📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 চতুর্থ : সমতা ও বরাবর হওয়া (التَّمَاثُل)

📄 চতুর্থ : সমতা ও বরাবর হওয়া (التَّمَاثُل)


এ শর্তটি বিশেষ এক প্রকার মুদ্রাবিনিময় চুক্তির জন্য নির্দিষ্ট। তা হলো, দুইটি মুদ্রার একটিকে তার সমশ্রেণীর বিনিময়ে বিক্রি করা। সুতরাং যদি স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ বা রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য বিক্রি করা হয় তাহলে সে ক্ষেত্রে গুণগত মান এবং আকার-আকৃতিতে উভয় স্বর্ণের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও পরিমাণের দিক থেকে সমান সমান হওয়া আবশ্যক। এটি ফকীহগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। কোনো একটি অতিরিক্ত হওয়া বৈধ নয়—এ অতিরিক্ত অংশটুকু এই শ্রেণী থেকে হোক কিংবা অন্য শ্রেণী থেকে হোক বা তৃতীয় কোনো কিছু হোক। হানাফী ফকীহগণ বাড়িয়ে বলেন, এক্ষেত্রে সংখ্যা মোটে ধর্তব্য নয়। আর শর্ত হলো জ্ঞান ও বিবেচনার দিক থেকে বরাবর হওয়া। শুধু বাস্তবে বরাবর হলে চলবে না। এ ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো রাসূল সা.-এর বাণী: 'তোমরা সমান সমান ব্যতীত স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ বিক্রি করো না, এবং তোমরা সমান সমান ব্যতীত রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য বিক্রি করো না... এবং স্বর্ণ-রৌপ্যের কোনোটি নগদের বিনিময়ে বাকি বিক্রি করো না।'

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 সরফ-চুক্তির প্রকারসমূহ (أَنْوَاعُ الصَّرْفِ)

📄 সরফ-চুক্তির প্রকারসমূহ (أَنْوَاعُ الصَّرْفِ)


ফকীহগণ সরফ বা মুদ্রাবিনিময় অধ্যায়ে যে সকল উদাহরণ ও অবস্থা আলোচনা করেছেন, তার আলোকে সরফ-চুক্তিকে কয়েকটি প্রকারে ভাগ করা হয়েছে। নিচে এর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো।

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 প্রথম প্রকার : দুই মুদ্রা (স্বর্ণ ও রৌপ্য)-এর একটিকে সমশ্রেণীর অপরটির বিনিময়ে বিক্রি করা

📄 প্রথম প্রকার : দুই মুদ্রা (স্বর্ণ ও রৌপ্য)-এর একটিকে সমশ্রেণীর অপরটির বিনিময়ে বিক্রি করা


ফকীহগণ এ কথায় একমত, যদি রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য বা স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ বিক্রি করে তাহলে পরিমাণ ও পরিমাপে সমান সমান হয়ে নগদে বিক্রি হওয়া আবশ্যক। মুদ্রাকে সমশ্রেণীর মুদ্রার বিনিময়ে কম-বেশি করে বিক্রি করা হারাম হবে, যেমনিভাবে তা তার সমশ্রেণীর মুদ্রার বিনিময়ে বাকিতে বিক্রি করা হারাম হয়। স্বর্ণ এবং রৌপ্যে উৎকৃষ্ট-নিকৃষ্ট হওয়া কোনো ধর্তব্য নয়। কারণ, রাসূল স.-এর বাণী : 'তার উৎকৃষ্ট ও নিকৃষ্ট সব সমান'। ফকীহগণ শর্ত করেছেন, চুক্তিকারী উভয় পক্ষকে দুই বিনিময়ের পরিমাণ সম্পর্কে এবং দুই বিনিময় সমান সমান হওয়া সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে।

