📄 উহুদ যুদ্ধ
উহুদ যুদ্ধ BATTLE OF UHUD
তারিখ: ৩য় হিজরি / ৬২৫ খ্রি.
স্থান: উহুদ, মদিনা মুনাওয়ারা
ফলাফল: অমীমাংসিত সমাপ্তি
পক্ষ-বিপক্ষ: মুসলমান বনাম কুরাইশ (সাথে তিহামা ও কিনানার কিছু মিত্রজোট)
সেনাপ্রধান: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বনাম আবু সুফিয়ান ইবনু হারব
সেনাসংখ্যা: ৭০০ বনাম ৩০০০
ক্ষয়ক্ষতি: ৭৫ জন শহিদ বনাম ২২ জন নিহত
উহুদ। এক নির্মম বাস্তবতার স্বচোখ সাক্ষী। ৩য় হিজরির শাওয়াল মাসের সাত তারিখ (২৩শে মার্চ, ৬২৫ খ্রি.) রোজ শনিবার এ স্থানেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বে মুসলমানদের সাথে মক্কাবাসী এবং তিহামা ও কিনানা গোত্রভূত তাদের কিছু অনুসারীদের মধ্যে ঐতিহাসিক উহুদ যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। এ-যুদ্ধে মুসলমানদের সাময়িক বিজয় লাভ হলেও আবু সুফিয়ানের বাহিনী ফিরে এসে অতর্কিত হামলা করে সেবার তাদের সামরিক কর্তৃত্ব ছিনিয়ে নেয়। মূলত বিজয় সুনিশ্চিত ভেবে মুসলমানরা যখন গনিমতের মাল সংগ্রহ করতে ব্যস্ত হয়ে যান এবং সে কারণে পূর্বপরিকল্পিত আত্মরক্ষার ঘাঁটিগুলো প্রহরাশূন্য হয়ে পড়ে— তখনই মুশরিকরা সুযোগ বুঝে আক্রমণ করে এবং যুদ্ধ নিজেদের পক্ষে নিয়ে যায়।
যুদ্ধের পূর্বকথা
বিগত বছরে বদর প্রান্তরে মুসলমানদের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হবার পর, মক্কার কুরাইশদের দাম্ভিকতা ধুলোয় মিশে যায়। ক্ষণে তারা অনুভব করে লাঞ্ছনাকর পরাজয়ের অসহনীয় তিক্ততা। ফলে তারা দ্বিতীয়বার মুসলমানদের মোকাবেলা করার সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। তাদের চোখ তাতিয়ে উঠছিল বিশ্বের বুক থেকে মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলার হিংস্র ক্রোধে, যাতে নিজেদের গা থেকে পূর্বপরাজয়ের ধুলো পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলা যায়। সে-মতে সাফওয়ান ইবনু উমাইয়া, ইকরিমা ইবনু আবি জাহল এবং আবদুল্লাহ ইবনু রাবিআ মিলে আবু সুফিয়ানের কাছে গিয়ে সৈন্য প্রস্তুত করার জন্য শামফেরত কাফেলার সম্পদ কামনা করে। পুঞ্জীভূত সেই মুনাফার পরিমাণ ছিল প্রায় এক হাজার উট এবং পঞ্চাশ হাজার দিনারের মতো। মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য আবু সুফিয়ান পুরোটা মুনাফাই তাদেরকে দিয়ে দিতে সম্মত হয়ে যায়। এরপর তারা একযোগে মক্কার গোত্রগুলোতে লোক পাঠাতে লাগল, যাতে শহরের সকল পুরুষকে যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করা যায়। বদরের রোমহর্ষক পরাজয়ের মাত্র এক বছর পার হলেও তারা কুরাইশ ও তাদের মিত্র গোত্রগুলো থেকে প্রায় তিন হাজার সেনা একত্র করতে সক্ষম হয়। অংশগ্রহণ করে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবাসহ আরও ১৫ জন মহিলা। ৩০০০ উট এবং ২০০ ঘোড়াসহ সম্মিলিত সেই বাহিনী নিয়ে মুশরিকরা উহুদ পাহাড়ের উপকণ্ঠে 'আইনাইন' নামক স্থানে গিয়ে সমবেত হয়।[১] এ-সময় হিন্দ বিনতে উতবা প্রস্তাব দেন যে, মুহাম্মদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মায়ের কবর যাতে ধ্বংস করে দেয়া হয়। কিন্তু এর পরিণাম ভয়াবহ হতে পারে ভেবে নেতারা এমন প্রস্তাবে সম্মত হননি।
হিজরি তৃতীয় সালের ৬ শাওয়াল, রোজ জুমাবার। মদিনার ঘরে ঘরে পৌঁছে গেল কুরাইশ বাহিনীর উপস্থিতির খবর। নতুন যুদ্ধের আগমনী বার্তায় অনেককে সন্তুষ্ট দেখা গেল; বিশেষত যারা বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি, ফলে গনিমতেরও কোন অংশ পাননি, তাদের কেউ কেউ বলছিল: 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনি আমাদেরকে নিয়ে মদিনার বাইরে গিয়ে শত্রুদলের মোকাবেলায় চলুন; যাতে তারা না ভাবে যে, আমরা দুর্বল কাপুরুষ হয়ে গেছি।' আর কিছু মুসলিম (যাদের মধ্যে মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনু সালুলও ছিল) চাচ্ছিল, মদিনার ভেতরে থেকে কুরাইশদের প্রতিরোধ করা হোক এবং ঘটনাক্রমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চিন্তাও ছিল এমন। তিনি ভাবছিলেন, মদিনার বাইরে না গিয়ে ভেতরে শক্ত প্রতিরক্ষা গড়ে তোলাই শ্রেয়। কারণ, তিনি আগের রাতে স্বপ্নে দেখেছিলেন, তাঁর তরবারির আগা ভেঙে গেছে; তাঁর একটি গরু জবেহ হয়ে গেছে এবং তিনি একটি শক্ত বর্মে হাত ঢুকিয়ে রেখেছেন।