📄 খ. সত্তার কাফালাত গ্রহণ
খ. সত্তার কাফালাত গ্রহণ (كَفَالَةُ الْعَيْنِ): বস্তুসত্তার কাফালাত বা দায় নেওয়ার অর্থ হচ্ছে, কাফীল মূল বস্তুটি অক্ষত থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়ার দায় নেবে। আর তা অক্ষত না থাকলে তার অনুরূপ বস্তু বা তার মূল্য ফিরিয়ে দেওয়ার দায় নেবে। মূল ঋণগ্রহীতার দায়িত্বে বস্তু ফিরিয়ে দেওয়ার হক সাব্যস্ত হওয়া বা না হওয়ার ভিত্তিতে বস্তুর কাফালাত গ্রহণের বিধান নিয়ে ফকীহগণ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। কাফালাতকৃত বস্তুটি হয়ে থাকে কখনো দায়বদ্ধ। সে বস্তুর দায়বদ্ধতা নিজ থেকে হতে পারে, হতে পারে অন্য কিছুর মাধ্যমে। আর কখনো কাফালাতের বস্তুটি তার গ্রহণকারীর হাতে আমানত হিসেবে থাকে। এভাবে কাফালাতকৃত বস্তুর মোট তিনটি অবস্থা হয়, যার বিস্তারিত বিবরণ সামনে আসছে।
📄 ক. নিজ থেকে দায়বদ্ধ বস্তু
ক. নিজ থেকে দায়বদ্ধ বস্তু (الْعَيْنُ الْمَصْمُونَةُ بِنَفْسِهَا): নিজ থেকে দায়বদ্ধ বস্তু এমন, যা তার বর্তমান ভোক্তার জন্য মূল মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া আর নষ্ট হলে তার অনুরূপ বা মূল্য দেওয়া আবশ্যক। এর উদাহরণ হলো: কেড়ে নেওয়া বস্তু বা কেনার জন্য দরদামকৃত বস্তু। হানাফী, হাম্বলী ও শাফেয়ীদের এক মতে এ প্রকারভুক্ত বস্তুর কাফালাত গ্রহণ বৈধ। সুতরাং অক্ষত থাকলে বস্তুটি ফিরিয়ে দেওয়ার দায় নেবে কাফীল। আর বস্তুর সমতুল্য নমুনা রয়েছে এমন জাতীয় বস্তু হলে তার সদৃশ বস্তু, আর সদৃশ বস্তু না হয়ে তা মূল্য-নির্ধারিত বস্তু হলে তার মূল্য দেওয়ার দায় নেবে। ফাসিদ বিক্রিতে বিক্রীত বস্তু ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও হানাফীদের মতে উপরিউক্ত বিধান প্রযোজ্য। মালেকীদের মতে, যা শাফেয়ীদের অপর একটি বর্ণনা, বস্তুর কাফালাত গ্রহণ বৈধ নয়। তবে বস্তুর হকদার বের হলে বস্তু ফিরিয়ে দেওয়া বর্তমান ভোক্তার জন্য আবশ্যক হবে। বস্তুর কাফালাত বৈধ হবে, যদি নির্দিষ্ট বস্তুর ক্ষেত্রে এভাবে কাফালাত নেয় যে, বস্তুটির ব্যবহারে অবহেলা বা অতিরিক্ত ব্যবহার হলে তার মূল্য বা অনুরূপ দেওয়ার দায় নিলাম।
টিকাঃ
৭৮. আল ফাতাওয়া আল হিন্দিয়্যা, খ. ৩, পৃ. ২৫৪; আল মুগনী, খ. ৫, পৃ. ৭৫
📄 খ. অন্য কিছুর মাধ্যমে দায়বদ্ধ বস্তু
