শত্রুরা মুসলমানদেরকে এতটা ভয় করত। এটাই মুসলমানদের হৃদয়োত্থিত উর্ধ্বগামী সুবাস, সুরভি। সেই মুসলিম বাহিনীর মৃত্যুপ্রেম আজ বদলে গেছে ভীরুতায়, দুর্বলতায় আর দুনিয়ার প্রতি লালসায়; অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে গেছেন, এই দুনিয়াসক্তির কারণেই পৃথিবীর তাবৎ কুফুরি শক্তি একযোগে আমাদের উপর হামলে পড়ছে। সাওবান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত এক হাদিসে তিনি স্পষ্ট ইরশাদ করেছেন: 'খাদ্য গ্রহণকারীরা যেভাবে খাবারের পাত্রের চতুর্দিকে একত্র হয়, অচিরেই কাফেররা তোমাদের বিরুদ্ধে সেভাবেই একত্রিত হবে। এক ব্যক্তি বলল, 'সেদিন আমাদের সংখ্যা কম হওয়ার কারণে কি এরূপ হবে?' তিনি বললেন: 'তোমরা বরং সেদিন সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে; কিন্তু তোমরা হবে প্লাবনের স্রোতে ভেসে যাওয়া আবর্জনার মতো। আর আল্লাহ তোমাদের শত্রুদের অন্তর থেকে তোমাদের প্রভাব দূর করে দিবেন, তিনি তোমাদের অন্তরে 'ওয়াহন' ভরে দেবেন। এক ব্যক্তি বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল, 'ওয়াহন' কী?' তিনি বললেন: 'দুনিয়ার প্রতি মোহ এবং মৃত্যুর প্রতি বিতৃষ্ণা।' [১]

শেকড়ছেঁড়া যুদ্ধ
মুসলিম সেনাপতির প্রেরিত পত্রের 'ইসলাম বা জিযিয়া প্রদানের দাওয়াত' গ্রহণ না করে ছুড়ে মারল হরমুজ। নিজের হাতে ডেকে আনল স্বজাতির সর্বনাশ। পারস্য সম্রাট কিসরার কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়ে দূত রওনা করল সে। ঘটনা শোনামাত্রই কিসরা বিরাট রণসাহায্য পাঠিয়ে দিল হরমুজ বরাবর। অল্প সময়ের মধ্যেই হরমুজের অধীনে জড়ো হলো বিপুল অস্ত্রবাহী বিশাল সেনাদল। হরমুজ তার পুরো যুদ্ধপরিকল্পনা করল 'কাজমা' (Kazma) শহরকে কেন্দ্র করে; কারণ, সে ভেবেছিল মুসলমানরা এখানটাতেই সেনা জমায়েত করবে। কিন্তু সে মুসলিম সেনাপতি হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের চৌকস সামরিক বুদ্ধিমত্তার কাছে হোঁচট খেয়ে গেল। তিনি আধুনিক যুদ্ধবিদ্যামতে 'লয় ও ক্ষয়ের যুদ্ধ' বা War of Attrition-এর পথ বেছে নিলেন। পারস্য বাহিনীকে নিয়ে তিনি কঠোর পরিকল্পনা করলেন। সে-মতে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ তাঁর বাহিনী নিয়ে চলে গেলেন 'হাফির' অঞ্চলে। এদিকে হরমুজ তার সেনাদল নিয়ে কাজমা শহরে এসে দেখে, সেখানে কেউ নেই। গুপ্তচররা তাকে জানাল, মুসলমানরা হাফিরের দিকে গেছে। এ-খবর শুনে বিকল্প পথে সে দ্রুত হাফিরের পথ ধরল, যাতে মুসলমানদের আগে পৌঁছানো যায়। ঘটলও তাই, মুসলমানদের আগে সে হাফিরে পৌঁছে গেল। সেখানে গিয়েই সে যুদ্ধের জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু করল; চারপাশে গভীর পরিখা খনন করতে করতে তার সেনারা ক্লান্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু বীর সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ ততক্ষণে শত্রুদের অবস্থান জানতে পেরে মুসলিম বাহিনীর মোড় ঘুরিয়ে নিলেন। তাদেরকে নিয়ে পুনরায় চলে গেলেন কাজমা শহরে। সেখানে সেনাতাঁবু স্থাপন করলেন এবং এ-সুযোগে যুদ্ধের পূর্বে সেনারা খানিক বিশ্রাম করারও সুযোগ পেয়ে গেল।

মুসলিম বাহিনীর কাজমা ফিরে যাওয়ার সংবাদ এল হরমুজের কাছে। ক্রোধে তার কান লাল হয়ে গেল, তার ললাটের ভাঁজে ভাঁজে জমে গেল দুঃশ্চিন্তা। অগত্যা সে তার ক্লান্ত শ্রান্ত বিশাল বাহিনী নিয়ে যুদ্ধের জন্য পুনরায় কাজমার পথ ধরল। তবে সে এলাকার ভূমি-প্রকৃতি এবং ভৌগোলিক অবস্থা সম্পর্কে মুসলমানদের চেয়ে স্থানীয় পারসিকদের জানাশোনা ছিল বেশি। ফলে পরবর্তীতে এলেও হরমুজ ময়দানের পার্শ্ববর্তী পানির উৎসগুলো দখল করে নিল; ফোরাত নদীকে পেছনে রেখে সে ময়দানে এসে হাজির হলো, যাতে মুসলমানরা পানির প্রয়োজনে ফোরাতে যেতে না পারে। কিন্তু মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর পবিত্র গ্রন্থে সত্য বলেছেন: 'কখনো তোমাদের কাছে কোনো কিছু অপছন্দ লাগে, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর।' [১] শত্রুপক্ষকর্তৃক ময়দানের সুবিধা দখল মুসলমানদের ভেতর আত্মমর্যাদার আগুন জ্বেলে দেয়; তারা কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য আরও উৎসাহী এবং উদ্যমী হয়ে ওঠে। এ-সময় সেনাদের উদ্বুদ্ধ করতে সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: 'তোমরা কি ময়দানে তোমাদের ঘোড়াগুলো নামিয়ে দেবে না? আল্লাহর অস্তিত্বের শপথ, পানির ঝরনাগুলো তাদেরই অধিকারে আসবে, দুপক্ষের যারা হবে সবচে ধৈর্যশীল এবং সবচে সম্মানিত।'

পারসিক বাহিনীপ্রধান হরমুজ মুসলিম সেনাদের সাথে ময়দানি মোকাবেলায় নামার আগে পরিস্থিতির বিবরণ জানিয়ে সম্রাট কিসরার কাছে আরেকটি চিঠি লিখে পাঠাল। সে তৎক্ষণাৎ কারিন ইবনু কিরবাসের নেতৃত্ব আরেকটি বিশাল বাহিনী পাঠিয়ে দিল, যাতে ঘটনাক্রমে হরমুজ মুসলমানদের কাছে পরাজিত হলেও এই বিকল্প বাহিনী যেন আবলেহ শহরটি তাদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। কারণ, শহরটি এতদাঞ্চলে পারস্য প্রভাব জিইয়ে রাখতে সার্বিক বিচারে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

