📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন 📄 দ্বিতীয় : মুরাবাহা বিশুদ্ধ হওয়ার শর্তসমূহ

📄 দ্বিতীয় : মুরাবাহা বিশুদ্ধ হওয়ার শর্তসমূহ


মুরাবাহা চুক্তি বিশুদ্ধ হওয়ার জন্যে কয়েকটি শর্ত রয়েছে:
ক. প্রথম চুক্তি শুদ্ধ হওয়া। যেহেতু মুরাবাহা বিক্রি হলো প্রথম মূল্যের চেয়ে লাভে বিক্রি করা, তাই প্রথম চুক্তি ফাসেদ হলে মুরাবাহা বিক্রয় বৈধ হবে না। যদিও সামগ্রিকভাবে হানাফীদের নিকট বিক্রয় ফাসেদ হলেও তাতে মালিকানা অর্জিত হয়, তবে তাতে মালিকানা সাব্যস্ত হয় পণ্যের বাজার মূল্যে বা অনুরূপ বস্তু দ্বারা।
খ. প্রথম মূল্য সম্পর্কে অবগতি। প্রথম মূল্য সম্পর্কে দ্বিতীয় ক্রেতার অবগতি থাকা শর্ত। অতএব প্রথম মূল্য অজ্ঞাত থাকলে চুক্তি ফাসেদ হয়ে যাবে।
গ. মূলধন বা মূল্য মিছলী বা সদৃশ বস্তু হওয়া। মূলধন যদি সদৃশবস্তু হয়, তা পাত্র দিয়ে মাপার বা ওজন করার বা গনে গনে হিসাব করার কাছাকাছি বস্তু হোক, তাহলে পণ্য প্রথম মূল্যের থেকে বেশী মূল্যে মুরাবাহা পদ্ধতিতে বিক্রি করা যাবে। আর মূলধন যদি মূল্যনির্ভর বস্তু হয় যার অনুরূপ সামগ্রী নেই, তাহলে এমন ব্যক্তির কাছে তা মুরাবাহা পদ্ধতিতে বিক্রি করা জায়েয নেই যার মালিকানায় সেই সামগ্রীটি নেই। মালেকী ফকীহদের নিকট মূলধন যদি মূল্যনির্ভর বস্তু হয় তাহলে ক্রেতার নিকট সামগ্রী না থাকলে পণ্যটি মুরাবাহা পদ্ধতিতে বিক্রি করা যাবে না। শাফেয়ীগণ বলেন: ক্রেতা যদি পণ্যটি আসবাবপত্রের মাধ্যমে ক্রয় করে তবে সেক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে মুরাবাহা শুদ্ধ হবে।
ঘ. প্রথম চুক্তির মূল্যটি বস্তুটির মতো সুদী সম্পদ না হওয়া। হানাফী ও হাম্বলীদের নিকট পরিমাপযোগ্য ও ওজনযোগ্য প্রত্যেক বস্তু। মূল্য যদি এমন হয়, যেমন কেউ পরিমাপ যোগ্য বা ওজনযোগ্য বস্তুকে সমজাতীয় বস্তু দ্বারা সমান সমান করে ক্রয় করে, তাহলে হানাফীদের নিকট তার উক্ত বস্তু মুরাবাহা পদ্ধতিতে বিক্রি করা জায়েয নেই।
৫. লভ্যাংশ/মুনাফা জানা থাকা। মুনাফা সম্পর্কে জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। কারণ মুনাফা অজ্ঞাত হলে মূল্যও হবে অজ্ঞাত।

টিকাঃ
১২. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ७, পৃ. ৩১৯৮
১৩. বাদায়েউস-সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩১৯৩; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১৯৯; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭৭
১৪. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২২১; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ২৫২
১৫. আল-খিয়াশী, খ. ৫, পৃ, ১৭২; মিনহুল জালীল, খ. ২, পৃ. ১৮২
১৬. ফাতহুল আজীজ, খ. ৯, পৃ. ১১; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭৯
১৭. আল-মুগনী ও আশ শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ২৬৩; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ২৩২
১৮. আল-মাবসূত, খ. ১৩, পৃ. ৮২, ৮৯; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২২২
১৯. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩১৯৫

