📄 পঞ্চম প্রকার : বাকিতে অথবা ঋণে মুদ্রাবিনিময়
এই প্রকার মুদ্রা বিনিময় চুক্তির কয়েকটি অবস্থা রয়েছে:
প্রথম: তুমি কারও নিকট একটি মজলিসে এক দিনারের বিনিময়ে কিছু দিরহাম ক্রয় করলে, অতঃপর তোমার পার্শ্ববর্তী অন্য কোনো ব্যক্তির নিকট এক দিনার ঋণ চাইলে। এরপর সে তার পার্শ্ববর্তী কোনো ব্যক্তির নিকট কিছু দিরহাম ঋণ চাইলে তুমি তাকে দিনার প্রদান করে সে দিরহামগুলো হস্তগত করলে। তাহলে হানাফী, শাফেয়ী এবং হাম্বলী ফকীহগণের মাযহাব হলো, যদি উভয় পক্ষ মজলিসে হস্তগত করে তাহলে মুদ্রাবিনিময় চুক্তি শুদ্ধ হবে। মালেকী ফকীহগণ বলেন: যদি উভয় পক্ষ বাকি রাখে তাহলে চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে।
দ্বিতীয় অবস্থা : জনৈক ব্যক্তির অন্য ব্যক্তির নিকট স্বর্ণ পাওনা আছে। সে ব্যক্তির প্রথম ব্যক্তিটির নিকট কিছু দিরহাম পাওনা আছে। অতঃপর উভয়ে তাদের ঋণের বিনিময়ে মুদ্রাবিনিময় করল। শাফেয়ী এবং হাম্বলী ফকীহগণের মাযহাব হলো এধরনের মুদ্রাবিনিময় চুক্তি বৈধ নয়। তারা কারণ বর্ণনা করেন, এটি ঋণের বিনিময়ে ঋণ বিক্রি। হানাফী ফকীহগণ বলেন : দেনাদারের এক দিনারের বিনিময়ে ঋণ হিসাবে থাকা দশ দিরহামকে পাওনাদার অর্থাৎ ঋণদাতার নিকট বিক্রি করা শুদ্ধ হবে। বৈধতার কারণ হলো, তা হস্তগত করা আবশ্যক নয় এবং তা হস্তগত করার দ্বারাও নির্দিষ্ট হয় না।
মালেকী ফকীহগণ বলেন : যদি ঋণের বিনিময়ে ঋণে মুদ্রাবিনিময় চুক্তি হয়, তাহলে যদি উভয় ঋণ উভয় পক্ষের ওপর বাকি থাকে—দুই মেয়াদের সময়সীমা এক হোক কিম্বা ভিন্ন হোক—মেয়াদদ্বয় আসার পূর্বে তারা দুই পক্ষ মুদ্রাবিনিময় চুক্তি করে অর্থাৎ তাদের উভয় পক্ষ এক পক্ষ আরেক পক্ষের কাছে যা পাওনা আছে তা সমান সমান হারে রহিত করে দেয় তাহলে তা বৈধ হবে না।
তৃতীয় অবস্থা: দুই ধরনের মুদ্রার মধ্যে একটি আরেকটির পরিবর্তে উসুল করা। মজলিসের মধ্যে বিনিময় হস্তগত করার শর্তে হানাফী, হাম্বলী ফকীহগণের মতে এরূপ করা বৈধ হবে। এটি শাফেয়ী ফকীহগণের নতুন মাযহাব। কারণ এর পক্ষে ইবনে ওমর রা.-এর হাদীস রয়েছে: 'তোমাদের দুই পক্ষের মাঝে কোনো কিছু অমীমাংসিত রেখে মজলিস ত্যাগ না করা পর্যন্ত ঐ দিনের মূল্যে তা গ্রহণ করা হলে কোনো সমস্যা নেই।'
টিকাঃ
৯৮. হাশিয়া ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ২৩৫; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২৩-২৫; ইবনে কুদামা রচিত আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৫১
৯৯. ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ২৩৫; ইবনে কুদামা রচিত আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৫১
১০০. মাওয়াহিবুল জালীল লিল হাত্তাব, খ. ৪, পৃ. ৩০৯; আল মুওয়াক, খ. ৪, পৃ. ৩১০
১০১. রওজাতুত তালেবীন, খ. ৩, পৃ. ৫১৬; মুগনিল-মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২৫; ইবনে কুদামা রচিত, খ. ৪, পৃ. ৫৩-৫৪; হাদীস : 'তিনি বাকির বিনিময়ে বাকি বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন।' বায়হাকী (খ. ৫, পৃ. ২৯০) কর্তৃক উদ্ধৃত।
১০২. ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ২৩৯; আল হিদায়া মায়াল ফাতহ, খ. ৬, পৃ. ২৬২; যায়লায়ী, খ. ৪, পৃ. ১৪০
