📄 সরফ (صَرْفٌ)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ
আস-সরফু (الصرف) শব্দটি শাব্দিকভাবে বেশ কতক অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন : রদ্দুশ শাইয়ি 'আনিল ওয়াজহি অর্থাৎ কোনো বস্তুকে সামনে থেকে সরানো। যখন কেউ কাউকে সরিয়ে দেয় বলা হয় : সরফাহু ইয়াসরিফুহু সরফান। এমনিভাবে বলা হয়, সরফতুর রাজুলা 'আন্নি ফানসারাফা লোকটিকে আমি আমার সম্মুখ থেকে সরিয়ে দেওয়ায় সে সরেছে। সরফ-এর অপর অর্থ : আল-ইনফাকু। ব্যয় করা। যেমন : সরফতুল মালা আমি সম্পদ ব্যয় করেছি। অপর এক অর্থ : আল-বাইউ বিক্রি, বিনিময়। যেমন : সরফতুয যাহাবা বিদ দারা-হিমা আমি দিরহামের বিনিময়ে স্বর্ণ বিক্রি করেছি। এ অর্থে আস সরফু থেকে নির্গত কর্তাবাচক বিশেষ্য হলো সররাফুন ও মুসররিফুন। আর আধিক্য প্রকাশ করতে সররাফা ব্যবহৃত হয়। অর্থ : মুদ্রা ব্যবসায়ী, মুদ্রা বিনিময়কারী। সরফ-এর আরো একটি অর্থ আল-ফাদলু ওয়াল যিয়াদাতু : অতিরিক্ত, বাড়তি। ইবনে ফারিস রহ. বলেন, সরফ হলো এক দিরহামের চেয়ে অন্য দিরহামের গুণগত মান বেশি হওয়া এবং এক দিনারের চেয়ে অন্য দিনারের গুণগত মান বেশি হওয়া।
📄 পারিভাষিক অর্থ
পরিভাষায় সম্মিলিত ফকীহ সম্প্রদায় সরফের সংজ্ঞা প্রদান করেছেন, আস সরফু হলো : বাইউস সামানি বিস সামানি, জিনসান বি জিনসিন, আও বিগাইরি জিনসিন। অর্থাৎ শ্রেণীর মূল্যের বিনিময়ে মূল্য বিক্রি করা। সুতরাং এর আওতাভুক্ত থাকবে স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ বিক্রি, রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য বিক্রি, যেমনিভাবে এটি আওতাভুক্ত করে রৌপ্যের বিনিময়ে স্বর্ণ বিক্রি এবং স্বর্ণের বিনিময়ে রৌপ্য বিক্রিকে। এখানে সামান বা মূল্য দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যা মূল্যরূপে সৃষ্ট হয়েছে। তাই এর আওতাভুক্ত হবে (স্বর্ণ/রৌপ্যের) তৈরি বস্তুর বিনিময়ে তৈরি বস্তু বা মুদ্রা অথবা মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রা বা তৈরি বস্তু।
মারগিনানী রহ. বলেন, উভয় বিনিময়ে এক হাত থেকে অন্য হাতে সরানোর প্রয়োজন থাকার কারণে সরফ বলে এর নামকরণ করা হয়েছে। অথবা এ কারণে যে, এ ধরনের বিক্রি দ্বারা কেবল অতিরিক্ত ও বাড়তি অংশটুকু কাম্য হয়ে থাকে। কারণ স্বয়ং বস্তু দ্বারা কোনো রূপ উপকৃত হওয়া যায় না। আর সরফ অর্থ হলো অতিরিক্ত ও বাড়তি। মালেকী ফকীহগণ সরফের সংজ্ঞা প্রদান করেন, সরফ হলো ভিন্ন ধরনের মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রা বিক্রি করা, যেমন রৌপ্যের বিনিময়ে স্বর্ণ বিক্রি করা। পক্ষান্তরে একই ধরনের মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রা বিক্রি করা; যেমন স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ বিক্রি অথবা রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য বিক্রিকে মালেকী ফকীহগণ অন্য নামে অভিহিত করেন। তারা বলেন: যদি উভয় বিনিম্যের শ্রেণী একই হয় তাহলে পরিমাণ হিসাবে বিক্রি হলে তাকে আল-মুরাতালাহ আর সংখ্যা হিসাবে বিক্রি হলে তাকে আল-মুবাদালাহ বলা হয়।
