📘 ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তি ও যুদ্ধ > 📄 মুসলিম আন্তর্জাতিক আইন

📄 মুসলিম আন্তর্জাতিক আইন


মানবজাতির ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, বহিঃশত্রুদের আক্রমণের ভয় না থাকলে একটি সভ্যতার মধ্যে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থা ও জাতির সমন্বয় গড়ে ওঠে। এসব জাতির পরস্পর সম্পর্ক নির্ণয়ে আচার-ব্যবহারের ভূমিকা সব চাইতে বেশী গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে রয়েছে। গোটা জাতি একই কর্তৃত্ব বা আইন দ্বারা শাসিত হয়, এমন দৃষ্টান্ত বিরল। সহজেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রাচীন নিকট-প্রাচ্য, গ্রীস, রোম, চীন, ইসলাম জগত ও পাশ্চাত্য খৃস্টান রাষ্ট্র গোষ্ঠী; প্রত্যেক দেশে বা অঞ্চলে এক একটা করে স্বতন্ত্র সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। শান্তির সময়ে অথবা যুদ্ধকালে একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে অপর রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কতকগুলো নিয়ম-কানুন ও ব্যবহার-বিধি গড়ে ওঠে। ব্যারন করফ বলেন, পাশাপাশি বাস করার ফলে নৈতিক ও আইনগত বিধি-নিষেধ গড়ে ওঠে। কালক্রমে এগুলো আন্তর্জাতিক আইনের বিধানে রূপান্তরিত হয়। এমনকি, প্রাচীন জাতিদের মধ্যেও দেখা যায় যে, এই আইন ছিল তাদের আচার-ব্যবহারেরই অংশ বিশেষ। সভ্য জাতিদের মধ্যে পরবর্তীকালে এগুলো সুসংবদ্ধ আইন হিসেবে বিবর্তিত হয়েছে। মতেসক্যু বলেছেন, সব জাতির মধ্যে, এমন কি ইরকোয়দের (উত্তর-পশ্চিম আমেরিকার আদিম জাতি) মধ্যেও আন্তর্জাতিক আইনের বিধান বহাল ছিল। কিন্তু এরা খুব সভ্য ছিল না; যুদ্ধবন্দীদের গোশত খাওয়ার রীতি এদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। সে যুগে সংঘর্ষ ও অরাজকতার রাজত্ব ছিল। তবু একথা তারা খুব স্পষ্টরূপে বুঝতে পারল যে, সার্বিক কল্যাণের দিক থেকে যুদ্ধবন্দী বিনিময়ের মত ব্যবস্থা এবং প্রতিহিংসা থেকে অব্যাহতি পাবার তাগিদে কতকগুলো নিবৃত্তিমূলক বিধি অনেক বেশী ফলপ্রসূ হবে। পাশাপাশি বসবাসের ফলে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে যখন মাত্র গুটিকয়েক আইনের প্রয়োজন থাকে, তখনই কয়েকটি জাতি নিয়ে এক বৃহত্তর সামাজিক সংস্থা গড়ে ওঠতে পারে।
অতীত যুগে আন্তর্জাতিক আইন আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের মত বিশ্বব্যাপী বা সর্বজনীন ছিল না। কারণ, তখন আন্তর্জাতিক আইনের কাজ ছিল একটি বিশেষ এলাকার ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থা ও জাতিগুলোর পরস্পর সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ আইন কেবলমাত্র একটি সভ্যতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তাছাড়া, আধুনিক আন্তর্জাতিক আইন ও প্রাচীন আন্তর্জাতিক আইনের