মৃত্যুর শেকল
পারস্য বাহিনীর সেনাপতি হরমুজ ছিল প্রচণ্ড অহংকারী এবং কাণ্ডজ্ঞানহীন হঠকারী একজন মানুষ। সে কেবল নিজের কথা ভাবত, নিজের স্বার্থের চিন্তা করত। এমনকি, নিজের মোকাবেলায় সে বাহিনীর বৃহৎ স্বার্থ বিসর্জন দিতেও দ্বিধাবোধ করত না। এবারও সে তা-ই করল, সে পারস্য বাহিনীর প্রত্যেক সেনাকে জোর করে শেকলাবদ্ধ করে ফেলল, যাতে যুদ্ধ যত ভয়াবহই হোক—মৃত্যু পর্যন্ত যেন কেউ যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করতে না পারে। তার এমন অপরিণামদর্শী কাজের দিকে সম্বন্ধ করে, ইতিহাসে এ-যুদ্ধকে 'যাতুস সালাসিল' ব্যাটল অফ চেইন বা শেকলের যুদ্ধ নামে অভিহিত করা হয়।

সে-সময়ের যুদ্ধের স্বাভাবিক রীতিমতো প্রথমে দুই সেনাপতির মাঝে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দিয়ে যুদ্ধ শুরু হলো। মহান মুসলিম সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের মোকাবিলার জন্য পারস্যদলের প্রধান হরমুজ ময়দানে নেমে এল। কিন্তু হরমুজ ছিল প্রচণ্ড ধূর্ত এবং বিশ্বাসঘাতক। সে একদল অশ্বারোহীকে বলে এল, দুই সেনাপতির প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলাকালে অতর্কিত যেন তারা খালিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর এরপরই যাতে মুসলমানদের সাথে কাফেরদের এলোপাতাড়ি যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।

দুই সেনাপতি তখন রণাঙ্গনে। খালিদ তো সেই সেনাপতি, ইসলাম গ্রহণের পূর্বাপর কোনো যুদ্ধেই—একটি বারের জন্যও জীবনে যে কোনো মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরাজিত হয়নি। পেছনে ফাঁদ পাতা হরমুজের অশ্বারোহীরা খালিদের উপর হামলে পড়ার আগেই মুসলিম শিবিরের অন্যতম আরেক বীর মুজাহিদ কাকা ইবনু আমর আত-তামিমি—বীরত্ব ও সাহসিকতায় তিনি খালিদের সমকক্ষ ছিলেন—ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন। দ্রুত তিনি সেনাদের সারি থেকে বের হয়ে হিংস্র সিংহের মতো গাদ্দার সে-সব অশ্বারোহীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। এদিকে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ ততক্ষণে হরমুজের ইহকাল সাঙ্গ করে দিলেন, চূড়ান্ত আঘাত হেনে ভেড়া জবেহ করার মতো তার গলার উপর তরবারি চালিয়ে দিলেন। এ অবস্থা দেখে পারস্য বাহিনীর চোখ কপালে উঠে গেল, তাদের ঐক্য ভেঙে গেল এবং সেনাপতির মৃত্যুতে বাহিনী চরম বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ল। আক্রমণের চিন্তা বাদ দিয়ে তারা দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে পালাতে শুরু করল। মুসলমানরা ঘোড়া হাঁকিয়ে তাদের পেছনে ছুটলেন। সেখানেই তারা তিরিশ হাজারোর্ধ্ব অগ্নিপূজারিকে জাহান্নামে পৌঁছে দিলেন। অনেকে ডুবে গেল ফোরাতের পানিতে, শেকল ছিঁড়ে যারা পালাতে পারে নি—সেনাপতির নির্বুদ্ধিতার কৈফিয়ত হিসেবে তাদেরকে সেখানেই চূড়ান্ত বলি হতে হলো। বাকি সেনারা কোনোমতে প্রাণ বাঁচিয়ে ময়দানের ভরাডুবি সয়ে সব ছেড়েছুড়ে পালিয়ে গেল। শোচনীয় এ পরাজয়ের জোয়ার কুফুরি শক্তি এবং অগ্নিপূজারি শিবিরের কোনায় কোনায় মুসলমানদের ভীতি পৌঁছে দিল।

ভয়াবহ ভীতির প্রসার
এ যুদ্ধের প্রাসঙ্গিকতা তখনও শেষ হয়নি; আবলেহ শহরটি তখনও মুসলমানদের হাতে আসেনি। তাছাড়া সেখানেও এক শক্তিশালী রক্ষীবাহিনী অপেক্ষমাণ, হরমুজের পরাজয়ের ভিত্তিতে যাদেরকে শহর বাঁচানোর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। হরমুজের তো ভরাডুবি হয়েছে, পরাজয়ের গ্লানি ও প্রভাব গায়ে মেখে পালিয়ে আসা বাহিনীর বাকিরা তখনও ভয়াবহ এ পরাজয়ের শোকে শোকার্ত হয়ে আছে। তাদের মনস্তত্ত্বে চেপে রয়েছে প্রচণ্ড ভয় ও সংশয়। এই ভয় ও গ্লানি নিয়েই তারা যোগ হয়েছে কারিন ইবনু কিরবাসের দায়িত্বে থাকা আবলেহ শহরের রক্ষীবাহিনীতে। পালিয়ে আসা সেনারা কারিনের কানেও পরিস্থিতির নাজুকতার খবর জানিয়েছে, ফলে এ সেনাপতির মনেও জমে উঠেছে মুসলমানদের সম্মুখ-মোকাবেলার প্রচণ্ড ভয় ও দুশ্চিন্তা।

কিন্তু তারপরও, পারস্য সম্রাটের হুকুম মানার তাগিদে একরকম বাধ্য হয়েই তাকে মুসলিম বাহিনীর সাথে যুদ্ধের জন্য শহরের বাইরে 'মিযার' নামক স্থানে নেমে আসতে হয়। সে যুদ্ধের জন্য এ অঞ্চল বেছে নিয়েছিল, যাতে ফোরাত নদীর প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। তদুপরি সে বিরাট এক নৌবহর তৈরি রেখেছিল, পরিস্থিতি প্রতিকূল হয়ে উঠলে যেন নদীপথে পালিয়ে যাওয়া যায়— সে জন্য। এদিকে হরমুজের অবশিষ্ট বাহিনী নিজেদের জন্য শহরের ভেতরে থেকে আত্মরক্ষাকেই উত্তম বলে ভেবে নিয়েছে। কারণ, তারা ময়দানে মুসলমানদের মোকাবেলা করা কতটা কঠিন, তা স্বচক্ষে দেখে এসেছে।

