📄 ২. বস্তুসত্তার কাফালাত
২. বস্তুসত্তার কাফালাত (كَفَالَةُ الْعَيْن): হানাফী ও হাম্বলী ফকীহদের মতে, কাফীল যদি নিজ থেকে দায়বদ্ধ পণ্য বা বস্তুর কাফালাত গ্রহণ করে, তাহলে তা অক্ষত থাকলে বস্তুটি ফিরিয়ে দিতে সে দায়বদ্ধ থাকবে। যদি বস্তুটি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে অনুরূপ বস্তু বা মূল্য ফিরিয়ে দেওয়ার দায় নেবে। মালেকীদের মতে যদি কাফীল কোনো বস্তুর দায় নেয় এই শর্তে যে, অবহেলা বা অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে বস্তুটি নষ্ট হলে তার অনুরূপ বা মূল্য দেবে, তাহলে কাফীলের জন্য এই দায় পূর্ণ করা আবশ্যক হবে। শাফেয়ীদের মতে দায়বদ্ধ বস্তুর কাফালাত গ্রহণ বৈধ, কাফীলের জন্য বস্তুটি অক্ষত থাকলে সোপর্দ করা আবশ্যক।
টিকাঃ
১০৮. আদ দুসুকী ওয়াদ দারদীর, খ. ৩, পৃ. ৩৩৪; আল হাত্তাব, খ. ৫, পৃ. ৯৮; আল খিরাশী, খ. ৫, পৃ. ২৮
১০৯. ক্বালয়ূবী ও 'উমায়রা, খ. ২, পৃ. ৩২৯; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ৪৪১
১১০. টীকাসহ ইবনু 'আবিদীন, খ. ৫, পৃ. ২৯৭; বাদায়ে 'উস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৪; ফাতহুল ক্বাদীর, খ. ৬, পৃ. ২৮৫
📄 ক. ব্যক্তির কাফালাত
ক. ব্যক্তির কাফালাত (কফালত আন-নাফস): হানাফী মাযহাবের ফকীহদের মতে ব্যক্তির কাফালাতের বিধান হলো, কাফালাতকৃত ব্যক্তি এবং সন্ধানকারীর মাঝে প্রতিবন্ধকহীন উপস্থিতির দায়িত্ব নিতে হবে এমন এক জায়গায়, যেখান থেকে সন্ধানকারী ঐ ব্যক্তিকে বিচারকের মজলিসে উপস্থিত করতে পারবে। মালেকীদের মতে, সত্তার দায় গ্রহণকারী কাফীলের জন্য আবশ্যক সে যার দায় নিয়েছে তাকে ঋণ পরিশোধের সময় হলে এমন জায়গায় সোপর্দ করা, যেখান থেকে ঋণদাতা তাকে বিচারকের সামনে এনে তার পাওনা পুরোপুরি উসুল করতে পারে। শাফেয়ীদের মতে সত্তার দায় নেওয়া কাফীল ঋণগ্রহীতাকে উপস্থিত করে ঋণদাতার হাতে তাকে বুঝিয়ে দেবে চুক্তিতে যে স্থানের উল্লেখ করা হয়েছে সে নির্ধারিত স্থানে। হাম্বলীদের মতে, ব্যক্তির কাফালাতে যদি কোনো স্থানের উল্লেখ না করা হয় তাহলে কাফালাত চুক্তির স্থানটিই সোপর্দ করার জন্য নির্ধারিত হয়ে যাবে।
টিকাঃ
১১১. আদ দুসূকী ওয়াদ দারদীর, খ. ৩, পৃ. ৩৪৫; আল মাওয়াক্কু, খ. ৫, পৃ. ১০৫-১০৬
১১২. টীকাসহ আল মুহতাজ, খ. ৫, পৃ. ২৫৮; রওযাতুত তালিবীন, খ. ৪, পৃ. ২৫৩; আশ শারকাবী 'আলাত তাহরীর, খ. ২, পৃ. ১১৯; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ৪৩১
১১৩. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬ পৃ. ১১; আয যায়লা'আী ও আশ শালবী, খ. ৪, পৃ. ১৫৬
📄 খ. মাকফুল আনহু (মূল ঋণগ্রহীতা)-র সাথে কাফীলের সম্পর্ক
ঋণগ্রহীতার অনুরোধে কাফালাত হলে কাফীল তাকে কাফালাত থেকে মুক্ত করার জন্য বলতে পারে। একইভাবে কাফীল শোধকৃত ঋণের অংশ ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে আদায় করতে পারবে। এর বিস্তারিত বিবরণ হলো:
📄 ক. ঋণগ্রহীতাকে কাফীলের দায়মুক্ত করতে বলা
হানাফীদের মতে, ঋণগ্রহীতার অনুরোধে কাফালাত হলে কাফীল তাকে দায়মুক্ত করার জন্য বলতে পারে, যদি ঋণদাতা তাকে ঋণ পরিশোধের জন্য তাগাদা দেয়। এটা এভাবে যে, কাফীল ঋণদাতাকে ঋণ পরিশোধ করবে। এরপর সে দায়মুক্ত হয়ে যাবে। একইভাবে কাফীল ঋণগ্রহীতার পেছনে লেগে থাকতে পারবে, যদি ঋণদাতা কাফীলের পেছনে লেগে থাকে। একইভাবে কাফীলের ঋণগ্রহীতাকে বন্দী করতে বলার অধিকার আছে, যদি ঋণদাতা কাফীলকে বন্দী করতে চেষ্টা করে। এ সকল অধিকার কাফীলের জন্য সাব্যস্ত হওয়ার কারণ হচ্ছে, কাফীলের বর্তমানে বিভিন্ন পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ার জন্য ঋণগ্রহীতা দায়ী। তাই কাফীলের সাথে যে আচরণই করা হোক কাফীল সে আচরণ ঋণগ্রহীতার সাথে করার অধিকার রাখে। পক্ষান্তরে ঋণগ্রহীতার অনুরোধ ছাড়া কাফালাত হয়ে থাকলে উল্লিখিত কোনো বিষয়ে ঋণগ্রহীতাকে বলার অধিকার নেই। কেননা, কাফীল তখন কাফালাত ও তার বিভিন্ন বিধানের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবী। তাই তার নেওয়া দায়ের বিষয় অন্যের দায়িত্বে চাপানোর কোনো অধিকার তার থাকবে না।
মালেকী মাযহাবের ফকীহদের মতে, ঋণদাতাকে ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে দেনা ও ঋণ আদায় করতে বলার অধিকার কাফীলের আছে, যেন কাফীল তার দায় থেকে মুক্ত হতে পারে। আর ঋণ পরিশোধের সময় হয়ে গেলে তখন ঋণগ্রহীতাকে শোধ করতে বাধ্য করার অধিকারও আছে কাফীলের। ঋণদাতা কাফীলকে ঋণের বিষয়ে কিছু বলুক বা না বলুক, কাফালাত ঋণগ্রহীতার অনুরোধে হোক বা না হোক—তাতে উপরিউক্ত বিধানে কোনো পার্থক্য হবে না। তবে ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধ পরিমাণ সম্পদ কাফীলকে দেবে, যেন কাফীল সে সম্পদ ঋণদাতাকে সোপর্দ করতে পারে, কাফীলের এ কথা বলার অধিকার নেই।
শাফেয়ীদের মতে, ঋণগ্রহীতার অনুরোধ ছাড়া যদি কাফীল দায় নেয় তাহলে কাফীলের তাকে দায়মুক্ত করতে বলার অধিকার নেই। যেহেতু কাফীল তার অনুরোধে দায় গ্রহণ করেনি। সুতরাং কাফীলকে দায়মুক্ত করা তার জন্য আবশ্যক হবে না। পক্ষান্তরে যদি ঋণগ্রহীতার অনুরোধে কাফীল দায় নেয়, আর ঋণদাতা তাকে ঋণ পরিশোধ করতে তাগাদা দেয়, তাহলে ঋণগ্রহীতাকে দায়মুক্ত করতে বলার অধিকার আছে কাফীলের।
হাম্বলী ফকীহদের মতে, যদি কোনো ব্যক্তি কারো অনুরোধে তার দায় গ্রহণ করে, তারপর এ কাফীলকে ঋণ পরিশোধে তাগাদা দেওয়া হয় তাহলে কাফীলের নিজেকে দায়মুক্ত করতে ঋণগ্রহীতাকে বলা সহীহ হবে। কেননা, তার অনুরোধেই কাফীলের দায়িত্বে ঋণ আবশ্যক হয়েছে। তবে কাফীলকে যদি ঋণ পরিশোধের জন্য তাগাদা না দেওয়া হয় তাহলে কাফীলের ঋণগ্রহীতাকে (দায়মুক্ত বা ঋণ পরিশোধ করার জন্য) বলার অধিকার নেই। এ বিষয়ে অন্য একটি মত রয়েছে। তা হলো, কাফীলের ঋণগ্রহীতাকে তাগাদা দেওয়ার সুযোগ আছে।