📄 কাফালাতের পারিভাষিক অর্থ
কাফালাতের শাস্ত্রীয় পরিচয়ে ফকীহগণ বিভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন, যেহেতু এ পরিচয়কেন্দ্রিক প্রতিক্রিয়ায় ও প্রভাবে তাদের মাঝে মতভিন্নতা আছে। অধিকাংশ হানাফী ফকীহ কাফালতের সংজ্ঞা দিতে বলেছেন: ضَمُّ ذِمَّةِ الْكَفِيلِ إِلَى ذِمَّةِ الأَصِيل فِي الْمُطَالَبَةِ بِنَفْسٍ أَوْ دَيْنِ أَوْ عَيْنٍ। কাফালাত হলো ব্যক্তি, ঋণ বা নগদ বস্তু উপস্থিত করার দাবি সংক্রান্ত মূল ঋণগ্রহীতার দায়িত্বের সাথে কাফীল বা দায়গ্রহণকারীর দায়িত্ব যুক্ত করা। কেউ কেউ বলেছেন, ذِمَّةِ الْكَفِيلَ إِلَى ذِمَّةِ الأَصِيل في الدين -এর অর্থ ঋণ গ্রহীতার দায়িত্বের সাথে কাফীলের দায়িত্ব যুক্ত করা। 'হিদায়া' গ্রন্থকার বলেন, প্রথমটিই অধিক বিশুদ্ধ মত।
মালেকীগণ ও হাম্বলীগণ বলেন, যা শাফেয়ীদের প্রসিদ্ধ বর্ণনা: أَنْ يَلْتَزِمَ الرَّشِيدُ بِإِحْضَارِ بَدَن مَّن يَلْزَمُ حُضُورُهُ فِي مَجْلِسِ الْحُكْمِ। প্রাপ্তবয়স্ক কোনো ব্যক্তি ফয়সালার মজলিসে উপস্থিতি আবশ্যক এমন কাউকে উপস্থিত করার দায়িত্ব নেওয়া। এভাবে সাব্যস্ত হয়, হানাফীদের মতে কাফালাত সম্পদ ও ব্যক্তি উভয়টির দায় নেওয়াকে বোঝায়। মালেকীগণ ও শাফেয়ীগণ তা দু'ভাগে ভাগ করেন, সম্পদের দায়িত্ব ও ব্যক্তির দায়িত্ব। তবে শাফেয়ীগণ কাফালাত দ্বারা কেবল নির্দিষ্ট ব্যক্তির দায় নেওয়াকে বোঝান। হাম্বলীগণ বলেন, যামান (الضَّمَانُ) হলো অন্য ব্যক্তির দায়িত্বে আবশ্যক প্রাপ্যের দায় নেওয়া। আর কাফালাত (الْكَفَالَةُ) হলো কাউকে সশরীরে উপস্থিতির দায় গ্রহণ। দায় গ্রহণকারী ব্যক্তিকে বলা হয়, জামিন, যামীন, হামীল, যাঈম, কাফিল, কাফীল, ছাবীর ও ক্বাবীল।
📄 সংশ্লিষ্ট পরিভাষা
ক. الإবْرَاء (আল-ইবরা): মুক্তকরণ, অব্যাহতি প্রদান, নিষ্কৃতিদান করা। শব্দটি মাসদার বা শব্দমূল। এর কতক অর্থ: সম্পর্কহীন করা, দায়মুক্ত করা, নিষ্কৃতিদান করা, কোনো কিছু থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। পরিভাষায় অপরের দায়িত্বে বা তার তরফে থাকা নিজ প্রাপ্য মাফ করে দেওয়া। সুতরাং 'ইবরা' হলো কাফালাতের বিপরীত। কারণ, ইবরা বোঝায় দায়মুক্তি আর কাফালাত বোঝায় তার বিপরীত দায় ও জিম্মাদার হওয়া।
খ. الْحَمَالَةُ (আল-হামালা): দায়িত্ব গ্রহণ করা, দায় নেওয়া। হামালা অর্থ: কারো পক্ষ থেকে দিয়্যাত বা জরিমানা আদায় করার দায় নেওয়া। হামালা ও কাফালাতের মাঝে মিল হলো, দিয়্যাত, পারস্পরিক সম্পর্কে শান্তি স্থাপনের লক্ষ্যে অর্থদণ্ডের ক্ষেত্রে হামালা শব্দটি বিশেষভাবে প্রচলিত।
