📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 তৃতীয় প্রকার : মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রা এবং দুই মুদ্রার যে-কোনো একটির অথবা উভয়টির সাথে অন্য বস্তু বিক্রি করা

📄 তৃতীয় প্রকার : মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রা এবং দুই মুদ্রার যে-কোনো একটির অথবা উভয়টির সাথে অন্য বস্তু বিক্রি করা


যদি কেউ ভিন্ন শ্রেণীর মুদ্রার বিপরীতে মুদ্রা বিক্রি করে, এমনিভাবে দুই মুদ্রার যে-কোনো একটি অথবা উভয়টির সাথে বস্তুসামগ্রী বিক্রি করে, যেমন রৌপ্য এবং কাপড়ের বিনিময়ে স্বর্ণ বিক্রি করে অথবা রৌপ্যের বিনিময়ে স্বর্ণখচিত তরবারি বিক্রি করে অথবা রৌপ্যের বিপরীতে এবং রৌপ্যসহ কোনো বস্তু বিক্রি করে এবং মজলিসের মধ্যে পারস্পরিক হস্তগতকরণ সম্পন্ন হয় তাহলে চুক্তি শুদ্ধ হবে। তা অনুমান করে হোক কিম্বা কম-বেশি করে হোক বা সমান সমান করে হোক। কারণ শ্রেণী ভিন্ন হওয়ার কারণে এটি মূলত দ্বিতীয় প্রকারের অন্তর্ভুক্ত।

যদি সমশ্রেণীর মুদ্রার বিনিময়ে অন্য বস্তুসহ মুদ্রা বিক্রি করে; যেমন- রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য এবং তার সাথে অন্য কোনো বস্তু এক দিরহাম এবং এক মুদ পরিমাণ আজওয়া খেজুরের বিনিময়ে দুই দিরহাম, স্বর্ণের বিনিময়ে মুদ্রাখচিত তরবারি বা সমশ্রেণীর মূল্যের বিনিময়ে রৌপ্য, তাহলে এ ব্যাপারে ফকীহগণ মতভেদ করেছেন। শাফেয়ী এবং একমত অনুযায়ী হাম্বলী ফকীহগণের মাযহাব হলো সমশ্রেণীর মুদ্রার বিনিময়ে একটি বা উভয়টির সাথে অন্য বস্তুসহ মুদ্রা বিক্রি করা বৈধ নয়। তারা ফাযালা বিন উবাইদের বর্ণিত হাদীস দ্বারা দলিল প্রদান করে থাকেন। তিনি বলেন: 'রাসূল সা. হারের সাথে যুক্ত স্বর্ণের ব্যাপারে আদেশ করার ফলে স্বর্ণ পৃথক করা হলো। অতঃপর রাসূল সা. তাদেরকে বললেন : স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ সমান সমান।' তারা অর্থগত দিক থেকে এভাবে প্রমাণ উত্থাপন করেন, যদি কেউ চুক্তির মধ্যে ভিন্ন শ্রেণীর দুইটি বিনিময় একত্র করে, তাহলে একটি অপরটির মূল্য অনুসারে অপরটিতে বন্টিত হওয়া আবশ্যক হয়।

হানাফী ফকীহগণ বলেন, যা হাম্বলী ফকীহগণের একটি বর্ণনাও বটে: মুদ্রার বিনিময়ে অন্য বস্তুসহ সমশ্রেণীর মুদ্রা বিক্রি করা বৈধ হবে— যদি একক মুদ্রার পরিমাণ অন্য বস্তু মিশ্রিত মুদ্রার তুলনায় বেশি হয়। অন্যথায় অর্থাৎ উভয় মুদ্রা সমান সমান হলে বা একক মুদ্রার পরিমাণ কম হলে বিক্রি বাতিল হয়ে যাবে।

