📄 সালামের মূলধনের শর্তাবলি
ফকীহগণ সালামের মূলধনের ক্ষেত্রে দুইটি শর্ত করেছেন:
প্রথম শর্ত: মূলধনটি জ্ঞাত বিষয় হতে হবে। ফকীহদের এ কথায় কোনোরূপ মতবিরোধ নেই, মূলধনটি জ্ঞাত বিষয় হওয়া শর্ত। কারণ মূলধনটি আর্থিক বিনিময় চুক্তির একটি বিনিময়, অতএব অন্য সমস্ত বিনিময়-চুক্তির ন্যায় এখানেও এটি জ্ঞাত হওয়া আবশ্যক। হানাফী ফকীহগণের মধ্যে আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ, প্রকাশ্য বর্ণনা মতে শাফেয়ী ফকীহগণ এবং হাম্বলী ফকীহগণের মতে মূলধনটি নির্দিষ্ট হলে তা দেখাই যথেষ্ট। তবে হাম্বলী ফকীহগণের নিকট নির্ভরযোগ্য মতে মূলধনের পরিমাণ এবং গুণাগুণ উল্লেখ করা আবশ্যক।
দ্বিতীয় শর্ত: চুক্তির বৈঠকে মূলধন হস্তান্তর করা। হানাফী, শাফেয়ী এবং হাম্বলী ফকীহগণের মাযহাব হলো, চুক্তির মজলিসে সালামের মূলধন হস্তান্তর করা সালাম শুদ্ধ হওয়ার একটি শর্ত। সুতরাং যদি হস্তান্তরের পূর্বে ক্রেতা-বিক্রেতা মজলিস ত্যাগ করে তাহলে চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে।
মালেকী ফকীহগণ তাদের প্রসিদ্ধ মতানুসারে, চুক্তির মজলিসে সালামের মূলধন নগদ পরিশোধের শর্ত সংক্রান্ত আলোচনায় জমহুর ফকীহ সম্প্রদায়ের বিরোধিতা করেছেন। তারা বলেছেন, শর্ত সাপেক্ষে এবং বিনা শর্তে দুই তিন দিন পর্যন্ত সালামের মূলধন পরিশোধে বিলম্ব করা বৈধ।
যদি সালামের ক্রেতা সালামের বিক্রেতার দায়িত্বে থাকা ঋণকে সালামের মূলধনে পরিণত করতে চায় তাহলে হানাফী, শাফেয়ী, হাম্বলী এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকীহগণের মতে এটি বৈধ নয়। যেহেতু এটি সালাম চুক্তিটিকে বাকির বিনিময়ে বাকি বিক্রিতে পরিণত করে। তবে শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া ও ইবনুল কাইয়িম রহ. এটি জায়েয বলেছেন যদি ঋণটি বর্তমানে পরিশোধ্য হয়।
📄 সালামের পণ্যের শর্তাবলি
প্রথম শর্ত: সালামের পণ্যটি দায়িত্বে আবশ্যক ও গুণাগুণ বর্ণনাকৃত ঋণ হওয়া। সালামের পণ্যটি সালামের বিক্রেতার দায়িত্বে আবশ্যক এবং গুণাগুণ বর্ণনাকৃত ঋণ হওয়ার ব্যাপারে ফকীহগণের মধ্যে কোনোরূপ মতভেদ নেই। যদি বিশেষভাবে নির্দিষ্ট কোনো বস্তুকে সালামের পণ্যরূপে নির্ধারণ করা হয় তাহলে সালাম শুদ্ধ হবে না। কারণ এটি প্রত্যাশিত উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।
সালামের পণ্যটি দায়িত্বে আবশ্যক দেনা হওয়ার শর্ত করাকে ভিত্তি করে ফকীহগণ বলেছেন, যে সমস্ত সম্পদ সালামের পণ্য হতে পারে তা হলো সমজাত বস্তু অর্থাৎ পরিমাপযোগ্য বস্তু, পরিমাণযোগ্য বস্তু, গজে বিক্রয়যোগ্য বস্তু, কাছাকাছি গড়নের সংখ্যায় গণনাযোগ্য বস্তু। পক্ষান্তরে যে সব সম্পদের গুণাগুণ আয়ত্ত করা যায় না সে সব সম্পদে সালাম বৈধ নয়।
