📘 ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তি ও যুদ্ধ > 📄 যুদ্ধের সূচনা

📄 যুদ্ধের সূচনা


মনে রাখা দরকার যে, জেহাদ শুধু সামাজিক কর্তব্যই ছিল না, ব্যক্তিগত কর্তব্য হিসেবেও জেহাদকে মূল্য দেয়া হত। ব্যক্তিগত কর্তব্য হিসেবেও জেহাদের কর্তব্য পালন করতে হবে। জেহাদ আহ্বান করা না হলে বা ইমামের হুকুম না পেলেও কিছু আসে যায় না। ইসলামী রাষ্ট্র অতর্কিতে আক্রান্ত হলে মহিলা ও শিশুসমেত প্রতিটি মুমিনকে ইসলামী রাষ্ট্র রক্ষার জন্যে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে রুখে দাঁড়াতে হবে। সামগ্রিক দৃষ্টিতে জেহাদ রাষ্ট্রীয় হাতিয়াররূপে বিবেচিত হয়। রাষ্ট্রের কর্তা বা উপকর্তা হিসেবে ইমামের কর্তব্য হবে জেহাদ ঘোষণা করা。

জেহাদ ঘোষণার পরই আসে বিশ্বাসীদের যুদ্ধে যোগদানের আহ্বান। জেহাদ ঘোষণার ফলে আইনের চোখে পরস্পর শত্রুতামূলক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিশ্বাসীদের আহ্বান করার মাধ্যমেই জেহাদের রূপায়ণ সম্ভব হয়। ইমাম অবশ্যই বিশ্বাসীদের প্রতি নৈতিক আবেদন জানাবেন এবং তাঁদের স্মরণ করিয়ে দেবেন যে, জেহাদ ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে গণ্য হয়। আল্লাহর পথে সংগ্রাম করা, ইমামের আহ্বানে সাড়া দেয়া বিশ্বাসীদের কর্তব্য। কারণ, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন : ‘তোমাদের আহ্বান করলে উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে সাড়া দাও।’ ইমাম কর্তৃক জনসভায় ভাষণ প্রদান, প্রার্থনা বা প্রদেশগুলোতে খবর পাঠাবার পর সবাই আহ্বানে সাড়া দেয়। ইসলামের প্রসারের যুগে প্রাথমিক যুগের খলিফাগণ কর্তৃক রাজধানীর নিকটবর্তী গোষ্ঠীগুলোর নিকট চিঠি লেখা হত। বালাযুরীর ভাষায়, “নজদ ও হেযাযের সমগ্র আরববাসীকে চিঠি লিখে যুদ্ধে আহ্বান জানানো হত এবং যুদ্ধে যোগ দিতে রাজি করানো হত।” ইসলামের ইতিহাসে পরবর্তী যুগেও খলিফা ও সুলতানগণ এ নিয়ম অনুসরণ করে এসেছেন।

যুদ্ধে আহ্বানের ক্ষমতা খলিফা প্রাদেশিক শাসনকর্তাদেরও দিতে পারেন। শত্রু রাষ্ট্রের সীমান্তের প্রদেশগুলো সম্পর্কে একথা বিশেষভাবে প্রযোজ্য। বিশ্বাসীদের যুদ্ধে আহ্বান করার জন্য খলিফাকে আমীরুল মুমেনিন হিসেবে শাসনকর্তাদের প্রতি হুকুমনামা পাঠাতে হত। বিশ্বাসীগণ যুদ্ধ করতে বাধ্য থাকতেন। দেশ আক্রান্ত হলেই সীমান্তের সেনাপতিগণের নিকট যুদ্ধ পরিচালনার হুকুম জারী করা হত। শত্রুপক্ষ সীমান্ত ভেদ করে এগিয়ে আসলে জেহাদ তৎক্ষণাৎ ব্যক্তিগত কর্তব্য হিসেবে গণ্য হয়। তখন শত্রুকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেবার জন্য অনাহূতভাবেই অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়।

‘দাওয়াতে’র প্রয়োজনীয়তা

রোমক অভ্যন্তরীণ আইনে যেমন যুদ্ধের জন্য কতকগুলো অনুষ্ঠান পালন করতে হত, তেমনি জেহাদের ব্যাপারেও ইসলামে আহ্বান করার রীতি প্রচলিত ছিল। অমুসলিম নতুন ধর্মের আহ্বান গ্রহণ না করলে আর কিতাবিগণ জিযিয়া না দিলে তারা শত্রু হিসেবে পরিগণিত হত এবং তাদের সাথে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে দেখা দিত। আল-কোরআনে আল্লাহ বলেছেন: "পয়গম্বর না পাঠিয়ে আমরা কাউকে শাস্তি দিই নি।" আর হাদিসে বর্ণনা করা হয়েছে যে রাসূলে আকরম বলেছেন: 'যে পর্যন্ত তারা এক আল্লাহকে উপাস্য বলে না মানে, সে পর্যন্ত আমি পৌত্তলিকদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি। যদি তারা একথা স্বীকার করে (জিযিয়া দেয়), তাদের জানমাল নিরাপদে থাকবে।' এদুটো উদ্ধৃতি থেকে বোঝা যায় যে, প্রথমতঃ, অবিশ্বাসীকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানানো হবে। তারা ইসলাম গ্রহণ করবে কিংবা যুদ্ধ করবে-একথা জানার জন্যই তাদের আহ্বান জানানো হয়।

যে নিয়ম হযরত মুহাম্মদ (সঃ) স্বয়ং নির্ধারিত করেন, তা তিনি অনুসরণ করতেন। তাঁর পরবর্তী যুগে প্রাথমিক খলিফাগণ বা খোলাফায়ে রাশেদা তাঁর এ নিয়ম-কানুন বিশ্বস্ততার সাথে মেনে চলতেন। বাইজান্টীয় ও ইরানীদের বিরুদ্ধে অভিযানের পূর্বে আরব সেনাপতিরা তাদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে অথবা জিযিয়া দিতে আহ্বান জানান। পরিপূর্ণ সরকারী দাওয়াতনামা কয়েকজন বিশিষ্ট যোদ্ধা মৌখিক কিংবা লিখিতভাবে শত্রুপক্ষের সেনাপতির নিকট নিয়ে যেতেন। এর মধ্যে ধর্ম গ্রহণের যে আহ্বান জানানো হত, মাদাইন দখলের (খৃস্টীয় ৬৩৪ সন) পূর্বে খালিদ বিন আল-ওয়ালীদ যে সরকারী পত্র লেখেন, তার ঐতিহাসিক বর্ণনা নীচে দেয়া হলঃ

"খালিদ বিন-ওয়ালীদের নিকট থেকে ইরানী কর্তৃপক্ষের নিকট। যাঁরা সত্যপন্থী, তাঁদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহকে অশেষ ধন্যবাদ, যিনি তোমাদের অপমানিত করেছেন এবং তোমাদের রাজ্যকে ধ্বংসের পথে টেনে নিয়েছেন। যাঁরা আমাদের প্রার্থনায় যোগদান করেও আমাদের সঙ্গে (যুদ্ধে) আহ্বান করে, তাঁরা মুসলমান এবং আমাদের মতোই তাঁরা সমান অধিকার লাভ করবে। আমার পত্র পাওয়ার পর আমি যা লিখলাম, আপনি তা গ্রহণ করার প্রতিশ্রুতি দেবেন। তবেই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। নতুবা আল্লাহর নামে আমি এমন সব লোক পাঠাব, আপনাদের কাছে জীবন যত প্রিয়, তাদের কাছে মৃত্যুও তেমনি বলে মনে হবে।"

যুদ্ধের পূর্বে শত্রুর কাছে দাওয়াত পাঠানোর সাধারণ নীতি সম্পর্কে ধর্মবেত্তা ও আইনবিদগণ ঐক্যমত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু খুঁটিনাটি বিষয়ে তাঁদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। খোলাফায়ে রাশেদার নীতি অনুসরণ করে হানাফী ও মালিকী আইনবিদরা বলেছেন যে, যুদ্ধের পূর্বে দাওয়াত পাঠানো উচিত। আল-কুদূরী (৯৭৩-১০৩৭ খৃস্টাব্দ) নামক হানাফী আইনবিদ বলেন যে, শত্রুপক্ষ যদি পূর্বে দাওয়াত নামা পেয়েও থাকে, তবু আর একবার দাওয়াত পাঠানো উচিত। শাফেয়ী আইনবেত্তাগণ বলেন যে, যাদের আগেই ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত করা হয়েছে, তাদের পুনরায় সংবাদ না দিয়েই ইমাম ইসলামের স্বার্থ রক্ষার্থে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারেন। আর যদি ইমাম দেখেন যে, বিনা যুদ্ধেই তাদের ইসলাম গ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে, তবে আর একবার তিনি দাওয়াত পাঠাতে পারেন। হাম্বলী আইনবিদরা বিশেষ জোর দিয়ে বলেন যে, ইসলাম গ্রহণের জন্য কেতাবীরা ত' পূর্বেই (তাঁদের নবীদের মারফত) আহূত হয়েছেন। সুতরাং, তাদের আবার আহ্বান জানানো এবং সতর্ক করে দেবার দরকার নেই। শুধু অবিশ্বাসী পৌত্তলিক জাতিগুলোকেই আহ্বান জানানো উচিত। কারণ, এদের কাছে কোনদিন ইসলাম গ্রহণের আহ্বান পৌঁছায় নি; কিংবা কোন দিন ইসলামের নাম পর্যন্তও তারা শোনেনি। তাই তাদের কাছেই শুধু সতর্কবাণী পাঠাতে হবে। পরবর্তী যুগের ধর্মবেত্তা ও আইনবিদগণ জেহাদকে আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা মনে করতেন। তাঁরা ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত অকেজো বলে মনে করতেন। কারণ, সমগ্র পৃথিবীতে ইসলাম খুবই সুপরিচিত হয়ে গিয়েছে। আবার কেউ কেউ ইসলাম গ্রহণের আহ্বান সম্পর্কে কোন কথাই বলেন নি।

আলাপ-আলোচনা

প্রাথমিক যুগের মুসলিম বিজয়ের যুগে সেনাপতিগণ দাওয়াতনামা পাঠানোর পর তিনদিন অপেক্ষা করতেন। তারপর যুদ্ধ শুরু হত। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে শত্রুপক্ষ আলাপ-আলোচনা চালাতে প্রস্তুত থাকলে মুসলমানগণ তাতে সম্মত হতেন। এসব আলাপ-আলোচনার ফলে অনেক সময়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানে পৌছানো সম্ভব হত, যেমন ইরাক ও সিরিয়ার কতকগুলো শহরের আত্মসমর্পণের ব্যাপারে একথা প্রযোজ্য। কিন্তু মতবাদের বিভিন্নতার ফলে প্রায়ই আলাপ-আলোচনা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যেত এবং তার অব্যবহিত পরেই লড়াই শুরু হয়ে যেত। এসব আলোচনার প্রকৃতি সম্পর্কে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে কাদেসিয়ার যুদ্ধের (৬৩৭ খৃস্টাব্দ) পূর্বে মুসলমান ও তাঁদের শত্রুপক্ষের পরস্পর আলাপ-আলোচনার মধ্যে। এ আলোচনা আরবসেনাপতি সা'দ বি ওয়াক্কাস ও পারস্যসেনাপতি রুস্তমের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। আল-মুগীরা বিন শু'বার নেতৃত্বে সা'দ বিখ্যাত যোদ্ধাদের একটি দলকে রুস্তমের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালাবার জন্য পাঠিয়ে দেন।

এই আলাপ-আলোচনার বিস্তৃত বিবরণ তাবারী ও বালাযুরীর লিখিত ইতিহাসে পাওয়া যায়। মৌলিক ব্যাপারে উভয় ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতৈক্য রয়েছে। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় খুঁটিনাটি ব্যাপারে বিরোধও যে নেই, তা নয়। বালাযুরীর বর্ণনা অনুসারে যোদ্ধাদল ইরানী পক্ষের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। ইবনে শু'বা রুস্তমের পাশে তাঁর সুউচ্চ আসনে বসতে উদ্যত হন। রুস্তমের দেহরক্ষীগণ দ্রুতপদে অগ্রসর হয়ে তাঁকে সেখানে বসতে বাধা দেয়। ইবনে শু'বা বলেন, এ ধরনের আচার-ব্যবহারই পারস্যের অবনতির প্রধান কারণ। দলের অন্যান্য সদস্যগণও রুস্তমের ছাউনীতে প্রবেশ করেন ও আলোচনায় শরীক হন।

রুস্তম নিম্নোক্ত প্রশ্ন করে আলাপ-আলোচনা শুরু করেন: "আপনারা এখানে এসেছেন কেন?"