মুসলমানদের বীর সেনাপতি হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ সবসময় প্রতিপক্ষের প্রতিটা কাজের তদন্ত ও অনুসন্ধানকেই যুদ্ধের প্রধান অস্ত্র বলে হিসেব করতেন। মুসলিম পক্ষের গুপ্তচরদের মাধ্যমে তিনি জানতে পারলেন, পারস্যের আরেকটি বাহিনী মিযার নামক স্থানে একত্র হচ্ছে। এ-সংবাদ পাওয়ামাত্রই খালিদ মুসলিম বিশ্বের খলিফা আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে পত্র পাঠান এ মর্মে যে, তারা অচিরেই মিযারে সেখানকার পারস্য বাহিনীর মোকাবেলার জন্যে আরেকটি যুদ্ধের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছে, যাতে এর মাধ্যমে আবলেহ দখলের পথ সুগম হয়। এরপর তিনি দ্রুত প্রতিপক্ষের সাক্ষাতের জন্য যাত্রা করেন। ইরাকের সিংহ হযরত মুসান্না ইবনু হারিসা রাদিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে একদল দক্ষ অশ্বারোহীকে তিনি অগ্রে প্রেরণ করেন এবং এত দ্রুত মুসলিম বাহিনী নিয়ে সেখানে পৌঁছে যান, যা শত্রুপক্ষ একদমই চিন্তা করতে পারেনি। মুসলমানদের ক্ষিপ্রতা দেখে তারা দিশেহারা হয়ে গেল।

সামরিক বুদ্ধিমত্তা
মিয়ার অঞ্চলে পৌঁছেই দিগ্বিজয়ী মুসলিম সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ প্রতিপক্ষের সেনাবাহিনীতে অনুসন্ধানী দৃষ্টি দেন। দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা এবং সুক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তা খাটিয়ে তিনি অনুধাবন করে নেন, শত্রুপক্ষের সেনাদের হৃদয় ভরে আছে মুসলিম বাহিনীর ভয়। কারণ, ঘাড় কাত করেই তিনি দেখতে পান ফোরাতের পাড়ে যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়ে নোঙর করে আছে বড় বড় নৌ জাহাজ। এটা দেখে তিনি মুসলিম বাহিনীর দিকে ঘুরে তাদেরকে যুদ্ধে ধৈর্য ধারণ করার এবং অবিচল থাকার নির্দেশ দেন। বলেন, পেছনে ফেরা ছাড়াই যেন সবাই সামনে অগ্রসর হয়! পারসিকদের সেনাসংখ্যা ছিল প্রায় ৮০ হাজার। এদিকে মুসলমানদের সেনা ছিল মাত্র ১৮ হাজার। তবে দুপক্ষের শক্তির মূল পরিমাপক ছিল দক্ষ ঘোড়সওয়ারের আনুপাতিক হার।

প্রথমেই ময়দানে বেরিয়ে এল পারস্যের সেনাপতি কারিন। সে ছিল দক্ষ ও সাহসী যোদ্ধা। ময়দানে পা রেখেই মুখোমুখি মোকাবেলার জন্য কোনো মুসলমানকে বের হয়ে আসতে আহ্বান করল কারিন। তার ডাকে সাড়া দিয়ে একসাথে ময়দানে নেমে এলেন দুজন, সেনাপতি খালিদ এবং অখ্যাত এক আরব বেদুইন। ইতিহাসে যার নাম লেখা হয় মাকিল ইবনু আল-আশা, যার উপাধি ছিল 'শুভ্র অশ্বারোহী'। বেদুইন এই সাহসী সেনা খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে পেছনে ফেলে ময়দানে বেরিয়ে যায় আগে। বাজপাখির মতো সে কারিনের উপর হামলে পড়ে এবং চোখের পলকেই তাকে হত্যা করে ফেলে। এরপর পারস্যের বাহিনী থেকে একসাথে কয়েকজন সাহসী যোদ্ধা এবং নেতাগোছের সেনারা বেরিয়ে আসে ময়দানে। মুসলমানদের মধ্য থেকে আসেম ইবনু আমর মোকাবেলা করেন পারস্য সেনাপতি আনোশজানের, মুহূর্তেই তিনি তাকে ওপারে পৌঁছে দেন। এরপর সাহাবি আদি ইবনু হাতিম রাদিয়াল্লাহু আনহু বের হন প্রতিপক্ষের সেনাপতি কাভাডের বিরুদ্ধে, কয়েক মিনিটে তাকেও তিনি পরপারের টিকেট ধরিয়ে দেন। এভাবে পারস্য সেনারা নেতা ও নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে।

এটা খুবই স্বাভাবিক ছিল যে, নেতাদের কল্লা পড়ে যাবার পর পারস্যের সাধারণ সেনারা দ্রুত ময়দান ত্যাগ করবে; তাদের সামরিক বন্ধন শিথিল হয়ে যাবে। কিন্তু তাদের ভেতরে মুসলমানদের জন্য জমে ছিল প্রচণ্ড ক্ষোভ ও ক্রোধ। পুষে রাখা সেই ঘৃণা ও ক্রোধের বশবর্তী হয়ে তারা মরণপণ যুদ্ধে অবতীর্ণ হলো। নিজেদের সর্বোচ্চ দিয়ে তারা মুসলিম বাহিনীকে নিবৃত্ত করতে চেষ্টা করল, কিন্তু শেষপর্যন্ত মুসলমানদের ধ্বংসাত্মক আক্রমণে তারা পদপিষ্ট হয়ে গেল। মুসলিম বাহিনীর পদ চুম্বন করল স্পষ্ট বিজয়। তারা গুরুত্বপূর্ণ শহর আবলেহ দখল করে নিল। যার ফলে ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলের ক্ষমতা চলে এল মুসলমানদের হাতে। তেমনি সাগর উপকূলের অধিকাংশ জরুরি বন্দর এলাকার নিয়ন্ত্রণ চলে এল খিলাফতের নিয়ন্ত্রণে। তবে এ বিজয় ইরাকের মাটিতে পারস্যের সাথে মুসলমানদের ভয়ঙ্কর কিছু যুদ্ধের দ্বার খুলে দিল। যে যুদ্ধগুলোর সবকটিতেই বিজয় সঙ্গী হয়েছে মুসলমানদের এবং এতদাঞ্চলে অগ্নিপূজারি শয়তানদের রাজত্বের যবনিকাপাত ঘটেছে।

টিকাঃ
[১] আবু দাউদ: ৪২৯৭, মুসনাদে আহমাদ: ২২৪৫০... শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানি হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন; দেখুন: আস-সিলসিলাতুস সাহিহা, হাদিস নং-৯৫৮
[১] সুরা বাকারা: ২০১

📘 ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ নববী যুগ থেকে বর্তমান 📄 ওয়ালাজার যুদ্ধ

📄 ওয়ালাজার যুদ্ধ


ওয়ালাজার যুদ্ধ BATTLE OF WALAJA
তারিখ: ১২তম হিজরি / ৬৩৩ খ্রি.
স্থান: ইরাক (ফুরাত নদীর তীরে)
ফলাফল: মুসলিম বাহিনীর গৌরবান্বিত বিজয়
পক্ষ-বিপক্ষ: খিলাফতে রাশিদা (মুসলমানরা) বনাম পারস্যের সাসানি সাম্রাজ্য এবং আরব খ্রিস্টান
সেনাপ্রধান: খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ বনাম আন্দুযগার
সেনাসংখ্যা: ১৫ হাজার বনাম ২৫/৩০ হাজার
ক্ষয়ক্ষতি: প্রায় ২ হাজার শহিদ বনাম ২০ হাজারের বেশি নিহত

