📄 মুরাবাহা সংক্রান্ত শরয়ী বিধান
সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকীহদের মতে মুরাবাহা চুক্তি বৈধ হওয়ার দলিল আল্লাহ তাআলার বাণী : 'এবং আল্লাহ বিক্রি বৈধ করেছেন।' এ আয়াতের মর্মে ব্যাপকতার কারণে তাতে মুরাবাহাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আল্লাহ তাআলার অপর বাণী : 'কেবল তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ' আয়াতের এ অংশটিও মুরাবাহার বৈধতার এক দলিল।
তা ছাড়া মুরাবাহা চুক্তিটিও ক্রেতা-বিক্রেতা পরস্পরের সম্মতিক্রমে অনুষ্ঠেয় একটি চুক্তি। ফকীহগণ আরো যুক্তি দিয়েছেন, এ চুক্তির মধ্যে শরয়ী জায়েযের শর্তসমূহ পর্যাপ্ত পরিমাণে বিদ্যমান। এবং এ ধরনের লেনদেন করার প্রয়োজন রয়েছে। কেননা অনভিজ্ঞ ব্যবসায়ী অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তির কাজে নির্ভর করার প্রয়োজন বোধ করে এবং বিক্রেতারও অনুরূপ আদায়কৃত মূল্যে লাভসহ বিক্রয় করতে মন তৃপ্ত হয়। অতএব মুরাবাহার বৈধতা আবশ্যক।
টিকাঃ
৭. সূরা আল-বাক্বারা, আয়াত-২৭৫
৮. সূরা আন নিসা: আয়াত-২৯
৯. ফাতহুল কাদীর, খ. ৬, পৃ. ৪৯৭, আল-মুহাযযাব, খ. ১, পৃ. ৩৮২; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১৯৯
১০. আশ শারহুস সাগীর, খ. ৩, পৃ. ২২৫; মাওয়াহিবুল জালীল লিল হাত্তাব, খ. ৪, পৃ. ৪৮৮
১১. আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১৯৯; মুদ্রণ: রিয়াদ।
📄 মুরাবাহার শর্তসমূহ
সমস্ত ক্রয়-বিক্রয়ে যা কিছু শর্ত বাইয়ে মুরাবাহার ক্ষেত্রেও সে সব-ই শর্ত। তৎসঙ্গে মুরাবাহা চুক্তির সাথে সামঞ্জস্যশীল আরো কিছু শর্ত রয়েছে। নিম্নে সে সবের বিবরণ দেওয়া হলো।
📄 প্রথম : শব্দরূপের সাথে সম্পর্কিত শর্তসমূহ
সমস্ত চুক্তির শব্দে যা কিছু শর্ত মুরাবাহার শব্দরূপের মধ্যে সেগুলো-ই শর্ত। তা হলো, ১. ঈজাব ও কবুলের অর্থ সুস্পষ্ট হওয়া। ২. উভয়টি পরস্পর সঙ্গতিপূর্ণ হওয়া। ৩. উভয়টি একত্রে হওয়া। বিস্তারিত 'শব্দ' শিরোনামে দ্রষ্টব্য।
📄 দ্বিতীয় : মুরাবাহা বিশুদ্ধ হওয়ার শর্তসমূহ
মুরাবাহা চুক্তি বিশুদ্ধ হওয়ার জন্যে কয়েকটি শর্ত রয়েছে:
ক. প্রথম চুক্তি শুদ্ধ হওয়া। যেহেতু মুরাবাহা বিক্রি হলো প্রথম মূল্যের চেয়ে লাভে বিক্রি করা, তাই প্রথম চুক্তি ফাসেদ হলে মুরাবাহা বিক্রয় বৈধ হবে না। যদিও সামগ্রিকভাবে হানাফীদের নিকট বিক্রয় ফাসেদ হলেও তাতে মালিকানা অর্জিত হয়, তবে তাতে মালিকানা সাব্যস্ত হয় পণ্যের বাজার মূল্যে বা অনুরূপ বস্তু দ্বারা।
খ. প্রথম মূল্য সম্পর্কে অবগতি। প্রথম মূল্য সম্পর্কে দ্বিতীয় ক্রেতার অবগতি থাকা শর্ত। অতএব প্রথম মূল্য অজ্ঞাত থাকলে চুক্তি ফাসেদ হয়ে যাবে।
গ. মূলধন বা মূল্য মিছলী বা সদৃশ বস্তু হওয়া। মূলধন যদি সদৃশবস্তু হয়, তা পাত্র দিয়ে মাপার বা ওজন করার বা গনে গনে হিসাব করার কাছাকাছি বস্তু হোক, তাহলে পণ্য প্রথম মূল্যের থেকে বেশী মূল্যে মুরাবাহা পদ্ধতিতে বিক্রি করা যাবে। আর মূলধন যদি মূল্যনির্ভর বস্তু হয় যার অনুরূপ সামগ্রী নেই, তাহলে এমন ব্যক্তির কাছে তা মুরাবাহা পদ্ধতিতে বিক্রি করা জায়েয নেই যার মালিকানায় সেই সামগ্রীটি নেই। মালেকী ফকীহদের নিকট মূলধন যদি মূল্যনির্ভর বস্তু হয় তাহলে ক্রেতার নিকট সামগ্রী না থাকলে পণ্যটি মুরাবাহা পদ্ধতিতে বিক্রি করা যাবে না। শাফেয়ীগণ বলেন: ক্রেতা যদি পণ্যটি আসবাবপত্রের মাধ্যমে ক্রয় করে তবে সেক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে মুরাবাহা শুদ্ধ হবে।
ঘ. প্রথম চুক্তির মূল্যটি বস্তুটির মতো সুদী সম্পদ না হওয়া। হানাফী ও হাম্বলীদের নিকট পরিমাপযোগ্য ও ওজনযোগ্য প্রত্যেক বস্তু। মূল্য যদি এমন হয়, যেমন কেউ পরিমাপ যোগ্য বা ওজনযোগ্য বস্তুকে সমজাতীয় বস্তু দ্বারা সমান সমান করে ক্রয় করে, তাহলে হানাফীদের নিকট তার উক্ত বস্তু মুরাবাহা পদ্ধতিতে বিক্রি করা জায়েয নেই।
৫. লভ্যাংশ/মুনাফা জানা থাকা। মুনাফা সম্পর্কে জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। কারণ মুনাফা অজ্ঞাত হলে মূল্যও হবে অজ্ঞাত।
টিকাঃ
১২. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ७, পৃ. ৩১৯৮
১৩. বাদায়েউস-সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩১৯৩; আল-মুগনী, খ. ৪, পৃ. ১৯৯; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭৭
১৪. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২২১; ফাতহুল কাদীর, খ. ৫, পৃ. ২৫২
১৫. আল-খিয়াশী, খ. ৫, পৃ, ১৭২; মিনহুল জালীল, খ. ২, পৃ. ১৮২
১৬. ফাতহুল আজীজ, খ. ৯, পৃ. ১১; মুগনিল মুহতাজ, খ. ২, পৃ. ৭৯
১৭. আল-মুগনী ও আশ শারহুল কাবীর, খ. ৪, পৃ. ২৬৩; কাশশাফুল কিনা, খ. ৩, পৃ. ২৩২
১৮. আল-মাবসূত, খ. ১৩, পৃ. ৮২, ৮৯; বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৫, পৃ. ২২২
১৯. বাদায়েউস সানায়ে, খ. ৭, পৃ. ৩১৯৫