📄 যুদ্ধের পরিসমাপ্তি
যে জাতি আল্লাহর নিকট হতে পূর্ব থেকেই বিজয়ের প্রতিশ্রুতি পেয়েছিল, তারা কি করে শত্রুপক্ষ আত্মসমর্পণ না করলে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘোষণা করতে পারে? ইসলামের মধ্যে আল্লাহর মহিমান্বিত শক্তি নিহিত রয়েছে। তাই শত্রুপক্ষ পরাজিত হতে বাধ্য। কারণ, যেখানে ইসলাম সেখানেই রয়েছে সাফল্য। যদি ইমাম বা তাঁর সেনাপতিগণ দেখেন যে, বিজয় লাভ করা খুব কঠিন হয়ে পড়ছে, তখন তাঁদের ধৈর্যের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে বলা হয়েছে। কারণ, এর ফলে অবশ্যই শেষ পর্যন্ত তাঁরা জয়লাভ করতে পারবেন। এতে খুব বেশী সময় লাগলেও কিছু আসে যায় না। আল্লাহ তাঁর নবীকে বলেছেন:
"হে বিশ্বাসীগণ! সবর কর। দেখা যাক তোমাদের মধ্যে কে বেশী ধৈর্যধারণ করতে পার। দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ কর এবং আল্লাহকে ভয় কর; তবেই কৃতকার্য হতে পারবে” (৩ঃ ২০০; ২ঃ ১৪৯)।
বিজয় লাভ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করার বিরুদ্ধে আল-কোরআনে অনেক সাবধান বাণী রয়েছে। আর হাদিসে যে কেবল এর বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারীই আছে তা নয়, যুদ্ধে পৃষ্ঠ প্রদর্শনকে গোনাহ বা পাপের কাজ বলেও গণ্য করা হয়েছে।
মাওয়ার্দী তাঁর 'আহকাম-উস-সুলতানিয়া'তে নসিহত করেছেন : 'বিজয়ের শুভমুহূর্ত না আসা অবধি ইমাম কখনোই যুদ্ধ বন্ধ করবেন না।' তিনি আরও বলেন যে, যুদ্ধ চালিয়ে যাবার জন্য সর্বদা ধৈর্যধারণ করা অপরিহার্য। এর থেকে এই চারটি ফলাফলের যে কোন একটি লাভ করা যেতে পারে :
প্রথমতঃ, শত্রুরা ইসলাম গ্রহণ করবে এবং আমাদের সঙ্গে সমান অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে, আর একই পর্যায়ের বাধ্যবাধকতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে।
দ্বিতীয়তঃ, আল্লাহর দয়ায় ইমাম মুশরিক গোত্রসমূহের ওপর বিজয়ী হলে এবং বিজিতরা অমুসলিম থাকলে তাদের জীবন ও ধন-সম্পদ মুসলমানদের কবলে আসবে।
তৃতীয়তঃ, শান্তি-চুক্তির ফলে শত্রুপক্ষ শুল্ক দিতে বাধ্য হবে।
চতুর্থতঃ, শত্রুপক্ষ আমানের (নিরাপত্তা) মারফত শান্তি লাভ করতে পারে।
মাওয়ার্দী অবশ্য যুদ্ধে অকৃতকার্য হওয়া সম্পর্কে সম্পূর্ণ নীরবতা অবলম্বন করেছেন। তিনি ও অন্যান্য বহু আইনবিদদের কাছে মুসলমানদের যুদ্ধে পরাজয় বলে কোন কিছুরই অস্তিত্ব নেই।
কোন কোন আইনবিদ বলেন যে, যদি মুসলমানদের ওপর বিপদ নিপতিত হয় (অর্থাৎ তাদের পরাজয় ঘটে), তবে ইমাম শত্রুপক্ষের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করতে পারেন। কিন্তু 'হোদায়বিয়ার সন্ধি'তে যতটা সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল, তার চেয়ে বেশী মেয়াদের চুক্তি সম্পাদন করা চলবে না। বিশেষ কারণ বিদ্যমান থাকলেই কেবল এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা চলবে। সন্ধির মেয়াদ পার হয়ে গেলেই মুসলমানেরা আবার জেহাদ শুরু করবেন। অবশ্য ইমাম যদি মনে করেন যে, পুনরায় যুদ্ধ করার মত শক্তি তাঁর আছে, তবেই জেহাদে নামতে হবে। আর ইমাম যদি মনে করেন যে, যুদ্ধ শুরু করবার মত শক্তি মুসলমানদের নেই, তবে তিনি চুক্তির মেয়াদ পূর্বের মতই বাড়িয়ে দিতে পারেন; কিন্তু তার বেশী নয়। তিনি যদি চুক্তির মেয়াদ পূর্বকথিত চুক্তির চাইতে বেশী বাড়িয়ে দেন, তবে তা আইন বহির্ভূত বলে গণ্য হবে।
