📄 সংশ্লিষ্ট পরিভাষা
ক. আল-বাইউ : বিক্রি, কেনাবেচা। সাধারণ অর্থে বাইউ হলো পারস্পরিক সম্মতিক্রমে সম্পদের বিপরীতে সম্পদ বিনিময় করা। এ অর্থে মুদ্রা বিনিময় এক প্রকার বিক্রি। আর বিশেষার্থে বিক্রি হলো এমন বিনিময় চুক্তি যার দুই বিনিময়ের মধ্যে একটি স্বর্ণ বা রৌপ্য হবে না।
খ. আর-রিবা : সুদ। রিবা-এর শাব্দিক অর্থ : অতিরিক্ত, বাড়তি। মুদ্রা বিনিময় চুক্তির মধ্যে কোনো শর্তের ব্যত্যয় ঘটলে তাতে সুদের অনুপ্রবেশ ঘটে।
গ. আস-সালামু : সালাম বা অগ্রিম মূল্য পরিশোধে বিক্রি। নগদ মূল্যের বিনিময়ে কোনো বস্তু বাকিতে বিক্রি করা।
ঘ. আল-মুকায়াযাহ : মুকায়াযা বা পণ্য বিনিময়। বস্তুর বিনিময়ে বস্তু বিক্রি অর্থাৎ মুদ্রাদ্বয় ছাড়া অন্য সম্পদের বিপরীতে সম্পদ বিনিময় করা।
📄 الصَّرْفُ বা মুদ্রা বিনিময়-এর বৈধতা
যদি নির্দিষ্ট শর্তগুলো পরিপূর্ণভাবে থাকে তাহলে মূল্যসমূহের একটিকে আরেকটির বিনিময়ে বিক্রি করা অর্থাৎ মুদ্রা ব্যবসা করা বৈধ। কারণ পূর্বের আলোচনার ভিত্তিতে এই মুদ্রা বিনিময় ও এক প্রকার বিক্রি। মহান আল্লাহর ঘোষণা : 'আর আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদ অবৈধ করেছেন।' (সূরা বাকারা : ২৭৫)
মুদ্রা বিনিময়ের বৈধতার পক্ষে অনেক সহীহ হাদীস রয়েছে। যেমন উবাদা বিন সামিত রা. বর্ণনা করেন, রাসূল সা. বলেছেন: 'স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ, রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য, গমের বিনিময়ে গম, যবের বিনিময়ে যব, খেজুরের বিনিময়ে খেজুর, লবণের বিনিময়ে লবণ পরিমাণে সমান সমান এবং নগদে বিক্রি করা যাবে। আর যদি এগুলোর শ্রেণী ভিন্ন হয় তাহলে যেভাবে ইচ্ছা বিক্রি করো।' রাসূল সা. আরো বলেন : 'সমান সমান ব্যতীত স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ বিক্রি করো না, পরস্পরের বিনিময়ে কমবেশি করো না। এবং সমান সমান ব্যতীত রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য বিক্রি করো না, পরস্পরের মধ্যে হ্রাস-বৃদ্ধি করো না। এবং নগদের বিনিময়ে বাকিতে বিক্রি করো না।'
যেহেতু সরফ বা মুদ্রাবিনিময় চুক্তি হলো মূল্যসমূহের একটিকে আরেকটির বিনিময়ে বিক্রি করা এবং এর দ্বারা উদ্দেশ্য কেবল আধিক্য ও বৃদ্ধি, সাধারণ ভাবে হুবহু বিনিময় দ্বারা উপকৃত হওয়া উদ্দেশ্য নয়। অপর দিকে সুদের মধ্যেও অনুরূপ আধিক্য এবং বৃদ্ধি রয়েছে; সেহেতু ফকীহগণ মুদ্রাবিনিময়ে বৈধতার জন্য এমন কিছু শর্ত প্রণয়ন করেছেন যা সরফ বা মুদ্রাবিনিময়কে সুদ থেকে আলাদা করে দেয় এবং সুদের শিকার হওয়া থেকে মানুষকে রক্ষা করে।
📄 الصَّرْفُ বা মুদ্রাবিনিময়ের শর্তাবলি
মুদ্রাবিনিময় বা সরফ চুক্তি শুদ্ধ হওয়ার জন্য শরীয়ত নির্ধারিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে, যা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
📄 প্রথম : পরস্পর উভয় বিনিময় হস্তগতকরণ (تَقَابُضُ الْبَدَلَيْنِ)
ফকীহগণ একথায় একমত, চুক্তি সম্পাদনকারী দুইপক্ষ মজলিস থেকে পৃথক হওয়ার পূর্বে মজলিসে উভয় পক্ষ থেকে প্রদত্ত বিনিময়দ্বয় পরস্পর হস্তগত করা মুদ্রাবিনিময় চুক্তির ক্ষেত্রে শর্ত। ইবনুল মুনযির রহ. বলেন, আমরা যাদের ইলম সংরক্ষণ করে থাকি তাদের সকলে একমত হয়েছেন, যদি মুদ্রাবিনিময়কারী দুই পক্ষ পারস্পরিক হস্তগত করার পূর্বেই মজলিস ত্যাগ করে তাহলে সরফ অর্থাৎ মুদ্রাবিনিময়-চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে মূলনীতি হলো রাসূল সা.-এর বাণী: 'নগদে সমান সমান করে স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ এবং নগদে সমান সমান করে রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য।' রাসূল সা. রৌপ্যের বিনিময়ে বাকিতে স্বর্ণ বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। অন্য হাদীসে এসেছে : 'রৌপ্যের বিনিময়ে স্বর্ণ বিক্রি করা সুদ, তবে নগদে বিক্রি হলে (তাতে সুদ হবে না)।'
মুদ্রাবিনিময়-চুক্তিকে ব্যাহতকারী মজলিস ত্যাগ হলো : চুক্তি সম্পাদনকারী দুই পক্ষ দৈহিকভাবে মজলিস ছেড়ে দিয়ে এক পক্ষ কোনো একদিকে চলে যাওয়া এবং অপর পক্ষ অন্য দিকে চলে যাওয়া। যদি চুক্তিকারী দুই পক্ষই মজলিসে থাকে, পৃথক না হয় তাহলে তারা উভয় পক্ষ মজলিস ত্যাগকারী হবে না—যদিও তারা দীর্ঘ সময় মজলিসে থাকে। মালেকী ফকীহগণ বলেন : যদি উভয় পক্ষ বাকি রাখে তাহলে চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে। কারণ উভয় পক্ষের বাকির বিষয়টি এমন দীর্ঘতার সন্দেহ সৃষ্টির কারণ যা পারস্পরিক হস্তগতকরণকে ব্যাহত করে।