[২] সে-মতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদেরকে বাইরে গিয়ে তাদের মোকাবেলা না করে শহরে শক্ত অবস্থান নিতে বললেন, যাতে তারা শহরের কাছাকাছি হলে যেন প্রবেশপথের মুখগুলোতে দাঁড়িয়ে তাদের সাথে যুদ্ধ করা যায়। রাসূলের এই সিদ্ধান্তের সাথে আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনু সালুলও সম্মত হলো। তবে আনসারি সাহাবিদের অনেক যুবকই যেন এটা মেনে নিতে পারছিল না। তারা বরং যে-কোনো মূল্যে শহরের বাইরে গিয়ে শত্রুদের মোকাবেলা করার পক্ষে। এতে আল্লাহ যাকে শাহাদাতের মর্যাদা দিতে চান, সে শহিদ হয়ে যাবে; আর যা বেঁচে ফিরতে পারবে, সে জয়ীর বেশে ফিরবে। রাসূল তাদের এমন চিন্তা দেখে কিছু বললেন না। সোজা তাঁর ঘরে প্রবেশ করলেন। নিজের যুদ্ধবর্মটি গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে এলেন।
দিনটি ছিল জুমাবার। রাসূলকে বর্ম পরে বের হতে দেখে, যারা শহরের বাইরে যাবার গোঁ ধরেছিল, তারা খুব লজ্জিত হলো। বলল, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনার ইচ্ছে হলে ফিরে যেতে পারেন।' রাসূল বললেন: 'কোনো নবীর জন্য বর্ম পরিধানের পর যুদ্ধ না করে ফিরে যাওয়া শোভাকর না।'[১] এই বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাজার সাহাবি নিয়ে উহুদ অভিমুখে যাত্রা করলেন। তাঁর অবর্তমানে অবশিষ্ট মুসলমানদের নামাযের ইমামতির জন্য দায়িত্ব দিয়ে গেলেন ইবনু উম্মি মাকতুমেক। কিন্তু মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনু সালুল—সে ছিল খাযরাজ গোত্রের সর্দার এবং মুসলমানদের মধ্যকার মুনাফিকদের নেতা—সিদ্ধান্ত নিলো, সে তার অনুসারীদের নিয়ে মদিনা ফিরে যাবে। তার কথা ছিল: 'জানি না কীসের নেশায় আমরা আত্মহত্যা করতে যাচ্ছি!' তিনশো যোদ্ধা তার অনুসরণ করে পথিমধ্য থেকে চলে আসে।
যুদ্ধক্ষেত্রে নবীজি
উহুদ পাহাড়ের উপত্যকায় গিয়ে মুসলমানরা অবস্থান গ্রহণ করে। বাহিনীর মুখ শহরের দিকে করে পেছনে রাখা হয় উহুদ পাহাড়ের সুউচ্চ টিলাগুলোকে। এ-সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৫০ জন দক্ষ তিরন্দাজের একটি বিশেষ দল গঠন করেন। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু জুবাইর ইবনুন নুমানের নেতৃত্বে এই বাহিনীকে তিনি নির্দেশ দেন, মানাত উপত্যকার দক্ষিণ পাশে 'রুমাত' পাহাড়ের ১৫০ মিটার উপরদিকে ঠায় প্রহরায় থাকতে। রাসূল তাদেরকে বিশেষ করে বলে দেন: 'যদি দেখো, পাখিরা আমাদের লাশগুলো ঠুকরে খাচ্ছে, তবু আমার আদেশ ছাড়া এখান থেকে নড়বে না। আর যদি দেখো আমরা শত্রুদের পরাজিত করে একেবারে পদদলিত করে ফেলেছি, তবুও আমাদের নির্দেশ ছাড়া এ জায়গা ত্যাগ করবে না।'[১] সে-দলের নেতা আবদুল্লাহ ইবনু জুবাইরকে নির্দেশ দিলেন, 'মুশরিকদের প্রতি ক্রমাগত তির নিক্ষেপ করতে থাকবে, যাতে তারা কোনোভাবেই তার পেছন থেকে উঠে আসতে না পারে।' এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর অবশিষ্ট সেনাদেরকে যুদ্ধের জন্য কাতারবদ্ধ করেন। বাহিনীর ডান পার্শ্বের নেতৃত্বে মুনজির ইবনে আমর ও বাম পার্শ্বে যুবাইর ইবনুল আওয়ামকে রাখেন। মিকদাদ ইবনে আসওয়াদকে নিযুক্ত করেন যুবাইরের সহকারী হিসেবে। মূলত এই বাম পার্শ্বে অধিক গুরুত্ব দেয়ার কারণ হলো, এদিকটার দায়িত্ব ছিল কুরাইশ বাহিনীর ডান পার্শ্বের নেতৃত্বে থাকা খালিদ বিন ওয়ালিদের অশ্বারোহীদের প্রতিরোধ করা। এ যুদ্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম বাহিনীর পতাকা তুলে দিয়েছিলেন বনু আবদিদ-দার গোত্রের বিখ্যাত সাহাবি হযরত মুসআব ইবনু উমাইর রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাতে।
ওদিকে মুশরিকদের বাহিনী ছিল তিন হাজার সেনার, যাদের মধ্যে দুইশো ছিল অশ্বারোহী। কুরাইশরা তাদের সেনাদলের ডান অংশের অশ্বারোহীদের নেতৃত্বে রেখেছিল খালিদ বিন ওয়ালিদকে; আর বাম পাশে রেখেছিল ইকরিমা ইবনু আবি জাহলকে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে আনসারদেরকে আবু সুফিয়ান বার্তা পাঠিয়ে জানান যে, তারা যদি মুহাজির মুসলিমদেরকে ত্যাগ করে, তাহলে তাদের কোনোরকম ক্ষতি করা হবে না এবং মদিনা শহরেও আক্রমণ করা হবে না। কিন্তু আনসাররা তার এই প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে এবং রাসূল ও তাঁর মুহাজির সেনাদের জন্য জান কুরবান করার অঙ্গিকার করেন।
যুদ্ধের বিবরণ
