📄 সরফ-চুক্তির প্রকারসমূহ (أَنْوَاعُ الصَّرْفِ)
ফকীহগণ সরফ বা মুদ্রাবিনিময় অধ্যায়ে যে সকল উদাহরণ ও অবস্থা আলোচনা করেছেন, তার আলোকে সরফ-চুক্তিকে কয়েকটি প্রকারে ভাগ করা হয়েছে। নিচে এর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো।
📄 প্রথম প্রকার : দুই মুদ্রা (স্বর্ণ ও রৌপ্য)-এর একটিকে সমশ্রেণীর অপরটির বিনিময়ে বিক্রি করা
ফকীহগণ এ কথায় একমত, যদি রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য বা স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ বিক্রি করে তাহলে পরিমাণ ও পরিমাপে সমান সমান হয়ে নগদে বিক্রি হওয়া আবশ্যক। মুদ্রাকে সমশ্রেণীর মুদ্রার বিনিময়ে কম-বেশি করে বিক্রি করা হারাম হবে, যেমনিভাবে তা তার সমশ্রেণীর মুদ্রার বিনিময়ে বাকিতে বিক্রি করা হারাম হয়। স্বর্ণ এবং রৌপ্যে উৎকৃষ্ট-নিকৃষ্ট হওয়া কোনো ধর্তব্য নয়। কারণ, রাসূল স.-এর বাণী : 'তার উৎকৃষ্ট ও নিকৃষ্ট সব সমান'। ফকীহগণ শর্ত করেছেন, চুক্তিকারী উভয় পক্ষকে দুই বিনিময়ের পরিমাণ সম্পর্কে এবং দুই বিনিময় সমান সমান হওয়া সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে।
অধিকাংশ ফকীহ এ কথায় একমত, অলংকার বা পাত্রের গড়ন এখানে কোনো ধর্তব্য নয়। সুতরাং সমান সমান হওয়ার বিষয়টি শর্তহীন থাকার দরুন অলংকারের বিনিময়ে অলংকার হতে পারে, পাত্রের বিনিময়ে স্বর্ণপিণ্ড হতে পারে। মালেকী ফকীহগণ এককভাবে সমশ্রেণীর মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রা বিক্রি করাকে আল-মুরাতালাহ বা আল-মুবাদালাহ নামকরণ করেছেন। আল-মুরাতালাহ হলো সমশ্রেণীর মুদ্রার বিনিময়ে পরিমাণ করে মুদ্রা বিক্রি করা। আল-মুবাদালাহ হচ্ছে সমশ্রেণীর মুদ্রার বিনিময়ে গণনা করে মুদ্রা বিক্রি করা। মালেকী ফকীহগণের মতে সুদী মুদ্রার মধ্যে অতিরিক্ত হারাম করা হয়েছে—যদিও তা নগদ বিক্রি হয়। আল-মুরাতালাহ হচ্ছে মুদ্রাকে তার সমশ্রেণীর বিনিময়ে অর্থাৎ স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ বা রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য বাটখারা বা দাড়িপাল্লার সাহায্যে পরিমাণ করে বিক্রি করা।
📄 দ্বিতীয় প্রকার : দুই মুদ্রার যে-কোনো একটিকে অপরটির বিনিময়ে বিক্রি
দুইটি মুদ্রার যে-কোনো একটিকে অপরটির বিনিময়ে পরিমাণে এবং সংখ্যায় তারতম্য করে বা সমান সমান করে বিক্রি করা বৈধ হওয়ায় ফকীহগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন। যেমনিভাবে দুইটি মুদ্রার একটিকে অপরটির বিনিময়ে অনুমান করে, অর্থাৎ চুক্তিকারী দুই পক্ষের কোনো এক পক্ষ বা উভয় পক্ষ দুই বিনিময়ের পরিমাণ এবং ওজন সম্পর্কে না জেনে বিক্রি করা বৈধ হওয়ায় ফকীহগণ একমত হয়েছেন। কারণ শ্রেণী ভিন্ন হওয়ার কারণে এটি মূলত প্রথম প্রকারের বহির্ভূত।
তবে এই প্রকার মুদ্রা বিনিময় চুক্তির ক্ষেত্রেও মজলিস ত্যাগ করার পূর্বে পারস্পরিক হস্তগত করা শর্ত। কারণ, সব ধরনের মুদ্রাবিনিময় চুক্তির মধ্যে বাকিজনিত সুদ অবৈধ। পারস্পরিক হস্তগত করার অবস্থায় বৈধতাকে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে, এর মাধ্যমে হারাম থেকে উক্ত অবস্থাকে ব্যতিক্রম সাব্যস্ত করা হয়েছে। সুতরাং উক্ত অবস্থা ছাড়া অন্য কোনো অবস্থায় বৈধতা থাকবে না। তাই ব্যতিক্রম অবস্থার ব্যাপকতার আওতাভুক্ত থাকবে কম-বেশি, সমান-সমান ও অনুমানের অবস্থা। সুতরাং এ সব বৈধ হবে। মালেকী ফকীহগণ কেবল উক্ত প্রকারকে الصرف (আস-সরফু) অর্থাৎ মুদ্রাবিনিময়-চুক্তি নামে অভিহিত করেন।
টিকাঃ
৭৭. হাদীস : 'শ্রেণী ভিন্ন হলে তোমরা যেভাবে ইচ্ছা নগদে বিক্রি করো।' ইমাম যাইলায়ী রহ. নাসবুর রায়া গ্রন্থে (খ. ৪, পৃ. ৪) এটি উল্লেখ করেছেন।
৭৮. ফাতহুল কাদীর, খ. ৬, পৃ. ২৬২