📄 সংশ্লিষ্ট পরিভাষা
ক. আল-বাইউ : বিক্রি, কেনাবেচা। সাধারণ অর্থে বাইউ হলো পারস্পরিক সম্মতিক্রমে সম্পদের বিপরীতে সম্পদ বিনিময় করা। এ অর্থে মুদ্রা বিনিময় এক প্রকার বিক্রি। আর বিশেষার্থে বিক্রি হলো এমন বিনিময় চুক্তি যার দুই বিনিময়ের মধ্যে একটি স্বর্ণ বা রৌপ্য হবে না।
খ. আর-রিবা : সুদ। রিবা-এর শাব্দিক অর্থ : অতিরিক্ত, বাড়তি। মুদ্রা বিনিময় চুক্তির মধ্যে কোনো শর্তের ব্যত্যয় ঘটলে তাতে সুদের অনুপ্রবেশ ঘটে।
গ. আস-সালামু : সালাম বা অগ্রিম মূল্য পরিশোধে বিক্রি। নগদ মূল্যের বিনিময়ে কোনো বস্তু বাকিতে বিক্রি করা।
ঘ. আল-মুকায়াযাহ : মুকায়াযা বা পণ্য বিনিময়। বস্তুর বিনিময়ে বস্তু বিক্রি অর্থাৎ মুদ্রাদ্বয় ছাড়া অন্য সম্পদের বিপরীতে সম্পদ বিনিময় করা।
📄 الصَّرْفُ বা মুদ্রা বিনিময়-এর বৈধতা
যদি নির্দিষ্ট শর্তগুলো পরিপূর্ণভাবে থাকে তাহলে মূল্যসমূহের একটিকে আরেকটির বিনিময়ে বিক্রি করা অর্থাৎ মুদ্রা ব্যবসা করা বৈধ। কারণ পূর্বের আলোচনার ভিত্তিতে এই মুদ্রা বিনিময় ও এক প্রকার বিক্রি। মহান আল্লাহর ঘোষণা : 'আর আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদ অবৈধ করেছেন।' (সূরা বাকারা : ২৭৫)
মুদ্রা বিনিময়ের বৈধতার পক্ষে অনেক সহীহ হাদীস রয়েছে। যেমন উবাদা বিন সামিত রা. বর্ণনা করেন, রাসূল সা. বলেছেন: 'স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ, রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য, গমের বিনিময়ে গম, যবের বিনিময়ে যব, খেজুরের বিনিময়ে খেজুর, লবণের বিনিময়ে লবণ পরিমাণে সমান সমান এবং নগদে বিক্রি করা যাবে। আর যদি এগুলোর শ্রেণী ভিন্ন হয় তাহলে যেভাবে ইচ্ছা বিক্রি করো।' রাসূল সা. আরো বলেন : 'সমান সমান ব্যতীত স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ বিক্রি করো না, পরস্পরের বিনিময়ে কমবেশি করো না। এবং সমান সমান ব্যতীত রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য বিক্রি করো না, পরস্পরের মধ্যে হ্রাস-বৃদ্ধি করো না। এবং নগদের বিনিময়ে বাকিতে বিক্রি করো না।'
যেহেতু সরফ বা মুদ্রাবিনিময় চুক্তি হলো মূল্যসমূহের একটিকে আরেকটির বিনিময়ে বিক্রি করা এবং এর দ্বারা উদ্দেশ্য কেবল আধিক্য ও বৃদ্ধি, সাধারণ ভাবে হুবহু বিনিময় দ্বারা উপকৃত হওয়া উদ্দেশ্য নয়। অপর দিকে সুদের মধ্যেও অনুরূপ আধিক্য এবং বৃদ্ধি রয়েছে; সেহেতু ফকীহগণ মুদ্রাবিনিময়ে বৈধতার জন্য এমন কিছু শর্ত প্রণয়ন করেছেন যা সরফ বা মুদ্রাবিনিময়কে সুদ থেকে আলাদা করে দেয় এবং সুদের শিকার হওয়া থেকে মানুষকে রক্ষা করে।