মধ্যে আর একটি পার্থক্য হল এই যে, প্রাচীন আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্র ছিল খুবই সংকীর্ণ ও সীমাবদ্ধ। কারণ, এ আইন-বিধান পৃথিবীর জাতিগুলোর মধ্যে আইনের ব্যাপারে পারস্পরিক সাম্য মেনে নেয় নি। কিন্তু বিভিন্ন জাতির আইনগত সাম্য আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি রচনা করেছে। তাই তখন বিভিন্ন জাতির আন্তর্জাতিক আইন সুসংবদ্ধ ও একত্রিত করে একটি স্বয়ং সম্পূর্ণ আইন-ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। অবশ্য এক আইন বিধান অপর আইন থেকে অবাধে প্রচুর মালমশলা সংগ্রহ করেছে। তবু তা হয়ত বা অস্বীকৃত রয়ে গেছে। কারণ, প্রত্যেকটি আইন-ব্যবস্থাই শ্রেষ্ঠত্ব দাবী করে এসেছে। একটি সভ্যতার অবলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই তার আইন-ব্যবস্থারও বিলুপ্তি ঘটেছে। কারণ, একটি সভ্যতার কল্যাণে তার আইন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। বেন্থামই প্রথম "আন্তর্জাতিক আইন" কথাটির প্রবর্তন করেছিলেন। "আন্তর্জাতিক আইন” কথাটিই "জাতিসমূহের আইনের" চাইতে বেশী প্রচলিত হয়ে গেছে। "জাতিসমূহের আইন" কথাটি কিন্তু অধিক সুদূরপ্রসারী এবং বিচিত্র সমাজব্যবস্থায় একে প্রয়োগ করা চলে। বর্তমান গ্রন্থে "জাতিসমূহের আইন" কথাটিই ব্যবহার করা যাক।
ইসলামের মিশন ও অন্যান্য জাতির প্রতি ইসলামের মিশন স্বতঃই অন্যান্য অমুসলিম দেশের সঙ্গে এবং ইসলামী রাষ্ট্রের অমুসলিম ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়ায়। ইসলামের শেষ লক্ষ্য হল সমগ্র দুনিয়ার সমাজকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করা। কিন্তু সব জাতিকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করা সম্ভব হয় নি। অনেকগুলো অমুসলিম গোষ্ঠী রয়ে গেল; যুগে যুগে এদের সঙ্গে ইসলামী রাষ্ট্রকে বোঝাপড়া করতে হয়েছে।
মুসলিম আন্তর্জাতিক আইনের প্রকৃতি অন্যান্য আইন বিধান থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ছিল। এ আইনকে আইনের সাময়িক বিধি-ব্যবস্থা বলে মনে করা হত। কিতাবিগণ (খৃস্টান, ইহুদী প্রভৃতি) ছাড়া অন্য সব জাতি যতদিন পর্যন্ত মুসলমান না হন, কেবলমাত্র ততদিন পর্যন্তই এ আইন বলবৎ থাকবে। কাজেই ইসলামের মিশন যদি সফল হয়, তবে ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে অন্যান্য অমুসলিম রাষ্ট্রের সম্পর্ক নির্ণয়ের আর প্রয়োজন হবে না। ইসলামের বিস্তৃতি একসময়ে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে; সুতরাং যতদিন পর্যন্ত অমুসলমানদের সঙ্গে মুসলমানকে বাস করতে হবে, ততদিন মুসলিম অমুসলিম সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কতকগুলো আইনের প্রয়োজন রয়েছে।