মদিনাত্যাগী আবু আমর মক্কার পক্ষে মুসলিম বাহিনীতে প্রথম আক্রমণ চালায়। কিন্তু সাহাবাদের তিরের বৃষ্টিতে আবু আমর ও তার লোকেরা টিকতে না পেরে কুরাইশ সারির একেবারে পেছনের দিকে সরে আসে। এরপর মক্কার পতাকাবাহক তালহা ইবনে আবি তালহা আল-আবদারি এগিয়ে গিয়ে দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহ্বান করে। সাহাবি যুবাইর ইবনুল আওয়াম তার আহ্বান শুনে এগিয়ে যান এবং তাকে হত্যা করে ফিরে আসেন। এটা দেখে তালহার ভাই উসমান ইবনে আবি তালহা এগিয়ে গিয়ে পড়ে যাওয়া শিরকের পতাকা তুলে নেয়। মুসলিমদের মধ্যে থেকে রাসূলের চাচা হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব এগিয়ে এসে তাকেও পরপারে পাঠিয়ে দেন। মক্কার পতাকা বহনের দায়িত্ব তাদের পরিবারের উপর ন্যস্ত ছিল। একারণে তালহার ভাই ও পুত্রসহ মোট ছয়জন, একের পর এগিয়ে আসে এবং সবাই মুসলিম সেনাদের হাতে নিহত হয়।
দ্বন্দ্বযুদ্ধের পর দুই বাহিনীর মধ্যে মূল লড়াই শুরু হয়। যুদ্ধে আগত কুরাইশ নারীরা দফ বাজিয়ে সেনাদের উৎসাহ জুগিয়ে যায়। মুসলিমরা মক্কার সৈনিকদের সারি ভেঙে ফেলতে সক্ষম হওয়ায় শুরুতেই কুরাইশ বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ে। খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে মক্কার অশ্বারোহীরা পরপর কয়েকবার মুসলিম বাহিনীর বাম পার্শ্বে আক্রমণ চালাতে চেষ্টা করে, কিন্তু জাবালে রুমাতের উপর মোতায়েন করা তিরন্দাজদের আক্রমণের কারণে তারা বেশি ভেতরে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ পায়নি। এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলিমরা সুবিধাজনক অবস্থান লাভ করে এবং বিজয়ের নিকটে পৌঁছে যায়। এমনকি, একসময় ময়দানে নিজেদের আধিপত্য দেখে তারা ভেবে বসে যে, যুদ্ধ তো শেষ। সে-মতে তারা পরাজিত মুশরিকদের ফেলে যাওয়া গনিমত গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এ-সময় পাহাড়ে দায়িত্বে থাকা তিরন্দাজ বাহিনী রাসূলে পাকের নির্দেশ বিস্মৃত হয়ে গনিমত সংগ্রহের কাজে অংশ নিতে তাদের স্থান ত্যাগ করে নিচে নেমে আসে। তাদের কেউ বলে, 'এখন আর দাঁড়িয়ে থেকে কী লাভ?'; তারা তাদের প্রতি রাসূলের নির্দেশনা ভুলে যায়। দলনেতা আবদুল্লাহ ইবনু জুবাইর তাদেরকে রাসূলের নির্দেশ স্মরণ করিয়ে দিলেও তারা তার কথায় ভ্রুক্ষেপ না করে দ্রুত গনিমতের মাল গোছাতে নেমে আসে। ফিরে যেতে যেতে খালিদ বিন ওয়ালিদ খেয়াল করে পাহাড়ের এই গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি থেকে দায়িত্বরত তিরন্দাজরা নেমে যাচ্ছে। সে বিলম্ব না করে একদল মুশরিককে সাথে নিয়ে পাহাড়ের পাশে জড়ো হয়; এরপর সুযোগ বুঝে মুসলমানদের উপর পেছন থেকে অতর্কিত হামলে পড়ে। আকস্মিক এ আক্রমণে মুসলমানরা অপ্রস্তুত হয়ে ভয়ে পেছনে সরে আসে। ধীরে ধীরে ময়দান চলে যায় মুশরিকদের দখলে, শিরকের পতাকা ক্রমশ উঁচু হতে থাকে। দূর থেকে নিজেদের পতাকা উত্তোলিত দেখতে পেয়ে আবু সুফিয়ানের মূল বাহিনীও পুনর্বার ময়দানে ছুটে আসে এবং একযোগে হামলা চালায়।
এক মুশরিক সেনা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লক্ষ করে একটি পাথরখণ্ড ছুড়ে মারলে প্রিয় রাসূলের দাঁত মোবারক শহিদ হয়ে যায়। এদিকে তিনি আহত হয়ে একটি গর্তে পড়ে যান। এ-যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাথা মোবারক ফেটে যায়। পরিস্থিতি ভয়াবহ দেখে রাসূলের প্রেমে প্রাণোৎসর্গকারী সাহাবারা তাঁকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেন। চারদিক থেকে রাসূলকে লক্ষ করে মুশরিকদের তির তলোয়ার বৃষ্টির মতো উড়ে এল, কিন্তু সাহাবারা সব নিজেদের গায়ে নিয়ে নেন। হযরত আবু দুজানা রাদিয়াল্লাহু আনহু নবীজির দিকে ঝুঁকে আক্রমণের সামনে ঢাল হয়ে গেলেন। উড়ে আসা তিরগুলো একে এক তার পিঠে বিদ্ধ হতে লাগল। অপরপাশে দাঁড়িয়ে গেলেন হযরত তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু। শত্রুদের দিকে মুখ করে দাঁড়ালে রাসূলের দিকে পিঠ হয়ে যায়, তাই তিনি রাসূলের দিকে মুখ করে তির-তলোয়ারের সামনে পিঠ পেতে দেন। ডান দিক থেকে তলোয়ারের আঘাত এলে তিনি নবীজিকে বাঁচাতে হাত পেতে দেন; তার হাতটি কেটে মাটিতে পড়ে যায়। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে দেখা যায়, হযরত তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহুর শরীরে সত্তরোর্ধ আঘাতের চিহ্ন ছিল। [১]
