📄 খন্দক যুদ্ধ
খন্দক যুদ্ধ BATTLE OF THE TRENCH
তারিখ: ৫ম হিজরি / ৬২৭ খ্রি.
স্থান: মদিনা মুনাওয়ারা
ফলাফল: অবরোধ প্রত্যাহার এবং শত্রুপক্ষের পলায়ন
পক্ষ-বিপক্ষ: মুসলমান বনাম কুরাইশ (সাথে তিহামা, সালিম, গাতফান ও কিনানার কিছু মিত্রজোট; তবে মূল আহ্বায়ক বনু নাযির)
সেনাপ্রধান: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বনাম আবু সুফিয়ান, উয়াইনা ইবনুল হিসন, হারিস ইবনু আওফ, মিসআর ইবনু রাখিলা
সেনাসংখ্যা: ৩০০০ বনাম ১০০০০
ক্ষয়ক্ষতি: ৪ জন শহিদ বনাম ২ জন নিহত
আহযাব -বা খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয় ৫ম হিজরিতে, মুসলমান ও কুরাইশ এবং তাদের সহযোগী গাতফান ও কিনানা গোত্রের মাঝে। মুসলমানদের বিজয়, মদিনার অবরোধ মুক্তি এবং শত্রুপক্ষের সম্মিলিত বাহিনীর পলায়নের মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক এ-যুদ্ধটি সমাপ্ত হয়।
যে-সব কারণে যুদ্ধ
মদিনাবাসী ইহুদিদের শাখাগোত্র বনু নাযিরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেশান্তর করে দিলে তারা খাইবারে গিয়ে শেকড় গাড়ে। এর কিছুদিন পর ইহুদিদের একটি প্রতিনিধিদল অনিষ্ট চিন্তার বিনিময় ঘটাতে মক্কা মুকাররমায় যায়। এরাই ছিল আহযাব বা খন্দক যুদ্ধের মূল হোতা। তারা কুরাইশদেরকে রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য উস্কে দেয় এবং তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যুদ্ধে অংশ নিলে নিজেদের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাসও প্রদান করে। মক্কাবাসীরা তাদের এমন আহ্বানে সানন্দে সাড়া দেয়। এভাবে আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে পঞ্চম হিজরির শাওয়াল মাসে, সাকুল্যে সেবার মদিনার বিরুদ্ধে জড়ো হয় প্রায় দশ হাজার যোদ্ধা।
পরিখা খনন
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন এই সংবাদ শুনতে পান, অবিলম্বে তিনি বিচক্ষণ সাহাবা ও যুদ্ধবিষয়ে অভিজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করেন। সাহাবি হযরত সালমান আল-ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহু[১] শহরের চারপাশে পরিখা খননের পরামর্শ দেন। তাঁর এ পরামর্শ রাসূল ও উপস্থিত সাহাবাদের মনঃপূত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং নেতৃপর্যায়ের সাহাবারা খননকাজের সার্বিক তদারকি করছিলেন। এ-সময় সালমান আল-ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাজে এক প্রকাণ্ড পাথর প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। সেটা সরাতে গিয়ে তাঁর লোহার শাবল ভেঙে যায়। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাথরটির কাছে এগিয়ে এসে 'বিসমিল্লাহ' বলে পাথরটিতে আঘাত করেন। এতে পাথরটি ফেটে চোখ-ঝলসানো এক উজ্জ্বল আলো বেরিয়ে আসে। রাসূল বলে ওঠেন: 'আল্লাহু আকবার, রোম বিজিত হয়েছে; আমি তার লাল প্রাসাদগুলো দেখতে পেয়েছি।' এভাবে তিনি আরও দুইবার পাথরটিতে আঘাত করেন এবং পারস্য ও ইয়েমেন বিজয়ের ঘোষণা দেন।
এদিকে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কাজ শেষ করলেন, ওদিকে তখন কুরাইশরা তাদের সহযোগী বাহিনী নিয়ে এগিয়ে এসে উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান নেয়। তাদেরকে চোখের দূরত্বে দেখতে পেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন হাজার সাহাবাদের নিয়ে পরিখার উপকণ্ঠে এসে দাঁড়ান।