১০৩. প্রাগুক্ত।
১০৪. খুচরা দিনার অথবা দিরহাম, দ্রষ্টব্য তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৪, পৃ. ১৩৯
১০৫. ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ২৩৯
১০৬. জাওয়াহিবুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ১০-১১; বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ১৭৪
১০৭. জাওয়াহিবুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ১০-১১; আল হাত্তাব, খ. ৪, পৃ. ৩১০; আশ শরহুস সগীর, খ. ৩, পৃ. ৫০
১০৮. জাওয়াহিবুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৭৬-৭৭; বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ১৭৪
১০৯. ইবনে ওমর রা.-এর হাদীস: আবু দাউদ (খ. ৩, পৃ. ৬৫১) কর্তৃক উদ্ধৃত।
১১০. ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ২৪৪; রওজাতুত তালিবিন, খ. ৩, পৃ. ৫১৫; ইবনে কুদামা রচিত আল মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৫৪
১১১. ইবনে কুদামা রচিত আল মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৫৪
📄 ষষ্ঠ প্রকার
ষষ্ঠ প্রকার : (صَرْفُ الدَّرَاهِم وَالدَّنَانِيرِ الْمَعْشُوشَةِ) ভেজালযুক্ত দিরহাম এবং দিনারের মুদ্রাবিনিময় চুক্তি।
📄 ভেজালযুক্ত দিরহাম এবং দিনারের মুদ্রাবিনিময় চুক্তি
যদি সচল থাকে তাহলে প্রচলন ও প্রথার দিক বিবেচনা করে সামগ্রিকভাবে ফকীহগণ ভেজাল দিনার-দিরহামের লেনদেন বৈধ হওয়ার ব্যাপারে একমত হয়েছেন।
হানাফী ফকীহগণ বলেন: যেটিতে স্বর্ণ বা রৌপ্যের পরিমাণ বেশি তা খাঁটি স্বর্ণ ও রৌপ্য সমতুল্য। যে দিনার-দিরহামে খাদের প্রাধান্য রয়েছে সে দিনার-দিরহাম প্রবল অংশের বিবেচনায় সাধারণ পণ্য তুল্য। সুতরাং তা খাঁটি স্বর্ণ-রৌপ্যের বিনিময়ে বিক্রি করা শুদ্ধ হবে, যদি খাঁটি স্বর্ণ-রৌপ্যের পরিমাণ ভেজালযুক্ত মুদ্রার মধ্যে যতটুকু স্বর্ণ-রৌপ্য আছে তার চেয়ে বেশি হয়। সমশ্রেণীর বিনিময়ে খাদের প্রাধান্যযুক্ত স্বর্ণ-রৌপ্যের ওজনে ও সংখ্যায় কম-বেশি করে মুদ্রা বিনিময় চুক্তি বৈধ হবে। তবে এর জন্য শর্ত হল মজলিস ত্যাগ করার পূর্বে একে অপরে হস্তগত করা।
মালেকী ফকীহগণের মাযহাব হলো, খাদযুক্ত মুদ্রা অনুরূপ খাদযুক্ত মুদ্রার বিনিময়ে ওজন করে বা দরাদরি করে বিক্রি করা বৈধ। খাদমুক্ত মুদ্রার বিপরীতে খাদযুক্ত মুদ্রার বিক্রি বৈধ হওয়ার জন্য শর্ত হলো, তা এমন ব্যক্তির নিকট বিক্রি করা যে তা দ্বারা কাউকে প্রতারিত করবে না।
শাফেয়ী ফকীহগণ বলেন, ওজনকৃত স্বর্ণ-রৌপ্যের সাথে মিশ্রিত খাদ বিনাশর্তে নিষিদ্ধ; পরিমাণে কম হোক কিম্বা বেশি। কারণ ওজন করার দ্বারা এটি প্রকাশিত হয়ে যাবে এবং সমান সমান হওয়ার ক্ষেত্রে অন্তরায় সৃষ্টি করবে। অতএব খাদযুক্ত রৌপ্যের বিনিময়ে খাঁটি রৌপ্য বা অনুরূপ খাদযুক্ত রৌপ্য বিক্রি করা যাবে না।
খাদযুক্ত মুদ্রাসমূহকে অনুরূপ মুদ্রার বিনিময়ে বিক্রি করার ক্ষেত্রে হাম্বলী ফকীহগণ সোনা-রূপা ও খাদ বরাবর হওয়া এবং তার পরিমাণ জানা থাকা এর বিপরীতে বরাবর না হওয়া অথবা পরিমাণ জানা না থাকার মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তারা বলেছেন, খাদযুক্ত মুদ্রাকে অনুরূপ মুদ্রার বিনিময়ে বিক্রি করা প্রথম অবস্থায় (অর্থাৎ খাদের পরিমাণ সমান সমান এবং তার পরিমাণ জানা থাকা অবস্থায়) বৈধ। আর দ্বিতীয় অবস্থা বৈধ নয়।