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন 📄 মূল্য কমবেশী করার বিধান

📄 মূল্য কমবেশী করার বিধান


কেউ যদি কোনো পণ্য ক্রয় করে এবং নির্দিষ্ট মূল্যে বিক্রয় সংঘটিত হয়, তারপর সে নির্দিষ্ট মূল্যে বাড়ানো কমানো হয় এবং এ কমবেশী মূল্যেই বিক্রয় সম্পন্ন হয়। বৃদ্ধি বা হ্রাস হয়তো খিয়ারের সময় ঘটবে বা বিক্রয়চুক্তি অত্যাবশ্যক হওয়ার পর ঘটবে। যদি খিয়ারের সময়ে ঘটে তাহলে এই কমা-বাড়াটা মূল্যের সাথে যোগ হবে।

আর যদি হ্রাসবৃদ্ধি বিক্রয়চুক্তি আবশ্যিক হওয়ার পর ঘটে, তাহলে হানাফীগণ বলেন, ক্রেতা প্রথম মূল্যের সাথে যে টাকা বাড়িয়ে দেবে তা মূল চুক্তির সাথে যুক্ত হবে। তদ্রূপ প্রথম বিক্রেতা যদি ক্রেতাকে কিছু মূল্য মাফ করে দেয় তাহলে তা মূল চুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে। মালেকি ফকীহদের নিকট প্রথম বিক্রেতা যদি ক্রেতাকে কিছু মূল্য উপহার দেয় এবং উক্ত ক্রেতা দ্রব্যটিকে মুরাবাহা পদ্ধতিতে বিক্রি করতে চায়, তাহলে দ্বিতীয় ক্রেতাকে তা অবহিত করতে হবে—যদি এ ধরনের দান মানুষের মাঝে প্রচলিত থাকে। শাফেয়ীদের অভিমত হলো, বিক্রয়চুক্তি আবশ্যক হওয়ার পর মূল্য কমবেশী হওয়া মূল চুক্তির সাথে যুক্ত হবে না। কেননা সেই কমবেশীটা উপহার ও স্বেচ্ছাপ্রদত্ত দান বলে পরিগণিত হবে। তবে শব্দরূপ যদি এমন হয়, 'আমার যত পড়েছে তাতে লাভ করে বিক্রি করলাম', তাহলে কমবেশীটা মূলধনের সাথে যুক্ত হবে।

টিকাঃ
২০. আল-মুগনী ও আশ শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ২৬০
২১. আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ২৯৬
২২. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ২২২
২৩. আল-খিরাশী, খ, ৫, পৃ. ১৭৬-১৭৭; মিনহুল জালীল, খ. ২, পৃ. ১৮৮
২৪. আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ২৯৬; ফাতহুল আজীজ, খ. ৯, পৃ. ১০; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭৮; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২২৩
২৫. আল-মুগনী ও আশ শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ২৬০; আল-ইনসাফ, খ. ৪, পৃ. ৪৪১

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন 📄 বিক্রীত বস্তু হতে সৃষ্ট বর্ধিত বস্তুর বিধান

📄 বিক্রীত বস্তু হতে সৃষ্ট বর্ধিত বস্তুর বিধান


বিক্রীত পণ্যে যদি আলাদা কোনো বস্তুর পরিবৃদ্ধি ঘটে, যেমন বাঁদীর সন্তান, গাভীর দুধ, গাছের ফল ইত্যাদি। হানাফীদের নিকট পণ্যের মালিক উক্ত পণ্য তার অবস্থা বর্ণনা ব্যতীত মুরাবাহা পদ্ধতিতে বিক্রি করতে পারবে না; যেহেতু পণ্য থেকে সৃষ্ট বাড়তি বস্তুও তাদের নিকট পণ্য বলে বিবেচ্য। আর যদি বিক্রীত পণ্য হতে উদ্ভূত বস্তু আসমানী দুর্যোগের কারণে ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে বর্ণনা ব্যতীতই তা মুরাবাহা পদ্ধতিতে বিক্রি করতে পারবে।