বনু কুরাইযার চুক্তি ভঙ্গ
আল্লাহর শত্রু হুয়াই ইবনু আখতাব কাব ইবনু আসাদ আল-কুরাজির কাছে এল। সে ছিল বনু কুরাইযার[১] গোত্রীয় চুক্তির মুখপাত্র। হুয়াই জানায়, অন্যান্য গোত্রগুলি মুসলিমরা নিশ্চিহ্ন না হওয়া পর্যন্ত ফিরে যাবে না বলে অঙ্গীকার করেছে। অতএব, মুহাম্মদের পতন আজকে নিশ্চিত। আক্রমণকারীদের সংখ্যা ও শক্তির কারণে শেষপর্যন্ত বনু কুরাইযা নিজের মত বদলায় এবং জোটে যোগ দেয়। এর ফলে মুসলিমদের সাথে বনু কুরাইযার চুক্তি ভঙ্গ হয়ে যায়। কাব এবং হুয়াইয়ের এই গোপন সাক্ষাতের খবর পৌঁছে যায় রাসূলের কাছে। তিনি খাযরাজপ্রধান সাদ ইবনু উবাদা এবং আওসপ্রধান সা'দ ইবনু মুয়াযকে পাঠান এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত হতে। তারা বনু কুরাইযার কাছে পৌঁছে দেখেন, তারা অত্যন্ত ভয়ংকর দুরভিসন্ধিতে লিপ্ত। তারা রাসূলের পাঠানো সাহাবাদের দেখে বলে উঠল: 'মুহাম্মদের সাথে আমাদের কোন চুক্তি নেই।' এরপর তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ফিরে আসেন। পরিস্থিতি ক্রমে নাজুক হতে থাকে। মুসলমানরা তখন সর্বদিক থেকে আক্রান্ত হয়ে আছে; কিন্তু তাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, আল্লাহ তাদের রক্ষা করবেন!
টুকরো টুকরো সংঘাত
আরবীয় যুদ্ধকৌশলে পরিখা খনন প্রচলিত ছিল না, তাই মুসলিমদের খননকৃত পরিখার কারণে জোটবাহিনী অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়ে যায়। পরিখা পার হওয়ার কোনো ব্যবস্থা তাদের কাছে হাজির নেই। বিশ দিনেরও অধিক, প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেছে—অথচ দুপক্ষের মাঝে কিছু তির ও পাথর নিক্ষেপ ছাড়া যুদ্ধের কিছুই ঘটেনি। তবে কুরাইশদের কিছু অশ্বারোহী পরিখার একটি সংকীর্ণ পথ খুঁজে পেয়ে সেখানে ঘোড়া তুলে দেয়। এ দেখে আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু মুসলমানদের একটি বাহিনী নিয়ে সেই ছিদ্রপথেই তাদেরকে ধরে ফেলেন। এদের মধ্যে ছিল আমর ইবনু আবদে-উদ্দ। আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু তার মুখোমুখি হয়ে তাকে তলোয়ারের আঘাতে ধরাশায়ী করেন এবং তার শির ধড় থেকে আলাদা করে ফেলেন।
আক্রমণ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে হেঁটে আসতে দেখা যায় নুআইম ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে। তিনি এসে রাসূলকে বলেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি মুসলমান হয়ে গেছি; কিন্তু আমার গোত্র সে-খবর জানে না। আপনি আদেশ দিলে আমি একটা কিছু চিন্তা করেছি, সেটা বাস্তবায়ন করতে চাই।' রাসূল তাকে অনুমতি দিলেন। অনুমতি পেয়ে নুআইম এক কার্যকরী কৌশল অবলম্বন করে এগিয়ে যান। তিনি প্রথমে বনু কুরাইযা গোত্রের কাছে গিয়ে তাদেরকে অন্যান্য মিত্রদের দুরভিসন্ধির ব্যাপারে সতর্ক করেন। এরপর তিনি মিত্রবাহিনীর নেতা আবু সুফিয়ানের কাছে যান এবং তাদের মধ্যেও সন্দেহের বীজ বপন করেন। এভাবে নুআইম ইবনু মাসউদের বিচক্ষণতায় উভয় দলের মধ্যে অবিশ্বাস এবং জোটভুক্ত গোত্রগুলোর মধ্যে ফাটল দেখা দিল। এরপর চূড়ান্ত বিজয়ের বার্তা দিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন রণক্ষেত্রে প্রবল বাতাস ছোটান, যা মুশরিকদের তাঁবুগুলো উড়িয়ে দেয় এবং যুদ্ধের পুরো চিত্রই পাল্টে দেয়।
বিজয়ের বার্তা
