📄 খাইবার যুদ্ধ
খাইবার যুদ্ধ BATTLE OF KHAYBAR
তারিখ: ৭ম হিজরি / ৬২৮ খ্রি.
স্থান: মদিনা থেকে ষাট বা আশি মাইল দূরে খাইবারে
ফলাফল: মুসলমানদের বিজয়
পক্ষ-বিপক্ষ: মুসলমান বনাম খাইবারের ইহুদিরা
সেনাপ্রধান: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বনাম আল-হারিস ইবনু আবি যাইনাব, মারহাব ইবনু আবি যাইনাব
সেনাসংখ্যা: ১৪০০ বনাম ১৪,০০০ (মতান্তরে ১৬০০ বনাম ১৪০০০)
ক্ষয়ক্ষতি: ২০ জনের মতো শহিদ বনাম ৯৩ জন নিহত
খাইবার একটি উর্বর এলাকা যার চারপাশ অসংখ্য খেজুর গাছে ঘেরা। সপ্তম হিজরির মুহাররম মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চৌদ্দশ সাহাবার এক বিশাল কাফেলা নিয়ে এই দুর্গের দিকে রওনা হন।
যুদ্ধের পটভূমি
মদিনা থেকে বিতাড়িত ইহুদিরা খাইবারে গিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের আখড়া গড়ে তুলেছিল। তারা খন্দকের যুদ্ধে মুশরিকদের উস্কে দিয়েছিল। হুদাইবিয়ার সন্ধির পর রাসূল চাচ্ছিলেন ইসলামের অগ্রযাত্রায় এই বিষফেঁড়াটি উপড়ে ফেলতে। আল্লাহ তাআলা সুরা ফাতহে খাইবার বিজয়ের সুসংবাদ দেন এবং ঘোষণা করেন যে, এ অভিযানে কেবল তারাই যেতে পারবে যারা হুদাইবিয়ায় উপস্থিত ছিল।
যুদ্ধ ও দুর্গ জয়
খাইবার এলাকাটি মূলত দুটি অঞ্চলে বিভক্ত ছিল এবং সেখানে অনেকগুলো সুদৃঢ় দুর্গ ছিল। প্রথম দিকে মুসলমানদের অগ্রগতি ধীর হলেও এক রাতে রাসূল ঘোষণা করলেন, 'কাল আমি এমন একজনের হাতে পতাকা তুলে দেব, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে এবং দুর্গ বিজিত হবে।' পরদিন তিনি হযরত আলির হাতে পতাকা দেন।
নায়িম দুর্গের পতন ঘটাতে হযরত আলি ইহুদি বীর মারহাবকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে হত্যা করেন। এরপর একে একে সাব ইবনু মুয়ায, যুবাইর এবং উবাই দুর্গগুলো বিজিত হয়। দ্বিতীয় অঞ্চলের কামুস, ওয়াতিহ এবং সুলালিম দুর্গগুলো দীর্ঘ অবরোধের পর ইহুদিরা সন্ধির প্রস্তাব দেয়।
ফলাফল
এ যুদ্ধে প্রায় ৯৩ জন ইহুদি নিহত হয় এবং ২০ জনের মতো মুসলমান শহিদ হন। ইহুদিরা তাদের জমিনে বর্গা চাষের শর্তে খাইবারে থাকার অনুমতি পায়। এ বিজয়ের পরই হযরত জাফর ইবনু আবি তালিব হাবাশা থেকে ফিরে আসেন এবং আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম গ্রহণ করেন। এ অভিযানেই সাফিয়্যাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা বন্দি হন এবং পরে রাসূল তাঁকে বিবাহ করেন। যুদ্ধের পর এক ইহুদি মহিলা রাসূলের খাবারে বিষ মিশিয়ে দিলে আল্লাহর অশেষ কৃপায় তিনি বেঁচে যান, তবে সাহাবি বশির ইবনু বারা বিষক্রিয়ায় শাহাদাত বরণ করেন। খাইবার বিজয়ের পর ফাদাক, ওয়াদিল কুরা এবং তাইমা অঞ্চলগুলোও মুসলমানদের অধীনে চলে আসে।
টিকাঃ
[১] তবে এ ঘটনার বেশকিছু বর্ণনা বিচার করলে মনে হয়, এ ঘটনা অন্য কোনো সফরেও হতে পারে।
📄 মক্কা বিজয়
মক্কা বিজয় CONQUEST OF MECCA