কারুকার্যখচিত তরবারি বিক্রির ক্ষেত্রে মালেকী ফকীহগণের মূলনীতি হলো, অবৈধ হওয়া। কারণ সমশ্রেণীর বিনিময়ে তা বিক্রি করার ক্ষেত্রে স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ ও বস্তুসামগ্রী বিক্রি হয় বা রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য ও বস্তুসামগ্রী বিক্রি হয়। তবে প্রয়োজনের তাগিদে এক্ষেত্রে তিনটি শর্তসাপেক্ষে অনুমোদন করা হয়েছে।

টিকাঃ
৮০. ফাযালা বিন উবাইদ রা.-এর হাদীস: স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ সমান সমান। মুসলিম (খ. ৩, পৃ. ১২১১) কর্তৃক উদ্ধৃত।
৮১. ইবনে কুদামা রচিত আল মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৯-৪১, মুগনিল-মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২৮
৮২. ফাতহুল কাদীর মাআল হিদায়া, খ. ৬, পৃ. ২৬৬
৮৩. আল ইখতিয়ার, খ. ২, পৃ. ৪০-৪১; ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ২৩৬
৮৪. সূরা: আর রাহমান, আয়াত- ২২
৮৫. আল ইখতিয়ার, খ. ২, পৃ. ৪০-৪১; ফাতহুল কাদীর, খ. ৬, পৃ. ২৬৬; ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ২৩৭
৮৬. আল হিদায়া মাআল ফাতহিল কাদীর, খ. ৬, পৃ. ২৭২
৮৭. আদ দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৪০; আল কাওয়ানিনুল ফিকহিয়‍্যা, পৃ. ২৫২; বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ১৭২
৮৮. প্রাগুক্ত।
৮৯. বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ১৭২

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 চতুর্থ প্রকার : দিনার ও দিরহামের বিনিময়ে দিনার-দিরহাম বিক্রি করা

📄 চতুর্থ প্রকার : দিনার ও দিরহামের বিনিময়ে দিনার-দিরহাম বিক্রি করা


মালেকী, শাফেয়ী, হাম্বলী এবং হানাফী ফকীহ যুফারসহ অধিকাংশ ফকীহের মাযহাব হলো, যদি একজনের দিরহাম বা দিনার বা সমুদয় দিরহাম ও দিনারের বিনিময়ে অপরজনের সমুদয় দিরহাম ও দিনার বিক্রি করে, তাহলে চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে। শাফেয়ী ও হাম্বলী ফকীহগণ মনে করেন, এই মাসআলাটি এক মুদ আজওয়ার মাসআলার শাখা। তারা বলেন : চুক্তির দুই পক্ষের যে-কোনো এক পক্ষে অথবা উভয় পক্ষে ভিন্ন ভিন্ন সম্পদ থাকায় উভয় পক্ষের নিকট যা আছে তার পরিমাণ মূল্যের বিবেচনায় নির্ধারিত হবে। তাতে হয়তো কম-বেশি হবে বা সমান হওয়ার ব্যাপারে অজ্ঞতার সৃষ্টি হবে।

মালেকী ফকীহগণ বলেছেন, এক পক্ষের স্বর্ণ ও রৌপ্যকে অপর পক্ষের অনুরূপ স্বর্ণ-রৌপ্যের বিনিময়ে বিক্রি করা বৈধ নয়। কারণ, সম্ভাবনা রয়েছে যে, চুক্তিকারী দুই পক্ষের এক পক্ষ অপর পক্ষের দিনারের প্রতি আগ্রহী হয়ে নিজ দিনার এবং দিরহামের কিছু অংশ দ্বারা উক্ত দিনারের বিনিময় করবে। এভাবে সাব্যস্ত হবে, বিনিময় সমান সমান হয়নি।