সম্মিলিত বাহিনীর প্রধান সেনাপতি আবু সুফিয়ান বুঝতে পারে, এখানে এভাবে বসে থেকে আসলেই কোনো লাভ নেই। শীত খুব তীব্র আকার ধারণ করেছে এবং প্রচণ্ড বায়ুপ্রবাহের ফলে সেনাদের শিবির তছনছ হয়ে গেছে। তাই সে বাহিনীতে মক্কা ফিরে যাবার নির্দেশ দেয়। সকালে সুর্য উঠে এলে দেখা যায়, ময়দান ফাঁকা হয়ে গেছে। কুরাইশদের বাহিনী ময়দান ছেড়ে গেলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: 'আজকের পর থেকে যুদ্ধ আমরা করবো, তারা নয়।' [১] অর্থাৎ, আজকের পর কুরাইশরা কখনোই মদিনায় আক্রমণ করার সাহস করবে না।
খন্দকের যুদ্ধ শেষ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহিনী নিয়ে এগিয়ে যান বনু কুরাইযার দিকে; ২৫ দিন অবরোধের পর শেষপর্যন্ত বনু কুরাইযা আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয়। বিচারে সা'দ ইবনে মুয়ায নির্দেশ দেন—সমস্ত পুরুষকে হত্যা, নারী ও শিশুদেরকে দাস হিসেবে বন্দি এবং সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে। সিদ্ধান্তমতে ৬০০ থেকে ৭০০ পুরুষ বন্দির শিরশ্ছেদ করা হয়। বনু কুরাইযাকে প্ররোচনাদানকারী হুয়াই বিন আখতাবকেও এ-সময় মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এভাবেই আহযাবের এ যুদ্ধে মুনাফিকের দল হেরে যায় এবং ঈমানের বাহিনী সফল হয়।
টিকাঃ
[১] সালমান আল-ফারসি। হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন বিখ্যাত সাহাবি। রাসূল ভালোবেসে তাকে সালমান আল-খায়র নাম প্রদান করেছিলেন। ... মহান এই সাহাবি ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে ইরাকের মাদায়েন শহরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
[১] বনু কুরাইযা ছিল মদিনার একটি ইহুদি গোত্র। খন্দকের যুদ্ধের পর মুসলিমদের সাথে তাদের সংঘর্ষ সৃষ্টি হয় এবং তারা আত্মসমর্পণ করে।
[১] মদিনার সনদ হলো ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা থেকে মদিনায় গমনের পর হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রণয়নকৃত একটি প্রাথমিক সংবিধান।
[১] আদ-দুরার ফি-ইখতিসারিল মাগাযি ওয়াস-সিয়ার: ইবনু আবদিল বার রহ.-১৮৬ পৃ.
[১] বুখারি: ৩৮৮৪, মুসনাদে আহমাদ: ১৮৩৩৪, আল-মুজামুল কাবির: ইমাম তাবারানি-৬৪৯৯
[১] বুখারি: ২৮৭৮, মুসলিম: ১৭৬৮
📄 হুদাইবিয়ার যুগান্তকারী সন্ধি
ষষ্ঠ হিজরি সাল। হঠাৎ এক রাতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখলেন। তিনি দেখলেন, মুসলমানরা মসজিদুল হারামে প্রবেশ করেছে। কাবার চাবি সংগ্রহ করে তিনি সাহাবাদের নিয়ে উমরা পালন করছেন। কয়েক দিনের মধ্যেই রাসূল মুসলমানদের উমরার জন্য প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দিলেন। মুহূর্তেই এ খবর হিজাযের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল যে, মুসলমানরা যিলকদ মাস নাগাদ উমরার উদ্দেশ্যে মক্কায় যাচ্ছে।
নবীজি জানতেন, এবারের সফরে মুসলমানরা সফলতা লাভ করলে তারা বহুল প্রতিক্ষিত একটি লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হবে। চৌদ্দ হাজার বা মতান্তরে আঠারো হাজার হজযাত্রী পথ চলতে চলতে 'যুল হুলাইফা' নামক স্থানে এসে ইহরাম বাঁধেন। কাফেলা উসফানের কাছাকাছি পৌঁছলে গুপ্তচর ফিরে এসে জানায়, কুরাইশরা বিশাল সেনাদল গঠন করেছে। রাসূল সংঘর্ষ এড়াতে অভিজ্ঞ কারো রাহবরিতে বিকল্প পথে কাফেলা এগিয়ে নিয়ে হুদাইবিয়ার উপকণ্ঠে এসে উপস্থিত হন। এখানে পৌঁছার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি কূপের পাড়ে এসে অবস্থান নেন।