মালেকীগণ বলেন: মুরাবাহা পদ্ধতিতে যে বিক্রয় করছে সে চতুষ্পদ জন্তুর বাচ্চা প্রসব-এর বিষয়টি ক্রেতাকে অবহিত করবে। এমনিভাবে বিক্রীত জন্তুর পশম যদি কর্তন করা হয় তাও বর্ণনা করবে। পক্ষান্তরে বিক্রেতা যদি বকরির দুধ দোহন করে তাহলে মুরাবাহা পদ্ধতিতে বিক্রয়ের ক্ষেত্রে তার এ বিষয়টি বর্ণনা করা অপরিহার্য নয়।

শাফেয়ীগণ বলেন, বিক্রেতার মালিকানায় থাকাকালে মূল বস্তু (পণ্য) থেকে যদি কোনো সন্তান, দুধ, ফল-মূল ইত্যাদি সৃষ্টি হয়; তাহলে তা মূল্য হ্রাস করবে না। কারণ, বর্ধিত বস্তুটি চুক্তিতে শামিল নয়। হাম্বলীগণ শাফেয়ীদের সাথে বর্ধিত বস্তুর বিধানের ক্ষেত্রে একমত পোষণ করেছেন।

টিকাঃ
২৬. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২২৩-২২৪
২৭. আততাজ ওয়াল-ইকলীল লিল মাওয়াক হাত্তাব-এর টীকা সহ, খ. ৪, পৃ. ৪৯৩
২৮. আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ২৯৬
২৯. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ২০১

📘 ইসলামের ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন 📄 প্রথম ক্রেতা কর্তৃক পণ্যে কোনো কিছু সংযোজনের বিধান

📄 প্রথম ক্রেতা কর্তৃক পণ্যে কোনো কিছু সংযোজনের বিধান


হানাফীগণ বলেন: প্রথম ক্রেতা মূলধনের সাথে ধোপা, রঙমিস্ত্রি, দর্জি, এজেন্ট/দালাল ইত্যাদির পারিশ্রমিক এবং ঘর ভাড়া, গবাদি পশুর খাদ্য বাবত খরচ প্রভৃতি সংযোজন করতে পারবে। কেননা ব্যবসায়ীদের প্রথা হলো তারা যাবতীয় খরচ মূল পণ্যের মূল্যভুক্ত মনে করে তাতে যুক্ত করে। তবে রাখাল, ডাক্তার, অপরাধের মুক্তিপণ ইত্যাদি খাতে যে অর্থ-কড়ি সে ব্যয় করেছে এগুলো মূলধনের সাথে সম্পৃক্ত করা হবে না।

মালেকীগণ এ পদ্ধতির সাথে একমত পোষণ করেছেন। তারা বলেন, বিক্রেতা ক্রেতার ওপর সেসব বস্তুর মুনাফা হিসাব করবে, যেসব বস্তুর মূলসত্তা পণ্যের সাথে বিদ্যমান। শাফেয়ীগণও এরকম মত পোষণ করেছেন যে, পরিমাপকারী, দালাল, ধোপা, রংরেজ ইত্যাদির মজুরী এবং রঙের মূল্য মূল্যে অন্তর্ভুক্ত হবে। বিক্রেতা বিক্রয়ের সময় বলবে, 'আমার এত টাকা পড়েছে'। হাম্বলীদের বর্ণনা হলো, প্রথম ক্রেতা পণ্যে যদি কোনো কাজ করে যেমন- কাপড় পরিষ্কার করল বা কাপড় কেটে জামা বানাল, তাহলে তা বর্ণনা করবে। ক্রেতার জন্য একথা বলা বৈধ নয় যে, এত টাকায় বস্তুটি সংগৃহীত হয়েছে।

টিকাঃ
৩০. ইমাম আহমাদ র. সংকলন করেছেন, খ. ১, পৃ. ৩৭৯
৩১. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২২৩; ফাতহুল কাদীর, খ. ৬, পৃ. ৪৯৮
৩২. আশ শারহুস সাগীর, খ. ৩, পৃ. ২১৭; মাওয়াহিবুল জালীল লিল হাত্তাব, খ. ৪, পৃ. ৪৮৯
৩৩. মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭৮; আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ২৯৫
৩৪. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ২০১

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية