📄 বদরর যুদ্ধ
বদর যুদ্ধ BATTLE OF BADR
তারিখ: ২য় হিজরি/৬২৪ খ্রিস্টাব্দ
স্থান: বদর কূপ সংলগ্ন প্রান্তর; মদিনা শহর থেকে প্রায় ১২০ কি. মি. দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত
ফলাফল: মুসলমানদের সম্মানজনক বিজয়
পক্ষ-বিপক্ষ: মুসলমান বনাম কুরাইশ
সেনাপ্রধান: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনাম আমর ইবনু হিশাম ইবনুল মুগিরা আল-মাখযুমি
সেনাদল: খাযরাজ গোত্রের ১৭০ জন, ৭১ জন আওস, ৭৩ জন মুহাজির সাহাবি মিলে সর্বমোট ৩১৪ জন বনাম ৯০০ পদাতিক সেনা এবং ১০০ অশ্বারোহী মিলে মোট ১০০০ জন
নিহতের সংখ্যা: ১৪ জন শহিদ বনাম ৭০ জন। বন্দি: ৭০ জন কুরাইশ
বদর ইসলামের প্রথম মহিমান্বিত যুদ্ধ ও জয়ের সাক্ষী। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বে মুসলমানরা মদিনার পূর্ব দিকে বদর প্রান্তরে আমর ইবনু হিশাম ইবনুল মুগিরা আল-মাখযুমির (ইতিহাসে যে আবু জাহাল নামে প্রসিদ্ধ) সঞ্চালিত কুরাইশ বাহিনীর মুখোমুখি হয়। ২য় হিজরির ১৭ই রমাদান (১৩ই মার্চ, ৬২৪ খ্রি.) সংঘটিত এ যুদ্ধটি ইতিহাসে 'বদরের বড় যুদ্ধ' বা 'বদরের প্রধান যুদ্ধ'[১] বলে পরিচিত। মুসলমানদের বিজয় ও কুরাইশ-সর্দার আমর ইবনু হিশাম ইবনুল মুগিরা আল-মাখযুমির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এ যুদ্ধটি সমাপ্ত হয়।
যুদ্ধের পটভূমি
মক্কার মরুপ্রান্তরে ইসলাম ছড়িয়ে পড়লে সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের মতো ধর্ম পালন করছিলেন। কিন্তু মক্কার মুশরিকদের তা কোনোভাবেই সহ্য হচ্ছিল না। দিনদিন রাসূলের আনীত ধর্মের প্রসার এরা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। শুরু হয় রাসূল ও তাঁর সাহাবাদের উপর অকথ্য নির্যাতন। জুলুম, শাস্তি আর কষ্টের পরিমাণ দিনদিন বাড়তে থাকে। রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে নির্দেশ আসে হিজরতের। সাহাবারা সে-আদেশকে সামনে রেখে নিজেদের মাতৃভূমি ত্যাগ করতে সম্মত হয়ে যান। যে-ভূমিতে তাদের বাবা-মার কবর, যেখানে কেটেছে তাদের সোনালি শৈশব, যে মক্কার বালি-মাটিতে জড়িয়ে আছে তাদের হাজারও সুখ-দুঃখের গল্প—কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রেম বুকে নিয়ে তারা ছেড়ে যান সে শহর। পেছনে রেখে যান নিজেদের বাড়ি-ঘর, ক্ষেত-খামার, সহায়-সম্পদ। গন্তব্য—মদিনার নতুন আবাস, যেখানে কোনো স্বজন নেই; নেই পূর্বপরিচিত কোনো বন্ধুবান্ধব।
মুসলমানরা মক্কা ছেড়ে যেতেই মুশরিকরা তাদের রেখে যাওয়া সম্পদ কুক্ষিগত করে নেয়। সেগুলোকে পুঁজি করে ব্যবসার উদ্দেশ্যে দ্রুত বেরিয়ে পড়ে শামের দিকে। বাণিজ্যের পর্ব চুকিয়ে তখন কুরাইশরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়ে উঠছিল। পূর্বশত্রুতা এবং যুদ্ধের সম্ভাবনা থেকে রাসূল চাচ্ছিলেন, যে-কোনোভাবে তাদের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে। কারণ, ময়দানে নেমে আসার আগেই শত্রুকে আর্থিকভাবে কাবু করে ফেলার চিন্তা ও চেষ্টা করা একজন সচেতন এবং বিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়কের আবশ্যিক কর্তব্য। [১]
কাফেলার পশ্চাদ্ধাবন
মদিনায় আসার পর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশদের বিরুদ্ধে তিনটি প্রধান সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে রেখেছিলেন। প্রথমত, তিনি মদিনার বিধর্মী গোত্রগুলির সাথে শান্তিচুক্তি স্থাপন করেন; দ্বিতীয়ত, কুরাইশ ও তাদের মিত্রদের তথ্য সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন পয়েন্টে গোয়েন্দা নিযুক্ত করেন; তৃতীয়ত, মদিনার পাশ দিয়ে সিরিয়াগামী মক্কার বাণিজ্য কাফেলাগুলোতে অভিযান চালান। ৬২৩ সালের নভেম্বর বা ডিসেম্বরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিরিয়া অভিমুখী মক্কার একটি বড় বাণিজ্যিক কাফেলাগুলোর বিরুদ্ধে অভিযানে নেতৃত্ব দেন। এই কাফেলায় কুরাইশদের অনেক মূল্যবান দ্রব্যসামগ্রী ছিল। মুসলিম বাহিনীর সদস্য ছিল ১৫০ থেকে ২০০ জন এবং আরোহণের উট ছিল ৩০টি। রাসূল তাদেরকে নিয়ে যুল-উশাইরাহ পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিলেন। কিন্তু মুসলিমরা পৌঁছানোর কয়েকদিন পূর্বেই, কুরাইশরা সে পথ অতিক্রম করে চলে যাওয়ার কারণে রাসূল সেবার তাদের পথরোধ করতে পারেনি। এই অভিযানটি ইতিহাসে গাজওয়াতুল উশাইরা নামে পরিচিত। ইবনে ইসহাকের মতে, এই অভিযানের জন্য রাসূল ২য় হিজরির জামাদিউল আওয়াল মাসের শেষে বের হয়ে জামাদিউল আখির মাসের শুরুতে ফিরে এসেছিলেন।
এরপর ৬২৪ সালের জানুয়ারিতে (২য় হিজরির রজব মাসে) মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারো জন মুহাজিরের একটি দল গঠন করেন। বাহিনীর প্রতি দুইজনের আরোহণের জন্য একটি করে উট বরাদ্দ দেন। আবদুল্লাহ ইবনে জাহশকে বাহিনীর আমির নিযুক্ত করে, তার হাতে একটি চিঠি তুলে দেন। বলেন, দুই দিনের রাস্তা অতিক্রম করার পর এই চিঠি পড়বে, এর আগে না। নির্দেশ মোতাবেক দুইদিনের পথ অতিক্রম করার আবদুল্লাহ ইবনে জাহশ চিঠিটা পড়েন। এতে এই বলে নির্দেশ দেয়া হয় যে, চিঠি পড়ার পর যাতে তারা অগ্রসর হয়ে মক্কা ও তাইফের মধ্যবর্তী নাখলা নামক স্থানে পৌঁছায়। এরপর কুরাইশ কাফেলার আগমনের অপেক্ষা করে এবং তাদের অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে জরুরি ভিত্তিতে মদিনায় অবহিত করে। চিঠির নির্দেশ পড়ার পর তারা নাখলার দিকে অগ্রসর হন। তবে পথিমধ্যে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস ও উতবা ইবনে গাজওয়ানের উট হারিয়ে যাওয়ার ফলে তারা দল থেকে পিছিয়ে পড়েন।
আবদুল্লাহ ইবনে জাহশ তার বাহিনীকে নিয়ে নাখলা পৌঁছলে সেখানে কুরাইশদের একটি কাফেলা দেখতে পান। এতে আবদুল্লাহ ইবনে মুগিরার দুই ছেলে উসমান ইবনে আবদুল্লাহ, নওফাল ইবনে আবদুল্লাহ এবং মুগিরার আজাদকৃত দাস আমর ইবনে হাদরামি ও হাকিম ইবনে কাইসানকে দেখা হচ্ছিল। তবে দিনটি ছিল রজব মাসের শেষ দিন। রজব যুদ্ধনিষিদ্ধ মাস ছিল বিধায়, তাদের উপর তাৎক্ষণিকভাবে আক্রমণ করার সুযোগ ছিল না। অন্যদিকে মাস শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলে, কাফেলাটি মক্কার হারাম সীমানায় প্রবেশ করে ফেলবে। তাহলে তাদের উপর আর আক্রমণ করা সম্ভব হবে না। এই পরিস্থিতিতে মুসলিম বাহিনীটি মদিনার স্বার্থকে সামনে রেখে পরস্পর পরামর্শের পর, কাফেলাটিতে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। আক্রমণের শুরুতেই তিরের আঘাতে আমর ইবনে হাদরামি নিহত হন। মুসলিমরা উসমান ইবনে আবদুল্লাহ এবং হাকিম ইবনে কাইসানকে গ্রেপ্তার করে ফেলে। তবে নওফাল ইবনে আবদুল্লাহ তাদের হাত ফসকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
রজব মাসে আক্রমণ করার কারণে মুসলিম দলটি ফিরে আসার পর রাসূল খানিক ক্ষুব্ধ হন। তিনি বলেন, আমি তো তোমাদেরকে হারাম মাসে যুদ্ধের অনুমতি দিইনি। তিনি কাফেলা থেকে অর্জিত সম্পদ এবং বন্দিদের গ্রহণে অসম্মতি জানান। অন্যদিকে রজব মাসে আক্রমণের কারণে কুরাইশ শিবিরেও মুসলিমদের কটূক্তি শুরু হয়। তারাও চূড়ান্ত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। এরপর কুরআনের অবতীর্ণ আয়াতে (সুরা বাকারা: ২১৭) বলা হয় যে, পবিত্র মাসের বিধান লঙ্ঘন করার চেয়ে মক্কার লোকেদের অত্যাচার এবং আল্লাহর পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা আরও বেশি নিকৃষ্ট। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূল কাফেলা ও বন্দিদেরকে গ্রহণ করেন। কিছুদিন পর উসমান ও হাকিমের মুক্তি চেয়ে কুরাইশরা বার্তা পাঠায় এবং বিনিময় হিসেবে পণ্য প্রদানের কথা বলে। কিন্তু ইতিপূর্বে নিখোঁজ হওয়া সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস ও উতবা ইবনে গাজওয়ান তখনও ফিরে আসেননি। কুরাইশদের হাতে তাদের জীবনের আশঙ্কা থাকায় তিনি তখনই তাদের প্রস্তাবে রাজি হননি। এরপর তারা দুইজন মদিনায় ফিরে এলে, পণ্য গ্রহণ করে বন্দিদের মুক্তি দিয়ে দেন। বন্দি দুজনের মধ্যে হাকিম ইবনে কাইসান ইসলাম গ্রহণ করে মদিনায় থেকে যান। পরবর্তীতে বিরে মাউনার যুদ্ধে তিনি শহিদ হয়েছিলেন। অপর বন্দি উসমান ইবনে আবদুল্লাহ চুক্তি মেনে মক্কায় ফিরে যান।
ইতিপূর্বে গাজওয়ায়ে উশাইরা থেকে বেঁচে যাওয়া সম্পদ নিয়ে আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে কুরাইশদের আরেকটি কাফেলা সিরিয়া যায়। আসার পথে শামফেরত এই কুরাইশ কাফেলার খবর পৌঁছে যায় মদিনার মাটিতে; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কানে। রাসূল তাদের মক্কা ফেরার তথ্য সংগ্রহের জন্য তালহা ইবনে উবাইদিল্লাহ ও সাইদ ইবনে জাইদকে উত্তর দিকে প্রেরণ করেন। তারা হাওরা নামক স্থানে পৌছে কুরাইশ কাফেলার আগমনের অপেক্ষা করতে থাকেন। কাফেলাটি এই স্থান অতিক্রম করলে, তারা দ্রুত মদিনায় ফিরে রাসূলকে ঘটনা অবহিত করেন। বলেন, কাফেলাটিতে প্রায় এক হাজার উট এবং এসব উটে ৫০,০০০ স্বর্ণমুদ্রা এবং সমমূল্যের মালামাল আছে। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কাফেলায় রক্ষী হিসেবে দেখা গেছে ৪০ জনের মতো কুরাইশ সেনা। সবকিছু জেনে আবু সুফিয়ানের এই কাফেলায় আক্রমণের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমদের প্রতি আহ্বান জানান। তবে ময়দানে বৃহদাকার কুরাইশ বাহিনীর সম্মুখীন হতে হবে, এমন কোনো দূরতম আশঙ্কা না থাকায়, তিনি এতে সকলের অংশগ্রহণ জরুরি বলে উল্লেখ করেননি। ফলে অনেক মুসলিমই যুদ্ধকে অতখানি জরুরি মনে না করে মদিনায় থেকে যান।
বদরের যাত্রা
হিজরতের দ্বিতীয় বছর, রমজানের সতের তারিখ। ৩১৩ জন সাহাবাকে সঙ্গে নিয়ে রাসূল বের হয়ে পড়েন। যাদের হাতে পতপত করে উড়ছিল ইসলামের পতাকা আর গায়ে শোভা পাচ্ছিল মুসলমানের স্বীকৃত বেশভূষা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে রওনা করা ইসলামের সর্বপ্রথম বৃহৎ যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাওয়া এ-মুসলিম বাহিনীতে ছিলেন সাহাবি হযরত আবু বকর, উমর ইবনুল খাত্তাব, আলি ইবনে আবি তালিব, হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব, মুসআব ইবনে উমাইর, যুবাইর ইবনুল আওয়াম, আম্মার ইবনে ইয়াসির এবং আবু যার আল-গিফারি রাদিয়াল্লাহু আনহুম। স্ত্রীর অসুস্থতার কারণে যুদ্ধে যেতে পারেননি উসমান ইবনে আফফান। সালমান ফারসি এ সময় অন্যের দাস ছিলেন, তাই তিনিও যুদ্ধে অংশ নেননি। বাহিনীতে সর্বমোট সৈনিক সংখ্যা ছিল ৩১৩ জন। এর মধ্যে মুহাজির ছিলেন ৮২ জন এবং আওস গোত্রের আনসার ছিলেন ৬১ জন ও খাযরাজ গোত্রের ১৭০ জন। মুসলিম বাহিনীর সাথে ৭০টি উট এবং দুইটি ঘোড়া ছিল। ফলে তাদের অনেকের জন্য পায়ে হেঁটে যাওয়া বা প্রতি দুই-তিনজনের জন্য একটি উট ব্যবহার ছাড়া গত্যান্তর ছিল না। ফলে একটি উটে পালাক্রমে তারা দুই বা তিনজন আরোহণ করতেন। এই বণ্টন হিসেবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আলি ইবনে আবি তালিব এবং মারসাদ ইবনে আবি মারসাদের জন্য একটি উট বরাদ্দ করা হয়েছিল।
সার্বিক নেতৃত্বের জন্য মুসআব ইবনে উমাইরকে রাসূল একটি সাদা পতাকা প্রদান করেন। মুহাজির ও আনসারদের জন্য একটি করে কালো পতাকা যথাক্রমে আলি ইবনে আবি তালিব এবং সাদ ইবনে মুয়াযকে প্রদান করা হয়। বাহিনীর ডান ও বাম অংশের প্রধান হিসেবে যথাক্রমে যুবাইর ইবনুল আওয়াম ও মিকদাদ ইবনে আমরকে নিযুক্ত করা হয়। মুসলিম বাহিনীতে থাকা দুইটিমাত্র ঘোড়ায় তারা আরোহণ করেছিলেন। পেছনের অংশের প্রধান হিসেবে কাইস ইবনে আবিকে নিয়োগ দেয়া হয়। আর সমগ্র বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন খোদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
কুরাইশি কাফেলা আক্রমণের আশঙ্কায় কুরাইশ কাফেলার নেতা আবু সুফিয়ান যাত্রাপথে সাক্ষাত লাভ করা বিভিন্ন কাফেলাগুলির কাছ থেকে মুসলিম বাহিনীর সম্ভাব্য অভিযানের ব্যাপারে তথ্য নিচ্ছিলেন। তিনি রাসূলের আগমনের খবর পান। এ মুহূর্তে মুসলিম বাহিনীর মোকাবেলা করার মতো পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই দেখে, সাহায্য চেয়ে যমযম ইবনে আমর গিফারিকে বার্তাবাহক হিসেবে মক্কা পাঠিয়ে দেয়। সে দ্রুতবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে মক্কা পৌঁছায়। শহরে ঢুকেই তৎকালীন আরবরীতি অনুযায়ী উটের নাক চাপড়ে, আসন উল্টিয়ে, নিজের জামাকাপড় ছিঁড়ে এই বলে ঘোষণা করে যে, 'কুরাইশগণ, কাফেলা আক্রান্ত, কাফেলা আক্রান্ত। আবু সুফিয়ানের সাথে তোমাদের সম্পদ রয়েছে, তার উপর আক্রমণ চালানোর জন্য মুহাম্মাদ ও তার সঙ্গীরা এগিয়ে আসছে। তাই আমার মনে হয় না যে, তোমরা তা পাবে। তাই সাহায্যের জন্য এগিয়ে চলো, এগিয়ে চলো।'
মক্কার বাহিনী এই খবর শোনার পর মক্কায় আলোড়ন শুরু হয়ে যায়। দ্রুত ১৩০০ সৈনিকের এক শক্তিশালী বাহিনী গড়ে তোলা হয় এবং আবু জাহল বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেয়। এই বাহিনীতে অসংখ্য উট, ১০০ ঘোড়া এবং ৬০০ লৌহবর্ম ছিল। নয়জন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি কুরাইশ বাহিনীর যাবতীয় রসদ সরবরাহের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেনাদের জন্য দৈনিক কখনো ৯টি এবং কখনো ১০টি উট জবাই করার প্রতিশ্রুতি দেন। আবু জাহল, উতবা ইবনে রাবিয়া, শাইবা ইবনে রাবিয়া, আবুল বাখতারি ইবনে হিশাম, হাকিম ইবনে হিজাম, নওফেল ইবনে খুয়াইলিদ, হারিস ইবনে আমির, তুয়াইমা ইবনে আদি, নাদার ইবনে হারিস, যামআ ইবনে আসওয়াদ ও উমাইয়া ইবনে খালাফসহ মক্কার অনেক অভিজাত ব্যক্তি এই বাহিনীতে যোগ দেন। এমন আকস্মিক যুদ্ধে এত লোকের অংশগ্রহণের কারণও ছিল। এদের কেউ কাফেলায় নিজেদের সম্পদ রক্ষা করতে চেয়েছিলেন, কেউ-বা ইবনে আল-হাদরামির মৃত্যুর বদলা নিতে চেয়েছিলেন। এছাড়া মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহজে জয়ী হওয়া যাবে, এই বিশ্বাসেও অনেকে আনন্দের সাথে সেনাযাত্রায় যোগ দেয়। কুরাইশের আরেক নেতা, রাসূলের চাচা আবু লাহাব নিজে সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নিয়ে, তার কাছে ৪০০০ দিরহাম ঋণগ্রস্থ থাকা আসি ইবনে হিশাম ইবনে মুগিরাকে ঋণের বিনিময়ে যুদ্ধে পাঠিয়ে দেন। অন্যদিকে উমাইয়া ইবনে খালাফ প্রথমে যুদ্ধে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে উকবা ইবনে আবু মুয়াইত তাকে নারী হিসেবে সম্বোধন করে বলে, 'ঘরে চুড়ি পরে বসে থাকো।' তার কথায় উমাইয়া ইবনে খালাফ লজ্জিত হয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু নিতে শুরু করে। তবে কুরাইশদের মধ্যে বনু আদি গোত্রের কেউই এই যুদ্ধে অংশ নেয়নি বলে জানা যায়।
অন্যদিকে আবু সুফিয়ান ক্রমাগত মুসলিম বাহিনীর খবরাখবর সংগ্রহ করছিলেন। বদরের নিকটে পৌঁছার পর মাজদি ইবনে আমর নামক এক ব্যক্তির সাথে তার সাক্ষাত হয়। তাকে তিনি মদিনার বাহিনী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে মাজদি স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি। তবে জানান যে, দুইজন উষ্ট্রারোহীকে তিনি টিলার পাশে উট বসিয়ে মশকে পানি পূর্ণ করতে দেখেছেন। আবু সুফিয়ান সতর্কতা হিসেবে সেখানে যান এবং উটের গোবর ভেঙে দেখেন। গোবর থেকে প্রাপ্ত খেজুরের বিচি দেখে বুঝতে পারেন, এগুলি মদিনার খেজুর। ফলে আশেপাশে মুসলিমদের উপস্থিতির ব্যাপারে তার আর সন্দেহ থাকে না। এরপর তিনি কাফেলাকে নিয়ে সমুদ্র উপকূলের দিকে ইয়ানবুতের পথে নেমে যান। মক্কার বাহিনী জুহফা নামক স্থানে পৌঁছার পর আবু সুফিয়ান একজন দূত পাঠান সেখানে। প্রেরিত বার্তাবাহক এসে জানায়, কাফেলা নিরাপদে বিপদসীমা পার হয়ে গেছে, তাই আর সামনে অগ্রসর হওয়ার দরকার নাই।
কাফেলা বিপদ পার হয়ে হবার খবর পেয়ে মক্কার বাহিনীর অধিকাংশ ফিরে যাওয়ার পক্ষে মত দেয়। কিন্তু বাহিনীর প্রধান আবু জাহল যুদ্ধ না করে ফিরে যেতে অসম্মতি জানান। এরপর বনু যুহরা গোত্রের মিত্র ও গোত্রপ্রধান আখনাস ইবনে শারিকও তাকে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু নেতাদের অধিকাংশ তার পক্ষে সায় না দেয়ায় তিনি বনু যুহরা গোত্রের ৩০০ সদস্য নিয়ে মক্কায় ফিরে আসেন। এর ফলে মক্কার বাহিনীতে সেনাসংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১০০০। ইতিহাস বলে, পরবর্তীতে বনু যুহরা গোত্রের সদস্যরা আখনাসের এই সিদ্ধান্তের কারণে আনন্দ প্রকাশ করেছিল। একইভাবে বনু হাশিমও মক্কায় ফিরে যেতে চায়। কিন্তু আবু জাহলের জেদের কারণে তারা যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য হয়। এরপর কুরাইশ বাহিনী অগ্রসর হয়ে বদর উপত্যকার একটি টিলার পেছনে গিয়ে আশ্রয় নেয়।[১]
মুসলিম বাহিনী
রাসূলের কানে আসে কাফেলা বাঁচাতে কুরাইশ বাহিনীর অগ্রযাত্রার খবর। মুসলমানদের এই সেনাদল মূলত কাফেলায় হামলা করার জন্য গঠিত হয়েছিল; স্বভাবতই ব্যাপক কোনো যুদ্ধের জন্য তারা প্রস্তুত ছিল না। ফলত কুরাইশ বাহিনীর আগমনের খবরে শত্রুর মুখোমুখি না হয়ে ফিরে যেতে পারত; কিন্তু এতে কুরাইশদের সাহস বৃদ্ধি পেত এবং তারা অগ্রসর হয়ে মদিনায়ও আক্রমণ করে বসতে পারত। অন্যদিকে বাহিনীতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মদিনার আনসাররা 'বাইয়াতে আকাবায়ে উলা' বা আকাবার প্রথম শপথ[২] অনুযায়ী মদিনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করতে বাধ্য ছিল না; অধিকন্তু এ অভিযানের ব্যয়ভারও তাদের উপরই বেশি ছিল। তাই উদ্ভূত পরিস্থিতি সমাধানে করণীয় সম্পর্কে আলোচনার জন্য রাসূল জরুরি যুদ্ধসভার আহ্বান করেন। রাসূল আহুত সেই সভায় প্রসিদ্ধ ও নেতৃস্থানীয় সাহাবারা দাঁড়িয়ে কথা বললেন, তারা এই যুদ্ধকে কল্যাণ হিসেবে দেখলেন এবং নিজেদের সৌভাগ্যের কারণ মনে করলেন। মুহাজিররা যেমন সন্তোষজনক মতামত দিলেন, আনসাররাও যুদ্ধের অনুকূল সিদ্ধান্ত জানালেন। আনসারদের সর্দার সাদ বিন মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন: 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, আনসাররা কখনোই আপনাকে লাঞ্ছিত হতে দেবে না, কিছুতেই আপনাকে আশাহত করবে না। আপনি যদি তাদেরকে সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে বলেন, আপনার সাথে তারা নির্দ্বিধায় সমুদ্রে ঝাঁপ দিতেও প্রস্তুত। আপনি আমাদের নিয়ে সামনে চলুন, আল্লাহ বারাকাহ দিবেন-ইনশাআল্লাহ' এই বলে তিনি বক্তব্য শেষ করলেন।
যুদ্ধের পূর্বাভাস
সাহাবাদের ইতিবাচক মতামত পেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে নিয়ে বদর প্রান্তরে এগিয়ে গেলেন। স্থানীয় এক বৃদ্ধের মাধ্যমে তাঁর কাছে খবর এল, আবু সুফিয়ান কাফেলা নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে চলে গেছে; তবে উপত্যকার ওপাশে কুরাইশের বাহিনী হাজির। আবু জাহাল কাফেলা নিরাপদ জেনেও ইঙ্গিতে কুরাইশদের বলেছে, তারা এখনই ফিরে যাবে না। বরং বদর প্রান্তরে গিয়ে তারা পশু জবেহ করবে, আনন্দভোজনের আয়োজন করবে এবং মদপানের আসর জমাবে; যাতে আরবরা তাদের এমন সাহাসের খবর শুনে ভীতবিহ্বল হয়ে পড়ে এবং সবসময় তাদের ভেতর কুরাইশদের ভয় ও প্রভাব জিইয়ে থাকে।
দিন পেরিয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলি ইবনে আবি তালিব, যুবাইর ইবনুল আওয়াম ও সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসকে তথ্য সংগ্রহের জন্য আশপাশে ঘুরে দেখতে পাঠান। তারা বদরের কূপে দুইজন পানি সংগ্রহরত ব্যক্তিকে বন্দি করেন। জিজ্ঞাসাবাদের পর তারা ভয় পেয়ে যায় এবং জানায়, তারা মক্কার বাহিনীর সদস্য এবং বাহিনীর জন্য পানি সংগ্রহ করছিল। রাসূল তখন নামায আদায় করছিলেন। উপস্থিত সাহাবিদের তাদের কথার সত্যতা সম্পর্কে সন্দিহান হলে তারা তাদের মারধর করেন এবং বারবার একই প্রশ্ন করতে থাকেন। চাপের মুখে তারা ভোল পাল্টে ফেলে। বলে, আমরা কুরাইশ বাহিনীর নয়, বরং আবু সুফিয়ানের কাফেলার লোক। রাসূল নামায শেষ করে আসতে আসতে বলেন, 'তারা সত্যই বলছিল অথচ এরপরও তাদেরকে তোমরা মারধর করলে কেন?' তাঁর চেহারায় বিরক্তি ফুটে ওঠে। এরপর তিনি নিজে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তারা উপত্যকার শেষ প্রান্তের টিলা দেখিয়ে বলে যে, কুরাইশরা তার পেছনে অবস্থান করছে এবং প্রতিদিন নয় বা দশটি উট তাদের সেনাদের জন্য জবাই করা হয়। একথা শুনে রাসূল অনুমান করে বলেন, তাহলে তাদের সেনাসংখ্যা ৯০০ থেকে ১০০০ হবে। এরপর বন্দি দুজন বাহিনীতে আগত সম্ভ্রান্ত কুরাইশ নেতাদের নামও বলে দেয়। রাসূল বুঝতে পারেন, যুদ্ধ না করে কুরাইশরা ময়দান ছেড়ে যাবে না। দেরি না করে তিনি বাহিনীকে বদরের দিকে যাত্রা শুরু করার নির্দেশ দেন।
কুরাইশরাও তাদের শিবির ভেঙে বদরের দিকে রওয়ানা হয়। মুসলিম বাহিনীর আগে প্রান্তরে পৌছে তারা উমাইর ইবনে ওয়াহাবকে রাসূলসেনাদের খবর সংগ্রহের জন্য পাঠায়। উমাইর পর্যবেক্ষণ করে এসে জানান, মুসলিমদের বাহিনী ছোট এবং আপাতত সাহায্যের জন্য নতুন কোন সেনাদল আসার সম্ভাবনাও নেই। তবে তারা সুবিন্যস্তভাবে যুদ্ধের জন্য তৈরি হয়ে আছে এবং তারা কুরাইশদের বিশেষ লোকদেরকে হত্যা করে ফেলতে পারে। এভাবে তিনি কুরাইশদের পক্ষে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা ব্যক্ত করেন। আরব যুদ্ধে হতাহতের পরিমাণ বেশি হত না, তাই এমন শঙ্কার কথা শুনে কুরাইশদের মনোবল নড়ে যায়। তারা মুসলমানদের মোকাবেলা করা না-করা নিয়ে পুনরায় তর্কে জড়িয়ে পড়ে। কুরাইশদের অন্যতম নেতা হাকিম ইবনে হিজাম আরেক নেতা উতবা ইবনে রাবিয়াকে ফিরে যেতে অনুরোধ জানায়। জবাবে উতবা বলেন, তিনি ফিরে যেতে রাজি আছেন এবং নাখলায় নিহত আমর ইবনে হাদরামির রক্তপণ নিজে পরিশোধ করতেও সম্মত আছেন। কিন্তু আবু জাহল কিছুতেই রাজি হচ্ছে না বলে তিনি হাকিমকে বলেন যে-কোনো মূল্যে তাকে রাজি করাতে। এরপর উতবা উপস্থিত কুরাইশদের উদ্দেশ্য করে বলেন, 'এই যুদ্ধে আমাদের হাতে হয়তো নিজেদের ভাইয়েরাই নিহত হবে; তাই যুদ্ধে বিজয়ী হলেও, নিহতদের লাশ দেখতে আমরা অবশ্যই পছন্দ করব না এবং চাইব না যে, আমরা আরববাসীর কাছে আত্মীয় হত্যাকারী হিসেবে পরিচিত হই!' কিন্তু তার কথায় কারও বোধোদয় হয়েছে বলে মনে হলো না। হাকিম ইবনে হিজাম এসময় আবু জাহলের কাছে গিয়ে পুনরায় তাকে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু আবু জাহল কঠোরভাবে জানান, যুদ্ধ না করে কিছুতেই তিনি ফিরে যাবেন না। সেইসাথে উতবার ফিরে যাওয়ার পরামর্শকে ধিক্কার দিয়ে অভিযোগ করে বলেন, 'তোমার ছেলে মুসলিমদের দলে রয়েছে বলে তুমি ছেলেকে বাঁচানোর জন্য যুদ্ধ না করার পরামর্শ দিচ্ছ, হ্যাঁ?''[১] আবু জাহলের এ-কথায় উতবা প্রচণ্ড বিব্রত হন এবং বলেন, 'আমি কাপুরুষ নই; মুহাম্মাদের সাথে চূড়ান্ত বোঝাপড়া না হওয়া পর্যন্ত আমি উতবা মক্কায় ফিরে যাবো না।' অন্যদিকে আবু জাহল নাখলায় নিহত আমরের ভাই আমির ইবনে হাদরামির কাছে গিয়ে অভিযোগ করে বলেন, 'উতবা যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে চলে যেতে চায়; তাই তোমার ভাইয়ের মৃত্যুর বদলা নেয়া সম্ভব হবে না বোধহয়!' এ-কথা শুনে আমির সারা শরীরে ধুলো মেখে কাপড় ছিঁড়তে ছিঁড়তে নিহত ভাইয়ের জন্য মাতম করতে থাকে। আবু জাহলের একগুঁয়েমি এবং মিথ্যা প্রচারণার ফলে যুদ্ধ বন্ধের জন্য হাকিমের সব তৎপরতা এখানেই ব্যর্থ হয়ে যায়।
প্রথম মৃত্যু
যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে কুরাইশ সেনা আসওয়াদ ইবনে আবদুল আসাদ মাখযুমি এগিয়ে এসে 'মুসলিমদের পানির জলাধার দখল করে নেবে নাহয় এজন্য নিজের জীবন দেবে' বলে ঘোষণা দেয়। এ-কথা শুনে রাসূলের চাচা হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব অগ্রসর হয়ে তার সাথে লড়াই করেন। লড়াইয়ে আসওয়াদের পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আহত অবস্থা আসওয়াদ চৌবাচ্চার দিকে এগিয়ে যায় এবং প্রতিজ্ঞা রক্ষার জন্য চৌবাচ্চার সীমানার ভেতর ঢুকে পড়ে। হামযা তাকে নিবৃত্ত করতে সেখানেই হত্যা করেন। ঐতিহাসিকদের মতে, এটিই ছিল বদর যুদ্ধের প্রথম মৃত্যুর ঘটনা।
ওদিকে রাসূলের নেতৃত্বে মুসলমানরা উপত্যকার কাছাকাছি কিছুটা নিচু জায়গায় বাহিনী স্থির করার সুযোগ পায়। আশপাশে কোন পানির কূপ বা ঝরনা ছিল না; এমন সময় আল্লাহ তাআলা মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করেন। ভারি বর্ষণের ফলে উপত্যকা বিশুদ্ধ পানিতে ভেসে যায়। প্রান্তরের বালু পানি শুষে নেবার আগেই মুসলমানরা তৃষ্ণা মিটিয়ে পাত্রগুলোতে প্রয়োজনীয় পানি ভরে রাখেন। বিক্ষিপ্ত বালুকাময় ভূমি বৃষ্টির সুবাদে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবাদের পায়ের তলে এসে জমাট বেঁধে যায়; এতে তাদের চলাচল সহজ ও সুবিধাজনক হয়ে আসে। এদিকে অসময়ের বৃষ্টিতে কাফেরদের পায়ের তলের বালু সরে গিয়ে সেখানকার মাটি কর্দমাক্ত হয়ে ওঠে, এতে তাদের চলাচল খুবই বিরক্তিকর হয়ে যায়। মাটিতে পা ফেলতেই তা আলগোছে দেবে যাচ্ছিল, হাঁটু গেড়ে যাচ্ছিল সাথে থাকা বাহন ও যুদ্ধঘোড়াগুলোরও। ফলে তাদের আক্রমণ বাধাগ্রস্ত এবং বিলম্বিত হতে থাকে। এদিকে রাসূল তাঁর বাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসেন। সঞ্চিত জলাভূমির কাছে এসে অবস্থান নিয়ে তিনি একটি হাউজ নির্মাণের নির্দেশ দেন, যেখানে বাহিনীর প্রয়োজনীয় পানি সংরক্ষিত থাকবে। হাউজটির পাড় ঘেঁষে চারপাশে একটু নিচু করে কিছু কূপ খননেরও সিদ্ধান্ত দেন। এতে মুশরিকদের জন্য মুসলমানদের ডিঙিয়ে পানি সংগ্রহের আশা একেবারে শূন্যে চলে যায়। ময়দানের উঁচু থেকে সব পানি এসে জমে যায় রাসূলের পায়ের কাছে, নিচু ভূমিতে। খানিকটা উঁচু টিলামতন একটি জায়গায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য রণক্ষেত্রমুখী একটি তাঁবু স্থাপন করা হয়।
যুদ্ধ যখন হলো
হিজরি দ্বিতীয় বর্ষের ১৭ই রমজান ভোরবেলা উভয় বাহিনী মুখোমুখি হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে তাঁর বাহিনী কাতারবদ্ধ করেন। তাদেরকে সীসাঢালা প্রাচীরের মতো সুসংহত করে তিনি কুরাইশ বাহিনীর দিকে তাকান। উচ্চস্বরে বলেন: 'হে আল্লাহ, এই কুরাইশের মুশরিক বাহিনী তাদের অহংকার ও বিদ্বেষবশত আপনার বিরুদ্ধে জড়ো হয়েছে, আপনার রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। হে আল্লাহ, আমাদেরকে আপনার প্রতিশ্রুত বিজয় দান করুন, আর এই সকাল-তাদের ধ্বংস ও নির্মূলের সকাল করে দিন।' [১]
এরপর মুশরিকদের দল থেকে তিনজন ময়দানে নেমে আসে: উতবা ইবনু রাবিআ, তার ছেলে ওয়ালিদ এবং তার ভাই শাইবা। ময়দানে এসে তারা আহ্বান করতে থাকে, কে আছে তাদের মোকাবেলা করবে! তাদের আহ্বানে সাড়া দিতে মুসলিম বাহিনী থেকে বেরিয়ে আসেন তিন আনসার সেনা: আওফ ইবনু হারিস, মুয়াব্বিজ ইবনু হারিস এবং আব্দুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা। কিন্তু তারা বলে, আমরা আমাদের সমগোত্রীয় কুরাইশিদের দেখতে চাই। এ-কথা শুনে ময়দানে বেরিয়ে আসেন তিন কুরাইশি সেনা: হামযা ইবনু আবদিল মুত্তালিব, উবাইদা ইবনুল হারিস, আলি ইবনু আবি তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)। হামযা রা. দাঁড়ান শাইবার সামনে, উবাইদা রা. উতবার সামনে আর আলি রা. দাঁড়ান তুলনামূলক যুবক-ওয়ালিদের সামনে। হামযা ও আলি রা. তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বীকে সহজেই ভূপাতিত করে ফেলেন কিন্তু উবাইদা রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীকে আঘাত করেছেন, তবে ধরাশায়ী করতে পারেননি। বিপরীতে উতবাও তাঁকে শক্ত আঘাত করেছে। আলি ও হামযা তাদের হাতসাফাই শেষে উবাইদার প্রতিদ্বন্দ্বী উতবার উপর আক্রমণ করে তার ইহকাল সাঙ্গ করে দেন এবং আহত উবাইদাকে তুলে মুসলিম বাহিনীর কাতারে নিয়ে রাখেন। কিছুক্ষণ পরই তিনি আহত অঙ্গের রক্তক্ষরণে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন—রাদিয়াল্লাহু আনহু।
একক মুখোমুখি লড়াইয়ের পর দুই দল একযোগে যুদ্ধে জড়িয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিকল্পনা ছিল, মুসলমানরা আগে যুদ্ধ শুরু না করুক, যাতে কাফেররা আগ বেড়ে মারতে এলে তাদেরকে নিজেদের বেষ্টনীর মধ্যে আটকে ফেলা যায়। তখন যুদ্ধক্ষেত্রের চারপাশের উঁচু টিলাগুলো থেকে আত্মগোপনকারী তিরন্দাজরা বের হয়ে মুহুর্মুহু তির ছুড়ে প্রতিপক্ষ সেনাদলের অগ্রভাগ ধরাশায়ী করে ফেলতে পারবে। মুসলমানদের পরিকল্পনামতে এমনটাই ঘটল!
যুদ্ধ তখন তুঙ্গে। দু পক্ষের সেনাদের তরবারি ক্রমাগত আঘাত করছে, সূর্যের আলোর সাথে সাথে চমকে উঠছে তাদের উন্মুক্ত বর্শাগুলো। বাতাসে উড়ছে বিক্ষিপ্ত ধুলোর দল, মুহূর্তেই ময়দান হয়ে উঠেছে সীমাহীন উত্তপ্ত। সাহাবাদের মুখে উচ্চারিত হচ্ছে বীরত্বের স্লোগান—আল্লাহু আকবার। বদরের পানিসঞ্চিত ভূমির অধিকার নিয়ন্ত্রণে নেবার সুবাদে মুসলমানরা চারপাশে কিছু কূপ ও উঁচু টিলা তৈরি করেছিল। যুদ্ধের একপর্যায়ে কাফিররা পানি পান করতে কূপের কাছে এলেই মুসলমানরা টিলাগুলোতে বসে একের পর এক তাদের বধ করেছে। মুয়ায ইবনে আমর এবং মুয়ায ইবনে আফরা নামক দুই কিশোর মুজাহিদ, কুরাইশপক্ষের সর্বাধিনায়ক আবু জাহলকে হত্যা করে ফেলে। বিলালের হাতে নিহত হয় তার সাবেক মনিব উমাইয়া ইবনে খালাফ। উমর ইবনুল খাত্তাব তার মামা আস ইবনে হিশাম ইবনে মুগিরাকে হত্যা করেন। তবে সবচে বড় মদদ ছিল অন্যকিছু; আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাদেরকে বিজয়ের ফেরেশতা পাঠিয়ে সাহায্য করেছিলেন। এর অল্প কিছুক্ষণের ব্যবধানে কাফিররা পরাজিত হয়ে পিঠ দেখিয়ে পালাতে শুরু করে। মুসলিম বাহিনী তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে এবং হত্যা ও বন্দির মাধ্যমে তাদেরকে আতঙ্কিত করে রাখে। তারা কুরাইশদের সত্তরজনকে হত্যা করে এবং অপর সত্তরজনকে আটক করে নেয়। নিহতদের মধ্যে মুশরিকদের বেশ কয়েকজন নেতাব্যক্তিও ছিল।
যুদ্ধ তখন শেষ
যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ হয়ে গেলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শহিদদের দাফন করার নির্দেশ দেন। মুসলমানদের মধ্য হতে মাত্র ১৪ জন সেনা সেবার শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করার সৌভাগ্য লাভ করেন-রাদিয়াল্লাহু আনহুম।
বদর প্রান্তরে যুদ্ধ সমাপ্ত হলে শহিদদের দাফনকার্য সেরে রাসূল নির্দেশ দেন গনিমত সংগ্রহ করার। কুরাইশ নেতাদের নিহত দেহগুলোকে পাশের এক কূপে নিক্ষেপ করার হুকুম দেন। একজন লোককে মদিনায় পাঠান শহরবাসীকে বিজয়ের সুসংবাদ দিতে। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গনিমতের মাল ও বন্দিদের নিয়ে মদিনায় ফিরে আসেন। বন্দিদের সাথে মুসলমানরা সদ্ব্যবহার করেন। নিজেরা খেজুর খেয়ে তাদেরকে রুটি খেতে দেন। শহরে পৌঁছে প্রথমে রাসূল গনিমত হিসেবে প্রাপ্ত সম্পদ নিয়মানুসারে মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করে দেন; শহিদদের উত্তরাধীকারীদের জন্য তাদের অংশ হেফাজতে রাখেন। বন্দিদের ব্যাপারে করণীয় সম্পর্কে তিনি সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করেন। সভায় আবু বকর মত দেন যে, বন্দিদের সবাই মুসলিমদেরই ভাই, একই বংশের সদস্য অথবা নিকটাত্মীয়। তাই আমার কাছে মনে হয়, তাদের থেকে মুক্তিপণ নিয়ে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া উচিত; যাতে মুসলিমদের তহবিলে অর্থ সঞ্চিত হয় এবং বন্দিরা ভবিষ্যতে ইসলাম গ্রহণের সুযোগ পায়। উমর ইবনুল খাত্তাবের মত ছিল, বন্দিদের প্রতি কোনোপ্রকার অনুকম্পা প্রদর্শন না করে মুসলিমদের প্রত্যেককে, বন্দিদের মধ্যে নিজ নিজ আত্মীয়কে হত্যা করার নির্দেশ দেয়া হোক; যাতে এটা প্রমাণ হয় যে, মুশরিকদের ব্যাপারে মুসলিমদের মনে কোনো দুর্বলতা নেই। তবে রাসূল আবু বকরের মত মেনে নিয়ে সিন্ধান্ত জানান, তাদেরকে হাতে রেখে কুরাইশদের থেকে মুক্তিপণ আদায় করবেন। সে-মতে মক্কায় 'মুক্তিপণ বাবদ বন্দিমুক্তির' বার্তা পাঠালে কুরাইশরা তা গ্রহণ করে এবং মুক্তিপণ দিয়ে তাদের বন্দিদের ছাড়িয়ে নেয়।
পুরুষ বন্দির বিনিময়ে মুসলমানদের ধার্যকৃত মুক্তিপণ ছিল, গোত্রে তাদের অবস্থান অনুযায়ী এক হাজার থেকে চার হাজার দিরহাম পর্যন্ত। আর যারা মুক্তিপণ আদায়ে সমর্থ ছিল না, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে পড়ালেখা জানতো-তাদেরকে রাসূল মুক্তিপণ হিসেবে মুসলমানদের দশজন কিশোরের শিক্ষাদানের দায়িত্ব প্রদান করেন। বন্দিদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেয়ে যায়নাব বিনতে মুহাম্মাদের স্বামী আবুল আসও ছিল। 'যায়নাবকে মদিনা আসতে বাঁধা দেবে না' এই শর্তে আবুল আসকে সেবার মুক্তি দেয়া হয়েছিল। মক্কার সুবক্তা হিসেবে পরিচিত সুহাইল ইবনে আমরও ছিলেন যুদ্ধবন্দিদের সাথে। উমর সুহাইলের সামনের দুটি দাঁত ভেঙে ফেলার প্রস্তাব দেন, যাতে সে আর মুসলিমদের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিতে না পারে। কিন্তু রাসূল উমরের এই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। পরবর্তীতে হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় এই সুহাইল কুরাইশপক্ষের প্রতিনিধি ছিলেন। আরও কিছু পরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
বদরের যুদ্ধে কুরাইশদের নিহত সেনাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল: আবু জাহল ইবনু হিশাম, উমাইয়া ইবনু খালাফ, উতবা ইবনু রাবিআ, শাইবা ইবনু রাবিআ, হানযালা ইবনু আবি সুফিয়ান, ওয়ালিদ ইবনু উতবা এবং জাররাহ।[১] মুসলমানদের মধ্যে যারা শহিদ হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন ছয়জন মুহাজির এবং আটজন আনসার সাহাবি।[২]
বদরের প্রভাব
বদরের এই অসম যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় সুদূরপ্রসারী প্রভাব সৃষ্টি করেছিল। যুদ্ধ জয়ের ফলে নেতা হিসেবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কর্তৃত্ব বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। এর ফলে অন্য আরব গোত্রগুলি মুসলিমদেরকে নতুন শক্তি হিসেবে দেখতে শুরু করে। মদিনার অনেক বিধর্মী এ-সময় ইসলাম গ্রহণ করে নেয়। বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুসলিমদেরকে পরবর্তী সময়ে খুবই সম্মানের দৃষ্টিতে দেখা হয়। অন্যদিকে হাইসমান ইবনু আবদিল্লাহ নামক এক কুরাইশ সেনা পরাজয়ের খবর মক্কায় পৌঁছে দেয়। নেতৃস্থানীয় এতগুলো লোকের মৃত্যুর খবরে সেখানে শোকের মাতম পড়ে যায়। যুদ্ধে আবু জাহলসহ মক্কার অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তির মৃত্যুর ফলে আবু সুফিয়ান নতুন নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন এবং শোকের পরিবেশ সামলে তিনি প্রতিশোধের জন্য সকলকে শক্তি সঞ্চার করতে বলেন। পরবর্তীতে বেশ কিছু যুদ্ধে মুসলিমদের বিরুদ্ধে তিনি পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে কুরাইশদের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এ যুদ্ধ ছিল মুসলমানদের বিজয়ের প্রথম মাইলফলক। এমন অভাবনীয় সাফল্য তাদের জন্য ছিল পরম গৌরবের। বদরের এ যুদ্ধে তাদের সেনাসংখ্যা ছিল কম, প্রস্তুতি ছিল সামান্য; অপরদিকে মক্কার মুশরিকরা সংখ্যায় ও সামগ্রীতে ছিল তুলনামূলক অনেক এগিয়ে। তারপরেও এমন অসামান্য বিজয় সে-সব মুসলমানদের প্রতি আল্লাহর অবারিত দান ও অনুগ্রহের প্রকৃষ্ট দলিল, যারা দৃঢ়প্রত্যয়ী হয়; যাদের হৃদয় ভরা থাকে আল্লাহর প্রতি ভরসায়, রাসূলের জবানিতে শোনা আল্লাহর বিজয় ও সাফল্যের প্রতিশ্রুতিতে—যাদের মনে থাকে অগাধ বিশ্বাস। বদর প্রান্তরে মুসলমানদের এমন মহিমাময় জয় ও কুরাইশ বাহিনীর শোচনীয় পরাজয়ের ফলে পুরো আরববাসীর অন্তর্জগতে রাসূল ও সাহাবাদের ভয় ঢুকে যায়। ফলে পরবর্তী সময়ের জন্য এ বিজয় মুসলমানদের সম্মান, প্রভাব ও শক্তির প্রতীক হয়ে ওঠে।
টিকাঃ
[১] 'বদর যুদ্ধ' হিসেবে প্রসিদ্ধ এবং প্রধান ২য় হিজরির এ যুদ্ধটিকে 'বদরের বড় যুদ্ধ' বলার কারণ হলো, ৪র্থ হিজরিতে উহুদের ময়দানে দেয়া পূর্বপ্রতিশ্রুতিমতে আবু সুফিয়ানের মক্কার বাহিনীর সাথে বদর প্রান্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি যুদ্ধের কথা ছিল। ৬২৬ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারিতে রাসূল আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহাকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে, প্রায় পনেরোশো সাহাবি নিয়ে দুই বছর আগে সংঘটিত মূল বদর যুদ্ধের জায়গাতেই হাজির হন। কিন্তু আবু সুফিয়ান যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি কোথাও এসে মুসলিম বাহিনী এবং রাসূলের উপস্থিতির খবর নিয়ে ভয় পেয়ে যায়। মোকাবেলার সাহস না পেয়ে সেখান থেকেই সে তার বাহিনী নিয়ে মক্কা ফিরে যায়। এদিকে রাসূল পূর্বনির্ধারিত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কুরাইশ বাহিনীর অপেক্ষায় সেখানে ৮ দিন অবস্থান করেন। বদর অভিমুখে রাসূলের এই অভিযানকে 'বদরের ছোট যুদ্ধ' বলে স্মরণ করা হয়। বিস্তারিত জানতে পড়ুন- যাদুল মাআদ: ২/১১২, সিরাতে ইবনে হিশাম: ২/২০৯
[১] দেখুন: সিরাতে ইবনু হিশাম: ৩/১৫২
[১] আস-সিরাহ: ইবনু কাসির-২/৩৮০
[২] আকাবার প্রথম শপথ বলতে বোঝায় ৬২১ খ্রিস্টাব্দে মদিনা থেকে আসা একদল সাহাবার ইসলামের উপর অটল থাকা এবং ইসলাম প্রচারের কাজে সাহায্য করার শপথ নেওয়ার ঘটনা। ... নবদীক্ষিত মদিনাবাসির এই শপথ বা বাইয়াতকে আল-আকাবার প্রথম শপথ বা বাইয়াতে আকাবা উলা নামে স্মরণ করা হয়।
[১] উতবার ছেলে আবু হুযাইফা ইবনে উতবা ইসলাম প্রচারের প্রাথমিক যুগে মুসলিম হয়েছিলেন
[১] সিরাতে ইবনে হিশাম: ৩/১৬৮
[১] সাহাবি আবু উবাইদা রাদিয়াল্লাহু আনহুর পিতা, যাকে কেবল দ্বীনের দাবিতে আবু উবাইদা রা. নিজে হত্যা করেছেন; পিতা জাররাহ তাকে হাতের কাছে পেয়েও দূরে সরে যাওয়া সত্ত্বেও।
[২] সিরাতে ইবনে হিশাম: ১/৭০৭, মারিফাতুস সাহাবা: ১৬/২৬৫, যাদুল মাআদ: ৩/১৬০
📄 উহুদ যুদ্ধ
উহুদ যুদ্ধ BATTLE OF UHUD
তারিখ: ৩য় হিজরি / ৬২৫ খ্রি.
স্থান: উহুদ, মদিনা মুনাওয়ারা
ফলাফল: অমীমাংসিত সমাপ্তি
পক্ষ-বিপক্ষ: মুসলমান বনাম কুরাইশ (সাথে তিহামা ও কিনানার কিছু মিত্রজোট)
সেনাপ্রধান: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বনাম আবু সুফিয়ান ইবনু হারব
সেনাসংখ্যা: ৭০০ বনাম ৩০০০
ক্ষয়ক্ষতি: ৭৫ জন শহিদ বনাম ২২ জন নিহত
উহুদ। এক নির্মম বাস্তবতার স্বচোখ সাক্ষী। ৩য় হিজরির শাওয়াল মাসের সাত তারিখ (২৩শে মার্চ, ৬২৫ খ্রি.) রোজ শনিবার এ স্থানেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বে মুসলমানদের সাথে মক্কাবাসী এবং তিহামা ও কিনানা গোত্রভূত তাদের কিছু অনুসারীদের মধ্যে ঐতিহাসিক উহুদ যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। এ-যুদ্ধে মুসলমানদের সাময়িক বিজয় লাভ হলেও আবু সুফিয়ানের বাহিনী ফিরে এসে অতর্কিত হামলা করে সেবার তাদের সামরিক কর্তৃত্ব ছিনিয়ে নেয়। মূলত বিজয় সুনিশ্চিত ভেবে মুসলমানরা যখন গনিমতের মাল সংগ্রহ করতে ব্যস্ত হয়ে যান এবং সে কারণে পূর্বপরিকল্পিত আত্মরক্ষার ঘাঁটিগুলো প্রহরাশূন্য হয়ে পড়ে— তখনই মুশরিকরা সুযোগ বুঝে আক্রমণ করে এবং যুদ্ধ নিজেদের পক্ষে নিয়ে যায়।
যুদ্ধের পূর্বকথা
বিগত বছরে বদর প্রান্তরে মুসলমানদের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হবার পর, মক্কার কুরাইশদের দাম্ভিকতা ধুলোয় মিশে যায়। ক্ষণে তারা অনুভব করে লাঞ্ছনাকর পরাজয়ের অসহনীয় তিক্ততা। ফলে তারা দ্বিতীয়বার মুসলমানদের মোকাবেলা করার সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। তাদের চোখ তাতিয়ে উঠছিল বিশ্বের বুক থেকে মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলার হিংস্র ক্রোধে, যাতে নিজেদের গা থেকে পূর্বপরাজয়ের ধুলো পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলা যায়। সে-মতে সাফওয়ান ইবনু উমাইয়া, ইকরিমা ইবনু আবি জাহল এবং আবদুল্লাহ ইবনু রাবিআ মিলে আবু সুফিয়ানের কাছে গিয়ে সৈন্য প্রস্তুত করার জন্য শামফেরত কাফেলার সম্পদ কামনা করে। পুঞ্জীভূত সেই মুনাফার পরিমাণ ছিল প্রায় এক হাজার উট এবং পঞ্চাশ হাজার দিনারের মতো। মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য আবু সুফিয়ান পুরোটা মুনাফাই তাদেরকে দিয়ে দিতে সম্মত হয়ে যায়। এরপর তারা একযোগে মক্কার গোত্রগুলোতে লোক পাঠাতে লাগল, যাতে শহরের সকল পুরুষকে যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করা যায়। বদরের রোমহর্ষক পরাজয়ের মাত্র এক বছর পার হলেও তারা কুরাইশ ও তাদের মিত্র গোত্রগুলো থেকে প্রায় তিন হাজার সেনা একত্র করতে সক্ষম হয়। অংশগ্রহণ করে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবাসহ আরও ১৫ জন মহিলা। ৩০০০ উট এবং ২০০ ঘোড়াসহ সম্মিলিত সেই বাহিনী নিয়ে মুশরিকরা উহুদ পাহাড়ের উপকণ্ঠে 'আইনাইন' নামক স্থানে গিয়ে সমবেত হয়।[১] এ-সময় হিন্দ বিনতে উতবা প্রস্তাব দেন যে, মুহাম্মদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মায়ের কবর যাতে ধ্বংস করে দেয়া হয়। কিন্তু এর পরিণাম ভয়াবহ হতে পারে ভেবে নেতারা এমন প্রস্তাবে সম্মত হননি।
হিজরি তৃতীয় সালের ৬ শাওয়াল, রোজ জুমাবার। মদিনার ঘরে ঘরে পৌঁছে গেল কুরাইশ বাহিনীর উপস্থিতির খবর। নতুন যুদ্ধের আগমনী বার্তায় অনেককে সন্তুষ্ট দেখা গেল; বিশেষত যারা বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি, ফলে গনিমতেরও কোন অংশ পাননি, তাদের কেউ কেউ বলছিল: 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনি আমাদেরকে নিয়ে মদিনার বাইরে গিয়ে শত্রুদলের মোকাবেলায় চলুন; যাতে তারা না ভাবে যে, আমরা দুর্বল কাপুরুষ হয়ে গেছি।' আর কিছু মুসলিম (যাদের মধ্যে মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনু সালুলও ছিল) চাচ্ছিল, মদিনার ভেতরে থেকে কুরাইশদের প্রতিরোধ করা হোক এবং ঘটনাক্রমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চিন্তাও ছিল এমন। তিনি ভাবছিলেন, মদিনার বাইরে না গিয়ে ভেতরে শক্ত প্রতিরক্ষা গড়ে তোলাই শ্রেয়। কারণ, তিনি আগের রাতে স্বপ্নে দেখেছিলেন, তাঁর তরবারির আগা ভেঙে গেছে; তাঁর একটি গরু জবেহ হয়ে গেছে এবং তিনি একটি শক্ত বর্মে হাত ঢুকিয়ে রেখেছেন।[২] সে-মতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদেরকে বাইরে গিয়ে তাদের মোকাবেলা না করে শহরে শক্ত অবস্থান নিতে বললেন, যাতে তারা শহরের কাছাকাছি হলে যেন প্রবেশপথের মুখগুলোতে দাঁড়িয়ে তাদের সাথে যুদ্ধ করা যায়। রাসূলের এই সিদ্ধান্তের সাথে আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনু সালুলও সম্মত হলো। তবে আনসারি সাহাবিদের অনেক যুবকই যেন এটা মেনে নিতে পারছিল না। তারা বরং যে-কোনো মূল্যে শহরের বাইরে গিয়ে শত্রুদের মোকাবেলা করার পক্ষে। এতে আল্লাহ যাকে শাহাদাতের মর্যাদা দিতে চান, সে শহিদ হয়ে যাবে; আর যা বেঁচে ফিরতে পারবে, সে জয়ীর বেশে ফিরবে। রাসূল তাদের এমন চিন্তা দেখে কিছু বললেন না। সোজা তাঁর ঘরে প্রবেশ করলেন। নিজের যুদ্ধবর্মটি গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে এলেন।
দিনটি ছিল জুমাবার। রাসূলকে বর্ম পরে বের হতে দেখে, যারা শহরের বাইরে যাবার গোঁ ধরেছিল, তারা খুব লজ্জিত হলো। বলল, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনার ইচ্ছে হলে ফিরে যেতে পারেন।' রাসূল বললেন: 'কোনো নবীর জন্য বর্ম পরিধানের পর যুদ্ধ না করে ফিরে যাওয়া শোভাকর না।'[১] এই বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাজার সাহাবি নিয়ে উহুদ অভিমুখে যাত্রা করলেন। তাঁর অবর্তমানে অবশিষ্ট মুসলমানদের নামাযের ইমামতির জন্য দায়িত্ব দিয়ে গেলেন ইবনু উম্মি মাকতুমেক। কিন্তু মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনু সালুল—সে ছিল খাযরাজ গোত্রের সর্দার এবং মুসলমানদের মধ্যকার মুনাফিকদের নেতা—সিদ্ধান্ত নিলো, সে তার অনুসারীদের নিয়ে মদিনা ফিরে যাবে। তার কথা ছিল: 'জানি না কীসের নেশায় আমরা আত্মহত্যা করতে যাচ্ছি!' তিনশো যোদ্ধা তার অনুসরণ করে পথিমধ্য থেকে চলে আসে।
যুদ্ধক্ষেত্রে নবীজি
উহুদ পাহাড়ের উপত্যকায় গিয়ে মুসলমানরা অবস্থান গ্রহণ করে। বাহিনীর মুখ শহরের দিকে করে পেছনে রাখা হয় উহুদ পাহাড়ের সুউচ্চ টিলাগুলোকে। এ-সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৫০ জন দক্ষ তিরন্দাজের একটি বিশেষ দল গঠন করেন। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু জুবাইর ইবনুন নুমানের নেতৃত্বে এই বাহিনীকে তিনি নির্দেশ দেন, মানাত উপত্যকার দক্ষিণ পাশে 'রুমাত' পাহাড়ের ১৫০ মিটার উপরদিকে ঠায় প্রহরায় থাকতে। রাসূল তাদেরকে বিশেষ করে বলে দেন: 'যদি দেখো, পাখিরা আমাদের লাশগুলো ঠুকরে খাচ্ছে, তবু আমার আদেশ ছাড়া এখান থেকে নড়বে না। আর যদি দেখো আমরা শত্রুদের পরাজিত করে একেবারে পদদলিত করে ফেলেছি, তবুও আমাদের নির্দেশ ছাড়া এ জায়গা ত্যাগ করবে না।'[১] সে-দলের নেতা আবদুল্লাহ ইবনু জুবাইরকে নির্দেশ দিলেন, 'মুশরিকদের প্রতি ক্রমাগত তির নিক্ষেপ করতে থাকবে, যাতে তারা কোনোভাবেই তার পেছন থেকে উঠে আসতে না পারে।' এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর অবশিষ্ট সেনাদেরকে যুদ্ধের জন্য কাতারবদ্ধ করেন। বাহিনীর ডান পার্শ্বের নেতৃত্বে মুনজির ইবনে আমর ও বাম পার্শ্বে যুবাইর ইবনুল আওয়ামকে রাখেন। মিকদাদ ইবনে আসওয়াদকে নিযুক্ত করেন যুবাইরের সহকারী হিসেবে। মূলত এই বাম পার্শ্বে অধিক গুরুত্ব দেয়ার কারণ হলো, এদিকটার দায়িত্ব ছিল কুরাইশ বাহিনীর ডান পার্শ্বের নেতৃত্বে থাকা খালিদ বিন ওয়ালিদের অশ্বারোহীদের প্রতিরোধ করা। এ যুদ্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম বাহিনীর পতাকা তুলে দিয়েছিলেন বনু আবদিদ-দার গোত্রের বিখ্যাত সাহাবি হযরত মুসআব ইবনু উমাইর রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাতে।
ওদিকে মুশরিকদের বাহিনী ছিল তিন হাজার সেনার, যাদের মধ্যে দুইশো ছিল অশ্বারোহী। কুরাইশরা তাদের সেনাদলের ডান অংশের অশ্বারোহীদের নেতৃত্বে রেখেছিল খালিদ বিন ওয়ালিদকে; আর বাম পাশে রেখেছিল ইকরিমা ইবনু আবি জাহলকে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে আনসারদেরকে আবু সুফিয়ান বার্তা পাঠিয়ে জানান যে, তারা যদি মুহাজির মুসলিমদেরকে ত্যাগ করে, তাহলে তাদের কোনোরকম ক্ষতি করা হবে না এবং মদিনা শহরেও আক্রমণ করা হবে না। কিন্তু আনসাররা তার এই প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে এবং রাসূল ও তাঁর মুহাজির সেনাদের জন্য জান কুরবান করার অঙ্গিকার করেন।
যুদ্ধের বিবরণ
মদিনাত্যাগী আবু আমর মক্কার পক্ষে মুসলিম বাহিনীতে প্রথম আক্রমণ চালায়। কিন্তু সাহাবাদের তিরের বৃষ্টিতে আবু আমর ও তার লোকেরা টিকতে না পেরে কুরাইশ সারির একেবারে পেছনের দিকে সরে আসে। এরপর মক্কার পতাকাবাহক তালহা ইবনে আবি তালহা আল-আবদারি এগিয়ে গিয়ে দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহ্বান করে। সাহাবি যুবাইর ইবনুল আওয়াম তার আহ্বান শুনে এগিয়ে যান এবং তাকে হত্যা করে ফিরে আসেন। এটা দেখে তালহার ভাই উসমান ইবনে আবি তালহা এগিয়ে গিয়ে পড়ে যাওয়া শিরকের পতাকা তুলে নেয়। মুসলিমদের মধ্যে থেকে রাসূলের চাচা হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব এগিয়ে এসে তাকেও পরপারে পাঠিয়ে দেন। মক্কার পতাকা বহনের দায়িত্ব তাদের পরিবারের উপর ন্যস্ত ছিল। একারণে তালহার ভাই ও পুত্রসহ মোট ছয়জন, একের পর এগিয়ে আসে এবং সবাই মুসলিম সেনাদের হাতে নিহত হয়।
দ্বন্দ্বযুদ্ধের পর দুই বাহিনীর মধ্যে মূল লড়াই শুরু হয়। যুদ্ধে আগত কুরাইশ নারীরা দফ বাজিয়ে সেনাদের উৎসাহ জুগিয়ে যায়। মুসলিমরা মক্কার সৈনিকদের সারি ভেঙে ফেলতে সক্ষম হওয়ায় শুরুতেই কুরাইশ বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ে। খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে মক্কার অশ্বারোহীরা পরপর কয়েকবার মুসলিম বাহিনীর বাম পার্শ্বে আক্রমণ চালাতে চেষ্টা করে, কিন্তু জাবালে রুমাতের উপর মোতায়েন করা তিরন্দাজদের আক্রমণের কারণে তারা বেশি ভেতরে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ পায়নি। এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলিমরা সুবিধাজনক অবস্থান লাভ করে এবং বিজয়ের নিকটে পৌঁছে যায়। এমনকি, একসময় ময়দানে নিজেদের আধিপত্য দেখে তারা ভেবে বসে যে, যুদ্ধ তো শেষ। সে-মতে তারা পরাজিত মুশরিকদের ফেলে যাওয়া গনিমত গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এ-সময় পাহাড়ে দায়িত্বে থাকা তিরন্দাজ বাহিনী রাসূলে পাকের নির্দেশ বিস্মৃত হয়ে গনিমত সংগ্রহের কাজে অংশ নিতে তাদের স্থান ত্যাগ করে নিচে নেমে আসে। তাদের কেউ বলে, 'এখন আর দাঁড়িয়ে থেকে কী লাভ?'; তারা তাদের প্রতি রাসূলের নির্দেশনা ভুলে যায়। দলনেতা আবদুল্লাহ ইবনু জুবাইর তাদেরকে রাসূলের নির্দেশ স্মরণ করিয়ে দিলেও তারা তার কথায় ভ্রুক্ষেপ না করে দ্রুত গনিমতের মাল গোছাতে নেমে আসে। ফিরে যেতে যেতে খালিদ বিন ওয়ালিদ খেয়াল করে পাহাড়ের এই গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি থেকে দায়িত্বরত তিরন্দাজরা নেমে যাচ্ছে। সে বিলম্ব না করে একদল মুশরিককে সাথে নিয়ে পাহাড়ের পাশে জড়ো হয়; এরপর সুযোগ বুঝে মুসলমানদের উপর পেছন থেকে অতর্কিত হামলে পড়ে। আকস্মিক এ আক্রমণে মুসলমানরা অপ্রস্তুত হয়ে ভয়ে পেছনে সরে আসে। ধীরে ধীরে ময়দান চলে যায় মুশরিকদের দখলে, শিরকের পতাকা ক্রমশ উঁচু হতে থাকে। দূর থেকে নিজেদের পতাকা উত্তোলিত দেখতে পেয়ে আবু সুফিয়ানের মূল বাহিনীও পুনর্বার ময়দানে ছুটে আসে এবং একযোগে হামলা চালায়।
এক মুশরিক সেনা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লক্ষ করে একটি পাথরখণ্ড ছুড়ে মারলে প্রিয় রাসূলের দাঁত মোবারক শহিদ হয়ে যায়। এদিকে তিনি আহত হয়ে একটি গর্তে পড়ে যান। এ-যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাথা মোবারক ফেটে যায়। পরিস্থিতি ভয়াবহ দেখে রাসূলের প্রেমে প্রাণোৎসর্গকারী সাহাবারা তাঁকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেন। চারদিক থেকে রাসূলকে লক্ষ করে মুশরিকদের তির তলোয়ার বৃষ্টির মতো উড়ে এল, কিন্তু সাহাবারা সব নিজেদের গায়ে নিয়ে নেন। হযরত আবু দুজানা রাদিয়াল্লাহু আনহু নবীজির দিকে ঝুঁকে আক্রমণের সামনে ঢাল হয়ে গেলেন। উড়ে আসা তিরগুলো একে এক তার পিঠে বিদ্ধ হতে লাগল। অপরপাশে দাঁড়িয়ে গেলেন হযরত তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু। শত্রুদের দিকে মুখ করে দাঁড়ালে রাসূলের দিকে পিঠ হয়ে যায়, তাই তিনি রাসূলের দিকে মুখ করে তির-তলোয়ারের সামনে পিঠ পেতে দেন। ডান দিক থেকে তলোয়ারের আঘাত এলে তিনি নবীজিকে বাঁচাতে হাত পেতে দেন; তার হাতটি কেটে মাটিতে পড়ে যায়। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে দেখা যায়, হযরত তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহুর শরীরে সত্তরোর্ধ আঘাতের চিহ্ন ছিল। [১]
হঠাৎ কুরাইশরা ময়দানে গুজব ছড়িয়ে দেয় যে, মুহাম্মদ এবং তার সাথিদ্বয় উমর ও আবু বকর মারা গেছে। এতে লড়াইরত সাহাবাদের মধ্যে হতাশা দেখা দেয় এবং তারা যুদ্ধের ময়দানে অমনোযোগী হয়ে পড়েন। কিন্তু সহসা রাসূল জীবিত আছেন বলে জানা যায়। সাহাবাদের হাতের মুঠি পুনরায় শক্ত হয়ে আসে এবং তারা কাফিরদের শক্ত মোকাবেলা করতে শুরু করেন। কিন্তু ততক্ষণে ময়দানের চিত্র পাল্টে গেছে। তীব্র সম্মুখযুদ্ধের পর অধিকাংশ মুসলিম উহুদ পর্বতের ঢালে এসে জমায়েত হয়ে যান। রাসূল এবং অন্যান্য নেতৃস্থানীয় সাহাবারাও পর্বতের উপরের দিকে এসে আশ্রয় নেন।
মক্কার সেনারা মুহাম্মদের খোঁজে পর্বতের দিকে অগ্রসর হয়; কিন্তু হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব এবং মুসলিমদের একটি সাহসী সেনাদলের প্রতিরোধের কারণে তারা বেশিদূর এগোতে সক্ষম হয়নি। ফলে লড়াই সেখানেই থেমে যায়। হিন্দু ও তার সঙ্গীরা এ-সময় নিহত মুসলিমদের লাশ টুকরো করে। যুদ্ধ চলাকালীন হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব ইথিওপীয় দাস ওয়াহশি ইবনে হারবের বর্শার আঘাতে শহিদ হয়ে যান। মুসলিমরা পর্বতে আশ্রয় নেয়ার পর আবু সুফিয়ানের সাথে উমরের কিছু উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। কথোপকথনের সময় আবু সুফিয়ান এই দিনকে বদরের প্রতিশোধ বলে উল্লেখ করেন। প্রতিউত্তরে ইবনুল খাত্তাব বলেন, 'আমাদের নিহতরা জান্নাতে এবং তোমাদের নিহতরা জাহান্নামে চলে গেছে।' এরপর কুরাইশরা ময়দান ত্যাগ করে মক্কাভিমুখে যাত্রা করে। আর মুসলিমরা নিহত সৈনিকদেরকে যুদ্ধের ময়দানে দ্রুত দাফন করে দেন।
ফলাফল
প্রথম দিকে মুসলিমরা সুবিধাজনক অবস্থায় থাকলেও একপর্যায়ে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় কুরাইশদের হাতে। শেষপর্যন্ত মুসলিমদের তুলনামূলক বেশি ক্ষয়ক্ষতি এবং কুরাইশদের সুবিধাজনক অবস্থান সত্ত্বেও যুদ্ধের ফলাফল অনেকাংশে অমীমাংসিতই রয়ে যায়। তবে যুদ্ধে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেনাপতি হিসেবে বিশেষ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। উহুদকে যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেয়া ছিল তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।
কেন এই বিপর্যয়?
যুদ্ধের ময়দানে কিছু মুসলিম সেনাকর্তৃক সেনাপ্রধানের আদেশ অমান্য করার মাশুল দিতে হয়েছে পুরো বাহিনীকে। যেমনটা আমরা দেখেছি, পাহাড়ে প্রহরায় থাকা তিরন্দাজ বাহিনী সেনাপতি রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুমতি ছাড়া তাদের স্থান ত্যাগ করে নিচে নেমে আসে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআনুল কারিমে ইরশাদ করেন: 'অসৎকে সৎ থেকে পৃথক করে দেয়া পর্যন্ত তোমরা যে অবস্থায় রয়েছ, আল্লাহ ঈমানদারগণকে সে অবস্থাতেই ছেড়ে দিতে পারেন না।' [১] উহুদ যুদ্ধের এই ঝাঁকুনি মদিনায় ঘাপটি মেরে থাকা মুনাফিকদেরকে মুমিনদের থেকে আলাদা করে দিয়েছে।
উহুদ: বিজয় নাকি পরাজয়
উহুদ একটি অমীমাংসিত যুদ্ধ ছিল। উহুদে প্রথমভাগে মুসলিম বাহিনী বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে চলে গেলেও পাল্টা আক্রমণে সেই বিজয় হতাশায় পরিণত হয়; মুসলমানদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়, কিন্তু সেটা কখনোই পরাজয় নয়। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ বলেন: 'আল্লাহ নিশ্চিত স্থির করে নিয়েছেন, আমি এবং আমার রাসূলগণ অবশ্যই বিজয়ী হব। নিশ্চয় আল্লাহ শক্তিধর, পরাক্রমশালী।' [১] এই আয়াতের দাবিমতে, উহুদে প্রিয় নবীজির উপস্থিতি সত্ত্বেও সেটাকে পরাজয় মনে করার কোন সুযোগ নেই।
টিকাঃ
[১] আইনাইন: উহুদ পাহাড়ের বিচ্ছিন্ন অংশগুলোর একটি। ইয়াকুত হামাবি: মুজামুল বুলদান—৪/১৭৪
[২] দেখুন: বিভিন্ন সনদে বর্ণিত একটি হাদিস, নাসায়ি: ৭৬৪৭, মুসনাদে আহমাদ: ২৪৪৫, দারিমি: ২১৫৯, মুস্তাদরাকে হাকেম: ২৫৮৮, আস-সুনানুল কুবরা: ইমাম বায়হাকি—১৩০৬১
[১] মুসনাদে আহমাদ: ১৪৮২৯
[১] বুখারি: ২৮৭৪, আবু দাউদ: ২৬৬২, নাসায়ি: ১১০৭৯, মুসনাদে আহমাদ: ১৮৬১৬
[১] আস-সুনানুল কুবরা: ইমাম নাসায়ি-১১০৭৭, ইবনু মাজাহ: ৪০২৭, মুসনাদে আহমাদ: ১২৮৫৪
[১] পাঠক এখানে একটু কল্পনা করুন... তারা যুদ্ধের এমন ঘোরতর মুহূর্তেও, রাসূলের প্রতি আদব প্রদর্শনে কতটা তৎপর এবং সচেতন ছিলেন?
[১] আর-রাওদুল উনুফ: সুহাইলি-৩/৫২, ৪/২০৯, ৬/১৩
[১] সুরা আলে-ইমরান: আয়াত-১৭৯
[১] সুরা মুজাদালাহ: ২১
📄 খন্দক যুদ্ধ
খন্দক যুদ্ধ BATTLE OF THE TRENCH
তারিখ: ৫ম হিজরি / ৬২৭ খ্রি.
স্থান: মদিনা মুনাওয়ারা
ফলাফল: অবরোধ প্রত্যাহার এবং শত্রুপক্ষের পলায়ন
পক্ষ-বিপক্ষ: মুসলমান বনাম কুরাইশ (সাথে তিহামা, সালিম, গাতফান ও কিনানার কিছু মিত্রজোট; তবে মূল আহ্বায়ক বনু নাযির)
সেনাপ্রধান: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বনাম আবু সুফিয়ান, উয়াইনা ইবনুল হিসন, হারিস ইবনু আওফ, মিসআর ইবনু রাখিলা
সেনাসংখ্যা: ৩০০০ বনাম ১০০০০
ক্ষয়ক্ষতি: ৪ জন শহিদ বনাম ২ জন নিহত
আহযাব -বা খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয় ৫ম হিজরিতে, মুসলমান ও কুরাইশ এবং তাদের সহযোগী গাতফান ও কিনানা গোত্রের মাঝে। মুসলমানদের বিজয়, মদিনার অবরোধ মুক্তি এবং শত্রুপক্ষের সম্মিলিত বাহিনীর পলায়নের মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক এ-যুদ্ধটি সমাপ্ত হয়।
যে-সব কারণে যুদ্ধ
মদিনাবাসী ইহুদিদের শাখাগোত্র বনু নাযিরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেশান্তর করে দিলে তারা খাইবারে গিয়ে শেকড় গাড়ে। এর কিছুদিন পর ইহুদিদের একটি প্রতিনিধিদল অনিষ্ট চিন্তার বিনিময় ঘটাতে মক্কা মুকাররমায় যায়। এরাই ছিল আহযাব বা খন্দক যুদ্ধের মূল হোতা। তারা কুরাইশদেরকে রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য উস্কে দেয় এবং তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যুদ্ধে অংশ নিলে নিজেদের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাসও প্রদান করে। মক্কাবাসীরা তাদের এমন আহ্বানে সানন্দে সাড়া দেয়। এভাবে আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে পঞ্চম হিজরির শাওয়াল মাসে, সাকুল্যে সেবার মদিনার বিরুদ্ধে জড়ো হয় প্রায় দশ হাজার যোদ্ধা।
পরিখা খনন
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন এই সংবাদ শুনতে পান, অবিলম্বে তিনি বিচক্ষণ সাহাবা ও যুদ্ধবিষয়ে অভিজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করেন। সাহাবি হযরত সালমান আল-ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহু[১] শহরের চারপাশে পরিখা খননের পরামর্শ দেন। তাঁর এ পরামর্শ রাসূল ও উপস্থিত সাহাবাদের মনঃপূত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং নেতৃপর্যায়ের সাহাবারা খননকাজের সার্বিক তদারকি করছিলেন। এ-সময় সালমান আল-ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাজে এক প্রকাণ্ড পাথর প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। সেটা সরাতে গিয়ে তাঁর লোহার শাবল ভেঙে যায়। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাথরটির কাছে এগিয়ে এসে 'বিসমিল্লাহ' বলে পাথরটিতে আঘাত করেন। এতে পাথরটি ফেটে চোখ-ঝলসানো এক উজ্জ্বল আলো বেরিয়ে আসে। রাসূল বলে ওঠেন: 'আল্লাহু আকবার, রোম বিজিত হয়েছে; আমি তার লাল প্রাসাদগুলো দেখতে পেয়েছি।' এভাবে তিনি আরও দুইবার পাথরটিতে আঘাত করেন এবং পারস্য ও ইয়েমেন বিজয়ের ঘোষণা দেন।
এদিকে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কাজ শেষ করলেন, ওদিকে তখন কুরাইশরা তাদের সহযোগী বাহিনী নিয়ে এগিয়ে এসে উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান নেয়। তাদেরকে চোখের দূরত্বে দেখতে পেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন হাজার সাহাবাদের নিয়ে পরিখার উপকণ্ঠে এসে দাঁড়ান।
বনু কুরাইযার চুক্তি ভঙ্গ
আল্লাহর শত্রু হুয়াই ইবনু আখতাব কাব ইবনু আসাদ আল-কুরাজির কাছে এল। সে ছিল বনু কুরাইযার[১] গোত্রীয় চুক্তির মুখপাত্র। হুয়াই জানায়, অন্যান্য গোত্রগুলি মুসলিমরা নিশ্চিহ্ন না হওয়া পর্যন্ত ফিরে যাবে না বলে অঙ্গীকার করেছে। অতএব, মুহাম্মদের পতন আজকে নিশ্চিত। আক্রমণকারীদের সংখ্যা ও শক্তির কারণে শেষপর্যন্ত বনু কুরাইযা নিজের মত বদলায় এবং জোটে যোগ দেয়। এর ফলে মুসলিমদের সাথে বনু কুরাইযার চুক্তি ভঙ্গ হয়ে যায়। কাব এবং হুয়াইয়ের এই গোপন সাক্ষাতের খবর পৌঁছে যায় রাসূলের কাছে। তিনি খাযরাজপ্রধান সাদ ইবনু উবাদা এবং আওসপ্রধান সা'দ ইবনু মুয়াযকে পাঠান এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত হতে। তারা বনু কুরাইযার কাছে পৌঁছে দেখেন, তারা অত্যন্ত ভয়ংকর দুরভিসন্ধিতে লিপ্ত। তারা রাসূলের পাঠানো সাহাবাদের দেখে বলে উঠল: 'মুহাম্মদের সাথে আমাদের কোন চুক্তি নেই।' এরপর তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ফিরে আসেন। পরিস্থিতি ক্রমে নাজুক হতে থাকে। মুসলমানরা তখন সর্বদিক থেকে আক্রান্ত হয়ে আছে; কিন্তু তাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, আল্লাহ তাদের রক্ষা করবেন!
টুকরো টুকরো সংঘাত
আরবীয় যুদ্ধকৌশলে পরিখা খনন প্রচলিত ছিল না, তাই মুসলিমদের খননকৃত পরিখার কারণে জোটবাহিনী অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়ে যায়। পরিখা পার হওয়ার কোনো ব্যবস্থা তাদের কাছে হাজির নেই। বিশ দিনেরও অধিক, প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেছে—অথচ দুপক্ষের মাঝে কিছু তির ও পাথর নিক্ষেপ ছাড়া যুদ্ধের কিছুই ঘটেনি। তবে কুরাইশদের কিছু অশ্বারোহী পরিখার একটি সংকীর্ণ পথ খুঁজে পেয়ে সেখানে ঘোড়া তুলে দেয়। এ দেখে আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু মুসলমানদের একটি বাহিনী নিয়ে সেই ছিদ্রপথেই তাদেরকে ধরে ফেলেন। এদের মধ্যে ছিল আমর ইবনু আবদে-উদ্দ। আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু তার মুখোমুখি হয়ে তাকে তলোয়ারের আঘাতে ধরাশায়ী করেন এবং তার শির ধড় থেকে আলাদা করে ফেলেন।
আক্রমণ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে হেঁটে আসতে দেখা যায় নুআইম ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে। তিনি এসে রাসূলকে বলেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি মুসলমান হয়ে গেছি; কিন্তু আমার গোত্র সে-খবর জানে না। আপনি আদেশ দিলে আমি একটা কিছু চিন্তা করেছি, সেটা বাস্তবায়ন করতে চাই।' রাসূল তাকে অনুমতি দিলেন। অনুমতি পেয়ে নুআইম এক কার্যকরী কৌশল অবলম্বন করে এগিয়ে যান। তিনি প্রথমে বনু কুরাইযা গোত্রের কাছে গিয়ে তাদেরকে অন্যান্য মিত্রদের দুরভিসন্ধির ব্যাপারে সতর্ক করেন। এরপর তিনি মিত্রবাহিনীর নেতা আবু সুফিয়ানের কাছে যান এবং তাদের মধ্যেও সন্দেহের বীজ বপন করেন। এভাবে নুআইম ইবনু মাসউদের বিচক্ষণতায় উভয় দলের মধ্যে অবিশ্বাস এবং জোটভুক্ত গোত্রগুলোর মধ্যে ফাটল দেখা দিল। এরপর চূড়ান্ত বিজয়ের বার্তা দিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন রণক্ষেত্রে প্রবল বাতাস ছোটান, যা মুশরিকদের তাঁবুগুলো উড়িয়ে দেয় এবং যুদ্ধের পুরো চিত্রই পাল্টে দেয়।
বিজয়ের বার্তা
সম্মিলিত বাহিনীর প্রধান সেনাপতি আবু সুফিয়ান বুঝতে পারে, এখানে এভাবে বসে থেকে আসলেই কোনো লাভ নেই। শীত খুব তীব্র আকার ধারণ করেছে এবং প্রচণ্ড বায়ুপ্রবাহের ফলে সেনাদের শিবির তছনছ হয়ে গেছে। তাই সে বাহিনীতে মক্কা ফিরে যাবার নির্দেশ দেয়। সকালে সুর্য উঠে এলে দেখা যায়, ময়দান ফাঁকা হয়ে গেছে। কুরাইশদের বাহিনী ময়দান ছেড়ে গেলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: 'আজকের পর থেকে যুদ্ধ আমরা করবো, তারা নয়।' [১] অর্থাৎ, আজকের পর কুরাইশরা কখনোই মদিনায় আক্রমণ করার সাহস করবে না।
খন্দকের যুদ্ধ শেষ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহিনী নিয়ে এগিয়ে যান বনু কুরাইযার দিকে; ২৫ দিন অবরোধের পর শেষপর্যন্ত বনু কুরাইযা আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয়। বিচারে সা'দ ইবনে মুয়ায নির্দেশ দেন—সমস্ত পুরুষকে হত্যা, নারী ও শিশুদেরকে দাস হিসেবে বন্দি এবং সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে। সিদ্ধান্তমতে ৬০০ থেকে ৭০০ পুরুষ বন্দির শিরশ্ছেদ করা হয়। বনু কুরাইযাকে প্ররোচনাদানকারী হুয়াই বিন আখতাবকেও এ-সময় মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এভাবেই আহযাবের এ যুদ্ধে মুনাফিকের দল হেরে যায় এবং ঈমানের বাহিনী সফল হয়।
টিকাঃ
[১] সালমান আল-ফারসি। হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন বিখ্যাত সাহাবি। রাসূল ভালোবেসে তাকে সালমান আল-খায়র নাম প্রদান করেছিলেন। ... মহান এই সাহাবি ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে ইরাকের মাদায়েন শহরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
[১] বনু কুরাইযা ছিল মদিনার একটি ইহুদি গোত্র। খন্দকের যুদ্ধের পর মুসলিমদের সাথে তাদের সংঘর্ষ সৃষ্টি হয় এবং তারা আত্মসমর্পণ করে।
[১] মদিনার সনদ হলো ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা থেকে মদিনায় গমনের পর হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রণয়নকৃত একটি প্রাথমিক সংবিধান।
[১] আদ-দুরার ফি-ইখতিসারিল মাগাযি ওয়াস-সিয়ার: ইবনু আবদিল বার রহ.-১৮৬ পৃ.
[১] বুখারি: ৩৮৮৪, মুসনাদে আহমাদ: ১৮৩৩৪, আল-মুজামুল কাবির: ইমাম তাবারানি-৬৪৯৯
[১] বুখারি: ২৮৭৮, মুসলিম: ১৭৬৮
📄 হুদাইবিয়ার যুগান্তকারী সন্ধি
ষষ্ঠ হিজরি সাল। হঠাৎ এক রাতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখলেন। তিনি দেখলেন, মুসলমানরা মসজিদুল হারামে প্রবেশ করেছে। কাবার চাবি সংগ্রহ করে তিনি সাহাবাদের নিয়ে উমরা পালন করছেন। কয়েক দিনের মধ্যেই রাসূল মুসলমানদের উমরার জন্য প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দিলেন। মুহূর্তেই এ খবর হিজাযের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল যে, মুসলমানরা যিলকদ মাস নাগাদ উমরার উদ্দেশ্যে মক্কায় যাচ্ছে।
নবীজি জানতেন, এবারের সফরে মুসলমানরা সফলতা লাভ করলে তারা বহুল প্রতিক্ষিত একটি লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হবে। চৌদ্দ হাজার বা মতান্তরে আঠারো হাজার হজযাত্রী পথ চলতে চলতে 'যুল হুলাইফা' নামক স্থানে এসে ইহরাম বাঁধেন। কাফেলা উসফানের কাছাকাছি পৌঁছলে গুপ্তচর ফিরে এসে জানায়, কুরাইশরা বিশাল সেনাদল গঠন করেছে। রাসূল সংঘর্ষ এড়াতে অভিজ্ঞ কারো রাহবরিতে বিকল্প পথে কাফেলা এগিয়ে নিয়ে হুদাইবিয়ার উপকণ্ঠে এসে উপস্থিত হন। এখানে পৌঁছার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি কূপের পাড়ে এসে অবস্থান নেন।
রাসূল (সা.) সকাশে কুরাইশ প্রতিনিধিদল
কুরাইশরা কয়েক দফায় রাসূলের কাছে বিভিন্ন ব্যক্তিকে পাঠিয়ে তাঁর সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাইল। সর্বপ্রথম বুদাইল খাযায়ি, তারপর মুকরিজ এবং তৃতীয়বার আরবের তিরন্দাজ বাহিনীর নেতা হুলাইস ইবনে আলকামাকে পাঠায় তারা। সর্বশেষ তারা বুদ্ধিমান উরওয়া ইবনে মাসউদ সাকাফিকে পাঠাল। উরওয়া ফিরে গিয়ে কুরাইশদের বলল: 'আমি বড় বড় রাজা-বাদশা দেখেছি। কিন্তু নিজ অনুসারীদের মাঝে মুহাম্মদের মতো সম্মানের অধিকারী আমি ইতিপূর্বে কাউকে দেখিনি।'
বাইয়াতে রিদওয়ান
মহানবী (সা.) নিজের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি হিসেবে উসমান ইবনে আফফানকে মক্কায় পাঠান। কিন্তু উসমান ফিরে আসতে বিলম্ব করায় 'উসমান নিহত হয়েছে' এমন একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে। মহানবী (সা.) সিদ্ধান্ত নিলেন মুসলমানদের সাথে তাঁর প্রতিশ্রুত শপথ নবায়ন করবেন। তিনি একটি গাছের নিচে বসলেন এবং সকল সঙ্গীকে বাইয়াত নেয়ার আহ্বান জানালেন। এটিই সেই ঐতিহাসিক 'বাইয়াতে রিদওয়ান'।
উসমান ফিরে এলে কুরাইশদের পক্ষ থেকে সুহাইল ইবনে আমর আসে সন্ধিচুক্তি করতে। মহানবী (সা.) হযরত আলিকে চুক্তিপত্র লেখার নির্দেশ দেন। চুক্তির শর্ত নির্ধারণের ক্ষেত্রে সুহাইল বেশ কঠোরতা অবলম্বন করছিল। এমনকি 'আল্লাহর রাসূল' শব্দটি মুছে ফেলার দাবি জানালে মহানবী তা মেনে নেন।
হুদায়বিয়ার সন্ধি-শর্ত
১. কুরাইশ ও মুসলমানরা দশ বছর একে অপরের সাথে যুদ্ধ করবে না।
২. যদি কুরাইশদের কোনো পুরুষ অভিভাবকদের অনুমতি ছাড়া মক্কা থেকে পালিয়ে মুসলমানদের কাছে যায়, মুহাম্মদ তাকে ফিরিয়ে দেবেন। কিন্তু কোনো মুসলমান মক্কায় পালিয়ে আসলে কুরাইশরা তাকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য নয়।
৩. মুসলমানরা এ বছর মক্কায় প্রবেশ না করে ফিরে যাবে এবং পরের বছর উমরা করতে পারবে।
৪. মক্কার মুসলমানরা স্বাধীনভাবে ইসলামী বিধান পালন করতে পারবে।
সন্ধির শর্তাবলি লেখার সময় সুহাইলের পুত্র আবু জান্দাল শেকল পরিহিত অবস্থায় সেখানে হাজির হন। চুক্তি অনুসারে তাকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হন রাসূল। এতে সাহাবারা অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা সুরা ফাতহ অবতীর্ণ করে একে 'প্রকাশ্য বিজয়' হিসেবে ঘোষণা দেন।
সন্ধিচুক্তির তাৎপর্য ও প্রভাব
হুদাইবিয়ার এ সন্ধি মুসলমানদের ভবিষ্যৎ আশ্চর্যভাবে বদলে দেয়। এ সন্ধির ফলে যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ হওয়ায় মুসলমানরা শান্তিপূর্ণভাবে দাওয়াতের কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে আবু বাসির নামে এক সাহাবীর হাত ধরে কুরাইশদের বাণিজ্যিক কাফেলাগুলো আক্রান্ত হলে তারা নিজেরাই সন্ধির বৈষম্যমূলক শর্তটি বাতিলের আবেদন জানায়। সন্ধির পর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পারস্যের কিসরা, রোম সম্রাট কায়সার, হাবাশার নাজাশি এবং মিশরের মুকাওকিসের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চিঠি পাঠান। এভাবেই হুদাইবিয়ার সন্ধি মক্কা বিজয়ের পথ প্রশস্ত করে দেয়।
টিকাঃ
[১] হুবশিরা হাবশি নয়; হুবশি মক্কা থেকে ছয় মাইল দূরে মক্কার নিম্নভূমিতে অবস্থিত কয়েকটি গোত্র।