রাসূল (সা.) সকাশে কুরাইশ প্রতিনিধিদল
কুরাইশরা কয়েক দফায় রাসূলের কাছে বিভিন্ন ব্যক্তিকে পাঠিয়ে তাঁর সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাইল। সর্বপ্রথম বুদাইল খাযায়ি, তারপর মুকরিজ এবং তৃতীয়বার আরবের তিরন্দাজ বাহিনীর নেতা হুলাইস ইবনে আলকামাকে পাঠায় তারা। সর্বশেষ তারা বুদ্ধিমান উরওয়া ইবনে মাসউদ সাকাফিকে পাঠাল। উরওয়া ফিরে গিয়ে কুরাইশদের বলল: 'আমি বড় বড় রাজা-বাদশা দেখেছি। কিন্তু নিজ অনুসারীদের মাঝে মুহাম্মদের মতো সম্মানের অধিকারী আমি ইতিপূর্বে কাউকে দেখিনি।'
বাইয়াতে রিদওয়ান
মহানবী (সা.) নিজের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি হিসেবে উসমান ইবনে আফফানকে মক্কায় পাঠান। কিন্তু উসমান ফিরে আসতে বিলম্ব করায় 'উসমান নিহত হয়েছে' এমন একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে। মহানবী (সা.) সিদ্ধান্ত নিলেন মুসলমানদের সাথে তাঁর প্রতিশ্রুত শপথ নবায়ন করবেন। তিনি একটি গাছের নিচে বসলেন এবং সকল সঙ্গীকে বাইয়াত নেয়ার আহ্বান জানালেন। এটিই সেই ঐতিহাসিক 'বাইয়াতে রিদওয়ান'।
উসমান ফিরে এলে কুরাইশদের পক্ষ থেকে সুহাইল ইবনে আমর আসে সন্ধিচুক্তি করতে। মহানবী (সা.) হযরত আলিকে চুক্তিপত্র লেখার নির্দেশ দেন। চুক্তির শর্ত নির্ধারণের ক্ষেত্রে সুহাইল বেশ কঠোরতা অবলম্বন করছিল। এমনকি 'আল্লাহর রাসূল' শব্দটি মুছে ফেলার দাবি জানালে মহানবী তা মেনে নেন।
হুদায়বিয়ার সন্ধি-শর্ত
১. কুরাইশ ও মুসলমানরা দশ বছর একে অপরের সাথে যুদ্ধ করবে না।
২. যদি কুরাইশদের কোনো পুরুষ অভিভাবকদের অনুমতি ছাড়া মক্কা থেকে পালিয়ে মুসলমানদের কাছে যায়, মুহাম্মদ তাকে ফিরিয়ে দেবেন। কিন্তু কোনো মুসলমান মক্কায় পালিয়ে আসলে কুরাইশরা তাকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য নয়।
৩. মুসলমানরা এ বছর মক্কায় প্রবেশ না করে ফিরে যাবে এবং পরের বছর উমরা করতে পারবে।
৪. মক্কার মুসলমানরা স্বাধীনভাবে ইসলামী বিধান পালন করতে পারবে।
সন্ধির শর্তাবলি লেখার সময় সুহাইলের পুত্র আবু জান্দাল শেকল পরিহিত অবস্থায় সেখানে হাজির হন। চুক্তি অনুসারে তাকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হন রাসূল। এতে সাহাবারা অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা সুরা ফাতহ অবতীর্ণ করে একে 'প্রকাশ্য বিজয়' হিসেবে ঘোষণা দেন।
সন্ধিচুক্তির তাৎপর্য ও প্রভাব
হুদাইবিয়ার এ সন্ধি মুসলমানদের ভবিষ্যৎ আশ্চর্যভাবে বদলে দেয়। এ সন্ধির ফলে যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ হওয়ায় মুসলমানরা শান্তিপূর্ণভাবে দাওয়াতের কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে আবু বাসির নামে এক সাহাবীর হাত ধরে কুরাইশদের বাণিজ্যিক কাফেলাগুলো আক্রান্ত হলে তারা নিজেরাই সন্ধির বৈষম্যমূলক শর্তটি বাতিলের আবেদন জানায়। সন্ধির পর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পারস্যের কিসরা, রোম সম্রাট কায়সার, হাবাশার নাজাশি এবং মিশরের মুকাওকিসের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চিঠি পাঠান। এভাবেই হুদাইবিয়ার সন্ধি মক্কা বিজয়ের পথ প্রশস্ত করে দেয়।
টিকাঃ
[১] হুবশিরা হাবশি নয়; হুবশি মক্কা থেকে ছয় মাইল দূরে মক্কার নিম্নভূমিতে অবস্থিত কয়েকটি গোত্র।
📄 খাইবার যুদ্ধ
খাইবার যুদ্ধ BATTLE OF KHAYBAR
তারিখ: ৭ম হিজরি / ৬২৮ খ্রি.