টিকাঃ
১১২. আদ দুরূল মুখতার, খ. ৪, পৃ. ২৪০; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২২০
১১৩. ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ২৪০-২৪১; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২২০
১১৪. যায়লায়ী রচিত তাবয়ীনুল হাকায়িক, খ. ৪, পৃ. ১৪১-১৪২; ফাতহুল কাদীর মাআল হিদায়া, খ. ৬, পৃ. ২৭৪
১১৬. হাত্তাব রচিত মাওয়াহিবুল জালীল, খ. ৪, পৃ. ৩৩৫; জাওয়াহিবুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ১৬
১১৭. জাওয়াহিবুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ১৬, আশ শরহুল সগীর, খ. ৩, পৃ. ৬৫
১১৮. সুবকী রচিত তাকমিলাতুল মাজমু, খ. ১০, পৃ. ৩৯৮
১১৯. আল মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ২৮১
১২০. তাকমিলাতুল মাজমু, খ. ১, পৃ. ৪০৮
১২১. তাকমিলাতুল মাজমু, খ. ১০, পৃ. ৪০৯; মুগনিল-মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৭
১২২. সুবকী রচিত তাকমিলাতুল মাজমু, খ. ১০, পৃ. ৪০৯-৪১১
১২৪. কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ২৬১
১২৫. ইবনে কুদামা রচিত আল মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৪৮-৫১
📄 সপ্তম প্রকার : খুচরা মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রাবিনিময়-চুক্তি
আল-ফুলূসু (الْقُلُوسُ) হলো সীলযুক্ত তাম্র বা লোহা যা দ্বারা লেনদেন করা যায়। মোটকথা স্বর্ণ-রূপা ব্যতীত অন্য যে কোনো পদার্থ দ্বারা প্রস্তুতকৃত সীল-মনোগ্রামযুক্ত মুদ্রাই আল-ফুলূসু। খুচরা মুদ্রার বিনিময়ে বিক্রি বৈধ হওয়ার ব্যাপারে ফকীহগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন। কারণ তা এমন সম্পদ যার মূল্য আছে এবং যা নির্ধারিত। যদি তা অচল হয় তাহলে তা নির্দিষ্ট করা আবশ্যক। কারণ, তখন তা বস্তুসামগ্রী।
যদি দিরহাম ও দিনারের বিনিময়ে বাকিতে সচল খুচরা মুদ্রার মুদ্রাবিনিময়চুক্তি করা হয়, অথবা খুচরা মুদ্রার বিনিময়ে খুচরা মুদ্রা কম-বেশি করে মুদ্রাবিনিময়চুক্তি করা হয়, তাহলে তা নিয়ে ফকীহগণ মতবিরোধ করেছেন।
টিকাঃ
১২৬. আদ দুসুকী, খ. ৩, পৃ. ৪৫; মুগনিল-মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ১৭; শরহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৯৪
১২৭. শরহু মুনতাহাল ইরাদাত, খ. ২, পৃ. ১৯৪; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ২৫২; আল ফুরু, খ. ৪, পৃ. ১৪৮-১৫০
১২৮. আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ২২; মুগনিল-মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২৫; আল জুমাল, খ. ৩, পৃ. ৪৫
১২৯. আসনাল মাতালিব, খ. ২, পৃ. ২২; আল কালয়ুবী, খ. ২, পৃ. ৫২; মুগনিল-মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২৫
১৩০. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ১৮৫
১৩১. আল হিদায়া মাআল ফাতহ, খ. ৬, পৃ. ১৬২