আল-কোরআনের যে নির্দেশে বলা হয়েছে যে, বিশজন বিশ্বাসী দু'শজনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারেন, (যে নির্দেশ অন্য আর একটির দ্বারা নাচক হয়ে গেছে: "এক হাজার বিশ্বাসী দু'হাজার অবিশ্বাসীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারেন; কারণ, আল্লাহ "জানেন যে, তোমাদের দুর্বলতা আছে" ৮: ৬৬-৬৭) তার ভিত্তিতে কোন, কোন আইনবিদ এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা যদি শত্রুপক্ষের সৈন্যের অর্ধেক হয়, তবে তাদের (মুসলিমদের) আর যুদ্ধ করতে হবে না। অন্যান্য আইনবিদগণ বলেন যে, শক্তির পরিমাণ কেবল জনবলের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়, প্রতিরোধ ক্ষমতা ও শত্রুর অস্ত্র-শস্ত্রের ওপরই এটা নির্ভর করবে। তাই কোন মুসলমান যদি দেখেন যে, শত্রুপক্ষের কোন সৈন্য তার চেয়ে অধিকতর এবং পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত, তবে তিনি পশ্চাদপসরণ করতে পারেন। ইমাম আবু হানিফা বলেন যে, মুসলমানরা যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়ে যখনই বুঝতে পারবেন যে জয়লাভ করা অসম্ভব কেবল তখনই পশ্চাদপসরণ করা যেতে পারে। মালিকী আইনবিদগণ পশ্চাদপসরণ করা কেবল তখনই অনুমোদন করেন, যখন অধিক অগ্রসর হওয়ার অর্থ নিশ্চিত মৃত্যু। কিন্তু তাঁরা যদি দেখেন যে, পশ্চাদপসরণ করলেও মৃত্যু অবধারিত, তবে তাঁরা মৃত্যুবরণ করে যুদ্ধ করে যাবেন। ইমাম ইবনে হাম্বল পশ্চাদপসরণ কেবল তখনই সমর্থন করেন যখন দেখা যায় যে, শত্রুপক্ষের সৈন্যসংখ্যা বিশ্বাসীদের সৈন্য সংখ্যার দ্বিগুণ। ইবনে হোদাইল বলেন যে, যদি বিশ্বাসীগণ যুদ্ধক্ষেত্রে চরম দুর্দশা ও সংকটে পতিত হন, যেমন তৃষ্ণা ও ক্ষুধার ফলে যদি তাঁরা যুদ্ধ পরিচালনার শক্তি হারিয়ে ফেলেন, তবেই শুধু পশ্চাদপসরণ করা যেতে পারে।
আওযায়ী এ বিষয়ে আরও বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন: 'যদি ইমাম দেখতে পান যে, তাঁর সৈন্যদল দুর্বল হয়ে পড়েছে অথবা মুসলমানগণ গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, তবে বার্ষিক শুল্ক দানের শর্তের ভিত্তিতে হলেও শত্রুপক্ষের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করতে হবে।' আওযায়ী উমাইয়া আমলের লোক। তাই, তাঁর সমসাময়িক কয়েকজন উমাইয়া খলিফা বাইজান্টীয়দের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে যে রীতি অনুসরণ করেছিলেন, তিনি তারই স্বপক্ষে অভিমত প্রকাশ করেছেন।
মুসলিম আইনবিজ্ঞানে যুদ্ধে পরাজয়ের প্রশ্নটি এক হেঁয়ালীপূর্ণ বিষয়। অনিবার্য কারণে বাধ্য না হলে এতে পরাজয়বরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এতে আরো নির্দেশ রয়েছে যে, যথেষ্ট সৈন্যসংখ্যা না থাকলে ইমামকে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকতে হবে; অথবা যদি পরাজিত হবার সম্ভাবনা দেখা দেয়, তবে তাঁকে পশ্চাদপসরণ করে অবশিষ্ট বিশ্বাসীদের জীবন রক্ষা করতে হবে। পরাজিত মুসলমানরা সব সময়েই একথা বলেছেন যে, যতদিনই অপেক্ষা করার দরকার হোক, শত্রুপক্ষের সঙ্গে অবশ্যই পুনরায় তাদের যুদ্ধ করতে হবে।
ইসলামী জগতে যখন সাধারণ যুদ্ধ চালু হয়ে গেল, তখন জেহাদ ঘোষণার ন্যায়ানুগতার ওপর জয়-পরাজয়ের প্রশ্ন নির্ভর করত না। সৈন্যদের মনোবল ও সেনাপতিদের রণকৌশলের ওপরই সব নির্ভর করত। তুরতুশী সাহসিকতা ও মনোবলের ওপর খুব বেশী জোর দিয়েছেন। আর আল-হাসান ইবনে আবদুল্লাহ্ অস্ত্র- শস্ত্রের কার্যকারিতার ওপর অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এ প্রসঙ্গে ইবনে খালদুনের অভিমতের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি বলেছেন যে, যুদ্ধ-জয়ের ব্যাপারে সংখ্যাগরিষ্ঠতার চাইতে কতগুলো সুপ্তশক্তি অধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে, যেমন যুদ্ধক্ষেত্রের ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রকৃতি এবং রণকৌশল। কোন মুসলিম শাসক ধর্মীয় উদ্দেশ্যবিহীন সাধারণ যুদ্ধে লিপ্ত হলে অবিশ্বাসীদের হাতে যদি বিশ্বাসীরা পরাজিত হন, তবে তাতে দোষণীয় কিছুই নেই।