📄 ক. ঋণগ্রহীতাকে কাফীলের দায়মুক্ত করতে বলা
হানাফীদের মতে, ঋণগ্রহীতার অনুরোধে কাফালাত হলে কাফীল তাকে দায়মুক্ত করার জন্য বলতে পারে, যদি ঋণদাতা তাকে ঋণ পরিশোধের জন্য তাগাদা দেয়। এটা এভাবে যে, কাফীল ঋণদাতাকে ঋণ পরিশোধ করবে। এরপর সে দায়মুক্ত হয়ে যাবে। একইভাবে কাফীল ঋণগ্রহীতার পেছনে লেগে থাকতে পারবে, যদি ঋণদাতা কাফীলের পেছনে লেগে থাকে। একইভাবে কাফীলের ঋণগ্রহীতাকে বন্দী করতে বলার অধিকার আছে, যদি ঋণদাতা কাফীলকে বন্দী করতে চেষ্টা করে। এ সকল অধিকার কাফীলের জন্য সাব্যস্ত হওয়ার কারণ হচ্ছে, কাফীলের বর্তমানে বিভিন্ন পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ার জন্য ঋণগ্রহীতা দায়ী। তাই কাফীলের সাথে যে আচরণই করা হোক কাফীল সে আচরণ ঋণগ্রহীতার সাথে করার অধিকার রাখে। পক্ষান্তরে ঋণগ্রহীতার অনুরোধ ছাড়া কাফালাত হয়ে থাকলে উল্লিখিত কোনো বিষয়ে ঋণগ্রহীতাকে বলার অধিকার নেই। কেননা, কাফীল তখন কাফালাত ও তার বিভিন্ন বিধানের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবী। তাই তার নেওয়া দায়ের বিষয় অন্যের দায়িত্বে চাপানোর কোনো অধিকার তার থাকবে না।
মালেকী মাযহাবের ফকীহদের মতে, ঋণদাতাকে ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে দেনা ও ঋণ আদায় করতে বলার অধিকার কাফীলের আছে, যেন কাফীল তার দায় থেকে মুক্ত হতে পারে। আর ঋণ পরিশোধের সময় হয়ে গেলে তখন ঋণগ্রহীতাকে শোধ করতে বাধ্য করার অধিকারও আছে কাফীলের। ঋণদাতা কাফীলকে ঋণের বিষয়ে কিছু বলুক বা না বলুক, কাফালাত ঋণগ্রহীতার অনুরোধে হোক বা না হোক—তাতে উপরিউক্ত বিধানে কোনো পার্থক্য হবে না। তবে ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধ পরিমাণ সম্পদ কাফীলকে দেবে, যেন কাফীল সে সম্পদ ঋণদাতাকে সোপর্দ করতে পারে, কাফীলের এ কথা বলার অধিকার নেই।
শাফেয়ীদের মতে, ঋণগ্রহীতার অনুরোধ ছাড়া যদি কাফীল দায় নেয় তাহলে কাফীলের তাকে দায়মুক্ত করতে বলার অধিকার নেই। যেহেতু কাফীল তার অনুরোধে দায় গ্রহণ করেনি। সুতরাং কাফীলকে দায়মুক্ত করা তার জন্য আবশ্যক হবে না। পক্ষান্তরে যদি ঋণগ্রহীতার অনুরোধে কাফীল দায় নেয়, আর ঋণদাতা তাকে ঋণ পরিশোধ করতে তাগাদা দেয়, তাহলে ঋণগ্রহীতাকে দায়মুক্ত করতে বলার অধিকার আছে কাফীলের।
হাম্বলী ফকীহদের মতে, যদি কোনো ব্যক্তি কারো অনুরোধে তার দায় গ্রহণ করে, তারপর এ কাফীলকে ঋণ পরিশোধে তাগাদা দেওয়া হয় তাহলে কাফীলের নিজেকে দায়মুক্ত করতে ঋণগ্রহীতাকে বলা সহীহ হবে। কেননা, তার অনুরোধেই কাফীলের দায়িত্বে ঋণ আবশ্যক হয়েছে। তবে কাফীলকে যদি ঋণ পরিশোধের জন্য তাগাদা না দেওয়া হয় তাহলে কাফীলের ঋণগ্রহীতাকে (দায়মুক্ত বা ঋণ পরিশোধ করার জন্য) বলার অধিকার নেই। এ বিষয়ে অন্য একটি মত রয়েছে। তা হলো, কাফীলের ঋণগ্রহীতাকে তাগাদা দেওয়ার সুযোগ আছে।
📄 খ. ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে কাফীলের ঋণ আদায় করা
সকল ফকীহের ঐকমত্যে কাফীল ঋণদাতাকে ঋণ পরিশোধ করার পূর্বে ঋণগ্রহীতাকে ঋণ পরিমাণ সম্পদ দেওয়ার তাগাদা করতে পারে না। তাদের মাঝে এ বিষয়েও কোনো দ্বিমত নেই, কাফীল যদি ঋণগ্রহীতার পাওনা স্বেচ্ছাদানের নিয়তে পরিশোধ করে তবে সে ঋণ ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে আদায় করতে পারে না। তবে ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে আদায়ের নিয়তে ঋণ শোধ করলে কাফীলের আদায় করার বিষয়ে বিশদ বিবরণ রয়েছে, যা সামনে উল্লেখ করা হচ্ছে।