হঠাৎ কুরাইশরা ময়দানে গুজব ছড়িয়ে দেয় যে, মুহাম্মদ এবং তার সাথিদ্বয় উমর ও আবু বকর মারা গেছে। এতে লড়াইরত সাহাবাদের মধ্যে হতাশা দেখা দেয় এবং তারা যুদ্ধের ময়দানে অমনোযোগী হয়ে পড়েন। কিন্তু সহসা রাসূল জীবিত আছেন বলে জানা যায়। সাহাবাদের হাতের মুঠি পুনরায় শক্ত হয়ে আসে এবং তারা কাফিরদের শক্ত মোকাবেলা করতে শুরু করেন। কিন্তু ততক্ষণে ময়দানের চিত্র পাল্টে গেছে। তীব্র সম্মুখযুদ্ধের পর অধিকাংশ মুসলিম উহুদ পর্বতের ঢালে এসে জমায়েত হয়ে যান। রাসূল এবং অন্যান্য নেতৃস্থানীয় সাহাবারাও পর্বতের উপরের দিকে এসে আশ্রয় নেন।
মক্কার সেনারা মুহাম্মদের খোঁজে পর্বতের দিকে অগ্রসর হয়; কিন্তু হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব এবং মুসলিমদের একটি সাহসী সেনাদলের প্রতিরোধের কারণে তারা বেশিদূর এগোতে সক্ষম হয়নি। ফলে লড়াই সেখানেই থেমে যায়। হিন্দু ও তার সঙ্গীরা এ-সময় নিহত মুসলিমদের লাশ টুকরো করে। যুদ্ধ চলাকালীন হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব ইথিওপীয় দাস ওয়াহশি ইবনে হারবের বর্শার আঘাতে শহিদ হয়ে যান। মুসলিমরা পর্বতে আশ্রয় নেয়ার পর আবু সুফিয়ানের সাথে উমরের কিছু উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। কথোপকথনের সময় আবু সুফিয়ান এই দিনকে বদরের প্রতিশোধ বলে উল্লেখ করেন। প্রতিউত্তরে ইবনুল খাত্তাব বলেন, 'আমাদের নিহতরা জান্নাতে এবং তোমাদের নিহতরা জাহান্নামে চলে গেছে।' এরপর কুরাইশরা ময়দান ত্যাগ করে মক্কাভিমুখে যাত্রা করে। আর মুসলিমরা নিহত সৈনিকদেরকে যুদ্ধের ময়দানে দ্রুত দাফন করে দেন।
ফলাফল
প্রথম দিকে মুসলিমরা সুবিধাজনক অবস্থায় থাকলেও একপর্যায়ে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় কুরাইশদের হাতে। শেষপর্যন্ত মুসলিমদের তুলনামূলক বেশি ক্ষয়ক্ষতি এবং কুরাইশদের সুবিধাজনক অবস্থান সত্ত্বেও যুদ্ধের ফলাফল অনেকাংশে অমীমাংসিতই রয়ে যায়। তবে যুদ্ধে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেনাপতি হিসেবে বিশেষ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। উহুদকে যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেয়া ছিল তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।
কেন এই বিপর্যয়?
যুদ্ধের ময়দানে কিছু মুসলিম সেনাকর্তৃক সেনাপ্রধানের আদেশ অমান্য করার মাশুল দিতে হয়েছে পুরো বাহিনীকে। যেমনটা আমরা দেখেছি, পাহাড়ে প্রহরায় থাকা তিরন্দাজ বাহিনী সেনাপতি রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুমতি ছাড়া তাদের স্থান ত্যাগ করে নিচে নেমে আসে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআনুল কারিমে ইরশাদ করেন: 'অসৎকে সৎ থেকে পৃথক করে দেয়া পর্যন্ত তোমরা যে অবস্থায় রয়েছ, আল্লাহ ঈমানদারগণকে সে অবস্থাতেই ছেড়ে দিতে পারেন না।' [১] উহুদ যুদ্ধের এই ঝাঁকুনি মদিনায় ঘাপটি মেরে থাকা মুনাফিকদেরকে মুমিনদের থেকে আলাদা করে দিয়েছে।
উহুদ: বিজয় নাকি পরাজয়
উহুদ একটি অমীমাংসিত যুদ্ধ ছিল। উহুদে প্রথমভাগে মুসলিম বাহিনী বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে চলে গেলেও পাল্টা আক্রমণে সেই বিজয় হতাশায় পরিণত হয়; মুসলমানদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়, কিন্তু সেটা কখনোই পরাজয় নয়। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ বলেন: 'আল্লাহ নিশ্চিত স্থির করে নিয়েছেন, আমি এবং আমার রাসূলগণ অবশ্যই বিজয়ী হব। নিশ্চয় আল্লাহ শক্তিধর, পরাক্রমশালী।' [১] এই আয়াতের দাবিমতে, উহুদে প্রিয় নবীজির উপস্থিতি সত্ত্বেও সেটাকে পরাজয় মনে করার কোন সুযোগ নেই।
টিকাঃ
[১] আইনাইন: উহুদ পাহাড়ের বিচ্ছিন্ন অংশগুলোর একটি। ইয়াকুত হামাবি: মুজামুল বুলদান—৪/১৭৪
[২] দেখুন: বিভিন্ন সনদে বর্ণিত একটি হাদিস, নাসায়ি: ৭৬৪৭, মুসনাদে আহমাদ: ২৪৪৫, দারিমি: ২১৫৯, মুস্তাদরাকে হাকেম: ২৫৮৮, আস-সুনানুল কুবরা: ইমাম বায়হাকি—১৩০৬১
[১] মুসনাদে আহমাদ: ১৪৮২৯
[১] বুখারি: ২৮৭৪, আবু দাউদ: ২৬৬২, নাসায়ি: ১১০৭৯, মুসনাদে আহমাদ: ১৮৬১৬
[১] আস-সুনানুল কুবরা: ইমাম নাসায়ি-১১০৭৭, ইবনু মাজাহ: ৪০২৭, মুসনাদে আহমাদ: ১২৮৫৪
[১] পাঠক এখানে একটু কল্পনা করুন... তারা যুদ্ধের এমন ঘোরতর মুহূর্তেও, রাসূলের প্রতি আদব প্রদর্শনে কতটা তৎপর এবং সচেতন ছিলেন?
