📄 সপ্তম প্রকার : খুচরা মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রাবিনিময়-চুক্তি
আল-ফুলূসু (الْقُلُوسُ) হলো সীলযুক্ত তাম্র বা লোহা যা দ্বারা লেনদেন করা যায়। মোটকথা স্বর্ণ-রূপা ব্যতীত অন্য যে কোনো পদার্থ দ্বারা প্রস্তুতকৃত সীল-মনোগ্রামযুক্ত মুদ্রাই আল-ফুলূসু। খুচরা মুদ্রার বিনিময়ে বিক্রি বৈধ হওয়ার ব্যাপারে ফকীহগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন। কারণ তা এমন সম্পদ যার মূল্য আছে এবং যা নির্ধারিত। যদি তা অচল হয় তাহলে তা নির্দিষ্ট করা আবশ্যক। কারণ, তখন তা বস্তুসামগ্রী।
যদি দিরহাম ও দিনারের বিনিময়ে বাকিতে সচল খুচরা মুদ্রার মুদ্রাবিনিময়চুক্তি করা হয়, অথবা খুচরা মুদ্রার বিনিময়ে খুচরা মুদ্রা কম-বেশি করে মুদ্রাবিনিময়চুক্তি করা হয়, তাহলে তা নিয়ে ফকীহগণ মতবিরোধ করেছেন।
টিকাঃ
১২৬. আদ দুসুকী, খ. ৩, পৃ. ৪৫; মুগনিল-মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৭; শরহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৯৪
১২৭. শরহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৯৪; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ২৫২; আল ফুরু, খ. ৪, পৃ. ১৪৮-১৫০
১২৮. আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ২২; মুগনিল-মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২৫; আল জুমাল, খ. ৩, পৃ. ৪৫
১২৯. আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ২২; আল কালয়ুবী, খ. ২, পৃ. ৫২; মুগনিল-মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২৫
১৩০. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ১৮৫
১৩১. আল হিদায়া মাআল ফাতহ, খ. ৬, পৃ. ১৬২
📄 প্রথম দৃষ্টিভঙ্গি
শাফেয়ী আলেমগণ, ইমাম মুহাম্মদ ব্যতীত হানাফী ফকীহবৃন্দ, প্রসিদ্ধ উক্তি অনুযায়ী হাম্বলী ফকীহগণ এবং ইবনে আকিল, শিরাজী ও মুস্তাওইবের গ্রন্থকার প্রমুখ ফকীহগণের মাযহাব হলো, যে সব খুচরা মুদ্রার লেনদেন সংখ্যা গণনার সাহায্যে হয় সেসব খুচরা মুদ্রা সচল হওয়া সত্ত্বেও তাতে কোনোরূপ সুদ হয় না। কারণ তা পরিমাণ ও পরিমাপ বহির্ভূত। বুহুতীর ভাষ্য মতে, এর বিপরীতে কুরআন ও হাদীসের কোনো ভাষ্য নেই। শাফেয়ী ফকীহগণ খুচরা মুদ্রাকে বস্তুসামগ্রীর আওতাভুক্ত করেন যদিও তা সচল হয়।
হানাফী ফকীহগণের দৃষ্টিভঙ্গি : সুদের কারণ হচ্ছে সমশ্রেণী হওয়ার পাশাপাশি তাতে পরিমাণ পাওয়া যাওয়া। এখানে খুচরা মুদ্রায় সমশ্রেণীর বিষয়টি পাওয়া গেলেও পরিমাণ পাওয়া যায়নি। কারণ খুচরা মুদ্রা গণনা করে বিক্রি করা হয়ে থাকে। উক্ত সূত্রের ভিত্তিতে খুচরা মুদ্রার একটিকে অপরটির বিনিময়ে কম-বেশি করে বিক্রি করা বৈধ। যেমনিভাবে দুই ডিমের বিনিময়ে এক ডিম বিক্রি করা বৈধ হয়ে থাকে।
টিকাঃ
১৩২. আল হিদায়া মাআল ফাতহ, খ. ৬, পৃ. ১৬২
১৩৩. ফাতহুল কাদীর মায়াল হিদায়া, খ. ৬, পৃ. ১৬২
📄 দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গি
মালেকী ফকীহগণের প্রণিধানযোগ্য মত এবং তা হাম্বলী ফকীহগণের একটি বর্ণনা, এবং এটি হানাফী ফকীহ ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর উক্তি, তা হচ্ছে—খুচরা মুদ্রাসমূহের কোনোটিকে অপরটির বিনিময়ে কম-বেশি করে এবং বাকিতে বিক্রি করা বৈধ নয় এবং স্বর্ণ বা রৌপ্যের বিনিময়ে তা বিক্রি করা বৈধ হবে না। মুদাওয়ানা নামক গ্রন্থে আছে : 'মালেক রহ. বলেন, দুই খুচরা মুদ্রার বিনিময়ে এক খুচরা মুদ্রা বিক্রি বৈধ হবে না। সোনা ও রূপার বদলে খুচরা মুদ্রা বিক্রি, এমনিভাবে দিনারের বিপরীতে খুচরা মুদ্রা বাকি বিক্রি সহীহ হবে না।'