📄 ১. কাফীলের ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে ঋণ আদায়ের শর্তসমূহ
ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে কাফীলের শোধকৃত ঋণ আদায় করার ক্ষেত্রে হানাফীদের মতে তিনটি শর্ত আছে। প্রথম: ঋণগ্রহীতার অনুরোধে কাফালাত গ্রহণ করা। দ্বিতীয়: ঋণগ্রহীতা কাফীলকে তার পক্ষ থেকে দায় নেওয়ার অনুরোধপূর্ণ কোনো কথা বলা। যেমন বলল, তুমি আমার পক্ষে দায় গ্রহণ করো। তৃতীয়: কাফীলের পরিশোধের ভিত্তিতে ঋণগ্রহীতার দায়মুক্ত হওয়া। মালেকীদের মতে, কাফীল ঋণ আদায় করা মাত্রেই ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে ঋণ বুঝে নিতে পারবে। ঋণগ্রহীতার অনুরোধে বা অনুরোধ ছাড়া কাফালাত যেভাবেই হোক না কেন। এর কারণ হলো, ঋণগ্রহীতার ওপর আবশ্যক ঋণ কাফীল শোধ করেছে। শাফেয়ীদের মতে, শোধকৃত ঋণ ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে আদায় করার অধিকার কাফীলের আছে, যদি ঋণ শোধ এবং তার দায় নেওয়া—উভয় ক্ষেত্রেই ঋণগ্রহীতার অনুরোধ থাকে। যদি ঋণের দায় ও পরিশোধের উভয় ক্ষেত্রে তার অনুরোধ না পাওয়া যায়, তাহলে কাফীল তার নিকট থেকে পরিশোধকৃত ঋণ আদায় করতে পারবে না। হাম্বলীদের মতে, যে কাফীল ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে আদায়ের নিয়তে দায় নেওয়া ঋণ শোধ করে তার চারটি অবস্থা: ১. ঋণগ্রহীতার অনুরোধে কাফালাত ও পরিশোধ হলে আদায় করতে পারবে। ২. দায়গ্রহণে অনুরোধ থাকলেও শোধে না থাকলেও পারবে। ৩. দায়গ্রহণে অনুরোধ না থাকলেও শোধে থাকলে পারবে। ৪. দায়গ্রহণে ও শোধে কোনো অনুরোধ না থাকলে দুটি বর্ণনা আছে; যার একটিতে আদায় করার অধিকারের কথা বলা হয়েছে।
📄 ২ কাফীলের ঋণ উসুল করার পদ্ধতি
হানাফী ফকীহদের মতে, কাফীলের শোধকৃত ঋণ আদায়ের অধিকার আছে। সে যে পরিমাণ ঋণ শোধ করবে তা-ই সে ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে আদায় করবে, যদি তার শোধকৃত সম্পদ হয়ে থাকে ঋণের অনুরূপ ও সমশ্রেণীর। আর যদি ঋণের মোট পরিমাণ সে শোধ না করে; বরং মোট পরিমাণের চেয়ে কম শোধ করে তাহলে সে শোধকৃত অংশ আদায় করবে। মালেকীদের মতে, যে কাফীলের শোধকৃত ঋণ আদায়ের অধিকার আছে সে যা শোধ করবে তা ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে আদায় করবে, যদি তার শোধকৃত সম্পদ মূল ঋণের সমশ্রেণীর হয়। যদি কাফীল ঋণের ভিন্ন শ্রেণীর বস্তু দ্বারা ঋণ শোধ করে তাহলে সে শোধকৃত সম্পদ ও মূল ঋণের মধ্যে যেটি কম সেটি ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে আদায় করবে। শাফেয়ীদের মতে, যখন কাফীলের জন্য ঋণের অর্থ ফেরত আদায়ের অধিকার সাব্যস্ত হবে তখন বিশুদ্ধতম মতানুসারে সে যা শোধ করেছে তা আদায় করবে; যা শোধ করেনি তা নয়। হাম্বলীদের মতে, কাফীল ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে মূল ঋণ ও শোধকৃত অংশের মধ্যে যেটি কম সেটি আদায় করবে। মেয়াদে পরিশোধযোগ্য ঋণ যদি কাফীল মেয়াদ আসার পূর্বেই আদায় করে তাহলে সময় আসার পূর্বে ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে তা আদায় করতে পারবে না।