[১] আর-রাওদুল উনুফ: সুহাইলি-৩/৫২, ৪/২০৯, ৬/১৩
[১] সুরা আলে-ইমরান: আয়াত-১৭৯
[১] সুরা মুজাদালাহ: ২১
📄 খন্দক যুদ্ধ
খন্দক যুদ্ধ BATTLE OF THE TRENCH
তারিখ: ৫ম হিজরি / ৬২৭ খ্রি.
স্থান: মদিনা মুনাওয়ারা
ফলাফল: অবরোধ প্রত্যাহার এবং শত্রুপক্ষের পলায়ন
পক্ষ-বিপক্ষ: মুসলমান বনাম কুরাইশ (সাথে তিহামা, সালিম, গাতফান ও কিনানার কিছু মিত্রজোট; তবে মূল আহ্বায়ক বনু নাযির)
সেনাপ্রধান: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বনাম আবু সুফিয়ান, উয়াইনা ইবনুল হিসন, হারিস ইবনু আওফ, মিসআর ইবনু রাখিলা
সেনাসংখ্যা: ৩০০০ বনাম ১০০০০
ক্ষয়ক্ষতি: ৪ জন শহিদ বনাম ২ জন নিহত
আহযাব -বা খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয় ৫ম হিজরিতে, মুসলমান ও কুরাইশ এবং তাদের সহযোগী গাতফান ও কিনানা গোত্রের মাঝে। মুসলমানদের বিজয়, মদিনার অবরোধ মুক্তি এবং শত্রুপক্ষের সম্মিলিত বাহিনীর পলায়নের মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক এ-যুদ্ধটি সমাপ্ত হয়।
যে-সব কারণে যুদ্ধ
মদিনাবাসী ইহুদিদের শাখাগোত্র বনু নাযিরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেশান্তর করে দিলে তারা খাইবারে গিয়ে শেকড় গাড়ে। এর কিছুদিন পর ইহুদিদের একটি প্রতিনিধিদল অনিষ্ট চিন্তার বিনিময় ঘটাতে মক্কা মুকাররমায় যায়। এরাই ছিল আহযাব বা খন্দক যুদ্ধের মূল হোতা। তারা কুরাইশদেরকে রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য উস্কে দেয় এবং তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যুদ্ধে অংশ নিলে নিজেদের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাসও প্রদান করে। মক্কাবাসীরা তাদের এমন আহ্বানে সানন্দে সাড়া দেয়। এভাবে আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে পঞ্চম হিজরির শাওয়াল মাসে, সাকুল্যে সেবার মদিনার বিরুদ্ধে জড়ো হয় প্রায় দশ হাজার যোদ্ধা।
পরিখা খনন
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন এই সংবাদ শুনতে পান, অবিলম্বে তিনি বিচক্ষণ সাহাবা ও যুদ্ধবিষয়ে অভিজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করেন। সাহাবি হযরত সালমান আল-ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহু[১] শহরের চারপাশে পরিখা খননের পরামর্শ দেন। তাঁর এ পরামর্শ রাসূল ও উপস্থিত সাহাবাদের মনঃপূত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং নেতৃপর্যায়ের সাহাবারা খননকাজের সার্বিক তদারকি করছিলেন। এ-সময় সালমান আল-ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাজে এক প্রকাণ্ড পাথর প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। সেটা সরাতে গিয়ে তাঁর লোহার শাবল ভেঙে যায়। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাথরটির কাছে এগিয়ে এসে 'বিসমিল্লাহ' বলে পাথরটিতে আঘাত করেন। এতে পাথরটি ফেটে চোখ-ঝলসানো এক উজ্জ্বল আলো বেরিয়ে আসে। রাসূল বলে ওঠেন: 'আল্লাহু আকবার, রোম বিজিত হয়েছে; আমি তার লাল প্রাসাদগুলো দেখতে পেয়েছি।' এভাবে তিনি আরও দুইবার পাথরটিতে আঘাত করেন এবং পারস্য ও ইয়েমেন বিজয়ের ঘোষণা দেন।
এদিকে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কাজ শেষ করলেন, ওদিকে তখন কুরাইশরা তাদের সহযোগী বাহিনী নিয়ে এগিয়ে এসে উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান নেয়। তাদেরকে চোখের দূরত্বে দেখতে পেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন হাজার সাহাবাদের নিয়ে পরিখার উপকণ্ঠে এসে দাঁড়ান।
বনু কুরাইযার চুক্তি ভঙ্গ
আল্লাহর শত্রু হুয়াই ইবনু আখতাব কাব ইবনু আসাদ আল-কুরাজির কাছে এল। সে ছিল বনু কুরাইযার[১] গোত্রীয় চুক্তির মুখপাত্র। হুয়াই জানায়, অন্যান্য গোত্রগুলি মুসলিমরা নিশ্চিহ্ন না হওয়া পর্যন্ত ফিরে যাবে না বলে অঙ্গীকার করেছে। অতএব, মুহাম্মদের পতন আজকে নিশ্চিত। আক্রমণকারীদের সংখ্যা ও শক্তির কারণে শেষপর্যন্ত বনু কুরাইযা নিজের মত বদলায় এবং জোটে যোগ দেয়। এর ফলে মুসলিমদের সাথে বনু কুরাইযার চুক্তি ভঙ্গ হয়ে যায়। কাব এবং হুয়াইয়ের এই গোপন সাক্ষাতের খবর পৌঁছে যায় রাসূলের কাছে। তিনি খাযরাজপ্রধান সাদ ইবনু উবাদা এবং আওসপ্রধান সা'দ ইবনু মুয়াযকে পাঠান এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত হতে। তারা বনু কুরাইযার কাছে পৌঁছে দেখেন, তারা অত্যন্ত ভয়ংকর দুরভিসন্ধিতে লিপ্ত। তারা রাসূলের পাঠানো সাহাবাদের দেখে বলে উঠল: 'মুহাম্মদের সাথে আমাদের কোন চুক্তি নেই।' এরপর তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ফিরে আসেন। পরিস্থিতি ক্রমে নাজুক হতে থাকে। মুসলমানরা তখন সর্বদিক থেকে আক্রান্ত হয়ে আছে; কিন্তু তাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, আল্লাহ তাদের রক্ষা করবেন!