অধিকাংশ ফকীহ এ কথায় একমত, অলংকার বা পাত্রের গড়ন এখানে কোনো ধর্তব্য নয়। সুতরাং সমান সমান হওয়ার বিষয়টি শর্তহীন থাকার দরুন অলংকারের বিনিময়ে অলংকার হতে পারে, পাত্রের বিনিময়ে স্বর্ণপিণ্ড হতে পারে। মালেকী ফকীহগণ এককভাবে সমশ্রেণীর মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রা বিক্রি করাকে আল-মুরাতালাহ বা আল-মুবাদালাহ নামকরণ করেছেন। আল-মুরাতালাহ হলো সমশ্রেণীর মুদ্রার বিনিময়ে পরিমাণ করে মুদ্রা বিক্রি করা। আল-মুবাদালাহ হচ্ছে সমশ্রেণীর মুদ্রার বিনিময়ে গণনা করে মুদ্রা বিক্রি করা। মালেকী ফকীহগণের মতে সুদী মুদ্রার মধ্যে অতিরিক্ত হারাম করা হয়েছে—যদিও তা নগদ বিক্রি হয়। আল-মুরাতালাহ হচ্ছে মুদ্রাকে তার সমশ্রেণীর বিনিময়ে অর্থাৎ স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ বা রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য বাটখারা বা দাড়িপাল্লার সাহায্যে পরিমাণ করে বিক্রি করা।

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন > 📄 দ্বিতীয় প্রকার : দুই মুদ্রার যে-কোনো একটিকে অপরটির বিনিময়ে বিক্রি

📄 দ্বিতীয় প্রকার : দুই মুদ্রার যে-কোনো একটিকে অপরটির বিনিময়ে বিক্রি


দুইটি মুদ্রার যে-কোনো একটিকে অপরটির বিনিময়ে পরিমাণে এবং সংখ্যায় তারতম্য করে বা সমান সমান করে বিক্রি করা বৈধ হওয়ায় ফকীহগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন। যেমনিভাবে দুইটি মুদ্রার একটিকে অপরটির বিনিময়ে অনুমান করে, অর্থাৎ চুক্তিকারী দুই পক্ষের কোনো এক পক্ষ বা উভয় পক্ষ দুই বিনিময়ের পরিমাণ এবং ওজন সম্পর্কে না জেনে বিক্রি করা বৈধ হওয়ায় ফকীহগণ একমত হয়েছেন। কারণ শ্রেণী ভিন্ন হওয়ার কারণে এটি মূলত প্রথম প্রকারের বহির্ভূত।

তবে এই প্রকার মুদ্রা বিনিময় চুক্তির ক্ষেত্রেও মজলিস ত্যাগ করার পূর্বে পারস্পরিক হস্তগত করা শর্ত। কারণ, সব ধরনের মুদ্রাবিনিময় চুক্তির মধ্যে বাকিজনিত সুদ অবৈধ। পারস্পরিক হস্তগত করার অবস্থায় বৈধতাকে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে, এর মাধ্যমে হারাম থেকে উক্ত অবস্থাকে ব্যতিক্রম সাব্যস্ত করা হয়েছে। সুতরাং উক্ত অবস্থা ছাড়া অন্য কোনো অবস্থায় বৈধতা থাকবে না। তাই ব্যতিক্রম অবস্থার ব্যাপকতার আওতাভুক্ত থাকবে কম-বেশি, সমান-সমান ও অনুমানের অবস্থা। সুতরাং এ সব বৈধ হবে। মালেকী ফকীহগণ কেবল উক্ত প্রকারকে الصرف (আস-সরফু) অর্থাৎ মুদ্রাবিনিময়-চুক্তি নামে অভিহিত করেন।

টিকাঃ
৭৭. হাদীস : 'শ্রেণী ভিন্ন হলে তোমরা যেভাবে ইচ্ছা নগদে বিক্রি করো।' ইমাম যাইলায়ী রহ. নাসবুর রায়া গ্রন্থে (খ. ৪, পৃ. ৪) এটি উল্লেখ করেছেন।
৭৮. ফাতহুল কাদীর, খ. ৬, পৃ. ২৬২
৭৯. হাশিয়া ইবনে আবেদীন, খ. ৪, পৃ. ২৩৫; দারদির রচিত আশ শারহুস সাগীর, খ. ৩, পৃ. ৪৮; মুগনিল-মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ২০৪; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ২৫৪; ইবনে কুদামা রচিত আল মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১১-৩৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00