ইমাম যুফার রহ. ব্যতীত হানাফী ফকীহগণ বলেন, এক দিরহাম ও দুই দিনারের বিনিময়ে দুই দিরহাম ও এক দিনার বিক্রি করা শুদ্ধ আছে। আর প্রতিটি শ্রেণীকে তার বিপরীত শ্রেণীর বিনিময় সাব্যস্ত করা হবে। অতএব প্রকৃত পক্ষে এটি হবে, দুই দিনারের বিনিময়ে দুই দিরহাম বিক্রি এবং এক দিনারের বিনিময়ে এক দিরহাম বিক্রি। হিদায়া গ্রন্থে বলা হয়েছে: সমশ্রেণীর দ্বারা যেভাবে সমশ্রেণীর বিনিময় করা হয় তদ্রূপ শর্তহীন বিনিময় বলতে অংশ-বিশেষের দ্বারা অংশ-বিশেষের বিনিময় সাব্যস্ত করা হবে।

টিকাঃ
৯০. মুগনিল-মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২৮; ইবনে কুদামা রচিত আল মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৯-৪১
৯১. সুবকী রচিত তাকমিলাতুল মাজমু, খ. ১০, পৃ. ৩২৯
৯২. তাকমিলাতুল মাজমু, খ. ১০, পৃ. ২৩৯
৯৩. জাওয়াহিবুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ১০; আশ শরহুস সাগীর, খ. ৩, পৃ. ৪৮-৪৯; আদ দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৩৯
৯৪. মাউসিলী রচিত আল ইখতিয়ার, খ. ২, পৃ. ৪০; ফাতহুল কাদীর, খ. ৬, পৃ. ৩৬৮-৩৫৯; আইনী রচিত আল বিনায়া, খ. ৬, পৃ. ৭০০
৯৫. আল হিদায়া মায়াল ফাতহু, খ. ৬, পৃ. ২৬৯
৯৬. আল ইখতিয়ার, খ. ২, পৃ. ৪০
৯৭. আল হিদায়া মায়া ফাতহিল কাদীর ওয়াল ইনায়া, খ. ৬, পৃ.২৭১

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 পঞ্চম প্রকার : বাকিতে অথবা ঋণে মুদ্রাবিনিময়

📄 পঞ্চম প্রকার : বাকিতে অথবা ঋণে মুদ্রাবিনিময়


এই প্রকার মুদ্রা বিনিময় চুক্তির কয়েকটি অবস্থা রয়েছে:

প্রথম: তুমি কারও নিকট একটি মজলিসে এক দিনারের বিনিময়ে কিছু দিরহাম ক্রয় করলে, অতঃপর তোমার পার্শ্ববর্তী অন্য কোনো ব্যক্তির নিকট এক দিনার ঋণ চাইলে। এরপর সে তার পার্শ্ববর্তী কোনো ব্যক্তির নিকট কিছু দিরহাম ঋণ চাইলে তুমি তাকে দিনার প্রদান করে সে দিরহামগুলো হস্তগত করলে। তাহলে হানাফী, শাফেয়ী এবং হাম্বলী ফকীহগণের মাযহাব হলো, যদি উভয় পক্ষ মজলিসে হস্তগত করে তাহলে মুদ্রাবিনিময় চুক্তি শুদ্ধ হবে। মালেকী ফকীহগণ বলেন: যদি উভয় পক্ষ বাকি রাখে তাহলে চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে।

দ্বিতীয় অবস্থা : জনৈক ব্যক্তির অন্য ব্যক্তির নিকট স্বর্ণ পাওনা আছে। সে ব্যক্তির প্রথম ব্যক্তিটির নিকট কিছু দিরহাম পাওনা আছে। অতঃপর উভয়ে তাদের ঋণের বিনিময়ে মুদ্রাবিনিময় করল। শাফেয়ী এবং হাম্বলী ফকীহগণের মাযহাব হলো এধরনের মুদ্রাবিনিময় চুক্তি বৈধ নয়। তারা কারণ বর্ণনা করেন, এটি ঋণের বিনিময়ে ঋণ বিক্রি। হানাফী ফকীহগণ বলেন : দেনাদারের এক দিনারের বিনিময়ে ঋণ হিসাবে থাকা দশ দিরহামকে পাওনাদার অর্থাৎ ঋণদাতার নিকট বিক্রি করা শুদ্ধ হবে। বৈধতার কারণ হলো, তা হস্তগত করা আবশ্যক নয় এবং তা হস্তগত করার দ্বারাও নির্দিষ্ট হয় না।