স্থান: মদিনা থেকে ষাট বা আশি মাইল দূরে খাইবারে
ফলাফল: মুসলমানদের বিজয়
পক্ষ-বিপক্ষ: মুসলমান বনাম খাইবারের ইহুদিরা
সেনাপ্রধান: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বনাম আল-হারিস ইবনু আবি যাইনাব, মারহাব ইবনু আবি যাইনাব
সেনাসংখ্যা: ১৪০০ বনাম ১৪,০০০ (মতান্তরে ১৬০০ বনাম ১৪০০০)
ক্ষয়ক্ষতি: ২০ জনের মতো শহিদ বনাম ৯৩ জন নিহত
খাইবার একটি উর্বর এলাকা যার চারপাশ অসংখ্য খেজুর গাছে ঘেরা। সপ্তম হিজরির মুহাররম মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চৌদ্দশ সাহাবার এক বিশাল কাফেলা নিয়ে এই দুর্গের দিকে রওনা হন।
যুদ্ধের পটভূমি
মদিনা থেকে বিতাড়িত ইহুদিরা খাইবারে গিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের আখড়া গড়ে তুলেছিল। তারা খন্দকের যুদ্ধে মুশরিকদের উস্কে দিয়েছিল। হুদাইবিয়ার সন্ধির পর রাসূল চাচ্ছিলেন ইসলামের অগ্রযাত্রায় এই বিষফেঁড়াটি উপড়ে ফেলতে। আল্লাহ তাআলা সুরা ফাতহে খাইবার বিজয়ের সুসংবাদ দেন এবং ঘোষণা করেন যে, এ অভিযানে কেবল তারাই যেতে পারবে যারা হুদাইবিয়ায় উপস্থিত ছিল।
যুদ্ধ ও দুর্গ জয়
খাইবার এলাকাটি মূলত দুটি অঞ্চলে বিভক্ত ছিল এবং সেখানে অনেকগুলো সুদৃঢ় দুর্গ ছিল। প্রথম দিকে মুসলমানদের অগ্রগতি ধীর হলেও এক রাতে রাসূল ঘোষণা করলেন, 'কাল আমি এমন একজনের হাতে পতাকা তুলে দেব, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে এবং দুর্গ বিজিত হবে।' পরদিন তিনি হযরত আলির হাতে পতাকা দেন।
নায়িম দুর্গের পতন ঘটাতে হযরত আলি ইহুদি বীর মারহাবকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে হত্যা করেন। এরপর একে একে সাব ইবনু মুয়ায, যুবাইর এবং উবাই দুর্গগুলো বিজিত হয়। দ্বিতীয় অঞ্চলের কামুস, ওয়াতিহ এবং সুলালিম দুর্গগুলো দীর্ঘ অবরোধের পর ইহুদিরা সন্ধির প্রস্তাব দেয়।
ফলাফল
এ যুদ্ধে প্রায় ৯৩ জন ইহুদি নিহত হয় এবং ২০ জনের মতো মুসলমান শহিদ হন। ইহুদিরা তাদের জমিনে বর্গা চাষের শর্তে খাইবারে থাকার অনুমতি পায়। এ বিজয়ের পরই হযরত জাফর ইবনু আবি তালিব হাবাশা থেকে ফিরে আসেন এবং আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম গ্রহণ করেন। এ অভিযানেই সাফিয়্যাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা বন্দি হন এবং পরে রাসূল তাঁকে বিবাহ করেন। যুদ্ধের পর এক ইহুদি মহিলা রাসূলের খাবারে বিষ মিশিয়ে দিলে আল্লাহর অশেষ কৃপায় তিনি বেঁচে যান, তবে সাহাবি বশির ইবনু বারা বিষক্রিয়ায় শাহাদাত বরণ করেন। খাইবার বিজয়ের পর ফাদাক, ওয়াদিল কুরা এবং তাইমা অঞ্চলগুলোও মুসলমানদের অধীনে চলে আসে।
টিকাঃ
[১] তবে এ ঘটনার বেশকিছু বর্ণনা বিচার করলে মনে হয়, এ ঘটনা অন্য কোনো সফরেও হতে পারে।
📄 মক্কা বিজয়
মক্কা বিজয় CONQUEST OF MECCA