ঐতিহাসিক মেসোপটেমিয়ায় ১২ হিজরি (৬৩৩ খ্রি.) সনে সংঘটিত হয় ওয়ালাজার যুদ্ধ। সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বে খুলাফায়ে রাশিদিনের বাহিনীর বিপক্ষে এ যুদ্ধে মোকাবেলা করে পারস্য (ইরান) সম্রাট এবং তার আরবীয় খ্রিস্টান মিত্ররা। মুসলমানদের দ্বিগুণ সেনাসমৃদ্ধ এ জোটবাহিনীর বিরুদ্ধে চৌকস সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ মর্যাদার বিজয় তুলে আনেন। সংখ্যাধিক্যে শত্রুদল এগিয়ে থাকলেও পূর্ববর্তী যুদ্ধগুলোর মতো এ যুদ্ধেও খালিদ 'লয় ও ক্ষয়ের যুদ্ধ' বা War of Attrition-এর সাঁড়াশি নীতি অবলম্বন করেন।

পারস্য বাহিনী
উল্লাইসের যুদ্ধে (Battle of Ullais) থাকতেই পারস্যের তৎকালীন সম্রাট তৃতীয় আরদাশির (Ardashir III) আরও দুটি নতুন বাহিনী গঠনের নির্দেশ পাঠায়। তার নির্দেশ পেয়ে সম্রাটের শহরে শুরু হয় নতুন সেনাবাহিনী তৈরির কাজ। রোমান সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমাঘেঁষা পারস্য বা ইরানের পশ্চিম দিকের সীমান্ত পাহারায় থাকা সেনারা ব্যতীত সে অঞ্চলের সবগুলো শহর ও দুর্গ থেকে সেনারা দলে দলে কেন্দ্রীয় শহরের দিকে আসতে থাকে। অল্প কয়েকদিনের ব্যবধানে প্রথম বাহিনী সংগঠিত হয়ে যায়। এবার সাম্রাজ্যের দক্ষ সমরবিদেরা পরামর্শ করে স্থির করে, মুসলিম বাহিনী অচিরেই ফোরাতের পাড় ঘেঁষে ইরাকের উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়ে আসবে। কারণ, তারা জানত, নিকট ইতিহাসে আরব সেনাদেরকে মরু এলাকা থেকে দূরে সরে আসতে দেখা যায়নি; কেননা তারা যুদ্ধে পরাজয়ের শঙ্কা টের পেলে মরু অঞ্চলকে পেছনে ফিরে যাবার জন্য ব্যবহার করে থাকে। পশ্চিম দিকটাকে মুসলমানদের আগমনের সম্ভাব্য দিক নির্বাচন করে সম্রাট তৃতীয় আরদাশির 'ওয়ালাজা' নামক জায়গাটিকে ধরে নেন যে, এখানেই খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের বাহিনীর গতিরোধ করে তাদেরকে চিরতরে কবরস্থ করা সম্ভব।

পারসিকদের প্রথম বাহিনী ততক্ষণে টেসিফুন (Ctesiphon) নামক স্থানে চলে এসেছে। খোরাসানের গভর্নরের নেতৃত্বে এ বাহিনী ধীরেধীরে ওয়ালাজার দিকে এগোতে থাকে, যেখানে কিছুক্ষণের মধ্যেই দ্বিতীয় বাহিনী তাদের সাথে মিলিত হবে। সে-মতে প্রথম বাহিনী টেসিফুন থেকে বের হয়ে দজলার পূর্ব পাড় ঘেঁষে কাসকার এলাকা দিয়ে নদী পার হয়ে যায়। এরপর পশ্চিম-দক্ষিণ দিক হয়ে তারা ফোরাতের দিকে এগিয়ে যায়। ওয়ালাজার কাছাকাছি এসে গেলে তারা ফোরাত পার হয়ে ওয়ালাজায় সেনা তাঁবু স্থাপন করে যাত্রা ক্ষান্ত দেয়।

মুসলিম বাহিনী
উল্লাইসের যুদ্ধে বিজয় মুসলমানদের জন্য ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য ক্ষয়ক্ষতি সয়ে সে-যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী পারস্যের বিশাল সেনাদলকে পরাজিত করে। সাথে হাসিল করে নেয় বিপুল পরিমাণ গনিমতের সম্পদ। এতে সেদিন থেকে পারসিকদের বহু সম্পদের উৎস মুসলমানদের হস্তগত হয়ে যায়। অথচ ততদিনে তারা কেবল ভিন্ন দুটি যুদ্ধে দুটি আলাদা বাহিনীর মোকাবেলা করেছে। এমনকি সে যুদ্ধগুলোর ভূমিও নির্ধারণ করেছে মুসলমানরা। তবে পারস্যের ছোট ছোট সহায়ক বাহিনী (Backup Force) তাদের সে ধারা নষ্ট করেছে। আমরা পূর্বেও বলেছি, পারসিকরা একই সময়ে একাধিক সেনাবাহিনী প্রস্তুত করতে পারত।

খালিদ তাঁর তদন্ত টিমকে নির্দিষ্ট কাজে নিয়োজিত রেখেছিলেন, যারা তাকে ক্ষণে ক্ষণে পারস্য বাহিনীর অবস্থান ও গতি-প্রকৃতি তাকে জানিয়ে দিচ্ছিল। খালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর এ বিশেষ টিম ছিল আরবের এমন সব অঞ্চলের লোকজন, যা ছিল পারসিকদের আঁতুড়ঘর। তাই এরা পারস্যের নতুন বাহিনী গঠন, ওয়ালাজায় তাদের অবস্থান গ্রহণ এবং তাদের বিপুল যুদ্ধপ্রস্তুতির কথা সহজেই খালিদের কাছে পৌঁছে দেয়। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু 'আল-হিরা' (Al-Hirah) অঞ্চল অধিকার করতে পূর্ব থেকেই ছিলেন বদ্ধপরিকর। ওয়ালাজা এলাকাটি 'আল-হিরা'র পথেই ছিল; তাই সাথে থাকা পনেরো হাজার সেনার বাহিনী নিয়ে খালিদ মূলত রওনা করেন আল-হিরা শহরকে টার্গেট করে। জলাভূমি পার হয়ে তিনি দ্রুত তাঁর বাহিনী এগিয়ে নিচ্ছিলেন। বাহামানের কল্পনার কয়েক দিন আগেই পূর্ব দিকে মুসলিম বাহিনীর উদয় ঘটল; ওয়ালাজার সামান্য দূরত্বে এসে তারা সেনাদের জন্য তাঁবু খাটাল।