টুকরো টুকরো সংঘাত
আরবীয় যুদ্ধকৌশলে পরিখা খনন প্রচলিত ছিল না, তাই মুসলিমদের খননকৃত পরিখার কারণে জোটবাহিনী অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়ে যায়। পরিখা পার হওয়ার কোনো ব্যবস্থা তাদের কাছে হাজির নেই। বিশ দিনেরও অধিক, প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেছে—অথচ দুপক্ষের মাঝে কিছু তির ও পাথর নিক্ষেপ ছাড়া যুদ্ধের কিছুই ঘটেনি। তবে কুরাইশদের কিছু অশ্বারোহী পরিখার একটি সংকীর্ণ পথ খুঁজে পেয়ে সেখানে ঘোড়া তুলে দেয়। এ দেখে আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু মুসলমানদের একটি বাহিনী নিয়ে সেই ছিদ্রপথেই তাদেরকে ধরে ফেলেন। এদের মধ্যে ছিল আমর ইবনু আবদে-উদ্দ। আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু তার মুখোমুখি হয়ে তাকে তলোয়ারের আঘাতে ধরাশায়ী করেন এবং তার শির ধড় থেকে আলাদা করে ফেলেন।
আক্রমণ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে হেঁটে আসতে দেখা যায় নুআইম ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে। তিনি এসে রাসূলকে বলেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি মুসলমান হয়ে গেছি; কিন্তু আমার গোত্র সে-খবর জানে না। আপনি আদেশ দিলে আমি একটা কিছু চিন্তা করেছি, সেটা বাস্তবায়ন করতে চাই।' রাসূল তাকে অনুমতি দিলেন। অনুমতি পেয়ে নুআইম এক কার্যকরী কৌশল অবলম্বন করে এগিয়ে যান। তিনি প্রথমে বনু কুরাইযা গোত্রের কাছে গিয়ে তাদেরকে অন্যান্য মিত্রদের দুরভিসন্ধির ব্যাপারে সতর্ক করেন। এরপর তিনি মিত্রবাহিনীর নেতা আবু সুফিয়ানের কাছে যান এবং তাদের মধ্যেও সন্দেহের বীজ বপন করেন। এভাবে নুআইম ইবনু মাসউদের বিচক্ষণতায় উভয় দলের মধ্যে অবিশ্বাস এবং জোটভুক্ত গোত্রগুলোর মধ্যে ফাটল দেখা দিল। এরপর চূড়ান্ত বিজয়ের বার্তা দিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন রণক্ষেত্রে প্রবল বাতাস ছোটান, যা মুশরিকদের তাঁবুগুলো উড়িয়ে দেয় এবং যুদ্ধের পুরো চিত্রই পাল্টে দেয়।
বিজয়ের বার্তা
সম্মিলিত বাহিনীর প্রধান সেনাপতি আবু সুফিয়ান বুঝতে পারে, এখানে এভাবে বসে থেকে আসলেই কোনো লাভ নেই। শীত খুব তীব্র আকার ধারণ করেছে এবং প্রচণ্ড বায়ুপ্রবাহের ফলে সেনাদের শিবির তছনছ হয়ে গেছে। তাই সে বাহিনীতে মক্কা ফিরে যাবার নির্দেশ দেয়। সকালে সুর্য উঠে এলে দেখা যায়, ময়দান ফাঁকা হয়ে গেছে। কুরাইশদের বাহিনী ময়দান ছেড়ে গেলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: 'আজকের পর থেকে যুদ্ধ আমরা করবো, তারা নয়।' [১] অর্থাৎ, আজকের পর কুরাইশরা কখনোই মদিনায় আক্রমণ করার সাহস করবে না।
খন্দকের যুদ্ধ শেষ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহিনী নিয়ে এগিয়ে যান বনু কুরাইযার দিকে; ২৫ দিন অবরোধের পর শেষপর্যন্ত বনু কুরাইযা আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয়। বিচারে সা'দ ইবনে মুয়ায নির্দেশ দেন—সমস্ত পুরুষকে হত্যা, নারী ও শিশুদেরকে দাস হিসেবে বন্দি এবং সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে। সিদ্ধান্তমতে ৬০০ থেকে ৭০০ পুরুষ বন্দির শিরশ্ছেদ করা হয়। বনু কুরাইযাকে প্ররোচনাদানকারী হুয়াই বিন আখতাবকেও এ-সময় মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এভাবেই আহযাবের এ যুদ্ধে মুনাফিকের দল হেরে যায় এবং ঈমানের বাহিনী সফল হয়।
টিকাঃ
[১] সালমান আল-ফারসি। হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন বিখ্যাত সাহাবি। রাসূল ভালোবেসে তাকে সালমান আল-খায়র নাম প্রদান করেছিলেন। ... মহান এই সাহাবি ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে ইরাকের মাদায়েন শহরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
[১] বনু কুরাইযা ছিল মদিনার একটি ইহুদি গোত্র। খন্দকের যুদ্ধের পর মুসলিমদের সাথে তাদের সংঘর্ষ সৃষ্টি হয় এবং তারা আত্মসমর্পণ করে।
[১] মদিনার সনদ হলো ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা থেকে মদিনায় গমনের পর হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রণয়নকৃত একটি প্রাথমিক সংবিধান।
[১] আদ-দুরার ফি-ইখতিসারিল মাগাযি ওয়াস-সিয়ার: ইবনু আবদিল বার রহ.-১৮৬ পৃ.