৭৯. হাশিয়া ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ২৩৫; দারদির রচিত আশ শারহুস সাগীর, খ. ৩, পৃ. ৪৮; মুগনিল-মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২০৪; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ২৫৪; ইবনে কুদামা রচিত আল মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১১-৩৯
📄 তৃতীয় প্রকার : মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রা এবং দুই মুদ্রার যে-কোনো একটির অথবা উভয়টির সাথে অন্য বস্তু বিক্রি করা
যদি কেউ ভিন্ন শ্রেণীর মুদ্রার বিপরীতে মুদ্রা বিক্রি করে, এমনিভাবে দুই মুদ্রার যে-কোনো একটি অথবা উভয়টির সাথে বস্তুসামগ্রী বিক্রি করে, যেমন রৌপ্য এবং কাপড়ের বিনিময়ে স্বর্ণ বিক্রি করে অথবা রৌপ্যের বিনিময়ে স্বর্ণখচিত তরবারি বিক্রি করে অথবা রৌপ্যের বিপরীতে এবং রৌপ্যসহ কোনো বস্তু বিক্রি করে এবং মজলিসের মধ্যে পারস্পরিক হস্তগতকরণ সম্পন্ন হয় তাহলে চুক্তি শুদ্ধ হবে। তা অনুমান করে হোক কিম্বা কম-বেশি করে হোক বা সমান সমান করে হোক। কারণ শ্রেণী ভিন্ন হওয়ার কারণে এটি মূলত দ্বিতীয় প্রকারের অন্তর্ভুক্ত।
যদি সমশ্রেণীর মুদ্রার বিনিময়ে অন্য বস্তুসহ মুদ্রা বিক্রি করে; যেমন- রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য এবং তার সাথে অন্য কোনো বস্তু এক দিরহাম এবং এক মুদ পরিমাণ আজওয়া খেজুরের বিনিময়ে দুই দিরহাম, স্বর্ণের বিনিময়ে মুদ্রাখচিত তরবারি বা সমশ্রেণীর মূল্যের বিনিময়ে রৌপ্য, তাহলে এ ব্যাপারে ফকীহগণ মতভেদ করেছেন। শাফেয়ী এবং একমত অনুযায়ী হাম্বলী ফকীহগণের মাযহাব হলো সমশ্রেণীর মুদ্রার বিনিময়ে একটি বা উভয়টির সাথে অন্য বস্তুসহ মুদ্রা বিক্রি করা বৈধ নয়। তারা ফাযালা বিন উবাইদের বর্ণিত হাদীস দ্বারা দলিল প্রদান করে থাকেন। তিনি বলেন: 'রাসূল সা. হারের সাথে যুক্ত স্বর্ণের ব্যাপারে আদেশ করার ফলে স্বর্ণ পৃথক করা হলো। অতঃপর রাসূল সা. তাদেরকে বললেন : স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ সমান সমান।' তারা অর্থগত দিক থেকে এভাবে প্রমাণ উত্থাপন করেন, যদি কেউ চুক্তির মধ্যে ভিন্ন শ্রেণীর দুইটি বিনিময় একত্র করে, তাহলে একটি অপরটির মূল্য অনুসারে অপরটিতে বন্টিত হওয়া আবশ্যক হয়।
হানাফী ফকীহগণ বলেন, যা হাম্বলী ফকীহগণের একটি বর্ণনাও বটে: মুদ্রার বিনিময়ে অন্য বস্তুসহ সমশ্রেণীর মুদ্রা বিক্রি করা বৈধ হবে— যদি একক মুদ্রার পরিমাণ অন্য বস্তু মিশ্রিত মুদ্রার তুলনায় বেশি হয়। অন্যথায় অর্থাৎ উভয় মুদ্রা সমান সমান হলে বা একক মুদ্রার পরিমাণ কম হলে বিক্রি বাতিল হয়ে যাবে।
কারুকার্যখচিত তরবারি বিক্রির ক্ষেত্রে মালেকী ফকীহগণের মূলনীতি হলো, অবৈধ হওয়া। কারণ সমশ্রেণীর বিনিময়ে তা বিক্রি করার ক্ষেত্রে স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ ও বস্তুসামগ্রী বিক্রি হয় বা রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য ও বস্তুসামগ্রী বিক্রি হয়। তবে প্রয়োজনের তাগিদে এক্ষেত্রে তিনটি শর্তসাপেক্ষে অনুমোদন করা হয়েছে।
টিকাঃ
৮০. ফাযালা বিন উবাইদ রা.-এর হাদীস: স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ সমান সমান। মুসলিম (খ. ৩, পৃ. ১২১১) কর্তৃক উদ্ধৃত।
৮১. ইবনে কুদামা রচিত আল মুগনী, খ. ৪, পৃ. ৩৯-৪১, মুগনিল-মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২৮
৮২. ফাতহুল কাদীর মাআল হিদায়া, খ. ৬, পৃ. ২৬৬
৮৩. আল ইখতিয়ার, খ. ২, পৃ. ৪০-৪১; ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ২৩৬
৮৪. সূরা: আর রাহমান, আয়াত- ২২
৮৫. আল ইখতিয়ার, খ. ২, পৃ. ৪০-৪১; ফাতহুল কাদীর, খ. ৬, পৃ. ২৬৬; ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ২৩৭
৮৬. আল হিদায়া মাআল ফাতহিল কাদীর, খ. ৬, পৃ. ২৭২
৮৭. আদ দুসূকী, খ. ৩, পৃ. ৪০; আল কাওয়ানিনুল ফিকহিয়্যা, পৃ. ২৫২; বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ১৭২
৮৮. প্রাগুক্ত।
৮৯. বিদায়াতুল মুজতাহিদ, খ. ২, পৃ. ১৭২