খ. অন্য কিছুর মাধ্যমে দায়বদ্ধ বস্তু (الْعَيْنُ الْمَصْمُونَةُ بِغَيْرِهَا): এটা হলো এমন বস্তু যা অক্ষত থাকলে বর্তমান ভোক্তা মালিকের কাছে তা ফিরিয়ে দেওয়া আবশ্যক। তবে বস্তুটি নষ্ট হলে তার অনুরূপ বস্তু বা মূল্য দেওয়া আবশ্যক নয়। বরং এ অবস্থায় তার ওপর অন্য একটি দায় চলে আসে। এর উদাহরণ হলো বিক্রেতার হাতে থাকা পণ্য। এ পণ্য মূল্য দ্বারা নিরাপত্তাপ্রাপ্ত। এখন পণ্যটি নষ্ট হলে ক্রেতার মূল্য পরিশোধ করা লাগবে না, যেহেতু পণ্যটি বিক্রেতা তাকে দেয়নি। হানাফী ও হাম্বলী ফকীহদের মতে, এ শ্রেণীভুক্ত বস্তুগুলো অক্ষত থাকলে অর্পণের দায়গ্রহণ বৈধ। যদি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে কাফালাতের দায় বাতিল হয়ে যায়। কেননা এ জাতীয় বস্তু যখন নষ্ট হয় তখন তা বর্তমান ভোক্তার হাতে উপযুক্ত দায়ে আবদ্ধ বস্তুর বিপরীতে নষ্ট হয়।
টিকাঃ
৭৯. আল হাত্তাব, খ. ৫, পৃ. ৯৮; আল খিরাশী, খ. ৫, পৃ. ২৮; আদ দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৩৩৪
📄 গ. আমানত
গ. আমানত (الأمانة): যে সকল বস্তু ভোক্তার হাতে আমানত হিসেবে থাকে, সেসব হানাফী মাযহাবের ফকীহদের মতে দু'ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগ: যা তার বর্তমান ভোক্তার হস্তান্তর করা আবশ্যক। যেমন ধার হিসেবে নেওয়া বস্তু যে ধার নিয়েছে তার হাতে এবং ভাড়া নেওয়া বস্তু ভাড়াটের হাতে থাকা অবস্থায় তা মূল মালিকের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ায় তারা দায়বদ্ধ। এ শ্রেণীভুক্ত বস্তু হস্তান্তরের দায় নেওয়া বৈধ। দ্বিতীয় প্রকার হলো যা তার ভোক্তার মূল মালিকের কাছে পৌঁছানো আবশ্যক নয়। যেমন আমানতরূপে গচ্ছিত সম্পদ ও মুদারাবার সম্পদ। এ শ্রেণীভুক্ত বস্তু মালিকের হাতে অর্পণের কাফালাত গ্রহণ বৈধ নয়। মালেকীদের মতে আমানতরূপে গচ্ছিত সম্পদ, ধারকৃত বস্তু ও মুদারাবার সম্পদের দায় নেওয়া বৈধ নয়। তবে যদি এগুলোর কোনোটি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে বর্তমান ভোক্তা তার মূল বস্তু ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে। শাফেয়ীদের মতে, বস্তু যদি বর্তমান ভোক্তার কাছে দায়বদ্ধ না থাকে যেমন অভিভাবক, প্রতিনিধি বা ব্যবসার শরীকের হাতে সম্পদ বা ঋণ, তাহলে এ বস্তুর দায়গ্রহণ বৈধ হবে না। হাম্বলীদের মতে, আমানতসমূহ যেমন আমানতরূপে গচ্ছিত সম্পদ, ভাড়া নেওয়া বস্তু ইত্যাদির দায় নেওয়া সহীহ নয়, যদি বিনা ক্ষতিতে এগুলোর দায় নেয়।
টিকাঃ
৮২. আল হাত্তাব, খ. ৫, পৃ. ৯৮; আল খিরাশী, খ. ৬, পৃ. ২৮; আদ দুসুকী, খ. ৩, পৃ. ৩৩৪
৮৩. ক্বালয়ূবী ও 'উমায়রা, খ. ২, পৃ. ৩২৯; নিহায়াতুল মুহতাজ, খ. ৪, পৃ. ৪১৪
৮৪. আল মুগনী মা'আশ শারহিল কাবীর, খ. ৫, পৃ. ৭৬
৮৫. আশ শারক্বাবী 'আলাত তাহরীর, খ. ২ পৃ. ১১৯