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে মুশরিকদের দখল থেকে পবিত্র শহর মক্কা অধিকারের ঐতিহাসিক ঘটনাটি সংঘটিত হয় ৮ম হিজরির (৬৩০ খ্রি.) ২০শে রমজান।
ঘটনার অনুঘটক
হুদাইবিয়ার সন্ধির শর্ত ভেঙে কুরাইশরা তাদের মিত্র বনু বকরের সাথে মিলে মুসলমানদের মিত্র খুযাআ গোত্রের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায় এবং হারাম শরিফের সীমানায় তাঁদের হত্যা করে। এই বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিবাদে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনটি শর্ত দেন, যার মধ্যে কুরাইশরা হুদাইবিয়ার সন্ধি বাতিল করার পথ বেছে নেয়। পরবর্তীতে আবু সুফিয়ান মদিনায় এসে সন্ধি নবায়নের চেষ্টা করলেও তা ব্যর্থ হয়।
কাফেলা প্রস্তুত হলো
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোপনে দশ হাজার সাহাবার এক বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করেন। এ সময় সাহাবি হাতেব ইবনু আবি বালতাআ একটি চিঠির মাধ্যমে কুরাইশদের খবর দিতে চাইলে রাসূল ওহির মাধ্যমে তা জেনে ফেলেন এবং চিঠিটি উদ্ধার করেন। হিজরি ৮ম বর্ষের ১০ রমজান মুসলিম সেনাদল মদিনা ত্যাগ করে।
বিজয়ের মাহেন্দ্রক্ষণ
মক্কার উপকণ্ঠে 'মাররে যাহরান' নামক স্থানে পৌঁছে রাসূলের নির্দেশে দশ হাজার আগুন জ্বালানো হয়, যা দেখে আবু সুফিয়ান ভীত হয়ে পড়েন এবং পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেন। মক্কায় প্রবেশের সময় রাসূল রাজধানীকে চারটি সারিতে বিভক্ত করেন যার নেতৃত্বে ছিলেন আবু উবাইদা, যুবাইর, আলি এবং খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শহরের উঁচু ফটক দিয়ে প্রবেশ করার সময় 'নিশ্চয়ই আমি তোমাকে দান করেছি সুস্পষ্ট বিজয়' আয়াতটি পাঠ করছিলেন। তিনি কাবাঘর তাওয়াফ করেন এবং কাবার ভেতরে থাকা ৩৬০টি মূর্তি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন। মক্কাবাসীদের উদ্দেশ্যে তিনি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে বলেন: 'আজ তোমাদের প্রতি আমার কোন অভিযোগ নেই; তোমরা যেতে পারো, কারণ তোমরা মুক্ত।'
বিজয়ের পর
মক্কা বিজয়ের দ্বিতীয় দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি ঐতিহাসিক খুতবা দেন যেখানে তিনি মক্কা নগরীতে রক্তপাত চিরতরে হারাম ঘোষণা করেন। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে তাঁর হাতে ইসলাম ও আনুগত্যের বাইয়াত গ্রহণ করে। এই বিজয়ের ফলে আরবের কোণায় কোণায় একত্ববাদের স্লোগান ছড়িয়ে পড়ে।
টিকাঃ
[১] সিরাতে ইবনে হিশাম: ৫/৫২
[১] বুখারি: ৪০২৫
[১] মুসলিম: ১৭৮০, আবু দাউদ: ৩০২১, নাসায়ি: ১১২৯৮, মুসনাদে আহমাদ: ৭৯০৯
[১] সুরা ফাতহ: ০১
[২] সুরা ইসরা; ৮১
[১] সুরা ইউসুফ: ১২; আস-সুনানুল কুবরা: বাইহাকি ১৮৭৩৯, সিরাতে ইবনু হিশাম: ২/৪১১, যাদুল মাআদ: ইবনুল কায়্যিম ৩/৩৫৬, আর-রাওদুল উনুফ: সুহাইলি ৪/১৭০, সিরাতে ইবনু কাসির: ৩/৫৭০, ফাতহুল বারি: ইবনু হাজার ৮/১৮