📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 ভেজালযুক্ত দিরহাম এবং দিনারের মুদ্রাবিনিময় চুক্তি

📄 ভেজালযুক্ত দিরহাম এবং দিনারের মুদ্রাবিনিময় চুক্তি


যদি সচল থাকে তাহলে প্রচলন ও প্রথার দিক বিবেচনা করে সামগ্রিকভাবে ফকীহগণ ভেজাল দিনার-দিরহামের লেনদেন বৈধ হওয়ার ব্যাপারে একমত হয়েছেন।

হানাফী ফকীহগণ বলেন: যেটিতে স্বর্ণ বা রৌপ্যের পরিমাণ বেশি তা খাঁটি স্বর্ণ ও রৌপ্য সমতুল্য। যে দিনার-দিরহামে খাদের প্রাধান্য রয়েছে সে দিনার-দিরহাম প্রবল অংশের বিবেচনায় সাধারণ পণ্য তুল্য। সুতরাং তা খাঁটি স্বর্ণ-রৌপ্যের বিনিময়ে বিক্রি করা শুদ্ধ হবে, যদি খাঁটি স্বর্ণ-রৌপ্যের পরিমাণ ভেজালযুক্ত মুদ্রার মধ্যে যতটুকু স্বর্ণ-রৌপ্য আছে তার চেয়ে বেশি হয়। সমশ্রেণীর বিনিময়ে খাদের প্রাধান্যযুক্ত স্বর্ণ-রৌপ্যের ওজনে ও সংখ্যায় কম-বেশি করে মুদ্রা বিনিময় চুক্তি বৈধ হবে। তবে এর জন্য শর্ত হল মজলিস ত্যাগ করার পূর্বে একে অপরে হস্তগত করা।

মালেকী ফকীহগণের মাযহাব হলো, খাদযুক্ত মুদ্রা অনুরূপ খাদযুক্ত মুদ্রার বিনিময়ে ওজন করে বা দরাদরি করে বিক্রি করা বৈধ। খাদমুক্ত মুদ্রার বিপরীতে খাদযুক্ত মুদ্রার বিক্রি বৈধ হওয়ার জন্য শর্ত হলো, তা এমন ব্যক্তির নিকট বিক্রি করা যে তা দ্বারা কাউকে প্রতারিত করবে না।

শাফেয়ী ফকীহগণ বলেন, ওজনকৃত স্বর্ণ-রৌপ্যের সাথে মিশ্রিত খাদ বিনাশর্তে নিষিদ্ধ; পরিমাণে কম হোক কিম্বা বেশি। কারণ ওজন করার দ্বারা এটি প্রকাশিত হয়ে যাবে এবং সমান সমান হওয়ার ক্ষেত্রে অন্তরায় সৃষ্টি করবে। অতএব খাদযুক্ত রৌপ্যের বিনিময়ে খাঁটি রৌপ্য বা অনুরূপ খাদযুক্ত রৌপ্য বিক্রি করা যাবে না।

খাদযুক্ত মুদ্রাসমূহকে অনুরূপ মুদ্রার বিনিময়ে বিক্রি করার ক্ষেত্রে হাম্বলী ফকীহগণ সোনা-রূপা ও খাদ বরাবর হওয়া এবং তার পরিমাণ জানা থাকা এর বিপরীতে বরাবর না হওয়া অথবা পরিমাণ জানা না থাকার মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তারা বলেছেন, খাদযুক্ত মুদ্রাকে অনুরূপ মুদ্রার বিনিময়ে বিক্রি করা প্রথম অবস্থায় (অর্থাৎ খাদের পরিমাণ সমান সমান এবং তার পরিমাণ জানা থাকা অবস্থায়) বৈধ। আর দ্বিতীয় অবস্থা বৈধ নয়।

টিকাঃ
১১২. আদ দুরূল মুখতার, খ. ৪, পৃ. ২৪০; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২২০
১১৩. ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ২৪০-২৪১; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২২০
১১৪. যায়লায়ী রচিত তাবয়ীনুল হাকায়িক, খ. ৪, পৃ. ১৪১-১৪২; ফাতহুল কাদীর মাআল হিদায়া, খ. ৬, পৃ. ২৭৪
১১৬. হাত্তাব রচিত মাওয়াহিবুল জালীল, খ. ৪, পৃ. ৩৩৫; জাওয়াহিবুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ১৬
১১৭. জাওয়াহিবুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ১৬, আশ শরহুল সগীর, খ. ৩, পৃ. ৬৫
১১৮. সুবকী রচিত তাকমিলাতুল মাজমু, খ. ১০, পৃ. ৩৯৮
১১৯. আল মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ২৮১
১২০. তাকমিলাতুল মাজমু, খ. ১, পৃ. ৪০৮
১২১. তাকমিলাতুল মাজমু, খ. ১০, পৃ. ৪০৯; মুগনিল-মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৭
১২২. সুবকী রচিত তাকমিলাতুল মাজমু, খ. ১০, পৃ. ৪০৯-৪১১
১২৪. কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ২৬১
১২৫. ইবনে কুদামা রচিত আল মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৪৮-৫১

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 সপ্তম প্রকার : খুচরা মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রাবিনিময়-চুক্তি

📄 সপ্তম প্রকার : খুচরা মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রাবিনিময়-চুক্তি


আল-ফুলূসু (الْقُلُوسُ) হলো সীলযুক্ত তাম্র বা লোহা যা দ্বারা লেনদেন করা যায়। মোটকথা স্বর্ণ-রূপা ব্যতীত অন্য যে কোনো পদার্থ দ্বারা প্রস্তুতকৃত সীল-মনোগ্রামযুক্ত মুদ্রাই আল-ফুলূসু। খুচরা মুদ্রার বিনিময়ে বিক্রি বৈধ হওয়ার ব্যাপারে ফকীহগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন। কারণ তা এমন সম্পদ যার মূল্য আছে এবং যা নির্ধারিত। যদি তা অচল হয় তাহলে তা নির্দিষ্ট করা আবশ্যক। কারণ, তখন তা বস্তুসামগ্রী।

যদি দিরহাম ও দিনারের বিনিময়ে বাকিতে সচল খুচরা মুদ্রার মুদ্রাবিনিময়চুক্তি করা হয়, অথবা খুচরা মুদ্রার বিনিময়ে খুচরা মুদ্রা কম-বেশি করে মুদ্রাবিনিময়চুক্তি করা হয়, তাহলে তা নিয়ে ফকীহগণ মতবিরোধ করেছেন।

টিকাঃ
১২৬. আদ দুসুকী, খ. ৩, পৃ. ৪৫; মুগনিল-মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৭; শরহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৯৪
১২৭. শরহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৯৪; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ২৫২; আল ফুরু, খ. ৪, পৃ. ১৪৮-১৫০
১২৮. আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ২২; মুগনিল-মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২৫; আল জুমাল, খ. ৩, পৃ. ৪৫
১২৯. আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ২২; আল কালয়ুবী, খ. ২, পৃ. ৫২; মুগনিল-মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২৫
১৩০. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ১৮৫
১৩১. আল হিদায়া মাআল ফাতহ, খ. ৬, পৃ. ১৬২

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 প্রথম দৃষ্টিভঙ্গি

📄 প্রথম দৃষ্টিভঙ্গি


শাফেয়ী আলেমগণ, ইমাম মুহাম্মদ ব্যতীত হানাফী ফকীহবৃন্দ, প্রসিদ্ধ উক্তি অনুযায়ী হাম্বলী ফকীহগণ এবং ইবনে আকিল, শিরাজী ও মুস্তাওইবের গ্রন্থকার প্রমুখ ফকীহগণের মাযহাব হলো, যে সব খুচরা মুদ্রার লেনদেন সংখ্যা গণনার সাহায্যে হয় সেসব খুচরা মুদ্রা সচল হওয়া সত্ত্বেও তাতে কোনোরূপ সুদ হয় না। কারণ তা পরিমাণ ও পরিমাপ বহির্ভূত। বুহুতীর ভাষ্য মতে, এর বিপরীতে কুরআন ও হাদীসের কোনো ভাষ্য নেই। শাফেয়ী ফকীহগণ খুচরা মুদ্রাকে বস্তুসামগ্রীর আওতাভুক্ত করেন যদিও তা সচল হয়।