খালিদের সুদক্ষ রণকৌশল
ওয়ালাজায় পারস্য বাহিনীর কিরাাট সংখ্যক সাসানি সেনা ছিল পূর্বের যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা। এরা এখানে এসে পুনরায় অস্ত্র হাতে তুলেছে। যাতুস সালাসিল যুদ্ধ থেকে বেঁচে আসা সেনারা যুক্ত হয়েছিল কারিনের সাথে, এরপর তারা উল্লাইসের যুদ্ধে মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়েছে। আবার সেখানে যারা পরাজিত হয়ে পলায়ন করেছিল, তাদেরকে এখন দেখা যাচ্ছে খোরাসানের শাসকের সাথে একজোট হয়ে ওয়ালাজায় এসে জড়ো হয়েছে।

অবস্থাদৃষ্টে মুসলমানরা দুটি কৌশলগত পরিকল্পনা করে। একটি সামগ্রিক, আরেকটি তুলনামূলক আংশিক এবং আনুষঙ্গিক।
এক: সামগ্রিক পরিকল্পনা
পারস্যের দুই বাহিনী অচিরেই একত্র হয়ে মুসলমানদের প্রতিরোধ করার সম্ভাবনা ছিল। এ আশংকার সমাধানে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ চিন্তা করেন, উপস্থিত প্রতিপক্ষের উপর দ্রুত হামলে পড়বেন এবং বাহামানের নেতৃত্বে দ্বিতীয় বাহিনী ময়দানে এসে পৌঁছার আগেই খোরাসানের শাসকের অধীনে ময়দানে হাজির প্রথম এ বাহিনীর ফায়সালা চূড়ান্ত করবেন। এরপর দ্বিতীয় বাহিনী এলে আলাদা করে তাদের মোকাবেলা করা যাবে।
দুই: আনুষঙ্গিক পরিকল্পনা
যুদ্ধের ময়দান থেকে শত্রুপক্ষের একজন সেনাকেও পালাতে দেয়া হবে না, যাতে তারা নতুন করে কাতারবদ্ধ হয়ে পুনরায় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে না পারে, যেমনটা এ-যাবৎ তারা করে এসেছে। এ-জন্য সেনাপতি খালিদ ভাবলেন, পারস্য সেনাদের সবদিক থেকে ঘিরে ফেলবেন, পেছন দিক থেকে আক্রমণ করবেন এবং সেখানে তাদেরকে নিঃশেষ করে ফেলবেন। বস্তুত খালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর এবারের পরিকল্পনাও ছিল অনেকটা সাঁড়াশি চিন্তা-উদ্ভূত।

এদিকে তিনি সুওয়াইদ ইবনু মুকরিনকে আদেশ করলেন, কিছু দায়িত্বশীল লোক নিয়ে বিজিত অঞ্চলগুলোর প্রশাসনের দিকে নজর রাখতে। আরেকদল সাহসী জানবাজদের ছড়িয়ে দিলেন দজলা নদীর আশপাশে, যাতে তারা শত্রুপক্ষের দ্বিতীয় প্লাটুনকে নদী পার হয়ে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে মুসলিম বাহিনীর উপর হামলে পড়া থেকে বাধা দেয়। পাশাপাশি সেদিক থেকে শত্রুসেনাদের ব্যাপারে যে-কোনো ধরনের সতর্ক বার্তা যেন সরাসরি মূল বাহিনীতে পৌঁছে দেয়।

যুদ্ধের ভূমি
পারস্য বাহিনীর সাথে মুসলমানদের এবারের যুদ্ধের ভূমি ছিল প্রায় দুই মাইল দীর্ঘ দিগন্তবিস্তৃত সমতল জমিন। যার দুপাশ স্বাভাবিক ভূমি থেকে প্রায় তিরিশ কদম উঁচু। এ সমতল ভূমির উত্তর-পূর্ব পাশ ঢুকে গেছে উত্তপ্ত মরু অঞ্চলে; এই উত্তর-পূর্ব দিকের অনতিদূরেই বয়ে গেছে 'খাসেফ' নামে ফোরাতের একটি উপনদী।

যুদ্ধের ক্ষণ
প্রথম বাহিনীর সেনাপতি খোরাসানের শাসক সাহায্যের ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত ছিল। তাই সে তার বাহিনীকে নদীর পাড় থেকে মাইল খানেক ভেতরে নিয়ে যাওয়ায় কোনো অসুবিধা বোধ করেনি। তখন হিজরি ১২তম বর্ষ (মে, ৬৩৩ খ্রি.)। চূড়ান্ত যুদ্ধের জন্য উভয় বাহিনী তাদের বিন্যাস সেরে নিয়েছে। প্রত্যেক বাহিনীর রয়েছে একটি কেন্দ্রীয় ভাগ ও কিছু শাখা অংশ। মুসলমানদের শাখা অংশগুলোর নেতৃত্বে ছিলেন আসেম ইবনু আমর আর আসি ইবনু হাতিম। ওদিকে পারস্যের বাহিনী সমতল ভূমির মাঝামাঝি এসে গেছে। তারা ছিল পূর্ব এবং পূর্ব-দক্ষিণমুখী। খালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু উনার বাহিনীকে দাঁড় করিয়েছেন পারস্য সেনাদের মুখোমুখি করে পূর্ব-উত্তরের টিলাগুলোর সামনে এবং অনেকটা ময়দানের ঠিক মাঝামাঝি অংশে। এ-যুদ্ধে মুসলিম সেনাদের অধিকাংশই ছিলেন মেষপালক, অশ্বারোহণে অভিজ্ঞ ছিলেন হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন।

পারস্যের অপেক্ষারত বাহিনী ভেবেছিল, খালিদের বাহিনী না-জানি কত বড় ও বিশাল হবে। ওয়ালাজার যুদ্ধের আগের রাতে সেনাপতি খালিদ বিশর ইবনু আবি রাহাম এবং সাঈদ ইবনু মারাকে দুই হাজার সেনার দুটি ছোট বাহিনীর নেতা বানিয়ে প্রেরণ করেন। তাদেরকে তিনি নিম্নোক্ত নির্দেশনা দেন:
১. প্রত্যেকে মধ্যরাতের দিকে সকলে ঘুমিয়ে গেলে তার অশ্বারোহী সেনাদের নিয়ে পারস্যের অশ্বারোহী শিবিরের দক্ষিণ দিকে দ্রুত বের হয়ে যাবে।
২. শত্রুদের অশ্বারোহী শিবিরের পেছনের সারিবদ্ধ টিলাগুলোর অপরপাশে পৌঁছে গেলে তোমরা তোমাদের সেনাদের লুকিয়ে ফেলবে।
৩. ভোরবেলা যখন যুদ্ধ শুরু হবে, তোমাদের এ দুটি দলের সেনারা তখন টিলার পেছনে লুকিয়ে থাকবে।
৪. আমি ইশারা দিতেই পেছন থেকে পারস্যের বাহিনীর উপর তোমরা হামলে পড়বে।

সেনাপতি খালিদ এ-নির্দেশনা ও দায়িত্ব তাদেরই দিয়েছিলেন, যারা তাঁর পরিকল্পনা সুষ্ঠুরূপে বুঝতে ও আঞ্জাম দিতে পারবে। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ তাঁর অবশিষ্ট ১৪ হাজার সেনাকে পারসিক সাসানি বাহিনীর সামনে দাঁড়াকালেন। ওদিকে প্রতিপক্ষ সেনাদের নিয়ে তাদের সেনাপতির পরিকল্পনা ছিল প্রতিরোধমূলক। তারা মুসলমানদেরকে প্রথমে আক্রমণ করার সুযোগ দিচ্ছিল এবং নিজেরা পণ করেছিল তাদেরকে ঠেকিয়ে দেয়ার।