[১] বুখারি: ৩৮৮৪, মুসনাদে আহমাদ: ১৮৩৩৪, আল-মুজামুল কাবির: ইমাম তাবারানি-৬৪৯৯
[১] বুখারি: ২৮৭৮, মুসলিম: ১৭৬৮
📄 হুদাইবিয়ার যুগান্তকারী সন্ধি
ষষ্ঠ হিজরি সাল। হঠাৎ এক রাতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখলেন। তিনি দেখলেন, মুসলমানরা মসজিদুল হারামে প্রবেশ করেছে। কাবার চাবি সংগ্রহ করে তিনি সাহাবাদের নিয়ে উমরা পালন করছেন। কয়েক দিনের মধ্যেই রাসূল মুসলমানদের উমরার জন্য প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দিলেন। মুহূর্তেই এ খবর হিজাযের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল যে, মুসলমানরা যিলকদ মাস নাগাদ উমরার উদ্দেশ্যে মক্কায় যাচ্ছে।
নবীজি জানতেন, এবারের সফরে মুসলমানরা সফলতা লাভ করলে তারা বহুল প্রতিক্ষিত একটি লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হবে। চৌদ্দ হাজার বা মতান্তরে আঠারো হাজার হজযাত্রী পথ চলতে চলতে 'যুল হুলাইফা' নামক স্থানে এসে ইহরাম বাঁধেন। কাফেলা উসফানের কাছাকাছি পৌঁছলে গুপ্তচর ফিরে এসে জানায়, কুরাইশরা বিশাল সেনাদল গঠন করেছে। রাসূল সংঘর্ষ এড়াতে অভিজ্ঞ কারো রাহবরিতে বিকল্প পথে কাফেলা এগিয়ে নিয়ে হুদাইবিয়ার উপকণ্ঠে এসে উপস্থিত হন। এখানে পৌঁছার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি কূপের পাড়ে এসে অবস্থান নেন।
রাসূল (সা.) সকাশে কুরাইশ প্রতিনিধিদল
কুরাইশরা কয়েক দফায় রাসূলের কাছে বিভিন্ন ব্যক্তিকে পাঠিয়ে তাঁর সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাইল। সর্বপ্রথম বুদাইল খাযায়ি, তারপর মুকরিজ এবং তৃতীয়বার আরবের তিরন্দাজ বাহিনীর নেতা হুলাইস ইবনে আলকামাকে পাঠায় তারা। সর্বশেষ তারা বুদ্ধিমান উরওয়া ইবনে মাসউদ সাকাফিকে পাঠাল। উরওয়া ফিরে গিয়ে কুরাইশদের বলল: 'আমি বড় বড় রাজা-বাদশা দেখেছি। কিন্তু নিজ অনুসারীদের মাঝে মুহাম্মদের মতো সম্মানের অধিকারী আমি ইতিপূর্বে কাউকে দেখিনি।'
বাইয়াতে রিদওয়ান
মহানবী (সা.) নিজের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি হিসেবে উসমান ইবনে আফফানকে মক্কায় পাঠান। কিন্তু উসমান ফিরে আসতে বিলম্ব করায় 'উসমান নিহত হয়েছে' এমন একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে। মহানবী (সা.) সিদ্ধান্ত নিলেন মুসলমানদের সাথে তাঁর প্রতিশ্রুত শপথ নবায়ন করবেন। তিনি একটি গাছের নিচে বসলেন এবং সকল সঙ্গীকে বাইয়াত নেয়ার আহ্বান জানালেন। এটিই সেই ঐতিহাসিক 'বাইয়াতে রিদওয়ান'।
উসমান ফিরে এলে কুরাইশদের পক্ষ থেকে সুহাইল ইবনে আমর আসে সন্ধিচুক্তি করতে। মহানবী (সা.) হযরত আলিকে চুক্তিপত্র লেখার নির্দেশ দেন। চুক্তির শর্ত নির্ধারণের ক্ষেত্রে সুহাইল বেশ কঠোরতা অবলম্বন করছিল। এমনকি 'আল্লাহর রাসূল' শব্দটি মুছে ফেলার দাবি জানালে মহানবী তা মেনে নেন।
হুদায়বিয়ার সন্ধি-শর্ত
১. কুরাইশ ও মুসলমানরা দশ বছর একে অপরের সাথে যুদ্ধ করবে না।
২. যদি কুরাইশদের কোনো পুরুষ অভিভাবকদের অনুমতি ছাড়া মক্কা থেকে পালিয়ে মুসলমানদের কাছে যায়, মুহাম্মদ তাকে ফিরিয়ে দেবেন। কিন্তু কোনো মুসলমান মক্কায় পালিয়ে আসলে কুরাইশরা তাকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য নয়।
৩. মুসলমানরা এ বছর মক্কায় প্রবেশ না করে ফিরে যাবে এবং পরের বছর উমরা করতে পারবে।
৪. মক্কার মুসলমানরা স্বাধীনভাবে ইসলামী বিধান পালন করতে পারবে।
সন্ধির শর্তাবলি লেখার সময় সুহাইলের পুত্র আবু জান্দাল শেকল পরিহিত অবস্থায় সেখানে হাজির হন। চুক্তি অনুসারে তাকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হন রাসূল। এতে সাহাবারা অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা সুরা ফাতহ অবতীর্ণ করে একে 'প্রকাশ্য বিজয়' হিসেবে ঘোষণা দেন।