গ. الْحَوَالَةُ (আল-হাওয়ালা): স্থানান্তর ও অর্পণ করা। হাওয়ালা শব্দের আভিধানিক অর্থ: রূপান্তরিত ও স্থানান্তরিত হওয়া। পরিভাষায় হাওয়ালা হলো এক ব্যক্তির দায়িত্ব থেকে দেনা অন্য ব্যক্তির দায়িত্বে স্থানান্তর করা। হাওয়ালার সাথে কাফালাত বা যামানের পার্থক্য হলো, হাওয়ালা হলো এক ব্যক্তির দায়িত্বের ঋণ অন্য ব্যক্তির দায়িত্বে দেওয়া। কাফালাত বা যামান হলো প্রাপ্য আদায়ে একের দায়িত্বের সাথে অন্যের দায়িত্ব যুক্ত করা। মাকফুল (মূল ঋণগ্রহীতা) দায়মুক্ত হয় না।
ঘ. الْقَبَالَةُ (আল-কাবালা): গ্রহণ করা, কবুল করা। মূলত এটি ক্বাবিলা বিহি -এর মাসদার, যার অর্থ কাফীল হওয়া। কব্বালাত অর্থ দায়গ্রহণ করল। আর ক্বাবীল অর্থ কাফীল। অনেক ফকীহ বলেন, কাবালা শব্দটি গঠনে যেমন কাফালাতের সদৃশ, অর্থেও তার তুল্য। তবে তারা বলেন, কাফালাত শব্দটি ব্যক্তি অথবা নির্দিষ্ট বস্তুর ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট। আর কাবালা শব্দটি সম্পদ, দিয়্যাত, ব্যক্তি ও নির্দিষ্ট বস্তু সবকিছুর সাথে ব্যবহৃত হতে পারে।
📄 সুন্নাহ
সুন্নাহে বর্ণিত হয়েছে: 'আরিয়া তথা উপকার লাভের জন্য ধার নেওয়া বস্তু ফিরিয়ে দিতে হবে। আর যে দায়িত্ব নেবে সে ক্ষতিপূরণ দিতে দায়বদ্ধ থাকবে। ঋণ পরিশোধ করতে হবে। খাত্তাবী ও অন্য হাদীস ব্যাখ্যাকারগণ বলেন, যাঈম অর্থ কাফীল আর যা'আমাহ অর্থ কাফালাত। আবু কাতাদা রা. বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে একজন মৃত ব্যক্তিকে আনা হলো, যেন নবীজী তার জানাযার নামায পড়ান। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরাই তোমাদের সাথীর জানাযা পড়ে নাও। (আমি পড়ব না।) যেহেতু তার দায়িত্বে ঋণ আছে। আবু কাতাদা রা. বললেন, আমি তার ঋণের দায়িত্ব নিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আদায় করার দায়িত্ব? তিনি বললেন, আদায় করার দায়িত্ব। তখন নবীজী তার জানাযা পড়ালেন।
📄 কাফালাতের রুকন বা মূল অংশ ও শর্তসমূহ
কাফালাতের রুকন হলো নির্দিষ্ট সীগা বা শব্দ, কাফীল, মাকফুল লাহু, মাকফুল আনহু ও মাকফুল বিহী (الصِّیغَةُ ، وَالْكَفِیلُ ، وَالْمَكْفُولُ لَهُ ، وَالْمَكْفُولُ عَنْهُ ، وَالْمَكْفُولُ بِهِ)। ফকীহগণ এই পাঁচটি রুকনের জন্য বিভিন্ন শর্ত ও বিধান বর্ণনা করেছেন।