ময়দানে যুদ্ধের প্রথম সূচনাটা প্রতিপক্ষের সেনাপতির পরিকল্পনা মতোই হলো। খালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু তার বাহিনীকে ব্যাপকভাবে শত্রুদের উপর হামলা করার নির্দেশ দিলেন। পারস্য সেনাদের কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ছিল, সেনাদলের সাহসী পুরুষেরা সেগুলো পরিকল্পনামতো বাস্তবায়নের চেষ্টা করল। এরই মধ্যে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ পারস্যের প্রসিদ্ধ বীর যোদ্ধার সাথে—যাকে হাজারমর্দ নামে ডাকা হতো—মুখোমুখি যুদ্ধ করলেন এবং তাকে মেরে ফেললেন। এতে মুসলমানদের ভেতর প্রাথমিক মনস্তাত্ত্বিক বিজয় খেলে গেল।

প্রথম ভাগের যুদ্ধ ততক্ষণে শেষ। দ্বিতীয় ভাগের যুদ্ধ শুরু হলো পারস্য বাহিনীর পাল্টা আক্রমণ দিয়ে। প্রতিপক্ষের সেনাপতি এ-সময় মুসলিম বাহিনীতে কিছুটা ক্লান্তির ছাপ দেখতে পেল। তাই সে ভাবল, এটাই মুসলিম বাহিনীকে সমূলে উৎখাতের জন্য পারসিক সেনাদের চূড়ান্ত আক্রমণের উপযুক্ত সময়। এই ভেবে সে ভারী অস্ত্রধারী মূল অশ্বারোহীদের বাহিনীর সামনের দিকে নিয়ে আসল মুসলমানদের মেরে ফেলার জন্য। মুসলমানরা কিছু সময় তাদের মোকাবেলা করল, কিন্তু প্রতিপক্ষের অশ্বারোহীরা যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করছিল, তাই মুসলমানরা অস্পষ্টভাবে খানিকটা পিছু হটতে লাগল।

পরিশেষে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর মূল পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে টিলার পেছনে লুকিয়ে থাকা সেনাদের বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত দিলেন। পারস্য বাহিনীর তাঁবুদের পেছন থেকে তারা বের হয়ে এলে তাদের যোদ্ধারা দুভাগ হয়ে গেল। একদল পেছনের ডান দিক সামাল দিতে চলে গেল, আরেকদল বাম দিক মোকাবেলা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু এরপরও পারস্য অশ্বারোহীদের ভারী অস্ত্রগুলো মুসলমান অশ্বারোহীদের হালকা ও সামান্য অস্ত্রের মোকাবেলায় পেরে উঠছিল না। এভাবে পারসিক অশ্বারোহীরা হেরে গেলে ছোট ছোট দলবদ্ধ হামলা করে তাদেরকে সংকুচিত করে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরা হলো। এরপর খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বে থাকা মুসলিম বাহিনীর মূল অংশ পারসিক বাহিনীর সম্মুখভাগে আক্রমণ করল। এরই মধ্যে পরিকল্পনামতো অশ্বারোহীদের দুই টিম তাদেরকে পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে ফেলেছে। ফলে পারস্য বাহিনী এমন জালে আটকে গেল, যা থেকে পালাবার আর কোনো উপায় রইল না। চারদিক থেকে ধারাবাহিক আক্রমণ হওয়ায় পারস্যের সেনারা এমন এক বৃত্তে আটকে গেল, যেখান থেকে তারা স্বাধীনভাবে না হাতিয়ার উঠাতে পারছিল— না পারছিল আক্রমণকারীদের প্রতিরোধ করতে।

যুদ্ধ তখন শেষ। পারস্যের বাহিনীর লজ্জাজনক পরাজয় হয়েছে। সাকুল্যে মাত্র কয়েক হাজার সেনা পালাতে পেরেছে, তাদের মধ্যে আছে খোদ সেনাপতিও। কিন্তু ফোরাতের দিকে কোনো পথ না পেয়ে তারা দৌড়ে গেছে মরুভূমির উত্তপ্ত বালুর দিকে। পরে সেখানে বাহিনীর সেনাপতিসহ অনেকে পিপাসায় কাতর হয়ে ক্লান্তি ও কষ্টে মৃত্যুর কোলে ঢলে গেছে।

wars-এর পরকথা
যুদ্ধ থেমে গেলে মুসলিম সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর সেনাদের একত্র করলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, আজকের যুদ্ধ পারস্য শক্তির জন্য প্রচণ্ড ভীতি ও চাপ সৃষ্টি করবে। যদিও মুসলমানরা পারসিক বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করতে পেরেছে, কিন্তু তারপরও—ওয়ালাজার এ-যুদ্ধ ইরাকের মাটিতে মুসলমানদের জন্য সবচে দীর্ঘ এবং ঘোরতর যুদ্ধ ছিল; আর এ-জন্য যুদ্ধকালের পুরোটা সময়জুড়ে সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ যে-কোনো মূল্যে মুসলমানদের মনস্তত্ত্ব উঁচু রাখতে নানাভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন।

📘 ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ নববী যুগ থেকে বর্তমান 📄 আইন আত-তামর যুদ্ধ

📄 আইন আত-তামর যুদ্ধ


আইন আত-তামর যুদ্ধ BATTLE OF AYN AL-TAMR
তারিখ: ১২তম হিজরি / ৬৩৩ খ্রি.
স্থান: আইন আত-তামর, ইরাক
ফলাফল: মুসলিম বাহিনীর বিজয়
পক্ষ-বিপক্ষ: খিলাফতে রাশিদা (মুসলিম) বনাম ইরাকের সাসানি গোষ্ঠী এবং তাদের আরব সহযোগীরা
সেনাপ্রধান: খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ বনাম আক্কা ইবনু আবি আক্কা
সেনাসংখ্যা: ৫/৬ শত বনাম ১০ হাজার
ক্ষয়ক্ষতি: সামান্য, যা উল্লেখযোগ্য নয় বনাম প্রচুর

আইন আত-তামর নামে প্রসিদ্ধ এ-যুদ্ধটি সংঘটিত হয় সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী এবং সাসানীয় জোট শক্তিগুলোর মাঝে। এ-যুদ্ধে আরবের বেশকিছু খ্রিস্টান গোত্র সাসানীয়দের সঙ্গে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অংশ নেয়। 'আনবার' অঞ্চলের পশ্চিমে অবস্থিত আইন আল-তামর এলাকাটি পারসিকরা তাদের সীমান্ত রক্ষার জন্য স্থাপন করেছিল। মুসলিম সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের হাতে দ্বাদশ হিজরিতে (৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে) 'আল-হিরা' শহর পতনের পর মুসলমান সেনাবাহিনী এই আইন আল-তামরে অবস্থিত পারস্যের সবচেয়ে বড় দুর্গের দিকে যাত্রা করে। দুর্গটি তখন মোটাদাগে দুই ভাগে বিভক্ত ছিল: প্রথমাংশ ছিল পারসিকদের, যার নেতৃত্বে ছিল পারস্য সেনাপতি মেহরান ইবনু বাহরাম। দ্বিতীয়াংশ ছিল আরবীয়দের, যেখানে আক্কা ইবনু আবি আক্কার নেতৃত্বে বসবাস করত তাগলিব, নামর এবং ইয়াদ গোত্রের লোকেরা।