কয়েকটি জাতি নিয়ে একটি জাতিপুঞ্জের অস্তিত্ব আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত হয়েছে। এক একটি জাতির সম্পূর্ণ সার্বভৌম ক্ষমতা ও সমমর্যাদাও স্বতঃসিদ্ধ বলে ধরে নেয়া হয়েছে। মুসলিম আন্তর্জাতিক আইন কিন্তু মুসলিম জাতি ছাড়া আর কোন জাতিকে স্বীকার করে না। কারণ, ইসলামের মূল উদ্দেশ্য হল, সমগ্র দুনিয়াকে একই ইমামের অধীনে এবং একই আইন ও ধর্মের আওতায় আনা। প্রাচীন রোম ও মধ্যযুগীয় খৃস্টান রাষ্ট্রের আইন-ব্যবস্থার মতোই মুসলিম আন্তর্জাতিক আইন সার্বজনীন রাষ্ট্রের প্রত্যয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। আল্লাহ-প্রদত্ত সার্বজনীন আদর্শ ব্যবস্থা হিসেবে খৃস্টান রাষ্ট্র ও ইসলামী রাষ্ট্র উভয়ই একথা ধরে নিয়েছিল যে, সব মানুষ একই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এ গোষ্ঠী এক আইন দ্বারা পরিচালিত ও একই শাসকের কর্তৃত্বাধীনে থাকবে। সমগ্র মানবজাতির মধ্যে ধর্মপ্রচার করাই ছিল এর লক্ষ্য। গোষ্ঠীর রাজনৈতিক, নৈতিক ও ধর্মীয় স্বার্থের ওপরেই এর ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ নির্ভর করত; পারস্পরিক সম্বলিত ও সুযোগ সুবিধা এ আইনের পেছনে খুব বেশী কাজ করে নি।
তাছাড়া মুসলিম আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য হত ব্যক্তির ওপর। আঞ্চলিক গোষ্ঠীর ওপর এ আইন প্রয়োগ করা চলত না। কারণ, প্রাচীনকালের আইন বিধানগুলোর মত ইসলামী আইন-ব্যবস্থা স্থান-কেন্দ্রিক ছিল না; এ ছিল একান্তরূপেই ব্যক্তি-কেন্দ্রিক। যে দেশের অধিবাসীই হোক না কেন, ব্যক্তি বা গোষ্ঠী হিসেবে সব মুসলমানের ওপর এ আইন মেনে চলা বাধ্যতামূলক ব্যাপার। আধুনিক যুগে বস্তুগত সভ্যতা ও সংস্কৃতির চাপে আইন বিধানকে গোষ্ঠীগতভাবে প্রযুক্ত না করে, একে স্থান-নির্ভর করে আনবার রীতি চালু হয়েছে। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায় যে, সার্বজনীন ধর্ম হিসেবে ইসলাম তার আদর্শের প্রতি আনুগত্যকেই সবচাইতে বেশী মর্যাদা দিয়েছে। এ ব্যাপারে কোন বিশেষ রাষ্ট্রীয় সীমানা স্বীকার করা হয় নি। ইসলামী জীবন-দর্শন অনুযায়ী সাধুতা ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্যই ছিল সুষ্ঠু নাগরিকত্বের মাপকাঠি। জাতি, শ্রেণী বা মাতৃভূমির প্রতি আনুগত্যের কোন মূল্য নেই। আইনের ব্যক্তিগত ভিত্তিটা মুসলিম আইনবেত্তাগণ কোনদিনই বাদ দেন নি। এ আইন প্রযোজ্য ছিল ব্যক্তির ওপরে। আধুনিক গোষ্ঠীর ওপর এ আইন প্রয়োগ করা হত না।
পরিশেষে একথাও মনে রাখা উচিত যে, মুসলিম আন্তর্জাতিক আইন কোন স্বয়ংসম্পূর্ণ আইন নয়। ইসলামী জগতের ভেতরে-বাইরে মুসলিম অমুসলিমের সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে আইনের সম্প্রসারণ করেই আন্তর্জাতিক আইনের জন্ম হয়েছে। সূক্ষ্ম বিচারে ধরা পড়বে যে, মুসলিম আন্তর্জাতিক আইনে জাতীয় আইন ও আন্তর্জাতিক আইনের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। উৎস বা সমর্থন (Sanction)-এর