দলের অন্যতম সদস্য রা'বী জবাব দেন:

"আল্লাহই আমাদের আপনাদের কাছে পাঠিয়েছেন। মানব-পূজা থেকে বিরত থাকার জন্য এবং এক আল্লাহর ইবাদাত করার জন্য আহ্বান জানাতে আমরা এসেছি।"

তখন রুস্তম অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধ বন্ধ রাখার দাবী জানান। রা'বী জবাবে বললেন যে, রাসূলে করীম হযরত মুহাম্মদ (সঃ) হুকুম দিয়েছেন যে দাওয়াতনামা পাঠাবার পর তিনদিনের বেশী যেন লড়াই বন্ধ রাখা না হয়।

পরদিন আলাপ-আলোচনার দিন ধার্য হয়। রুস্তম আবার আলাপ-আলোচনা শুরু করেন। আলোচনাকালে তিনি বলেন: "আমি বুঝতে পেরেছি যে, আপনাদের দেশ দরিদ্র বলেই আপনারা এখানে এসেছেন। এ অবস্থায় আপনাদের সেনাপতির জন্য একটি পোশাক, একটি খচ্চর ও এক হাজার দিনার এবং প্রত্যেক সৈনিকদের জন্য এক ওয়াকার খেজুর ও পোশাক উপহার দেবার জন্য আমি আদেশ দেব। কারণ, আপনাদের হত্যা বা কয়েদ করার ইচ্ছা আমার নেই।" ইবনে শু'বা এর জবাবে বললেন:

"আমাদের দারিদ্র্য সম্পর্কে আপনি যা বলেছেন, তা সুস্পষ্ট এবং আমরা তা অস্বীকার করি না। কিন্তু আপনি আমাদের আগমনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে যে মন্তব্য করলেন, তা ঠিক নয়। ...কারণ, আল্লাহ আমাদের কাছে এক রাসূল পাঠিয়েছেন এবং তাঁর বদৌলতেই আমরা ঐক্যবদ্ধ ও সম্মানিত হয়েছি।"

আলাপ-আলোচনা চলতে লাগল। মুসলিম প্রতিনিধিদলের সদস্যবৃন্দ রুস্তমকে ইসলাম গ্রহণ, জিযিয়া প্রদান বা যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া এ তিনটির যেকোন একটি গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করতে লাগলেন। রুস্তম এতে খুব বিরক্ত হন। এক বর্ণনায় জানা যায় যে, তিনি হতাশার সুরে বলেন, তাঁর পক্ষে মুসলমানদের সঙ্গে শান্তি স্থাপন করা অসম্ভব। বালাযুরীর বর্ণনায় আছে, তখন মুসলমানদের দলের একজন জবাব দেনঃ 'আমাদের রাসূল (সঃ) আপনাদের দেশে আমাদের বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন।'

তাবারীর বর্ণনায় পারসিক ও বাইজান্টীয়দের সাথে আলোচনার যে বর্ণনা রয়েছে, ওপরের আলোচনা থেকে তা খুব আলাদা নয়। মিসর বিজয়ের সময় মুসলমানদের সঙ্গে মিসরীয়দের যে আলাপ-আলোচনা হয়, তাও প্রায় একই ধরনের। ইবনে আবদুল হাকামের বর্ণনায় জানা যায় যে, মিসরের প্রধান খৃস্টান যাজক মুসলিম সেনাপতি আমর বিন আসের কাছে শান্তি চুক্তি সম্পাদন করার আহ্বান জানিয়ে এক প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে দেন। আমর ওই আহ্বানে সাড়া দেন। যদিও গোড়ার দিকে আলাপ-আলোচনা সফল হয় নি, তবু পরিশেষে কপটগণ মুসলমানদের সঙ্গে একটা সমঝোতায় পৌঁছেছিল। দুঃখের বিষয়, ঐতিহাসিকরা চুক্তির ধারাগুলো ছাড়া আর কোন কিছুই লিপিবদ্ধ করেন নি। চুক্তি সম্পাদনের পূর্বে আলাপ-আলোচনার কথোপকথনের ধারা সম্পর্কে কোন বর্ণনাও তাঁরা দেন নি।

📘 ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তি ও যুদ্ধ > 📄 স্থল-যুদ্ধ

📄 স্থল-যুদ্ধ


যুদ্ধে বিজয়ী হওয়া বা শত্রুপক্ষের ধনসম্পদ লাভ করা মুসলিম আইনে যুদ্ধের আসল উদ্দেশ্য নয়। যুদ্ধের মধ্যে কর্তব্য পালন ছাড়া আর কোন কিছুই নেই। ইসলামী আদর্শকে সার্বজনীনভাবে প্রতিষ্ঠিত করার তাগিদেই আল্লাহর পথে জেহাদ পরিচালিত হয়। সে জন্য জেহাদীদের তাঁদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য অযথা রক্তক্ষয় করতে বা ধন-সম্পদ বিনষ্ট করতে নিষেধ করা হয়েছে। সিরিয়া অভিযানকারী সেনাদলের প্রতি হযরত আবু বকরের (রাঃ) ভাষণ এবং পরবর্তী যুগের খলিফাদের একই রকমের উপদেশ-বাণীর মধ্যে এ বিষয় সম্পর্কে মৌলিক নীতি খুঁজে পাওয়া যাবে।

নিষিদ্ধ কার্যাবলী

আইনবিগদগণ হযরত আবু বকরের (রাঃ) নসিহতগুলোর মধ্যে অকারণে অমুসলিমদের ধনসম্পদ বিনষ্ট না করার নীতি মেনে নিয়েছেন। কিন্তু খুঁটিনাটি ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে মতবিরোধ আছে। বর্তমানে যে সব বিবরণ আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে, তা থেকে জানা যায় যে, কেবলমাত্র আল-আউযায়ী (খৃস্টীয় ৭৭৪) ও আস-সাউরী (খৃস্টীয় ৭৭৮) অকারণে ধ্বংস না করার নীতি নির্বিবাদে মেনে নিয়েছেন। আইনের চারটি মযহাবের প্রবর্তক এবং অন্যান্য আইনবিদগণ আল-কোরআন ও সুন্নার কতিপয় নির্দেশ অনুযায়ী এ নীতিকে অনেকটা সীমিত করে এনেছেন। আল-আউযায়ী বলেন যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) ও অন্যান্য সাহাবির ব্যবহারিক জীবনের আলোকে আল-কোরআন ও সুন্নার ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। কেননা, তাঁর মতে সাহাবিগণ আল-কোরআনের ব্যাখ্যার ব্যাপারে ইমাম আবু হানিফার চাইতেও পারদর্শী ছিলেন। তাই তাঁদের ব্যাখ্যাই সর্বাগ্রে গৃহীত হওয়া উচিত।

ইমাম মালিক তাঁর "মু'আত্তায়” যুদ্ধের আইনের ব্যাপারে যে আলোচনা করেন, তাতে তিনি গৃহপালিত পশু ও মৌচাক ধ্বংস না করতে বলেছেন। ইমাম আবু হানিফা এ বিধান দিয়েছেন যে, জেহাদীগণ যে সব জিনিস নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে না যেমন বাড়ী, চার্চ, গাছ-পালা, পশু—সবই ধ্বংস করতে পারেন। ইমাম শাফেয়ী বলেন যে, প্রাণহীন সব কিছু ধ্বংস করা যেতে পারে, যেমন বৃক্ষ। কিন্তু পশু কেবল তখনই হত্যা করা উচিত যখন জেহাদীরা মনে করেন যে, এগুলো ধ্বংস না করলে শত্রুপক্ষ যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে পড়বে।

আইনবিদগণ এ সম্বন্ধে সর্বসম্মত অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, যাঁরা যুদ্ধে যোগদান করেন না যেমন নারী, শিশু, পাদ্রী, ফকির, বৃদ্ধ, অন্ধ, উন্মাদ, এদের কোন প্রকার পীড়ন করা চলবে না। অনেক হানাফী ও শাফেয়ী আইনবিদ কৃষক ও ব্যবসায়ীদের নিপীড়ন করতে নিষেধ করেছেন। কারণ, তারা যুদ্ধে যোগদান করে না।

প্রাক-ইসলামী যুগে শত্রুপক্ষের নিহত ব্যক্তিদের মস্তক বর্শার অগ্রভাগে বহন করার নীতি প্রচলিত ছিল। আইনবিদগণ এ প্রথা রহিত করার সুপারিশ করেন। এই হল এসব আইনবিদের অভিমত। খলিল নামক মালিকী আইনবেত্তা যুদ্ধে বিষাক্ত তীর ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। আর হিল্লী শত্রুর বিরুদ্ধে তীর ব্যবহার একেবারেই নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন।

প্রাক-ইসলামী যুগের রীতি-নীতি অনুসরণ করে মুসলিমগণ পবিত্র মাসে যুদ্ধে যোগ দিতেন না। এ সময়ে সকলের যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত থাকা উচিত। কারণ, তখন আল্লাহর বিশেষ রহমত নাযিল হয়। আল-কোরআনের নিম্নলিখিত নির্দেশের মধ্যেও এর ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়:

"পবিত্র মাস শেষ হয়ে গেলে মুশরিকদের যেখানে পাও হত্যা কর। কারণ, তারা আল্লাহর সঙ্গে অন্যান্য দেবতাদের শরীক করে।" (৯:৫)।

কোরআনের এ নীতি পরবর্তীকালে আর একটি নীতি দ্বারা বাতিল হয়ে যায়। সেটা হল এই:

"তারা (মুসলমানগণ) তোমাকে পবিত্র মাসে যুদ্ধ পরিচালনা সম্পর্কে প্রশ্ন করবে। তাদের বল: পবিত্র মাসে যুদ্ধ করা খারাপ; কিন্তু আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরে যাওয়া ও তার ওপরে ইমান না রাখা এবং কাবা শরীফকে সম্মান না করা ও সেখান থেকে লোকদের তাড়িয়ে দেয়া আল্লাহর দৃষ্টিতে অতি খারাপ।” (২:২১৪)।