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে মুশরিকদের দখল থেকে পবিত্র শহর মক্কা অধিকারের ঐতিহাসিক ঘটনাটি সংঘটিত হয় ৮ম হিজরির (৬৩০ খ্রি.) ২০শে রমজান।
ঘটনার অনুঘটক
হুদাইবিয়ার সন্ধির শর্ত ভেঙে কুরাইশরা তাদের মিত্র বনু বকরের সাথে মিলে মুসলমানদের মিত্র খুযাআ গোত্রের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায় এবং হারাম শরিফের সীমানায় তাঁদের হত্যা করে। এই বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিবাদে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনটি শর্ত দেন, যার মধ্যে কুরাইশরা হুদাইবিয়ার সন্ধি বাতিল করার পথ বেছে নেয়। পরবর্তীতে আবু সুফিয়ান মদিনায় এসে সন্ধি নবায়নের চেষ্টা করলেও তা ব্যর্থ হয়।
কাফেলা প্রস্তুত হলো
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোপনে দশ হাজার সাহাবার এক বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করেন। এ সময় সাহাবি হাতেব ইবনু আবি বালতাআ একটি চিঠির মাধ্যমে কুরাইশদের খবর দিতে চাইলে রাসূল ওহির মাধ্যমে তা জেনে ফেলেন এবং চিঠিটি উদ্ধার করেন। হিজরি ৮ম বর্ষের ১০ রমজান মুসলিম সেনাদল মদিনা ত্যাগ করে।
বিজয়ের মাহেন্দ্রক্ষণ
মক্কার উপকণ্ঠে 'মাররে যাহরান' নামক স্থানে পৌঁছে রাসূলের নির্দেশে দশ হাজার আগুন জ্বালানো হয়, যা দেখে আবু সুফিয়ান ভীত হয়ে পড়েন এবং পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেন। মক্কায় প্রবেশের সময় রাসূল রাজধানীকে চারটি সারিতে বিভক্ত করেন যার নেতৃত্বে ছিলেন আবু উবাইদা, যুবাইর, আলি এবং খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শহরের উঁচু ফটক দিয়ে প্রবেশ করার সময় 'নিশ্চয়ই আমি তোমাকে দান করেছি সুস্পষ্ট বিজয়' আয়াতটি পাঠ করছিলেন। তিনি কাবাঘর তাওয়াফ করেন এবং কাবার ভেতরে থাকা ৩৬০টি মূর্তি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন। মক্কাবাসীদের উদ্দেশ্যে তিনি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে বলেন: 'আজ তোমাদের প্রতি আমার কোন অভিযোগ নেই; তোমরা যেতে পারো, কারণ তোমরা মুক্ত।'
বিজয়ের পর
মক্কা বিজয়ের দ্বিতীয় দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি ঐতিহাসিক খুতবা দেন যেখানে তিনি মক্কা নগরীতে রক্তপাত চিরতরে হারাম ঘোষণা করেন। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে তাঁর হাতে ইসলাম ও আনুগত্যের বাইয়াত গ্রহণ করে। এই বিজয়ের ফলে আরবের কোণায় কোণায় একত্ববাদের স্লোগান ছড়িয়ে পড়ে।
টিকাঃ
[১] সিরাতে ইবনে হিশাম: ৫/৫২
[১] বুখারি: ৪০২৫
[১] মুসলিম: ১৭৮০, আবু দাউদ: ৩০২১, নাসায়ি: ১১২৯৮, মুসনাদে আহমাদ: ৭৯০৯
[১] সুরা ফাতহ: ০১
[২] সুরা ইসরা; ৮১
[১] সুরা ইউসুফ: ১২; আস-সুনানুল কুবরা: বাইহাকি ১৮৭৩৯, সিরাতে ইবনু হিশাম: ২/৪১১, যাদুল মাআদ: ইবনুল কায়্যিম ৩/৩৫৬, আর-রাওদুল উনুফ: সুহাইলি ৪/১৭০, সিরাতে ইবনু কাসির: ৩/৫৭০, ফাতহুল বারি: ইবনু হাজার ৮/১৮
📄 হুনাইনের যুদ্ধ
হুনাইনের যুদ্ধ BATTLE OF HUNAYN
তারিখ: ৮ম হিজরি / ৬৩০ খ্রি.