এ যুদ্ধটি ইতিহাসে অন্যতম 'দ্রুতসমাপ্ত' যুদ্ধ হিশেবে পরিচিত; যেখানে আরবের খ্রিস্টানরা ময়দানে কার্যত কোনো যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার আগেই তল্পিতল্পা তুলে পালিয়ে গিয়েছিল।

যুদ্ধের আগে
আইন আত-তামর দুর্গে আরবদের নেতৃত্বে থাকা আক্কা ইবনু আবি আক্কা হঠাৎই অহংকারী এবং উদ্ধত হয়ে ওঠে। সে পারস্য নেতা মেহরানকে বলে, ময়দান খালি করে দিতে, যাতে সে পারসিকদের কোনো সহায়তা ছাড়া একাই মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে। মেহরান আক্কার এমন বাসনা দেখে তার প্রস্তাবে সম্মত হয়ে গেল। মেহরান মূলত মুসলমানদের সাথে সম্মুখযুদ্ধ এড়াতে চাচ্ছিল; কারণ সে জানত, ইরাকে লাগাতার বিজয়ের কেতন উড়িয়ে আসা অদম্য এ বাহিনী পরাভূত হবার নয়। মেহরানের যুক্তি ছিল, এই আরবরা খালিদকে পরাজিত করলে সেটা পারসিকদের জন্য কল্যাণ; আর তারা হেরে গেলে পারসিকরা তখন মাঠে নামবে।

যুদ্ধ
আক্কা তার খ্রিস্টান আরব সেনাদের নিয়ে মুসলিম বাহিনীর মোকাবেলার উদ্দেশ্যে সদম্ভে 'আইন আল-তামর' দুর্গ থেকে বের হলো। চলতে চলতে 'কারখ' নামক স্থানে পৌঁছে সে যাত্রাবিরতি করল এবং সেনাদের প্রস্তুত করে নিল। ওদিকে মুসলমানরাও যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত। সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ দ্রুত তাঁর সেনাদের গুছিয়ে নিলেন। মুসলিম সেনাপতি খালিদ শত্রুপক্ষের সেনাপতি আক্কাকে দেখে বুঝতে পারলেন লোকটা খুব অহংকারী। তাই তিনি দুঃসাহসিক এক অভিনব কৌশল করার চিন্তা করলেন। ভাবলেন, প্রতিপক্ষের সেনাপতি আক্কার উপর বজ্রাঘাতের মতো এক প্রাণোৎসর্গকারী হামলা চালাবেন এবং তাকে অপহরণ করে নিয়ে আসবেন। সে-মতে তিনি একদল বীর বাহাদুর সেনা নির্বাচন করলেন।

যুদ্ধ-পরিকল্পনার দাবি ছিল, মুসলমানরা আগে ছোট ছোট দলবদ্ধ আক্রমণ শুরু করবে। মুসলিম বাহিনীর দুই পাশকে হালকা আক্রমণে লাগিয়ে প্রতিপক্ষের মনোযোগ সেদিকে নিবদ্ধ রাখলেন; মাঝের মূল অংশকে নীরব রেখে সেনাপতি খালিদ চূড়ান্ত হামলার জন্য তাঁর ইঙ্গিতের অপেক্ষা করতে বললেন। এর অল্প কিছুক্ষণ পরে যা ঘটল, তাতে খ্রিস্টানদের দশ হাজার সেনা হতবুদ্ধি হয়ে গেল। তখনও আঘাতের ঘোর কাটেনি, আক্কা নিজেকে আবিষ্কার করল খালিদের দু হাতের মধ্যে—বন্দি অবস্থায়। সেনাপতি খালিদ তাকে বাচ্চাদের মতো দুই হাতে তুলে নিয়ে মুসলমানদের সারিতে এনে ফেললেন। এ দৃশ্য দেখে আরবীয় খ্রিস্ট সেনাদের শিরাগুলোয় রক্ত জমে গেল। তারা ময়দান ছেড়ে পালাতে শুরু করল।

জয়ের প্রাপ্তি ও পরাজয়ের পূর্ণতা
যুদ্ধের পরিস্থিতি জানতে মেহরান ময়দানে লোক পাঠিয়ে রেখেছিল। সে যখন জানতে পারল, আক্কা ও তার বাহিনী পরাজিত হয়েছে, কেল্লা থেকে নেমে দ্রুত সে তার দুর্গবাসীদের নিয়ে টেসিফুন বা মাদায়েনের দিকে পালিয়ে গেল। দুর্গ পড়ে রইল ন্যূনতম প্রহরাহীন অবস্থায়। ময়দান ছেড়ে পালিয়ে আসা আরব সেনারা দুর্গে প্রবেশ করে নিজেদের নিরাপদ জ্ঞান করে। কিন্তু খালিদ তাদের পশ্চাদ্ধাবনে দুর্গের বাইরে চলে আসেন এবং শক্ত অবরোধ করেন। তারা নেমে এলে শেকলে জড়ানো হয় সকলের পা, দুর্গ হস্তান্তর হয় মুসলিম সেনাপতির হাতে। এরপর আক্কা ও ময়দানে যুদ্ধ অবস্থায় বন্দি হওয়া অন্যদের শিরশ্ছেদ করা হয়।

খালিদের যে বন্দিরা মহৎ বড়
দুর্গ জয়ের পর সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ সেটার ভেতরে প্রবেশ করলেন। সেখানে গির্জার ভেতর এক কারাপ্রকোষ্ঠে দেখতে পেলেন চল্লিশটি স্বল্পবয়সী বালক, যারা ইনজিলের জ্ঞান আহরণে মত্ত ছিল। সেনাপতি তালা ভেঙে তাদের জীবন বাঁচালেন; এরপর মুসলিম ভূমি, রাজ্য ও দেশ-বিদেশে তাদেরকে ছড়িয়ে দিলেন। আইন আল-তামর দুর্গে সেনাপতি খালিদের হাতে আসা সে-সব বালকদের একজন ছিলেন সিরিন, যিনি প্রসিদ্ধ ফকিহ ইমাম মুহাম্মদ ইবনু সিরিনের পিতা। তেমনি এই বন্দিদলের আরেকজন ছিলেন নুসাইর, যার ঔরসে পরবর্তীতে জন্ম গ্রহণ করেন দিগ্বিজয়ী মুসলিম সেনাপতি মুসা বিন নুসাইর।

📘 ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ নববী যুগ থেকে বর্তমান 📄 দাওমাতুল জানদাল যুদ্ধ