আতা ভিন্ন আর সব আইনবিদ এই সর্বসম্মত অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, মুসলিম আইন অনুসারে পবিত্র মাসে বিশেষ রহমত নাযিলের নীতি আর গ্রাহ্য নয়; অবশ্য পবিত্র মাসে যুদ্ধে যোগদান হতে বিরত থাকা অনুমোদন করা হয়েছে।

শত্রুদের প্রতি ব্যবহার

দারুল হারবের অমুসলমানগণকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত জানাবার পর তারা যদি বিভিন্ন বিকল্পপন্থার যে কোন একটি (ইসলাম গ্রহণ অথবা জিযিয়া প্রদান) গ্রহণ না করেন, তবে জেহাদীগণ নীতিগতভাবে জেহাদের মারফত তাদের হত্যা করতে পারেন। তারা যুদ্ধে যোগ দিন আর না দিন।

অবশ্য তাদের বিশ্বাসভঙ্গ করে হত্যা বা অঙ্গচ্ছেদ করা কোন মতেই অনুমোদিত হয় নি। নিজেদের ধর্মবিশ্বাস ও ইসলামের মধ্যে যে কোনটি বেছে নিতে হলে হারবীদের যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েই তার মীমাংসা করতে হবে।

জেহাদীগণ শত্রুপক্ষকে অবরোধ করতে এবং নগরের প্রাচীর ও গৃহ ধ্বংস করতে আগ্নেয়াস্ত্র (নিক্ষেপাস্ত্র) ব্যবহার করতে পারেন। শত্রু-অধিকৃত স্থান দগ্ধ করতে বা প্লাবিত করতে পারেন। তাঁরা খালের পানি অবরুদ্ধ করতে পারেন ও শত্রুপক্ষ যাতে পানি না পায়, সেজন্য পানি সরবরাহও বন্ধ করে দিতে পারেন। বিষাক্ত দ্রব্য, রক্ত বা অন্যান্য জিনিস পান করার পানিতে বা খালে নিক্ষেপ করা যেতে পারে। এতে শত্রুগণ আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে। সাধারণভাবে বিষাক্ত ও অগ্নিবহ তীরও যুদ্ধে ব্যবহার করতে অনুমতি দেয়া হয়।

যদি হারবীগণ (অমুসলিম যোদ্ধা) নারী ও শিশুসমেত মুসলিমদের ধরে ফেলে এবং তাঁরা ও অসুমসলিমগণ জেহাদীদের দ্বারা অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকেন, তবে জেহাদীগণ হিংসাত্মক কার্যকলাপ সীমিত করবেন। এটাই হল আইনবিদগণের সর্বসম্মত অভিমত। হিংসাত্মক কার্যকলাপের পরিসীমা সম্পর্কে অবশ্য তাঁদের মধ্যে মতবিরোধ আছে। ব্যক্তিগতভাবে জেনে হারবীদের যদি আক্রমণ করা না যায়, তবে প্রত্যক্ষ আক্রমণ থেকে বিরত থাকার জন্য আল-আউযায়ী উপদেশ দিয়েছেন। আল-কোরআনের নিম্নলিখিত আয়াতের ওপর ভিত্তি করে তিনি এ মতামত প্রকাশ করেছেন। মক্কা বিজয়ের সময়ে এটি নাযিল হয়:

"তোমাদের অজান্তে বিশ্বাসী নারী-পুরুষের তোমরা হয়ত মথিত করতে পার। এবং তার ফলে তোমরা গোনাহগার হয়ে যেতে পার।" (৪৮:২৫)।

সুফিয়ান আস-সাউরী ও ইমাম আবু হানিফা প্রয়োজনবোধে তীর-ধনুক দিয়ে শত্রুকে আক্রমণ করার সপক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। এতে জেহাদীগণ কর্তৃক অমুসলিম আক্রান্ত হওয়ার ফলে যদি অস্ত্র-শস্ত্রের আঘাতে কোন মুসলমানের মৃত্যু হয়, তবু আক্রমণ করা বাঞ্ছনীয়। মুমিনদের (মহিলা ও শিশুসমেত) হত্যা তখন ভুলক্রমে হয়ে গিয়েছে বলে মনে করতে হবে। ইমাম শাফেয়ী বলেন, যুদ্ধার্থে সুরক্ষিত কেন্দ্র ও দুর্গসমূহ আক্রমণ করা চলে। কিন্তু বাড়ী-ঘরের ওপর হামলা চলবে না। যদি যুদ্ধের এলাকা খুব পাশাপাশি হয়, তবে মুমিনদের মৃত্যু ঘটলেও তীর না ছুঁড়ে (আক্রমণ না করে) হাত গুটিয়ে বসে থাকা উচিত নয়। শাফেয়ী আইন ও ধর্মবেত্তা ইমাম গাজ্জালী বলেন যে, হারবীদের ওপর বেপরোয়া আক্রমণকালে জেহাদীদের তীরের আঘাতে দুর্ঘটনাক্রমে কোন মুমিন নিহত হলে তা' দোষাবহ হবে না। অর্থাৎ এ অবস্থায় 'ইসতিসলাহ' বা জনকল্যাণের তাগিদে কয়েকজন মুমিনের হত্যা অনুমোদিত হয়েছে। কারণ, জেহাদকালে এ ধরনের আক্রমণে মুসলমানদের বৃহত্তর স্বার্থের প্রশ্ন জড়িত রয়েছে।

গুপ্তচর

মুসলিম সেনাপতিগণ গুপ্তচর বৃত্তির উপযোগিতা স্বীকার করতেন এবং এ প্রাচীন প্রথার উপযুক্ত ব্যবহার প্রচলন করেন। কিন্তু অন্যান্য জাতির মত তাঁরা বৈদেশিক গুপ্তচরদের কঠোর হস্তে শাস্তি দিতেন। যদি কোন হারবী নিরাপদভাবে (আমান) দারুল ইসলামে প্রবেশ করে থাকে ও পরে তার গুপ্তচর বৃত্তি ধরা পড়ে, তবে তাকে হত্যা করা হয়। আর ইমাম যদি সিদ্ধান্ত করেন তবে তাকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করাও যেতে পারে। যদি কোন মহিলা ও শিশু আমানের (নিরাপত্তা) ভিত্তিতে দারুল ইসলামে প্রবেশ করে থাকে এবং তাদের গুপ্তচরবৃত্তি ধরা পড়ে তবে মহিলাকে হত্যা করা উচিত, কিন্তু ক্রুশবিদ্ধ করে নয়। শিশুকে শত্রুপক্ষ থেকে প্রাপ্ত দ্রব্য (Fay) বলে মনে করতে হবে; কিন্তু হত্যা করা যাবে না।

যদি কোন মুসলমান গুপ্তচর হিসেবে কাজ করে শত্রুপক্ষকে খবর সরবরাহ করে, তবুও আইনে তার জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান দেয়া হয় নি। অবশ্য ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম মালিক দেশের শাসনকর্তা বা ইমামের ওপর তার শাস্তি বিধানের বিষয়টি ন্যস্ত করেছেন। আল-আউযায়ী তাকে নির্বাসিত করার বা নিপীড়নমূলক শাস্তি বিধান করার সুপারিশ করেছেন। ইমাম আবু হানিফা বলেন যে, সে তওবা (অনুশোচনা) না করা পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখা হবে। কেতাবীদের গুপ্তচর বৃত্তির ব্যাপারে এই একই আইন প্রযোজ্য হবে।

মৃত ব্যক্তির প্রতি ব্যবহার

হারবীর মৃত্যুর পর তার মৃতদেহকে অবমাননা করা, তার মাথা কেটে ফেলা বা বর্শার অগ্রভাগে তার মাথা তুলে নেয়া চলবে না। আবু ইয়ালা বলেন যে, মৃতব্যক্তি মাত্রকেই দাফন করা উচিত। তবে শবাধারে রাখা বা কাফন না পরালেও চলবে। বদরের যুদ্ধের পর হযরত মুহাম্মদের (সঃ) সুন্নার ওপরই তাঁর এ মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

📘 ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তি ও যুদ্ধ > 📄 নৌ-যুদ্ধ

📄 নৌ-যুদ্ধ


ইসলাম ও নৌ-শক্তি

ইসলামী আইনবিজ্ঞানে সমুদ্রপথে যুদ্ধের বিষয়টির আলোচনা অনেকখানি অপূর্ণ রয়ে গেছে। গোড়া থেকেই মুসলমানেরা সমুদ্রপথ এড়িয়ে চলতেন। তাছাড়া সব চাইতে বড় কারণ হল এই যে, মুসলিম শক্তি স্থলপথেই সীমাবদ্ধ ছিল। পানিপথে তাঁদের শক্তি দানা বেঁধে উঠতে পারে নি। ফলে বিষয়টি তাঁরা অবহেলা করেই এসেছেন। স্থল এলাকায় ইসলামের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মরুপ্রদেশ থেকে বাইজান্টীয় ও ইরানী সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে তা ছড়িয়ে পড়ে। ইরানী সাম্রাজ্যের দ্রুত ও চরম অধঃপতন ঘনিয়ে আসল। কারণ, ইরান হল এমন একটি স্থলশক্তি, যাকে ইসলাম সম্পূর্ণরূপে পর্যুদস্ত করতে পেরেছিল। কিন্তু মুসলমানরা যখন আলেকজান্দ্রিয়ায় ও সিরিয়ার সমুদ্রতীরে বাইজান্টীয়দের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন, তখন তাঁরা বিপুল বাধার সম্মুখীন হন। বাইজান্টীয়দের নৌ-শক্তি তখনও অটুট ছিল। এ পর্যন্ত বহুদিন ধরে মুসলমানগণ স্থলশক্তির সাহায্যেই তাঁদের বিজিত দেশ নিয়ন্ত্রণ করে এসেছেন। জাবিয়া, কুফা ও ফুসতাত মরুভূমিতে অবস্থিত এসব ঘাঁটি থেকেই স্বচ্ছন্দে বিজিত এলাকাগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়। কিন্তু সমুদ্রপথে মুসমানদের সর্বক্ষণ আক্রমণের মোকাবিলা করতে হত। তাই নৌ-বাহিনী গঠন করে সাম্রাজ্যকে বিদেশী আক্রমণ থেকে রক্ষা করার বন্দোবস্ত করা হয়। ভৌগোলিক অবস্থান ও হযরত মুয়াবিয়ার রাষ্ট্রনৈতিক দূরদর্শিতার ফলে মুসলমানগণ নৌ-শক্তির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারলেন। কারণ, যতদিন ভূমধ্যসাগর বাইজান্টীয়দের কবলে রয়ে গেল, ততদিন মিসর ও সিরিয়ায় ইসলামের অবস্থা মোটেই নিরাপদ ছিল না।