সন্ধিচুক্তির তাৎপর্য ও প্রভাব
হুদাইবিয়ার এ সন্ধি মুসলমানদের ভবিষ্যৎ আশ্চর্যভাবে বদলে দেয়। এ সন্ধির ফলে যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ হওয়ায় মুসলমানরা শান্তিপূর্ণভাবে দাওয়াতের কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে আবু বাসির নামে এক সাহাবীর হাত ধরে কুরাইশদের বাণিজ্যিক কাফেলাগুলো আক্রান্ত হলে তারা নিজেরাই সন্ধির বৈষম্যমূলক শর্তটি বাতিলের আবেদন জানায়। সন্ধির পর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পারস্যের কিসরা, রোম সম্রাট কায়সার, হাবাশার নাজাশি এবং মিশরের মুকাওকিসের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চিঠি পাঠান। এভাবেই হুদাইবিয়ার সন্ধি মক্কা বিজয়ের পথ প্রশস্ত করে দেয়।
টিকাঃ
[১] হুবশিরা হাবশি নয়; হুবশি মক্কা থেকে ছয় মাইল দূরে মক্কার নিম্নভূমিতে অবস্থিত কয়েকটি গোত্র।
📄 খাইবার যুদ্ধ
খাইবার যুদ্ধ BATTLE OF KHAYBAR
তারিখ: ৭ম হিজরি / ৬২৮ খ্রি.
স্থান: মদিনা থেকে ষাট বা আশি মাইল দূরে খাইবারে
ফলাফল: মুসলমানদের বিজয়
পক্ষ-বিপক্ষ: মুসলমান বনাম খাইবারের ইহুদিরা
সেনাপ্রধান: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বনাম আল-হারিস ইবনু আবি যাইনাব, মারহাব ইবনু আবি যাইনাব
সেনাসংখ্যা: ১৪০০ বনাম ১৪,০০০ (মতান্তরে ১৬০০ বনাম ১৪০০০)
ক্ষয়ক্ষতি: ২০ জনের মতো শহিদ বনাম ৯৩ জন নিহত
খাইবার একটি উর্বর এলাকা যার চারপাশ অসংখ্য খেজুর গাছে ঘেরা। সপ্তম হিজরির মুহাররম মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চৌদ্দশ সাহাবার এক বিশাল কাফেলা নিয়ে এই দুর্গের দিকে রওনা হন।
যুদ্ধের পটভূমি
মদিনা থেকে বিতাড়িত ইহুদিরা খাইবারে গিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের আখড়া গড়ে তুলেছিল। তারা খন্দকের যুদ্ধে মুশরিকদের উস্কে দিয়েছিল। হুদাইবিয়ার সন্ধির পর রাসূল চাচ্ছিলেন ইসলামের অগ্রযাত্রায় এই বিষফেঁড়াটি উপড়ে ফেলতে। আল্লাহ তাআলা সুরা ফাতহে খাইবার বিজয়ের সুসংবাদ দেন এবং ঘোষণা করেন যে, এ অভিযানে কেবল তারাই যেতে পারবে যারা হুদাইবিয়ায় উপস্থিত ছিল।
যুদ্ধ ও দুর্গ জয়
খাইবার এলাকাটি মূলত দুটি অঞ্চলে বিভক্ত ছিল এবং সেখানে অনেকগুলো সুদৃঢ় দুর্গ ছিল। প্রথম দিকে মুসলমানদের অগ্রগতি ধীর হলেও এক রাতে রাসূল ঘোষণা করলেন, 'কাল আমি এমন একজনের হাতে পতাকা তুলে দেব, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে এবং দুর্গ বিজিত হবে।' পরদিন তিনি হযরত আলির হাতে পতাকা দেন।
নায়িম দুর্গের পতন ঘটাতে হযরত আলি ইহুদি বীর মারহাবকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে হত্যা করেন। এরপর একে একে সাব ইবনু মুয়ায, যুবাইর এবং উবাই দুর্গগুলো বিজিত হয়। দ্বিতীয় অঞ্চলের কামুস, ওয়াতিহ এবং সুলালিম দুর্গগুলো দীর্ঘ অবরোধের পর ইহুদিরা সন্ধির প্রস্তাব দেয়।
ফলাফল
এ যুদ্ধে প্রায় ৯৩ জন ইহুদি নিহত হয় এবং ২০ জনের মতো মুসলমান শহিদ হন। ইহুদিরা তাদের জমিনে বর্গা চাষের শর্তে খাইবারে থাকার অনুমতি পায়। এ বিজয়ের পরই হযরত জাফর ইবনু আবি তালিব হাবাশা থেকে ফিরে আসেন এবং আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম গ্রহণ করেন। এ অভিযানেই সাফিয়্যাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা বন্দি হন এবং পরে রাসূল তাঁকে বিবাহ করেন। যুদ্ধের পর এক ইহুদি মহিলা রাসূলের খাবারে বিষ মিশিয়ে দিলে আল্লাহর অশেষ কৃপায় তিনি বেঁচে যান, তবে সাহাবি বশির ইবনু বারা বিষক্রিয়ায় শাহাদাত বরণ করেন। খাইবার বিজয়ের পর ফাদাক, ওয়াদিল কুরা এবং তাইমা অঞ্চলগুলোও মুসলমানদের অধীনে চলে আসে।
টিকাঃ
[১] তবে এ ঘটনার বেশকিছু বর্ণনা বিচার করলে মনে হয়, এ ঘটনা অন্য কোনো সফরেও হতে পারে।