স্থান: তায়েফসংলগ্ন হুনাইন উপত্যকা
ফলাফল: মুসলমানদের বিজয়
পক্ষ-বিপক্ষ: মুসলমান বনাম হাওয়যিন এবং সাকিফ গোত্র
সেনাপ্রধান: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বনাম মালিক ইবনু আওফ
সেনাসংখ্যা: ২০০০০ বনাম (জানা যায় নি)
ক্ষয়ক্ষতি: মুসলমানদের অনেকেই শাহাদাতবরণ করেন বনাম ৭০ জন নিহত
মক্কা ও তায়েফের মাঝামাঝি হুনাইন নামক স্থানে ৮ম হিজরির শাওয়াল মাসে এই ঐতিহাসিক যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। মক্কা বিজয়ের পর হাওয়াযেন ও সাকিফ গোত্র মুসলমানদের বিরুদ্ধে একজোট হয়।
যুদ্ধ শুরু হলো
শত্রুপক্ষ হুনাইন উপত্যকার গোপন ঘাঁটিগুলো থেকে অতর্কিত তির বৃষ্টি শুরু করলে মুসলমানরা শুরুতে বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। এ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অটল থেকে ডাক দিলেন— 'আমি মিথ্যাবাদী নবী নই, আমি আবদুল মুত্তালিবের সন্তান।' সাহাবারা পুনরায় সংগঠিত হয়ে পাল্টা আক্রমণ করলে মুশরিকরা পরাজিত হয়ে পালিয়ে যায়। তারা প্রায় ছয় হাজার ব্যক্তিকে বন্দি করেন।
তায়েফ অবরোধ
পলায়নপর সেনারা তায়েফের দুর্গে আশ্রয় নিলে রাসূল তায়েফ অবরোধ করেন। ২৩ দিন পর তিনি অবরোধ তুলে নিয়ে জিররানা নামক স্থানে অবস্থান নেন এবং হুনাইনে প্রাপ্ত গনিমত বণ্টন করেন। এ সময় আনসার সাহাবিদের কিছু মান-অভিমান সৃষ্টি হলে রাসূল তাঁদের প্রতি অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ও দরদভরা বক্তব্য দেন, যাতে তাঁদের মন জয় হয়ে যায়।
শিক্ষা ও উপদেশ
হুনাইনের যুদ্ধ মুসলমানদের শিখিয়েছে যে বিজয় সংখ্যাধিক্যে নয় বরং আল্লাহর সাহায্যে আসে। আল্লাহ তায়ালা সুরা তাওবায় এ যুদ্ধ সম্পর্কে আয়াত অবতীর্ণ করেছেন।
টিকাঃ
[১] বুখারি: ২৭০৯, মুসলিম: ১৭৭৬
[১] এর কারণ ছিল অনেকটা এমন যে, এরা মক্কা বিজয়ের পর সদ্য ইসলামে এসেছে। ... ফলে তারা তাদের চিরাচরিত লুটের স্বভাব তখনো কাটাতে পারেনি।
[১] সুরা তাওবা: ২৫-২৭
📄 মুততার যুদ্ধ
মুতার যুদ্ধ BATTLE OF MU'TAH
তারিখ: ৮ম হিজরি / ৬২৯ খ্রি.
স্থান: জর্ডানের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত মুতা প্রান্তরে
ফলাফল: রোমানদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে মুসলমানদের ময়দান ত্যাগ
পক্ষ-বিপক্ষ: মুসলমান বনাম রোমান বাহিনী (সহযোগী হিসেবে থাকে আরবের খ্রিস্টানরা)
সেনাপ্রধান: যাইদ ইবনু হারিসা, জাফর ইবনু আবি তালিব, আব্দুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা, খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ বনাম হেরাক্লিয়াস
সেনাসংখ্যা: ৩ হাজার বনাম ২ লক্ষ
ক্ষয়ক্ষতি: ১৩ জন শহিদ বনাম নিহতের সংখ্যা হাজার হাজার
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দূত হারিস ইবনু উমাইরের হত্যাকে কেন্দ্র করে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। এটি ছিল ইসলামে দূত হত্যার প্রথম ঘটনা।
যুদ্ধের বিবরণ
রাসূল ৩০০০ সেনার একটি বাহিনী প্রেরণ করেন এবং নির্দেশ দেন যদি যাইদ শহিদ হয় তবে জাফর, আর জাফর শহিদ হলে আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা নেতৃত্ব দেবেন। রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াস ২ লক্ষ সেনার এক বিশাল বাহিনী নিয়ে প্রস্তুত ছিলেন। মুতার ময়দানে একে একে তিন সেনাপতিই বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করেন। এরপর খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের পরিকল্পনা
খালিদ তাঁর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে রাতে সেনাবিন্যাস বদলে দেন এবং ধুলো উড়িয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি করেন যাতে রোমানরা মনে করে মুসলমানদের বড় সৈন্য সাহায্য এসেছে। এরপর তিনি সুকৌশলে রোমানদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে বাহিনীকে ফিরিয়ে আনেন। যদিও এটি একটি অসম যুদ্ধ ছিল, কিন্তু খালিদের রণকৌশলে মুসলমানরা বিজয়ী হয়ে ফিরে আসে।
টিকাঃ
[১] বুখারি: ৪০১৩, নাসায়ি: ৮২৪৯, মুসনাদে আহমাদ: ২২৬০৪
[২] মুসলিম: ১৭৩১
[১] সিরাতে ইবনু হিশাম: ২/৩৮২, সিরাতে ইবনু কাসির: ৩/৪৭৯