মালেকী ফকীহগণ বলেন : যদি ঋণের বিনিময়ে ঋণে মুদ্রাবিনিময় চুক্তি হয়, তাহলে যদি উভয় ঋণ উভয় পক্ষের ওপর বাকি থাকে—দুই মেয়াদের সময়সীমা এক হোক কিম্বা ভিন্ন হোক—মেয়াদদ্বয় আসার পূর্বে তারা দুই পক্ষ মুদ্রাবিনিময় চুক্তি করে অর্থাৎ তাদের উভয় পক্ষ এক পক্ষ আরেক পক্ষের কাছে যা পাওনা আছে তা সমান সমান হারে রহিত করে দেয় তাহলে তা বৈধ হবে না।

তৃতীয় অবস্থা: দুই ধরনের মুদ্রার মধ্যে একটি আরেকটির পরিবর্তে উসুল করা। মজলিসের মধ্যে বিনিময় হস্তগত করার শর্তে হানাফী, হাম্বলী ফকীহগণের মতে এরূপ করা বৈধ হবে। এটি শাফেয়ী ফকীহগণের নতুন মাযহাব। কারণ এর পক্ষে ইবনে ওমর রা.-এর হাদীস রয়েছে: 'তোমাদের দুই পক্ষের মাঝে কোনো কিছু অমীমাংসিত রেখে মজলিস ত্যাগ না করা পর্যন্ত ঐ দিনের মূল্যে তা গ্রহণ করা হলে কোনো সমস্যা নেই।'

টিকাঃ
৯৮. হাশিয়া ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ২৩৫; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২৩-২৫; ইবনে কুদামা রচিত আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৫১
৯৯. ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ২৩৫; ইবনে কুদামা রচিত আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৫১
১০০. মাওয়াহিবুল জালীল লিল হাত্তাব, খ. ৪, পৃ. ৩০৯; আল মুওয়াক, খ. ৪, পৃ. ৩১০
১০১. রওজাতুত তালেবীন, খ. ৩, পৃ. ৫১৬; মুগনিল-মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২৫; ইবনে কুদামা রচিত, খ. ৪, পৃ. ৫৩-৫৪; হাদীস : 'তিনি বাকির বিনিময়ে বাকি বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন।' বায়হাকী (খ. ৫, পৃ. ২৯০) কর্তৃক উদ্ধৃত।
১০২. ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ২৩৯; আল হিদায়া মায়াল ফাতহ, খ. ৬, পৃ. ২৬২; যায়লায়ী, খ. ৪, পৃ. ১৪০
১০৩. প্রাগুক্ত।
১০৪. খুচরা দিনার অথবা দিরহাম, দ্রষ্টব্য তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ. ৪, পৃ. ১৩৯
১০৫. ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ২৩৯
১০৬. জাওয়াহিবুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ১০-১১; বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ১৭৪
১০৭. জাওয়াহিবুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ১০-১১; আল হাত্তাব, খ. ৪, পৃ. ৩১০; আশ শরহুস সগীর, খ. ৩, পৃ. ৫০
১০৮. জাওয়াহিবুল ইকলীল, খ. ২, পৃ. ৭৬-৭৭; বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ১৭৪
১০৯. ইবনে ওমর রা.-এর হাদীস: আবু দাউদ (খ. ৩, পৃ. ৬৫১) কর্তৃক উদ্ধৃত।
১১০. ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ২৪৪; রওজাতুত তালিবিন, খ. ৩, পৃ. ৫১৫; ইবনে কুদামা রচিত আল মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৫৪
১১১. ইবনে কুদামা রচিত আল মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৫৪

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 ষষ্ঠ প্রকার

📄 ষষ্ঠ প্রকার


ষষ্ঠ প্রকার : (صَرْفُ الدَّرَاهِم وَالدَّنَانِيرِ الْمَعْشُوشَةِ) ভেজালযুক্ত দিরহাম এবং দিনারের মুদ্রাবিনিময় চুক্তি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00