হানাফী ফকীহগণের দৃষ্টিভঙ্গি : সুদের কারণ হচ্ছে সমশ্রেণী হওয়ার পাশাপাশি তাতে পরিমাণ পাওয়া যাওয়া। এখানে খুচরা মুদ্রায় সমশ্রেণীর বিষয়টি পাওয়া গেলেও পরিমাণ পাওয়া যায়নি। কারণ খুচরা মুদ্রা গণনা করে বিক্রি করা হয়ে থাকে। উক্ত সূত্রের ভিত্তিতে খুচরা মুদ্রার একটিকে অপরটির বিনিময়ে কম-বেশি করে বিক্রি করা বৈধ। যেমনিভাবে দুই ডিমের বিনিময়ে এক ডিম বিক্রি করা বৈধ হয়ে থাকে।

টিকাঃ
১৩২. আল হিদায়া মাআল ফাতহ, খ. ৬, পৃ. ১৬২
১৩৩. ফাতহুল কাদীর মায়াল হিদায়া, খ. ৬, পৃ. ১৬২

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গি

📄 দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গি


মালেকী ফকীহগণের প্রণিধানযোগ্য মত এবং তা হাম্বলী ফকীহগণের একটি বর্ণনা, এবং এটি হানাফী ফকীহ ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর উক্তি, তা হচ্ছে—খুচরা মুদ্রাসমূহের কোনোটিকে অপরটির বিনিময়ে কম-বেশি করে এবং বাকিতে বিক্রি করা বৈধ নয় এবং স্বর্ণ বা রৌপ্যের বিনিময়ে তা বিক্রি করা বৈধ হবে না। মুদাওয়ানা নামক গ্রন্থে আছে : 'মালেক রহ. বলেন, দুই খুচরা মুদ্রার বিনিময়ে এক খুচরা মুদ্রা বিক্রি বৈধ হবে না। সোনা ও রূপার বদলে খুচরা মুদ্রা বিক্রি, এমনিভাবে দিনারের বিপরীতে খুচরা মুদ্রা বাকি বিক্রি সহীহ হবে না।'

হানাফী ফকীহগণ ইমাম মুহাম্মদ রহ. এর প্রমাণ উত্থাপন করেছেন যে, খুচরা মুদ্রা হলো মূল্য; অতএব সমশ্রেণীর বিনিময়ে কম-বেশি করে তা বিক্রি করা বৈধ হবে না যেমন দিনার এবং দিরহামে বৈধ হয় না। ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন : অধিক প্রকাশ্য মত হলো এটি নিষিদ্ধ হওয়া। কারণ সাধারণত সচল মুদ্রাকে মূল্যরূপে সাব্যস্ত করা হয়।

টিকাঃ
১৩৪. আল মুদাওয়ানাতুল কুবরা, খ. ৩, পৃ. ৩৯৫; ফাতহুল কাদীর মায়াল হিদায়া, খ. ৬, পৃ. ১৬২-১৬৩; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ২৫২; আল ফুরু, খ. ৪, পৃ. ১৪৮-১৫১
১৩৫. আল মুদাওয়ানা, খ. ৩, পৃ. ৩৯৫
১৩৬. প্রাগুক্ত।
১৩৭. ইরশাদুস সালিক মায়া শরহিহি আসহালিল মাদারিক, খ. ২, পৃ. ২৩৩
১৩৮. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ১৮৫
১৩৯. মাজমুয়া ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া, খ. ২৯, পৃ. ৪৬৮
১৪০. কাগজের মুদ্রা (ব্যাংক নোট) সম্পর্কে সরফ অধ্যায়ে আলোচনা: এটি স্বর্ণ এবং রৌপ্যের বিধানধারী।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00