হানাফী ফকীহগণ ইমাম মুহাম্মদ রহ. এর প্রমাণ উত্থাপন করেছেন যে, খুচরা মুদ্রা হলো মূল্য; অতএব সমশ্রেণীর বিনিময়ে কম-বেশি করে তা বিক্রি করা বৈধ হবে না যেমন দিনার এবং দিরহামে বৈধ হয় না। ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন : অধিক প্রকাশ্য মত হলো এটি নিষিদ্ধ হওয়া। কারণ সাধারণত সচল মুদ্রাকে মূল্যরূপে সাব্যস্ত করা হয়।
টিকাঃ
১৩৪. আল মুদাওয়ানাতুল কুবরা, খ. ৩, পৃ. ৩৯৫; ফাতহুল কাদীর মায়াল হিদায়া, খ. ৬, পৃ. ১৬২-১৬৩; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ২৫২; আল ফুরু, খ. ৪, পৃ. ১৪৮-১৫১
১৩৫. আল মুদাওয়ানা, খ. ৩, পৃ. ৩৯৫
১৩৬. প্রাগুক্ত।
১৩৭. ইরশাদুস সালিক মায়া শরহিহি আসহালিল মাদারিক, খ. ২, পৃ. ২৩৩
১৩৮. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ১৮৫
১৩৯. মাজমুয়া ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া, খ. ২৯, পৃ. ৪৬৮
১৪০. কাগজের মুদ্রা (ব্যাংক নোট) সম্পর্কে সরফ অধ্যায়ে আলোচনা: এটি স্বর্ণ এবং রৌপ্যের বিধানধারী।
📄 মুদ্রাব্যবসার বিনিময়ের মধ্যে দোষ-ত্রুটি প্রকাশ
পূর্বে বলা হয়েছে, মুদ্রাব্যবসার মধ্যে خِيَارُ الشَّرْطِ (অর্থাৎ চুক্তি চূড়ান্ত বা বাতিল করার স্বাধীনতা প্রদানের শর্ত) গ্রহণযোগ্য নয়। পক্ষান্তরে خِيَارُ الْعَيْبِ (অর্থাৎ ত্রুটির কারণে চুক্তি বাতিল করার স্বাধীনতা) সাব্যস্ত হতে পারে। কারণ, পণ্য স্বভাবত ত্রুটিমুক্ত হওয়াই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে।
হানাফী ফকীহগণ বলেন: যদি মুদ্রাব্যবসার বিনিময় নগদ হয় তাহলে ত্রুটির কারণে তা ফেরত প্রদান করার দ্বারা চুক্তি ভেঙ্গে যাবে। মজলিসে ফেরত প্রদান করা হোক কিম্বা মজলিস ত্যাগ করার পর ফেরত প্রদান করা হোক। আর যদি মুদ্রাব্যবসার বিনিময় বাকি হয় অর্থাৎ হস্তগতকৃত দিরহামকে জাল বা অচল পায়, অতঃপর তা মজলিসের মধ্যে ফেরত প্রদান করে, তাহলে ফেরত প্রদান করার দ্বারা চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে।
মালেকী ফকীহগণ বলেন: যদি দিরহাম বা দিনারের মধ্যে ঘাটতি বা খাদ জাতীয় কোনো রূপ ত্রুটি পায় অথবা রৌপ্য বা স্বর্ণ ছাড়া অন্য কিছু দেখতে পায়, আর এটি যদি মজলিস ত্যাগ করার পূর্বে প্রকাশিত হয়, তা হলে তাতে সম্মত হওয়া তার জন্য বৈধ হবে এবং সরফ চুক্তি শুদ্ধ হবে।
শাফেয়ী ফকীহগণ বলেন: যদি নগদে সরফ চুক্তি এই শর্তে সম্পাদিত হয় যে, তা রৌপ্য বা স্বর্ণ, আর প্রকাশিত হলো যে, তার একটি বা উভয়টি তামা, তাহলে চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে। হাম্বলী ফকীহগণ বলেন, যদি দুই বিনিময়ের কোনো একটির পুরোটার মধ্যে অন্য শ্রেণীর অন্তর্ভুক্তিতে সামান্য ত্রুটিও প্রকাশ পায়; যেমন দিরহামের মধ্যে তামা, স্বর্ণের মধ্যে আলমাস তাহলে চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে।
টিকাঃ
১৪১. কাসানী রচিত বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২১৯
১৪২. ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ২৩৬
১৪৩. দারদীর রচিত আশ শরহুস সগীর, খ. ৩, পৃ. ৫৮-৫৯; জাওয়াহিবুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ১৩
১৪৪. আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ৭৬; আল মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ২৭৯
১৪৫. প্রাগুক্ত।
১৪৬. কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ২৬৭-২৬৮
১৪৭. আল মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৪৮
১৪৮. প্রাগুক্ত।
১৪৯. ইবনে কুদামা রচিত, খ. ৪, পৃ. ৫১