ব্যাপারেও কোন বিভিন্নতা নেই। হযরত মূসা (আঃ) কর্তৃক প্রবর্তিত আইনের ওপর প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন ইহুদী আইন-বিধান ও মুসলিম আন্তর্জাতিক আইন প্রাণবস্তুতে প্রায় একই জিনিস। ইহুদী জাতি ও অইহুদী জাতিদের মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয়ে এ আইন বলবৎ ছিল। প্রাথমিক যুগে মুসলমান আইনবিদগণ 'জিহাদে' যুদ্ধক্ষেত্রে লব্ধ ধনসম্পদ আমান (নিরাপত্তা) ও আলখারাজ, এসব বিষয়ের সঙ্গেই বৈদেশিক সম্পর্কের বিষয়টি বিবেচনা করতেন। বৈদেশিক সম্পর্কের বিষয়টি পরে খুব বেশী গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে এবং আন্তর্জাতিক আইন বুঝতে "আস-সিয়ার" কথাটি প্রচলিত হয়ে যায়। আইনের যে শাখাটি কেবলমাত্র বৈদেশিক সম্পর্ক নির্ণয়ে প্রযুক্ত হয়, তারই নাম "আস-সিয়ার"। কোন কোন আইনবিদ অবশ্য 'জিহাদ' কথাটিই চালু রেখেছিলেন।
শরিয়তের উৎস বা সমর্থন Sanction) যা, মুসলিম আন্তর্জাতিক আইনেরও ঠিক তাই। আন্তর্জাতিক আইন বলতে আমরা যদি অন্যান্য জাতির সঙ্গে ইসলামী রাষ্ট্রের সম্পর্ক নির্ণয়ের সমগ্র আইন-কানুন ও বিধি-ব্যবস্থার কথা বলি, তবে আইনের চিরাচরিত মূল (উসুল) ও শরিয়তের উৎস ভিন্ন আরও অনেক জায়গা থেকেই মুসলিম আইনের নজির খুঁজে পাওয়া যায়। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যেতে পারে, মুসলিম অমুসলিম সম্পর্কিত চুক্তি, জনসমক্ষে খলিফার উক্তি ও যুদ্ধের ময়দানে সেনাপতিদের প্রতি তাঁর প্রদত্ত নির্দেশাবলী (যেগুলো আইনবিদগণ পরবর্তী যুগে লিপিবদ্ধ করেন) এবং বৈদেশিক সম্পর্কের ব্যাপারে মুসলিম আইনবিদদের মতামত, অনুশীলন ও ব্যাখ্যা।
আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে একথা বলা চলে যে, মুসলিম আন্তর্জাতিক আইনের উৎসগুলো আধুনিক যুগের আইনবিদ ও আন্তর্জাতিক আদালতের বিধি (Statute) সম্মত উৎসগুলোর সঙ্গে একই পর্যায়ে পড়ে। এর মধ্যে আছে : মতৈক্যমূলক চুক্তি (Agreement), আচার-ব্যবহার, চুক্তি ও কর্তৃত্ব। আল-কোরআন ও প্রামাণ্য হাদিস কর্তৃত্বের পর্যায়ে, আরবীয় প্রচলিত আইন আচার-বিধির পর্যায়ে, অমুসলিমদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির আইন মতৈক্যমূলক চুক্তির পর্যায়ে আর ফতোয়া, আইন-সম্পর্কীয় তফসীর, কিয়াস ও অন্যান্য প্রামাণ্য সূত্র থেকে লব্ধ আইনের ব্যাখ্যা ও রূপায়ণের ব্যাপারে খলিফাদের বাণী ও অভিমত যুক্তির পর্যায়ে পড়বে। এসব বাণী, মতামত ও সিদ্ধান্ত প্রথম যুগের আইনের তফসীর ও ফতোয়ার সংকলনের মধ্যে পাওয়া যায়। আইনের বিবর্তনে এসব আইনের গ্রন্থ ও সংক্ষিপ্তসারগুলো বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। পরবর্তীকালে আইনবিদগণ যেভাবে এগুলোর ব্যাখ্যা দিয়েছেন ও বহুল ব্যবহার করেছেন, তা থেকে এ প্রভাব আরও বেশী সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00