খৃস্টীয় ৬৪৮ সালে হযরত মুয়াবিয়া কর্তৃক সাইপ্রাস অধিকারের পরই মুসলিম নৌ-শক্তির গোড়াপত্তন হয়। ফলে সিরিয়ার ওপর তাঁর আধিপত্য অনেকটা মজবুত হয়ে আসে। রোডস ও সিসিলি দ্বীপের ওপর আক্রমণ মুসলমানদের অভিজ্ঞতা বাড়িয়ে দেয় এবং ৬৫৫ সালে প্রথম বৃহৎ নৌ-সমরে তাঁরা জয়ী হন। কয়েকটি নৌ-কৌশল প্রয়োগের ফলেই মুসলিমগণ যাত-আস-সাউরীর যুদ্ধে জয়লাভ করেন। এতে বোঝা গেল যে, শেষ পর্যন্ত মুসলমানগণও সামুদ্রিক যুদ্ধে পারদর্শী হয়ে উঠেছেন। বাইজান্টীয়-শক্তি সমুদ্রপথে অপ্রতিদ্বন্দ্বী থাকা সত্ত্বেও ভূমধ্যসাগরের আধিপত্য কেবলমাত্র খৃস্টান শক্তির মধ্যে আর সীমাবদ্ধ রইল না। নৌ-আধিপত্যের ব্যাপারে খৃস্টান ও মুসলমানদের মধ্যে বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলল। কারণ প্রতিবার কেউ না কেউ নতুন নতুন রণ-কৌশল বা অস্ত্রশস্ত্র উদ্ভাবন করতে লাগল। ইস্তাম্বুলের মুসলিম অবরোধ গ্রীকদের অগ্নিপ্রক্ষেপ কৌশলের কাছে পর্যুদস্ত হয়ে যায় (খৃস্টীয় ৬৭৩-৬৯৭)। আবার অপরপক্ষ হয়তো বা একই অস্ত্র আকস্মিকভাবে প্রয়োগ করতেন অথবা নতুন কৌশল উদ্ভাবন করে পালটা আক্রমণ চালাতেন। এ কারনেই উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলের একটানা আক্রমণ সত্ত্বেও (৭১৭ খৃস্টাব্দে ইস্তাম্বুলের ওপর আর একটি আক্রমণ) বাইজান্টীয় সাম্রাজ্য টিকে থাকতে পেরেছিল।

পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ইসলামের নৌ-শক্তি দ্রুতগতিতে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। খৃস্টীয় দশম শতাব্দীতে সমগ্র উত্তর আফ্রিকার সমুদ্র অঞ্চল ও স্পেনের ওপর সুদৃঢ় আধিপত্যের ফলে এবং সিসিলি, সাডিনিয়া ও দক্ষিণ ইতালী অধিকারের ফলে ইসলাম সর্বাঙ্গ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল। ভূমধ্যসাগরের ওপর প্রভাবের তাৎপর্য খুব সুদূরপ্রসারী ছিল। এর ফলে যে কেবল পূর্ব ও পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে আন্ত র্জাতিক বাণিজ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠাই কেবল সম্ভব হল তাই নয়, নতুন পদ্ধতিতে (যেমন স্বর্ণ-দিনারের ব্যবহার ও ব্যাঙ্কিং ইত্যাদি) সামুদ্রিক বাণিজ্য, নৌ-যুদ্ধ ও নৌ-চলাচল ব্যবস্থা পরিচালনার নতুন নতুন পন্থা ও রীতি-নীতির পত্তন হল। মুসলিম নৌ-শক্তির অবনতির সঙ্গে সঙ্গে খৃস্টান শক্তিগুলো পশ্চিমে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে মুসলিম ভূখণ্ডের ওপর হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে। ইবনে খালদুন সুস্পষ্টরূপে দেখিয়েছেন, কি করে খৃস্টান রাষ্ট্রগুলোর নৌ-আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ফলে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল ও স্পেনের কোন কোন অঞ্চল মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে যায়। পঞ্চদশ শতাব্দীতে উসমানীয় তুর্কিগণ কর্তৃক পূর্ব ভূমধ্যসাগরের এক বৃহৎ অঞ্চল ও আফ্রিকার উপকূলে প্রভুত্ব বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ইসলামের নৌ-শক্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী তিন শতাব্দী ধরে এ প্রভুত্ব বজায় ছিল।

মুসলিম সামুদ্রিক আইন

অধিকাংশ আইনবিদই সমুদ্র সম্পর্কে প্রায় একরকম কিছুই বলেন নি। অল্প কয়েকজন সমুদ্রের আইন সম্বন্ধে যা লিখেছেন, তা থেকে যুদ্ধ ও শান্তিকালে আন্ত র্জাতিক ক্ষেত্রে সামুদ্রিক আইনের নিখুঁত ছবি দাঁড় করানো কঠিন। আল-কোরআনে সমুদ্র সম্পর্কে কয়েকটি উক্তি আছে। একটিতে এই সাবধান বাণী রয়েছে: "আল্লাহ ফেরাউনের সৈন্যদের সমুদ্রে নিমজ্জিত করে শাস্তি দিয়েছেন" (২:৪৭)। আবার অন্য আর একটিতে দু'রকমের সমুদ্রের কথা আছে—স্বাদু ও মিঠে পানির সাগর আর নোনা এবং তেতো পানির সাগর। আল্লাহ বলেন, উভয় প্রকারের সমুদ্র থেকেই বিশ্বাসীগণ মাছ ধরে খেতে পারবেন, মণি-মুক্তা সংগ্রহ করতে পারবেন ও বিভিন্ন প্রকার সুবিধা লাভের জন্য সমুদ্রে অভিযান চালাতে পারেন। আল-কোরআনের যে সব নির্দেশের মধ্যে "সমুদ্রকে অধীন করে দিয়েছেন" যাতে করে "সেখানে জাহাজ চলাচল করতে পারে" (৪৫: ১১) রয়েছে, সেগুলোই অনেক বেশী প্রাসঙ্গিক। আল-কোরআনে আরও আছে, "তিনি তোমাদের জন্য তারকা সৃষ্টি করেছেন, যাতে স্থলে ও সমুদ্রপথে তোমরা অন্ধকারে পথ চলতে পারো" (৬ঃ ৯৭)।

হাদিসে কোরআনের চাইতে বেশী কিছু নেই। খলিফা হযরত উমর (রাঃ) বিশ্বাসীদের নাকি সমুদ্র ভ্রমণ থেকে বিরত করেন। সেনাপতিদের তিনি এই নির্দেশ দেন যে, তাঁরা যেন সামরিক অভিযান মরুভূমির দিকেই পরিচালিত করেন। স্মরণ রাখা উচিত যে, হযরত উমর (রাঃ) হযরত মুয়াবিয়া কর্তৃক সাইপ্রাস দখলের প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেন; আর অনিচ্ছাকৃতভাবেই হযরত উসমান (রাঃ) তা অনুমোদন করেন। এ অবস্থায় আইনবিদগণ ইসলাম থেকে শান্তিকালে নৌ-চলাচল ব্যবস্থা কিংবা নৌ- যুদ্ধের আইন সম্বন্ধে প্রামাণ্য সূত্রে কোন নির্দেশ বার করতে পারেন নি। তাই তাঁদের স্থল-যুদ্ধের অনুরূপ অবস্থা থেকে বা অন্যান্য জাতির ব্যবহার-বিধি ও আচার-ব্যবহারের ওপরই এ ব্যাপারে নির্ভর করতে হয়েছে।

নৌ-যুদ্ধের আইন-কানুন

হাদিসে আছে যে, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন: 'যাঁরা নৌ-যুদ্ধে শহীদ হন, তাঁরা স্থল-যুদ্ধের শহীদদের চাইতে দ্বিগুণ পুরস্কার পাবেন'। সমুদ্র সম্বন্ধে যে চিরাচরিত ভীতি ছিল, এই পুরস্কার ঘোষণার মধ্যেই সমুদ্র-যুদ্ধে উৎসাহ দেবার প্রয়োজনীয়তা পরোক্ষভাবে সুপরিস্ফুট হয়েছে। শায়বানিও বলেছেন, কোন মুসলমান সমুদ্র অভিযানে শরীক হলে দ্বিগুণ পুরস্কার লাভ করবেন। জেহাদী জাহাজে আরোহণ করার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর সব গোনাহ মাফ হয়ে যায়। তিনি নবজাত শিশুর মত নিষ্পাপ হয়ে যান।

স্থলযুদ্ধে দুর্গ সম্বন্ধে যে আইন প্রচলিত আছে, নৌ-যুদ্ধে সে আইনই জাহাজের ওপরও প্রযোজ্য হবে। আইনবিদগণ তুলনামূলক বিচার করে ঐক্যবদ্ধভাবে এ নীতি প্রয়োগ করতে চেয়েছেন। জেহাদীরা যেমন অস্ত্রশস্ত্র নিক্ষেপ করে এবং বাইরের সাহায্য থেকে বিচ্ছিন্ন বা বিনষ্ট করে দুর্গ অবরোধ ও আক্রমণ করতে পারেন, তেমনি সামুদ্রিক জেহাদীরা শত্রুপক্ষের জাহাজের লোকদের বশে এনে বশ্যতা স্বীকার না করানো পর্যন্ত আগুন ধরিয়ে বা ডুবিয়ে দিয়ে শত্রু-জাহাজকে আক্রমণ করতে পারেন ও তার ধ্বংসসাধন করতে পারেন। এ আইনের ওপর ভিত্তি করেই নৌ-জেহাদীগণ শত্রুপক্ষের মনোবল বিনষ্ট করে ভীতিজনক অবস্থার সৃষ্টি করে জাহাজের ওপর সরাসরি আক্রমণ করার জন্য বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতেন। জাহাজের ওপর মুসলমান নৌ-সেনারা যে কেবল পাথর ও আগুনের গোলা নিক্ষেপ করতেন তাই নয়, তাঁরা সাপ, বিচ্ছু ও ক্ষতিকর চূর্ণও ছুঁড়ে মারতেন। শত্রুপক্ষকে বিতাড়িত করার জন্য এবং জাহাজের লোকদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা ও ভীতি সঞ্চারের জন্য তাঁরা এ পন্থা অবলম্বন করতেন।

স্থল-যুদ্ধের নিয়ম অনুসারে শত্রু-দুর্গের চারদিক শত্রুগণ কর্তৃক বন্দী মুসলিম নারী ও শিশুদের দিয়ে ঘিরে দিলেও যেমন সে দুর্গ আক্রমণ করা যেত, তেমনি জাহাজের চারদিক মুসলিম বন্দী দ্বারা ঘিরে রাখলেও তা হামলা থেকে রেহাই পাবে না। সাধারণ আইনবিদদের মতের বিরুদ্ধে আল-আউযায়ী অবশ্য এই অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, মুসলিম বন্দীদের দ্বারা দুর্গ ঘিরে রাখলে সে দুর্গ আক্রমণ করা চলবে না। তেমনি শত্রু-জাহাজও যদি মুসলমানদের দ্বারা পরিবেষ্টিত করে দেয়া হয়, তবে সে জাহাজ আগুন ধরিয়ে বা অন্যান্য উপায়ে ধ্বংস করা চলবে না।

নৌ-যুদ্ধের সময় যদি মুসলমানদের কোন জাহাজ ঘায়েল হয়, তবে জেহাদী হয় জাহাজেই অবস্থান করবেন, নয় এক সঙ্গে ডুবে যাবেন অথবা সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে নিমজ্জিত হয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারেন। যদি তিনি ঝাঁপ দিয়ে পড়েন, তবে তাঁর শত্রুর হাতে পড়ার সম্ভাবনা খুব কম থাকে। তবু শত্রুর হাতে তিনি মারা পড়বেন না, এ কথা জোর করে বলা যায় না।