📄 দাওমাতুল জানদাল যুদ্ধ


দাওমাতুল জান্দাল যুদ্ধ BATTLE OF DAWMAT AL-JANDAL
তারিখ: ১২তম হিজরি / ৬৩৩ খ্রি.
স্থান: দাওমাতুল জান্দাল
ফলাফল: মুসলিম বাহিনীর বিজয়
পক্ষ-বিপক্ষ: খিলাফতে রাশিদা (মুসলিম) বনাম কালব নামক আরবের খ্রিস্টান গোত্র
সেনাপ্রধান: খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ বনাম জুদি ইবনু রাবিআ
সেনাসংখ্যা: ১০ হাজার বনাম ১২/১৫ হাজার
ক্ষয়ক্ষতি: জানা যায় নি বনাম অধিকাংশ সেনা নিহত, মহিলা শিশুসহ বহু যুবক আটক

দাওমাতুল জান্দাল। দ্বাদশ হিজরি সময়ের আরব উপদ্বীপ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র। জায়গাটি প্রসিদ্ধ হয় এখানে অবস্থিত জনপ্রিয় বাজারটির কারণে। দাওমাতুল জান্দালের মানুষেরা বিভিন্ন মূর্তির পূজা করত। তাবুক যুদ্ধের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এ অঞ্চলে আসেন এবং 'ওয়াদ' মূর্তিটি গুঁড়িয়ে দেন।

দাওমাতুল জান্দালে মুসলমানদের বারংবার অভিযান
দাওমাতুল জান্দালে মুসলমানদের মোট চারটি অভিযান পরিচালিত হয়। প্রথমবার ৫ম হিজরিতে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) সেখানে হাজির হন। এরপর ৬ষ্ঠ হিজরিতে আবদুর রহমান ইবনু আওফ এবং নবম হিজরিতে হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ সেখানে অভিযান পরিচালনা করেন।

যুদ্ধকালীন মুসলমানদের খলিফা
দ্বাদশ হিজরি চলছে। মুসলিম জাহানের খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু ইয়াজ ইবনু গানামকে পাঠালেন দাওমাতুল জান্দাল অধিকার করার ফরমান দিয়ে। ইয়াজ যখন দাওমাতুল জান্দালে পৌঁছলেন, শহরটি তখন খ্রিস্টানঅধ্যুষিত 'কালব' গোত্রের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ইয়াজ দুর্গের দক্ষিণ দিকে তাঁর বাহিনীর শিবির স্থাপন করলেন। কয়েক সপ্তাহ এভাবে কেটে গেল। দুর্গের ভেতর থেকে কিছু তির-বর্শা উড়ে আসা ছাড়া কার্যকর কোনো যুদ্ধই হলো না। অগত্যা সেনাপতি ইয়াজ ইরাকে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের কাছে সাহায্য চেয়ে একটি পত্র পাঠালেন। মহান সেনাপতি খালিদ তখন আইন আল-তামরের কাজ শেষ করেছেন। ইয়াজের পত্র পেয়ে পরদিন তিনি ছয় হাজার সৈন্য নিয়ে দাওমাতুল জান্দাল অভিমুখে যাত্রা করলেন।

পরিস্থিতির নতুন মোড়
দুর্গের ইটে ইটে খবর রটে গেল, খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ এসেছেন দাওমাতুল জান্দাল অবরোধে। দুর্গরুদ্ধ সেনাদের মূল নেতৃত্বে ছিল দুইজন, আকিদর ইবনে আবদুল মালিক আল-কিন্দি এবং জুদি ইবনে রাবিআ। হঠাৎ এ দুই আরবনেতার মধ্যে বিরোধ দেখা দিল এবং আকিদর নেতৃত্ব থেকে সরে পড়ল। আকিদর বলেছিল: 'খালিদের ব্যাপারে আমার চেয়ে ভালো কেউ জানে না, যুদ্ধের ময়দানে তার চেয়ে ভাগ্যবান এবং সাহসী নেতা হতে পারে না।' আকিদর দুর্গ থেকে বেরিয়ে গেল। কিন্তু তার দুর্গ ছাড়ার কথা পৌঁছে গেল খালিদের কাছে। তিনি আসিম ইবনু আমরকে পাঠালেন তাকে ধরে আনতে এবং পরবর্তীতে তার শিরশ্ছেদ করা হয়।

খ্রিস্টানরা সাহায্যের আবেদন সমেত পার্শ্ববর্তী আরব গোত্রগুলোতে দূত পাঠাল। কালব এবং গাসসান গোত্রের সেনারা দুর্গ বাঁচাতে তাদের সাথে অংশ নিল। ফলে সেনাসংখ্যা এত বেড়ে গেল যে, দুর্গে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় অনেকে দুর্গের দেয়ালের নিচে অবস্থান গ্রহণ করল।

যুদ্ধের গতি
সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ এসে ইয়াজ ইবনু গানামকে তাঁর নেতৃত্বে নিয়ে নিলেন। এখন দুই বাহিনী মিলে মুসলমানদের সেনাসংখ্যা দাঁড়াল প্রায় ১০ হাজারে। খালিদ ইয়াজের বাহিনীকে দায়িত্ব দিলেন দুর্গের দক্ষিণ দিকের গমনপথ আটকে দিতে এবং নিজের বাহিনী নিয়ে তিনি উত্তরের দিকগুলো অবরোধ করলেন।

আরব খ্রিস্টান বাহিনীর নেতা জুদি ইবন রাবিআ ভাবল সে নিজেই মুসলিম বাহিনীর প্রধান সেনাদলের ওপর হামলা করবে। জুদি যখন বাহিনী নিয়ে মুসলিমদের সামনে এগিয়ে এল, তখন সে দেখল মুসলমানরা যুদ্ধের জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছে। যখন উভয় বাহিনীর সামনে খুব বেশি আর দূরত্ব নেই, খালিদ তখন তাঁর বাহিনীকে অতর্কিত হামলে পড়ার নির্দেশ দিলেন। অল্প সময়ের ভেতর জুদির বাহিনীকে দমন করা হলো। বন্দি হলো গোত্রপতি জুদি, বাকিরা দুর্গের দিকে পালিয়ে গেল। মুসলিম সেনারা তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে দুর্গের ফটক আটকে দিল। ফটকের সামনেই অনেক খ্রিস্টান সেনার প্রাণ গেল। সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ জুদি ও তার সাথে বন্দি হওয়া অন্যদের ধরে দুর্গের সামনে নিয়ে এলেন এবং তাদের শিরশ্ছেদ করলেন। এরপর চূড়ান্ত হামলা চালিয়ে দুর্গটি দখল করে নেয়া হয়।

যুদ্ধ যখন শেষ
যুদ্ধের পরও বেশ কিছুদিন সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ দাওমাতুল জান্দালে অবস্থান করলেন। এরপর ইয়াজ ইবনু গানামকে সাথে নিয়ে তিনি 'আল-হিরা' নগরীর পথ ধরলেন। এ ঘটনাটি দ্বাদশ হিজরির (৬৩৩ খ্রিস্টাব্দ) আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহের।

ফন্ট সাইজ
15px
17px