মালেকী, শাফেয়ী এবং হাম্বলী ফকীহ সম্প্রদায় সালামের মূলধনটি অমুদ্রা হওয়ার শর্তে মুদ্রার সালাম বৈধ হওয়ার কথা বলেছেন। এ ব্যাপারে হানাফী ফকীহগণ মতবিরোধ করে বলেছেন, সালামের পণ্য মুদ্রা হওয়া বৈধ নয়। কারণ মুদ্রাকে নির্দিষ্ট করার দ্বারা মুদ্রাবিনিময় চুক্তিতে নির্দিষ্ট হয় না।
📄 দ্বিতীয় শর্ত : সালামের পণ্যটি উভয়ের জ্ঞাত হওয়া
ফকীহগণের মধ্যে এ শর্তে কোনোরূপ মতভেদ নেই, সালাম শুদ্ধ হওয়ার জন্য, সালামের পণ্যটি এমন জ্ঞাত ও স্পষ্ট হতে হবে যা তার অস্পষ্টতা দূর করবে এবং তা হস্তান্তরকালে চুক্তি সম্পাদনকারী দুই পক্ষের (সম্ভাব্য) বিবাদের রাস্তা বন্ধ করে দেবে। ফকীহগণ শর্ত করেছেন, সালাম চুক্তির মধ্যে পণ্যের শ্রেণী উল্লেখ করতে হবে এবং ধরন উল্লেখ করতে হবে। ফকীহগণ রাসূল স.-এর হাদীসের কারণে সালামের পণ্যে পরিমাণ বর্ণনা করা শর্ত করেছেন। পরিমাণের বর্ণনাটি এমন যে কোনো পদ্ধতিতে হতে পারে যা, ঐ পরিমাণ থেকে অজ্ঞতা ও অস্পষ্টতা দূর করবে।
সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকীহ তথা হানাফী, শাফেয়ী এবং হাম্বলী ফকীহগণের মতে সুনির্দিষ্ট ও প্রচলিত পরিমাপক যে কোনো একক দ্বারা সালামের পণ্য নির্দিষ্ট করার লক্ষ্যে চুক্তিকারী দুই পক্ষ একমত হওয়ায় কোনো সমস্যা নেই; যদিও তা নবী স.-এর আমলে ব্যবহৃত না হয়ে থাকে। মালেকী ফকীহগণ বলেন : যে দেশে সালাম সম্পাদিত হচ্ছে সে দেশের নাগরিকদের প্রচলন বিবেচ্য। যদি সালামের পণ্যটি এমন মূল্যজাত বস্তু হয় যার এককগুলো বিভিন্ন ধরনের, তবে তার গুণাগুণ বর্ণনার শর্তে সালাম বৈধ হবে।
📄 তৃতীয় শর্ত : সালামের পণ্য বিলম্বিত ও বাকি থাকা
হানাফী, মালেকী ও হাম্বলী ফকীহ সম্প্রদায় সালাম শুদ্ধ হওয়ার জন্য শর্ত করেন, সালামের পণ্যটি নগদ না হয়ে বাকি হতে হবে। অতএব নগদ সালাম শুদ্ধ হবে না। বাকির শর্ত করার ক্ষেত্রে তাদের প্রমাণ হলো রাসূল সা.-এর হাদীস, যেখানে তিনি মেয়াদের নির্দেশ প্রদান করেছেন। তাছাড়া কোমল আচরণ হিসাবে সালাম বৈধ করা হয়েছে। মেয়াদ নির্ধারণ করা হলেই কোমল আচরণ হবে।
শাফেয়ী মাযহাবের ফকীহগণের মাযহাব হচ্ছে, বাকি সালামের ন্যায় নগদ সালাম বৈধ। এর পক্ষে তাদের প্রমাণ হলো বাকি সালামের তুলনায় তা অগ্রগণ্য হওয়ার কিয়াস। তারা বলেন, নগদে হস্তান্তর করা হলে ধোঁকা ও প্রতারণা থেকে তা অধিক নিরাপদ হয়।