নৌ-যুদ্ধের পর মুসলিম যুদ্ধ জাহাজ বন্দী ও ধন-সম্পদ লাভ করতে পারে। আইনবিদদের মতে, স্থল-যুদ্ধে অর্জিত ধন-সম্পদ যেভাবে বণ্টন করা হয়, নৌ-যুদ্ধেও সেই একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। যদি মুসলিম নৌ-সেনারা দেখেন যে, অর্জিত ধন-সম্পদ ওজনে এত ভারী যে জাহাজ ডুবে যাবার আশংকা দেখা দিয়েছে, তখন তাঁরা যে কেবল ধন-সম্পদই সমুদ্রে নিক্ষেপ করতে পারেন তা নয়, নারী ও শিশু সমেত সব যুদ্ধবন্দীকে তাঁরা ফেলে দিতে পারেন। কিন্তু জাহাজে যদি মুসলিম নারী ও শিশু থাকে তবে তাদের সমুদ্রে নিক্ষেপ করা চলবে না। কারণ, তাদের সমুদ্রে নিক্ষেপ করা অবৈধ বলে সাব্যস্ত হয়েছে। এ দুরবস্থার কথা চিন্তা করেই সুযুতী প্রমুখ আইনবিদগণ বলেছেন যে, যুদ্ধ জাহাজে নারী ও শিশুদের নিয়ে যাওয়া উচিত নয়। মুসলমানদের জাহাজে যদি জিম্মী বা আমানের (নিরাপত্তা) ভিত্তিতে আনীত অমুসলিম থাকেন, তবে তাদেরও সমুদ্রে নিক্ষেপ করা চলবে না। কারণ মুসলমানদের তাদের দেয়া ওয়াদা পালন করতেই হবে।

যদি শত্রু পক্ষের জাহাজ সমুদ্রযাত্রার পক্ষে অকেজো হয়ে পড়ে ও জাহাজীগণ আমান না নিয়েই দারুল ইসলামের উপকূলে এসে হাজির হন, তবে তাদের নিপীড়িত করা চলবে না। আউযায়ী বলেছেন যে, শত্রুপক্ষ যদি আমান প্রার্থী হয়, তবে তাদের তা প্রদান করতে হবে। তবে তারা যদি আমান না চান, তবে তাদের আক্রমণ করা যেতে পারে। যদি কোন শত্রু-জাহাজ দারুল ইসলামের সমুদ্র-উপকূলে এসে পড়ে এবং জাহাজের ব্যবসায়ীদের কোন আমান না থাকে, তবে তাদের শত্রুর কাছ থেকে পাওয়া সম্পদ (Fay) হিসেবে মনে করতে হবে। কিন্তু তারা যদি কূটনৈতিক কার্যোপলক্ষে এসেছে বলে দাবী করে, তবে তাদের কূটনৈতিক নিরাপত্তা (Immunity) দান করতে হবে এবং ইমামের কাছে যেতে অনুমতি দিতে হবে। ইমাম যদি দেখেন যে, তাদের কাছে পরিচয়-পত্র নেই, তবে তাদের কয়েদ করা, দাসে পরিণত করা কিংবা হত্যা করা যেতে পারে। তাদের ধন-সম্পদও বাজেয়াপ্ত করা চলবে।

নৌ-বাহিনী সংগঠন

মুসলিম নৌ-বাহিনী যতই অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে থাকে, এর দক্ষতা এবং সংগঠন-শক্তি ততই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। খৃস্টীয় দশম শতাব্দীতে সমুদ্রে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতারূপে যখন মুসলিম নৌ-শক্তি সর্বাধিক শক্তিশালী হয়, তখন মুসলিম রণপোত ও বাণিজ্য বহর পরিচালনা-নৈপুণ্য, সামুদ্রিক-জ্ঞান ও নৌ-কলাকৌশলের দিক থেকে সর্বোচ্চ যোগ্যতা অর্জন করে এবং তদানীন্তন যুগের অগ্রগামী ভূমিকা গ্রহণ করে। পশ্চিম ভূমধ্যসাগরে মুসলিম নৌ-বাহিনী ও নৌ-সংগঠন সম্পর্কে বিস্তর তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যান্য মুসলিম এলাকার ব্যাপারেও বোধহয় এ তথ্যগুলো প্রযোজ্য। লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরে চালু জাহাজের চাইতে ভূমধ্যসাগরের জাহাজগুলো ছিল আকারে অনেক বড় ও উন্নতমানের। জাহাজ তৈরীর জন্য মুসলমানেরা উৎকৃষ্ট কাঠ আমদানী করতেন এবং সুদক্ষ পরিচালনা ও দ্রুত গমনের জন্য বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সংযোজিত করতেন। বিশাল সমুদ্রে চলাচলের সময় জাহাজের ফাটল ও ছিদ্র সহজেই মেরামত করে নেয়া চলত। চলমান জাহাজের চারদিকে কয়েকজন জাহাজীকে সাঁতার দেবার শিক্ষা দেয়া হত। এরা মোম ও সহজলভ্য অন্যান্য জিনিস দিয়ে জাহাজের ছিদ্রগুলো বন্ধ করে দিতেন।

প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের মত নৌ-বাহিনীর এডমিরাল বা "আমীরুল বাহরকে" পরিপূর্ণ ক্ষমতা প্রদান করা হত। স্বয়ং খলিফার অনেক ক্ষমতারও তিনি অংশীদার ছিলেন। স্থলে যেমন খলিফা শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করতেন, তেমনি "আমীরুল বাহরের" কাজ হল সমুদ্র-পথে শাসন চালান। নৌ-জেহাদীদের পরিচালনা এবং অস্ত্রাদির তত্ত্বাবধানের জন্য একজন কায়েদ বা কাপ্তেন নিয়োজিত হতে এবং পাল ও দাড় পরিচালনার জন্য একজন সরদার বা “রইস” থাকতেন। যদি আমিরুল-বাহর নৌ-অভিযান পরিচালনা নিজহস্তে গ্রহণ না করতেন, তবে কোন নিম্নপদস্থ আমীরের হাতে এ কাজের ভার দেয়া হত। গ্রীকগণ কর্তৃক আগ্নেয়াস্ত্র দ্বারা আক্রমণ করার ফলে মুসলমানদের সমূহ ক্ষতি সাধিত হবার পর মুসলমানরা নিজেদের যুদ্ধ-জাহাজে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার প্রচলন করেন। এসব জাহাজকে হারাক্কাস বা আগ্নেয় জাহাজ বলা হত। এগুলো থেকে শত্রু-জাহাজে দাহ্য-বস্তু নিক্ষেপে করা হত।

মুসলমানেরা কম্পাস ব্যবহার করতেন। তবে বোধহয় পরবর্তী যুগে এর প্রচলন হয়। প্রথম যুগের মুসলিম আন্তর্জাতিক আইন-বিশারদগণ এর কোন উল্লেখই করেন নি। প্রাথমিক ইউরোপীয় কম্পাসের মত এ কম্পাস-পঞ্জীতে বত্রিশটি বিন্দু ছিল। কিন্তু এটুকু ছাড়া এ দুটোর মধ্যে আর কোন সাদৃশ্য নেই। মুসলমানেরা চারটি প্রধান বিন্দুর উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তাঁরা এ বিন্দুগুলোকে আরও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিভাগে বিভক্ত করেন নি। বিভিন্ন তারকার নামের সঙ্গে মিলিয়ে এঁরা বিন্দুগুলোর নামকরণ করেছেন। প্রধান চারটি বিন্দুকে তাঁরা "আল-জিহাত আল-আ'রবা" বা চারদিক বলে অভিহিত করেছেন। এগুলো হলেঃ "ইয়া" বা উত্তর (ধ্রুবতারারও ওই একই নাম); "মাতলা” বা পূর্ব; "মাগরিব” বা পশ্চিম। "মাতলা" ও "মাগরিব" সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত থেকে গৃহীত হয়েছে। "কুতব" বলতে দক্ষিণ বোঝায়, মেরুর ওই একই নাম। কম্পাসের বিন্দুগুলো পশ্চিম দিকে উত্তর থেকে দক্ষিণে চিহ্নিত করা হয়। যে তারকা যে দিকে অস্ত যায়, সেই অনুসারেই হয় এক একটি বিন্দুর নামকরণ। পূর্বের দিকেও পর পর একই নামকরণ করে শুধু "মাতলা" কথাটি জুড়ে দেয়া হয়।

📘 ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তি ও যুদ্ধ > 📄 যুদ্ধ-লব্ধ সম্পদ: গানিমা

📄 যুদ্ধ-লব্ধ সম্পদ: গানিমা


যুদ্ধ-লব্ধ সম্পদের অর্থ ও প্রকৃতি

মুসলিম আইনে সম্পত্তির ওপর অধিকার বিস্তারের দুটি পন্থা আছেঃ "ইহরায” ও “নকল”। "ইহরায” বলতে বোঝায় প্রাকৃতিক পরিবেশে কোন জিনিস দখল করা। একে মৌলিক দখলও বলা যেতে পারে। আর "নাকল" হল সর্বজনস্বীকৃত চুক্তির মাধ্যমে বা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির হস্তান্তর। বলপূর্বক হোক আর না হোক, যুদ্ধের ফলে অমুসলিমদের কাছ থেকে ধনসম্পদ লাভ করার সাথে সাথে বণ্টনের পূর্বমূহুর্ত পর্যন্ত তার ওপর সামগ্রিকভাবে সব মুসলিম যোদ্ধার মৌলিক দখলের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। কারণ, যদিও অমুসলিমগণ এ সম্পদের অধিকারী, তবু ইসলাম গ্রহণ না করে অবিশ্বাস বজায় রাখার ফলে এবং মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হবার শাস্তি হিসেবে ধনসম্পদের ওপর তাদের দখল বরবাদ হয়ে যায়।

"গানিমা” কথাটি কেবল জোরপূর্বক অমুসলিমের কাছ থেকে অর্জিত সম্পদ সম্পর্কে প্রয়োগ করা হয়। এর মধ্যে যে কেবল স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি থাকে তা-ই নয়, যুদ্ধবন্দী বা "আসরা" এবং নারী ও শিশু বা "সাবিও” থাকে। গানিমা লাভ করতে হলে পূর্বাহ্নে শক্তি প্রয়োগ ও ইমামের অনুমতি গ্রহণ করতে হবে। কারণ, শক্তি প্রয়োগ না করে ধনসম্পদ অর্জিত হলে তা শত্রুপক্ষ থেকে অর্জিত সামগ্রিক সম্পদ (Fay) বলে গণ্য হবে। আর ইমামের অনুমতি যদি না থাকে এবং তা এক বা ততোধিক জেহাদী দ্বারা অধিকৃত সম্পত্তি হয়, তবে তাকে চুরি করা জিনিস মনে করা হয়, তা গানিমার পর্যায়ে পড়বে না। ইমামের অনুমতিই নিছক যুদ্ধকে জেহাদে রূপান্তরিত করে এবং যুদ্ধ পরিচালনা ও যুদ্ধপ্রাপ্ত ধনসম্পদ অর্জন ও দাবীদারদের মধ্যে বণ্টনের ব্যাপারে আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা করে। মুমিনদের মধ্যে যারা যুদ্ধে যোগদান করেন, গানিমা তাদেরই প্রাপ্য। যুদ্ধের শেষে যারা এসে হাজির হন, এতে তাদের কোন দাবীই নেই।

অবশ্য ধনসম্পদ দখলের পূর্বে যারা এসে উপস্থিত হন, তাদের কথা স্বতন্ত্র। খলিফা হযরত উমরের কাছ থেকে পাওয়া হযরত মুহাম্মদের (সঃ) একটি বাণী এ আইনের ভিত্তি। এ বাণীতে আছে: "জেহাদে যাঁরা শরীক হন, গানিমা কেবল তাঁদেরই প্রাপ্য।" আইনবিদগণও এ সাধারণ নিয়ম সম্পর্কে একমত প্রকাশ করেছেন। যুদ্ধে জয়লাভের পূর্বে যদি নব-প্রেরিত সেনাদল পথে থাকে, সে সব সৈন্য অথবা যদি কোন জেহাদী অসুস্থতা ও অন্যান্য বিশেষ কারণ হেতু যুদ্ধে যোগদান করতে অসমর্থ হন, তবে তাঁরাও গানিমার অংশ পেতে পারেন।' কোন কোন আইনবিদ এ সুপারিশ করেছেন। যুদ্ধ শেষ হবার আগেই যদি কোন যুদ্ধরত জেহাদীর মৃত্যু হয়, তবে তাঁর প্রাপ্য গানিমার অংশ তাঁর উত্তরাধিকারীদের প্রদান করতে হবে।

গানিমা বণ্টন

যুদ্ধ-জয়ের পর গানিমা বন্দোবস্ত করতে হবে। বিজয়ের পূর্বে গানিমা বণ্টন করা নিয়ম নয়। কারণ, যুদ্ধ-জয়ের ওপরই গানিমা লাভ করা নির্ভর করে। বিজয়ের ফলেই সম্পত্তির ওপর শত্রুদের অধিকার বিলুপ্ত হয় এবং তাদের সম্পদের ওপর মুসলমানদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে তারা এ সম্পদ বণ্টন করে দিতে পারেন। যদি মুসলমানরা যুদ্ধে জয়লাভ করেন ও যুদ্ধ চলতেই থাকে, তবে পরিপূর্ণভাবে বিজয়লাভ না করা পর্যন্ত গানিমা বেটে দেবার কাজ স্থগিত রাখতে হবে। যুদ্ধে জয়লাভ না করতে পারলে গানিমার সুষ্ঠু বণ্টন ও গানিমা সম্পর্কিত আলোচনা চালানো উচিত নয়। কারণ, এতে জেহাদীদের মনোযোগ যুদ্ধক্ষেত্রের দিক থেকে গানিমা বণ্টনের বিষয়ে নিবিষ্ট হতে পারে।

গানিমার বণ্টন-কার্য দারুল হারবে চালানো যেতে পারে অথবা দারুল ইসলামে নিয়ে গিয়েই গানিমা বণ্টন করা যেতে পারে। হানাফীপন্থীগণ দারুল হারবে গানিমা বণ্টন করার বিরোধী, যদি না বিশেষ অবস্থায় পড়ে ইমাম দারুল হারবে গানিমা বণ্টনের ব্যবস্থা করতে বাধ্য হন। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বানু মুস্তালিক, হাওয়াযিন, হোনায়েন ও খায়বারের যুদ্ধে দারুল হারবেই গানিমা বণ্টন করেন। তাঁর ব্যবস্থা অনুসরণ করে আউযায়ী দারুল হারবেই গানিমা বণ্টনের উপদেশ দিয়েছেন। আবু ইউসুফ বলেন, রাসূল আকরম (সঃ) দারুল হারবেই গানিমা বণ্টন করেছেন। কারণ, এসব যুদ্ধ-জয়ের পরই দারুল হারবের কতকগুলো অঞ্চল দারুল ইসলামের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। বদরের যুদ্ধের পর মুসলমানরা মদিনায় না পৌঁছানো পর্যন্ত তিনি গানিমা বণ্টন করেন নি। এ বিষয়ে ইমাম মালিক আউযায়ীর সঙ্গে একমত পোষণ করেন। কিন্তু শাফেয়ীপন্থীগণ বিষয়টি নির্ধারণের ভার ইমামের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। ইমাম মুসলিম রাষ্ট্রীয় স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি বিবেচনা করবেন। দারুল হারবে গানিমা বণ্টন করা যদি তিনি যুক্তিযুক্ত মনে করেন, তবে তিনি সেই হুকুমই দেবেন। আর তিনি যদি গানিমা বণ্টন স্থগিত রাখতে চান, তবে গানিমা দারুল ইসলামে নিয়ে যেতে হবে।

বদরের যুদ্ধের (খৃস্টীয় ৬২৪ সন) পূর্বে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) গানিমা বণ্টনের ব্যাপারে অনেকখানি স্বাধীনতা ভোগ করতেন। আরবীয় আচার-ব্যবহার অনুসারেই তখন তিনি গানিমা বণ্টনের ব্যবস্থা করতেন। কিন্তু এর ফলে মুসলমানদের মধ্যে গোলযোগ উপস্থিত হয়। তাই আল্লাহ-প্রদত্ত এ আইন-বিধান মারফত বিষয়টির মীমাংসা হয়:

"যখন তোমরা গানিমা লাভ কর, তখন তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য দান কর, এবং নিকট আত্মীয়, এতিম দরিদ্র ব্যক্তি ও মুসাফিরদের জন্যে রাখো" (৮:৪২)।

গানিমার এক-পঞ্চমাংশ রাষ্ট্রের প্রাপ্য। কিন্তু এ অংশ কি করে খরচ করা হবে, এ নিয়ে তীব্র মত-বিরোধের সৃষ্টি হয়। নেতৃস্থানীয় আইনবিদগণ তাঁদের মতামত এভাবে ব্যক্ত করেছেনঃ

ইবনে আব্বাস বলেন যে, এই এক পঞ্চমাংশ ছ'ভাগে ভাগ করা হত। এক ভাগ আল্লাহর জন্য (কাবা শরীফের জন্য ব্যয়িত হবে); দ্বিতীয় ভাগ রাসূলুল্লাহ'র (সঃ) জন্য; তৃতীয় ভাগ নিকট আত্মীয়-স্বজনের জন্য; চতুর্থ ভাগ এতিমের জন্য; পঞ্চম ভাগ গরীব লোকদের জন্য ও ষষ্ঠ ভাগ মুসাফিরদের জন্য বরাদ্দ করা হত। আতা ইবনে আবিরুবাহ ও আল হাসান ইবনে মুহাম্মদ বলেছেন যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এক পঞ্চমাংশের একটি অংশ পাবেন। আল্লাহর সম্পর্কে আয়াতটি অন্যান্য অংশের পূর্বসূচনা, তাই এ ভাগ গণনা করা উচিত নয়। হাম্বলী আইনবিদগণ এই একই মত পোষণ করেন।

হানাফী আইনবিদগণ অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, গানিমার এক-পঞ্চমাংশ এ তিনটি ভাগে বিভক্ত করা উচিত: একটি রসূলের (সঃ) (যা তাঁর মৃত্যুর পর খলিফার অধীনে যাবে); অন্যটি নিকট আত্মীয়-স্বজনের এবং তৃতীয়টি এতিম, গরীব লোক ও সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করে দিতে হবে।

মালিকী আইনবিদগণ যুক্তি দেখিয়েছেন যে, এক পঞ্চমাংশ গানিমা শত্রুপক্ষ থেকে উদ্ধার করা সামগ্রিক সম্পত্তিরূপে বিবেচিত হবে; অর্থাৎ তা মুসলিম সমাজভুক্ত গরীব ও ধনীর মধ্যে ন্যায়সঙ্গতভাবে বেটে দিতে হবে। ইমাম মালিক আরও বলেন যে, যদি ইমাম ইচ্ছা করেন, তবে তাঁর অংশ নবী করীমের (সঃ) আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যেও বণ্টন করে দিতে পারেন।

শাফেয়ী আইনবিদগণ বলেন যে, এক পঞ্চমাংশ গানিমা আল-কোরআনের বিধান অনুসারে পাঁচভাগে ভাগ করতে হবে। আল্লাহ ও রাসূল এর একভাগ পাবেন।

হযরত মুহাম্মদের (সঃ) ওফাতের পর আল্লাহ ও রাসূলের (সঃ) অংশ সম্পর্কে মতবিরোধ দেখা দেয়। এক মত অনুসারে এভাগ অন্যান্য সবার মধ্যে বেটে দিতে হবে। আবার অন্যান্য আইনবিদ বলেন, এ ভাগ ইমামকে দিতে হবে। আবার কেউ কেউ বলেন, যুদ্ধের প্রস্তুতির কাজে এ অংশের সদ্ব্যবহার করতে হবে।

নিকট আত্মীয় কথাটি নিয়েও তখন মতবিরোধ দেখা দেয়। কোন কোন আইনবেত্তা নিকট আত্মীয় বলতে বানু হাশিম গোত্র বুঝেছেন। আবার অন্যান্য আইনবিদ বানু হাশিম ও বানু আবদুল মুত্তালিবকে নিকট আত্মীয়ের পর্যায়ে এনেছেন।

পাঁচভাগের একভাগ পুরুষ ও সাবালক যুদ্ধরত জেহাদীদের মধ্যে বণ্টন করে দিতে হবে। আউযায়ী বলেছেন, মহিলা এবং শিশুদেরও গানিমার অংশ দিতে হবে। কিন্তু অন্যান্য আইনবিদ এর বিরোধিতা করেছেন। ইবনে হাম্বল তাদের কিছু অংশ দিতে চান। কিন্তু তা পুরুষের অংশের চাইতে কম হবে।

বিভিন্ন আইনের মযহাব হিসেবে গানিমার চারভাগ বিভিন্ন উপায়ে বণ্টন করতে হবে। ইমাম মালিক ও শাফেয়ী বলেন, তিনভাগ অশ্বারোহী সৈন্যকে দিতে হবে (দু'ভাগে অশ্বের জন্য ও একভাগ অশ্বারোহীর জন্য) এবং একভাগ পদাতিক সৈন্যরা পাবেন। ইমাম ইবনে হাম্বল ও ইমাম মালিক ইমাম শাফেয়ীর সঙ্গে একমত প্রকাশ করেছেন। ইমাম আবু হানিফা দু'ভাগ অশ্বরোহীকে দিয়েছেন (একভাগ অশ্বের জন্য ও অপর ভাগ অশ্বারোহীর জন্য)। তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে, পশুকে মানুষের চাইতে বেশী দেয়া যুক্তিযুক্ত নয়। পদাতিক সৈন্যকে তিনি এক অংশ দিয়েছেন। ইমাম আবু হানিফার সুবিখ্যাত শিষ্য আবু ইউসুফ তাঁর ওস্তাদের সঙ্গে একমত হতে পারেন নি। তিনি অশ্বারোহীকে তিনভাগ দিয়েছেন। ইমাম আবু হানিফা ও শায়েবানীর মতে, যদি অশ্বারোহী একাধিক অশ্ব এনে থাকেন, সে ক্ষেত্রেও তিনি আর বেশী অংশ পাবেন না। আবু ইউসুফ ও ইমাম ইবনে হাম্বল ঊর্ধ্বপক্ষে দুটি অশ্ব পর্যন্ত গানিমার অংশ দিতে চেয়েছেন। এছাড়া পদাতিক সৈন্যরাই কেবল অংশ পেতে পারবেন। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে অশ্ব ভিন্ন অন্যান্য পশু যারা আনবেন, তারা কোন অংশ পাবেন না।

ইমাম অবশ্য গানিমার বিশেষ অংশ দেবার জন্য যুদ্ধ-জয়ের পূর্বে কিংবা যুদ্ধ শুরু হবার পূর্বে প্রতিশ্রুতি দান করতে পারেন। আইনের ভাষায় বলতে গেলে, ইমামের "তানফীলে"র ক্ষমতা রয়েছে, যার বদৌলতে তিনি প্রয়োজন মনে করলে জেহাদীদের অংশ বাড়িয়ে দিতে পারেন।

ইমাম বৈধ অধিকার অনুযায়ী অমুসলমানদের হত্যা করে তাদের সম্পত্তি অধিকার করার অনুমতি জেহাদীদের দিতে পারেন। এ ক্ষমতা প্রয়োগ করার ব্যাপারে অবশ্য মতবিরোধ রয়েছে। ইমাম মালিক বলেন, ইমাম যদি তাঁর "তানফীল" ক্ষমতার মারফত বিজয়ী জেহাদীকে ধন-সম্পদ অধিকার করার অনুমতি না দেন, তবে তিনি তা দখল করতে পারবেন না। বাস্তুত্যাগী অমুসলিমদের পরিত্যক্ত সম্পত্তি যদি আত্মসাৎ করা না হয়, তবে ইমাম শাফেয়ী বিজয়ী জেহাদীদের শত্রুপক্ষের ধন-সম্পদ দখল করার অনুমতি দেন। আর কোন কোন আইনবিদ বলেন যে, গানিমা বন্টনের সাধারণ নিয়ম অনুসারেও যুদ্ধ-লব্ধ ধন-সম্পদ বেটে দেয়া যেতে পারে।

পরিশেষে, বিশ্বাসীদের ধন-সম্পদ যখন আবার অমুসলিমদের কবল থেকে উদ্ধার করা হয়, তার কথা ধরা যাক।

প্রথমতঃ, হযরত আলীর (রঃ) মতামতের উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি বলেন এ সম্পত্তি গানিমার অংশ বলে বিবেচিত হবে।

দ্বিতীয়তঃ, ইমাম শাফেয়ী বলেন যে, এ সম্পত্তি মালিককে ফিরিয়ে দিতে হবে।

তৃতীয়তঃ, যদি উদ্ধারকৃত সম্পদ গানিমা হিসেবে বিভক্ত হবার পর সাবেক মালিক কর্তৃক দাবী করা হয়, তবে তাতে তার আর কোন অধিকার নেই। তবে বণ্টন করার পূর্বে যদি তিনি দাবী পেশ করতে পারেন, তবে তিনি তার সম্পদ ফিরে পেতে পারেন।

চতুর্থতঃ, যদি উদ্ধারকৃত সম্পদ শক্তি-বলে অমুসলিমরা ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে থাকে, তবে সাবেক মালিক এ সম্পদ বন্টনের পূর্বে ফেরত পেতে পারেন। তবে যদি অমুসলিমগণ এ মাল বিনা শক্তি প্রয়োগে ছিনিয়ে নিয়ে থাকে, তবে সাবেক মালিক গানিমা বণ্টনের পূর্বে বা পরে ফেরত পেতে পারবেন।

স্থাবর সম্পত্তি

শক্তি-বলে যখন অস্থাবর সম্পত্তির মত স্থাবর সম্পত্তিও অধিকার করা হয়, তখন তা গানিমার অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে। অস্থাবর সম্পত্তির বণ্টন খুব বেশী সমস্যার সৃষ্টি করে নি। কিন্তু স্থাবর সম্পদের বণ্টন ও মালিকানা বিভিন্ন জটিল সমস্যার সৃষ্টি করে। বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন ভাবে বিশেষ আইন মারফত এ সমস্যার সমাধান করা হয়। বিভিন্ন মযহাবে এ সম্বন্ধে নানাপ্রকার মত রয়েছে। হযরত মুহাম্মদের (সঃ) জীবদ্দশায় জেহাদীদের মধ্যে জমি বণ্টন থেকে শুরু করে সম্পত্তিতে রাষ্ট্রীয় অধিকার পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকার নিয়ম প্রবর্তিত হয়। কিন্তু হযরত উমরের (রাঃ) জমি সম্বন্ধীয় নির্দেশের পূর্বে এ সম্পর্কে কোন বাঁধা-ধরা নিয়ম ছিল না। সামরিক কারণে হযরত উমর নেতৃস্থানীয় মুসলমানদের সঙ্গে পরামর্শ করে স্থির করেন যে, জমি থেকে তার মালিককে বঞ্চিত করা ও তাদের অপসারণ করা চলবে না। তবে তাদের খারাজ বা ভূমি-রাজস্ব এবং জিযিয়া দিতে হবে। এ শুল্ক থেকে পাওয়া অর্থ বিশ্বাসীদের ভরণপোষণের কাজে ব্যয়িত হবে। মুসলমানগণ যেমন কৃষিকার্যে নিযুক্ত হতে চাইতেন না, তেমনি তাদের এ বৃত্তি গ্রহণ করতে অনুমতিও দেয়া হত না। এ নিয়ম প্রথম সাওয়াত নামক ভূ-খণ্ডের ওপর (দক্ষিণ মেসোপটেমিয়া বা ইরাক) বলবৎ করা হয়। পরে গানিমার অংশ হিসেবে নতুন জমি অধিকৃত হলে সেখানেও মৌলিকভাবে এ নিয়মই প্রযোজ্য হতে থাকে। জমির তত্ত্বাবধায়কের ইসলাম গ্রহণ বা মুসলমানের কাছে জমি বিক্রয়ের ফলে সাবেক কৃষকের কাছ থেকে জমি হস্তান্তর অনুমোদিত হয় নি। তবু ইমাম মাঝে মাঝে বিশেষ অবস্থায় এ অনুমতি প্রদান করেছেন।

অধিকাংশ লোকের ইসলাম গ্রহণ এবং জমি হস্তান্তর বৈধ বলে গণ্য হবার ফলে আইনবিদগণ বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করেন ও বিভিন্ন মযহাবের লোকের বিভিন্ন মত পেশ করেন। হাম্বলী আইনবিদগণ বলেন যে, ইমাম ইচ্ছা করলে স্বচ্ছন্দে জমি জেহাদীদের মধ্যে বেটে দিতে পারেন কিংবা জমিকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বলে মনে করতে পারেন। আবার জমির মালিকদের জমি যে অবস্থায় আছে, তিনি সে অবস্থাতেও রেখে দিতে পারেন। এ জন্যে তাদের অবশ্য খারাজ দিতে হবে। ইমাম আবু হানিফা খায়বারের নজির দেখিয়ে বলেন যে, রাসূলে আকরম (সঃ) এ স্থানের জমি অংশতঃ বণ্টন করে দেন ও বাকীটুকু রাষ্ট্রায়ত্ত করেন। ইমাম মালিক সব স্থাবর সম্পত্তিকে রাষ্ট্রের অধীনে সামগ্রিক সম্পদ হিসেবে এবং জমির ফসলের অংশকে সরকারী আয়ের অংশ হিসেবে গণ্য করেছেন। মালিক আইনবিদদের মতে, জমি কখনই বণ্টন করে দেয়া চলবে না। শাফেয়ী আইনবিদগণ সাধারণ-নীতি অনুসরণ করে অন্যান্য সম্পদের মত জমিকেও বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করেছেন এবং জেহাদীদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া যাবে বলে সাব্যস্ত করেছেন। অবশ্য জেহাদীরা যদি এ জমি গ্রহণ করতে অসম্মত হন, তবে তা সামগ্রিক সম্পদে পরিণত হয়।

যুদ্ধ-বন্দী

যুদ্ধ-বন্দীদের 'গানিমার' অংশ হিসেবে গণ্য করার রীতি খুবই প্রাচীন এবং পুরাকাল থেকেই এ প্রথা চলে আসছে। পারসিকগণ যুদ্ধ-বন্দীদের প্রতি অমানুষিক ও নিষ্ঠুর ব্যবহার করত। বন্দীদের অন্ধ করে দেয়া হত, শারীরিক কষ্ট দেয়া হত, মেরে ফেলা হত কিংবা ক্রুশে বিদ্ধ করে হত্যা করা হত। ইহুদীদের রীতি পারসিকদের চাইতেও কম নৃশংস ছিল না। যুদ্ধ-বন্দীদের গানিমার অংশ হিসেবে গণ্য করে মুসলমানেরা তাদের প্রতি যে ব্যবহার করতেন, তা পূর্ববর্তীদের চাইতে কম কঠোর ছিল না। যুদ্ধ-বন্দীদের সম্পর্কে আইন আল-কোরআনের এ নির্দেশের মধ্যে পাওয়া যায় :

"লোক-ক্ষয়ী যুদ্ধ ব্যতিরেকে কোন নবীর পক্ষেই যুদ্ধ-বন্দী লাভ করা সম্ভব হয় নি" (৮ঃ ৬৮)।

"তাই, যখন তোমরা যুদ্ধে অবিশ্বাসীদের মোকাবেলা কর, তখন তাদের রেহাই দিও না; তাদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার পর চুক্তির শর্ত কঠোরভাবে স্থির কর। অতঃপর যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে সুযোগ-সুবিধা প্রদান কর অথবা ছেড়ে দাও” (৪৭:৪-৫)।

যুদ্ধ-বন্দীদের প্রতি ব্যবহার সম্পর্কে বিভিন্ন আইনপন্থীদের মধ্যে নানামতের সৃষ্টি হয়েছে। আইনবিদরা এ চারটি পন্থার যে কোন একটি অনুসরণ করতে ইমামকে পরামর্শ দিয়েছেন:

প্রথমতঃ, ইমাম যুদ্ধ-বন্দীদের সবাইকে বা কিছুসংখ্যককে মেরে ফেলার হুকুম দিতে পারেন। আবু ইউসুফ ও ইমাম শাফেয়ী বলেন যে, বিশেষ কারণ ভিন্ন হত্যা করা উচিত নয়। শত্রুপক্ষকে দুর্বল করে দেবার জন্য বা বৃহত্তর মুসলিম স্বার্থের খাতিরে এ নীতির প্রয়োজন হতেও পারে। আউযায়ী বলেন যে, যুদ্ধ-বন্দীকে হত্যার পূর্বে মৃত্যুদণ্ডের বিকল্প প্রস্তাব হিসেবে তাকে ইসলাম গ্রহণের সুযোগ দেয়া উচিত।

দ্বিতীয়তঃ, তিনি আল-কোরআনের নির্দেশানুযায়ী "ফিদা” (যুদ্ধ-বন্দীদের মুক্ত করার জন্য ক্ষতিপূরণ) গ্রহণ করে তাদের মুক্ত করে দিতে পারেন; অথবা ক্ষতিপূরণ ব্যতিরেকেও তাদের ছেড়ে দিতে পারেন। খলিফা হযরত আবু বকর (রাঃ) ফিদা নিয়ে মুক্ত করার বিরোধী ছিলেন।

তৃতীয়তঃ, তিনি মুসলিম যুদ্ধ-বন্দীদের সঙ্গে এসব বন্দীদের বিনিময় করতে পারেন। খলিফা হযরত উমর (রাঃ) মুসলিম যুদ্ধ-বন্দীদের মুক্ত করার ওপর বিশেষ জোর দেন। তাঁর মতে, এজন্য গানিমা থেকেও অর্থ ব্যয় করা যেতে পারে কিংবা বায়তুল মাল থেকে টাকা দিয়ে তাদের মুক্ত করা যেতে পারে। ইমাম মালিক বলেন যে, যুদ্ধ-বন্দীদের যদি দাসে পরিণত করা না হয়, তবে হয় তাদের হত্যা করতে হবে নতুবা মুসলিম যুদ্ধ-বন্দীদের সঙ্গে বিনিময় করতে হবে। আব্বাসীয় আমলে এটাই সাধারণ নীতি হয়ে দাঁড়ায় এবং চুক্তি মারফত বিষয়টি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হয়।

চতুর্থতঃ, ইমাম যুদ্ধ-বন্দীদের দাসে পরিণত করতে পারেন। দাসদের প্রতি ব্যবহার সম্পর্কে পরবর্তী অংশে আলোচনা করা হবে।

যুদ্ধ-বন্দী হিসেবে সুবিখ্যাত পারসিক সেনাপতি আল হারমুযানের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ইনি প্রথম ইরাক অভিযানে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। হারমুযান খৃস্টীয় ৬৪০ সনে বন্দী হন এবং তাঁকে মদিনায় প্রেরণ করা হয়। খলিফা হযরত উমর (রাঃ) তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার মনস্থ করেন। হারমুযানকে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, তিনি মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। আল-হারমুযান জবাব দেন (মুগীরা ইবনে শূবা দোভাষী ছিলেন):

'প্রাক-ইসলামী যুগে আল্লাহ নিরপেক্ষ ছিলেন এবং আমাদের যুদ্ধ করার সুযোগ দান করেন। আর এভাবেই আমরা আপনাদের ওপর জয়ী হই।'

হযরত উমর (রাঃ) বললেন: 'না। এর কারণ হল, আপনারা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন, আর আমরা তা ছিলাম না। এখন বলুন, আপনি কেন শান্তির ওয়াদা পালন করেন নি?' হারমুযান জবাব দিলেন: 'আমার ভয় হয়, আপনি আমার কথা শেষ হবার পূর্বেই আমাকে হত্যা করবেন'।

তৃষ্ণায় প্রায় অচৈতন্য অবস্থায় তিনি পানি চাইলেন। খলিফা বললেন: 'তাকে শান্তিতে পানি পান করতে দাও'।

বন্দী বললেন: 'না, আমার ভয় হয়, কেউ আমাকে অজান্তে হত্যা করবে।'

'হযরত উমর (রাঃ) বললেন: 'পানি পান না করা পর্যন্ত আপনার জীবন নিরাপদ।'

হারমুযান ভাবলেন, তিনি জয়ী হয়েছেন। তাই তিনি পানি মাটিতে ফেলে দিলেন। খলিফা আর এক পেয়ালা পানি আনতে বললেন। কিন্তু হারমুযান বললেন যে, তাঁর আর পানির দরকার নেই। 'আমি পানি চাই নি, চেয়েছি নিরাপত্তা (আমান)। আর তা ত' আপনি আমাকে দান করেছেন।

হযরত উমর বললেন: 'মিথ্যাবাদি! আমি তোমাকে হত্যা করব।' খলিফার পারিষদগণ বাধা দিয়ে বললেন যে, তাঁকে ত' ইতিমধ্যেই আমান দেয়া হয়ে গেছে। তখন খলিফা তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দানের আইনগত পন্থা খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু কোন কিছুই খুঁজে পেলেন না। তাই তাঁকে ক্ষান্ত হতে হল। তিনি বললেন: 'লোকটা আমায় ঠকিয়েছে। কিন্তু আমি ত সে লোকের জীবন বাঁচাতে পারি না, যে ব্যক্তি বার বার বিশ্বাসঘাতকতা করে অতগুলো বিশ্বাসীকে হত্যা করেছে। আমি প্রতিজ্ঞা করছি, যে পর্যন্ত আপনি ইসলাম গ্রহণ না করেন, সে পর্যন্ত আপনি প্রতারণা দ্বারা বিশেষ সুবিধা করতে পারবেন না।' তৎক্ষণাৎ সেখানেই আল-হারমুযান ইসলাম কবুল করলেন। অতঃপর স্বাধীনভাবে তিনি মদিনায় বসবাস করতে থাকেন এবং বায়তুল মাল থেকে একটি বৃত্তি লাভ করেন।

আইনজ্ঞগণ এ সম্বন্ধে একমত যে, সাবীকে হত্যা করা যাবে না। এর মধ্যে অনেক মহিলা ও শিশু থাকে। তাদের দাসে পরিণত করে বণ্টন করে দিতে হবে। কোন কোন মহিলা ও শিশুকে মৃত্যুদণ্ড দান করা হয়। কিন্তু রাসূল করীম হযরত মুহাম্মদ (সঃ) মহিলা ও শিশু হত্যার বিরুদ্ধে সাবধান বাণী উচ্চারণ করেন। সাবীদের বিনিময়ে মুসলিম বন্দীদের মুক্ত করার রীতি তিনিই প্রবর্তন করেন।

শত্রুপক্ষ কর্তৃক ধৃত মুসলিম বন্দীগণ শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করবেন না এবং তাদের হুকুম তামিল করবেন না। যদি তারা পালিয়ে যেতে পারেন কিংবা শত্রুপক্ষের ধন-সম্পদ বিনষ্ট করতে পারেন, তবে তা করবেন। যদি মুসলিম বন্দীগণ পালিয়ে না যাবার ওয়াদা দিয়ে থাকেন, তবে তিনি তা যথাযোগ্যভাবে পালন করবেন। মুসলিম বন্দীগণ কখনও শত্রুপক্ষকে মুসলমানদের প্রয়োজনীয় খবরাখবর দিবেন না। এটাই তাদের কর্তব্য। তারা ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও শরীক হবেন না ও ধর্ম পরিত্যাগ করতে পারবেন না। অবশ্য জোরপূর্বক যদি তাদের ধর্ম পরিত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়, তবে সে কথা স্বতন্ত্র। যদি কোন মুসলিম মহিলা শত্রু-হস্তে বন্দী হন, তবে তাঁকে প্রহার করলেও তিনি তাদের কোন দাবী দাওয়া মেনে নেবেন না। তাঁর জীবন বিপন্ন হলে অবশ্য অন্য কথা। ইমাম লোক বা সম্পত্তি বিনিময়ের দ্বারা বন্দীদের মুক্ত করার বন্দোবস্ত করবেন।

দাসদের অবস্থা

যুদ্ধে পরাজিত শত্রুকে দাসে পরিণত করার রীতি খুবই প্রাচীন। পুরাকালে প্রাচ্যে এ নীতি প্রচলিত ছিল। অধিকাংশ দাসই ছিল বিদেশী। অবশ্য আরবীয় দাস যে একেবারে ছিল না, তা নয়। এরা ক্ষতিপূরণ দিয়ে নিজেদের মুক্ত করতে পারত। ইসলামী আইনের ভিত্তি ছিল, আরবীয় আচার-বিধি। তাই এ আইন দাস প্রথাকে স্বীকার করেই নিয়েছিল। কিন্তু ইসলামী আইন ও ধর্মের চুলচেরা বিচারে দেখা যায় যে, ইসলাম দাসদের নৈতিক মান উন্নত করেছে এবং তাদের সামনে মুক্তির বিপুল সম্ভাবনা এনে দিয়েছে। পুণ্যবান মুসলিমকে দাসমুক্ত করতে উপদেশ দেয়া হয়েছে। আর দাস- মুক্তির ফলে বেহেশতে তাঁদের জন্য রয়েছে অপরিমিত নেয়ামত। যাই হোক, তবুও দাস প্রথা উনবিংশ শতাব্দীতে বিলুপ্ত হওয়া অবধি আংশিকভাবে মুসলিম সমাজে প্রচলিত ছিল।

ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে বা যুদ্ধে অর্জিত গানিমা হিসাবে দাসদের ওপর কর্তৃত্ব ব্যাপিত হত। গানিমার মারফতই মুসলিম যুদ্ধ আইনে দাস প্রথা নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে। ক্রয়-বিক্রয় আমাদের বর্তমান আলোচ্য বিষয় নয়। কারণ, তা বিক্রয়ের আইনের মধ্যে পড়ে। শত্রুপক্ষের পরাজয়ের পর ইমাম যদি বিজিত এলাকার সমগ্র অধিবাসীকে দাসে পরিণত করতে পারেন, তবে জেহাদীদের মধ্যে গানিমা হিসেবে তাদের বণ্টন করে দিতে পারেন। যখন বিজিত এলাকার অধিবাসীগণ ইসলাম গ্রহণ করে না এবং তাদের জমিজমা বহাল রেখে তাদের কাছ থেকে খারাজ আদায় করতেও ইমাম রাজী হন না, তখনই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যারা দাস গ্রহণ করেন, তারা দাসদের নিজের সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করতে পারেন। আইনের এরূপ ব্যাখ্যাই দেয়া হয়েছে। কিন্তু নৈতিক দিক থেকে মুসলমানদের অভিমত এই যে, দাসদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে হবে এবং করুণা প্রদর্শন করতে হবে। গানিমা বণ্টনের ব্যাপারে মহিলাকে তার স্বামীর কাছ থেকে এবং শিশুদের তাদের মাতা-পিতার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা চলবে না।

সাধারণতঃ আরবদের দাসে পরিণত কর হত না। কিন্তু রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ও খলিফা আবু বকরের (রাঃ) আমলে কিছু কিছু আরবকে দাসে পরিণত করা হয়। রাসূল (সঃ) বানু মুসতালিক গোত্রের আরবদের দাস করে নেন। কিন্তু যখন তিনি এ গোত্রের জুবাইরিয়া নাম্নী সুন্দরী মহিলাকে বিবাহ করেন, তখন তিনি এদের একশো জনকে মুক্ত করার আদেশ দেন। হাওয়াযিন গোষ্ঠীর কয়েক হাজার ব্যক্তিকে তিনি দাস করে নেন। কিন্তু আত্মীয়তা ও দাবী-দাওয়া পেশ করার দরুন তিনি ছ'হাজার দাস মুক্ত করে দেন। খলিফা আবু বকর (রাঃ) বানু নাজিরার লোকদের দাস করে নেন। খলিফা উমর (রাঃ) কিন্তু আরবদের দাসে পরিণত করার ঘোর বিরোধী ছিলেন। বার বার তাঁর বাণী উল্লিখিত হয়েছে, 'আরবদের ওপর মালিক হওয়া (অর্থাৎ তাদের দাসে পরিণত করা) চলবে না'। সিরিয়া ও ইরাকের অধিকৃত অঞ্চলের অধিবাসীদের কৃষিকার্যে নিযুক্ত রেখে তিনি খারাজ গ্রহণ করতেন; এতেই তিনি অধিক উৎসাহী ছিলেন।

মুসলমানদের দাস প্রথার সঙ্গে দাসমুক্তি অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত ছিল। প্রভুর কাছ থেকে দাস বিশেষ সুযোগের ভিত্তিতে বা ক্ষতিপূরণ দিয়ে মুক্তি লাভ করতে পারত। ইহকাল ও পরকালের কল্যাণের তাগিদে আল-কোরআন ও হাদিসে দাসমুক্ত করতে আহ্বান করা হয়েছে। কাজেই মুসলিম সমাজে দাসদের স্বায়ীভাবে দাসত্বের নিগড়ে বন্দী করা হত না। দাস জীবদ্দশায়ই মুক্তির ভরসা পেত। মনে রাখতে হবে যে, ইসলামী জগতের বাইরে দাস প্রথার রীতি নীতি তখনকার দিনে অনেক বেশী কঠোর ও অনমনীয় ছিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00